Published : 26 Feb 2026, 08:18 PM
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি আসতেই আমরা আবেগে উদ্বেলিত হই। বাংলা ভাষার জন্য এ মাসে আমরা একটু বেশিই দরদী হয়ে উঠি। সারা বছর মাতৃভাষাটাকে অবহেলা করার জন্য এ যেন প্রায়শ্চিত্তের মাস। এ প্রায়শ্চিত্তেও কাজের চেয়ে কথাই বেশি। প্রায়শ্চিত্তটাতেও তারাই বাড়াবাড়ি করেন যারা এ ভাষাকে অবহেলা করেন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সব শেষে দেশে বাংলা ভাষার যে অবস্থা তা যা ছিল তাই থেকে যায়—মানে থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়।
এ মাসে শহুরে বাঙালির বই কেনার হার অবশ্য একটু বেড়ে যায়, বিশেষ করে ঢাকায় বাংলা একাডেমির বইমেলার কারণে। কেউ কেউ হয়তো বছরে দু-একটা বই কেনেন, হয়তো নিজের জন্য নয়, ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য। তাও মন্দের ভালো। কিন্তু সত্যিই ভালো হতো যদি মানুষ সারা বছরই বই কিনত। যেসব বই মানুষ বেশি কেনে, সেগুলো আসলে মানসম্মত কি না—সেটাও দেখার বিষয়। বই কেনার অভ্যাস না থাকলে বেশিরভাগ সময় মন্দ বই কেনাই স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ কারণেই আমাদের বইমেলায় এত মন্দ বইয়ের ছড়াছড়ি। ক্রেতা যদি বইয়ের সঙ্গে চেয়ারটেবিল বা হাঁড়িপাতিলের পার্থক্য বুঝতে না পারেন, তাহলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে ক্রেতারা চকচকে বিজ্ঞাপন বা আবেদনময়ী ভাষার ওপর নির্ভর করেন। ফলে মানহীন বইয়ের ভিড়ে অনেক ভালো মানের বইয়ের নাম হারিয়ে যায়।
তাহলে করণীয় কী? করণীয় হলো বই নিয়ে আলোচনা বাড়ানো। ভালো আলোচনা, বেশি আলোচনা এবং দেশব্যাপী তা সম্প্রসারণ। কিন্তু বই না পড়লে বই নিয়ে আলোচনাই বা আসবে কোত্থেকে? সংকট হচ্ছে বাংলাদেশে ভালো মানের বইয়ের আলোচনা বলতে গেলে নেই বললেই চলে। বইমেলা শুরু হলে পত্রপত্রিকায় নতুন বইয়ের ছবি ছাপা হয়। তাতে কিছু ভালো বইয়ের নাম জানা যায় ঠিকই, কিন্তু গভীরভাবে কিছু বোঝা যায় না। পত্রিকায় যা ছাপা হয়, তা প্রকাশনা ব্যবসার জন্য উপকারী হলেও লেখক ও পাঠকের কাজে লাগে না; অপাঠকদের কাছে কিছু বইয়ের খবর পৌঁছাতে পারে মাত্র। তাহলে বাংলাদেশে বইয়ের আলোচনার অবস্থা কী? এক কথায় করুণ।
প্রথমত বইয়ের আলোচনাকে এদেশে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করা হয় না। পত্রপত্রিকায় বা আনুষ্ঠানিকভাবে বইয়ের আলোচনা নেই বললেই চলে। আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করলে কোনো কোনো লেখককেও অনুপস্থিত থাকতে দেখা যায়—তাদের কারও কারও অহমিকার জন্য হয়তো। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখক নিজেই হয়তো আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজক, তাই উপস্থিত থাকেন। কোনো খ্যাতিমান লেখক যদি তার বইয়ের আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকেন, তা আলোচককে অনুৎসাহিত করে, কেননা যে আলোচনাটি তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন লেখকের নিজের কাছে তার কোনো মূল্য নেই। আমার নিজের এ অভিজ্ঞতা আছে বলে এটি উল্লেখ করছি।
লেখকের নিজের যদি এমন মানসিকতা হয়, তবে বইয়ের আলোচনায় কেউ উৎসাহিত হবেন কেন? আবার অনেক হামবড়া লেখক আছেন যাদের বইয়ের আলোচনা কেউ করলে লেখক ভাবেন আলোচক এর দ্বারা বর্তে গেছেন! খ্যাতিমান লেখকের ঘাড়ে ভর করে কোনো উঠতি লেখক যেন নিজের নাম কামাই করার ধান্দায় আছেন। কোনো লেখক যিনি এত উন্নাসিক হন, তিনি যত খ্যাতিমানই হন, কোনোভাবেই একজন মহৎ লেখক হওয়া দূরে থাক, তিনি যে ভালো মানুষই নন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আবার বই নিয়ে যেসব অল্পস্বল্প আলোচনা অনুষ্ঠান দেশে হয়, সেখানে এমনসব খ্যাতিমান আলোচক মঞ্চ আলোকিত করেন যে, তারা অনেকে আলোচ্য বইটি ছুঁয়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করেন না। কিন্তু আয়োজকগণ হয়তো বইয়ের আলোচনা ততখানি চান না, যতখানি চান মঞ্চে নামডাকওয়ালা ব্যক্তির উপস্থিতি। অনেকেই তারা বলেন, “আমি বইটি পড়ে দেখার সময় পাইনি”, বা “এখানে এসে কথা শুনে বুঝতে পারছি”, বা “কাল রাতে বইয়ের দু-চার পাতা পড়ে দেখেছি”, ইত্যাদি। এতেই আয়োজক ও আলোচ্য বইয়ের লেখক লজ্জাহীনভাবে খুশি হন! বই নিয়ে সত্যিকার আলোচনা তাহলে উৎসাহিত হবে কী করে?
তা হবে যখন আলোচ্য বই মন দিয়ে পড়ে লেখককে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি করা হবে, খ্যাতির বিচারে কোনো ছাড় না দিয়ে। তবে সব লেখকেরই মনের গোপন বাসনা থাকে প্রশংসা লাভ। এমনকি মিথ্যা প্রশংসায় ভেসে যেতে চান বেশিরভাগ। সত্য সমালোচনার প্রতি থাকে তীব্র বিদ্বেষ। কোনো কোনো লেখক আশাই করেন তার লেখা নিয়ে কেবল ভূয়সী প্রশংসা হবে, ন্যূনতম সমালোচনা নয়। সত্যিকার ভালো লেখকের ক্ষেত্রে এটি শিশুসুলভ দুর্বলতা, মধ্যম মানের লেখকের ক্ষেত্রেও একে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখা যায়। তা বলে অবশ্য সমালোচক সৎ সমালোচনা হতে বিরত হতে পারেন না, কেননা তাহলে তিনি পাঠকের সঙ্গে ও সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে প্রতারণা করবেন।
সমালোচক কোনো গুণ বা ত্রুটি বললেই যে তা সর্বসম্মতভাবে মানতে হবে, তা নয়। একেক সমালোচকের একেক রকম দৃষ্টিভঙ্গি, বিচারপদ্ধতি ও মূল্যায়ন থাকে। তাছাড়া পাঠিকা-পাঠকও স্বাধীন। সমালোচনার মূল উদ্দেশ্য অবশ্য লেখককে নিছক প্রশংসা বা কেবল সমালোচনা নয়, আলোচ্য বইয়ের সঙ্গে পাঠকের সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এটাই সমালোচকের প্রধান কাজ বলে মনে করতেন। বইয়ের ক্ষেত্রেও তাই। বইটি পড়তে পাঠককে উৎসাহিত করা। তাই বলে একটি মানহীন বই পড়তে পাঠককে উৎসাহিত করাও অনৈতিক। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন তার ভালো-মন্দ দিকগুলো তুলো ধরা এবং একইসঙ্গে পাঠকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সম্মান করা।
কিন্তু বইয়ের আলোচনা তিনি কোথায় প্রকাশ করবেন? বেশিরভাগ পত্রপত্রিকা বইয়ের আলোচনার ব্যাপারে অনাগ্রহী। অনেক সম্পাদকের কাছেই এ ধরনের আলোচনা কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা হিসেবে বিবেচ্য নয়। পৃথিবীর অনেক খ্যাতিমান পত্রপত্রিকা কেবল বইয়ের আলোচনা নিয়ে মাঝেমাঝেই বিরাট সাপ্লিমেন্টারি বা বিশেষ সংখ্যা বের করে থাকে। তাছাড়া বইয়ের আলোচনাকে সাহিত্যের, রাজনীতির, অর্থনীতির বা যে কোনো বিষয়ের জন্য স্বতন্ত্র লেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে একে কেবল আলাদা করে পুস্তক আলোচনা হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়। অতএব লেখা পেলে সম্পাদক হয়তো গর্বভরে বলে বসবেন, আমরা বইয়ের আলোচনা ছাপি না। একটি রাজনৈতিক গ্রন্থের আলোচনা সম্পর্কে উপসম্পাদকীয় পাতার সম্পাদক বলবেন, এটা তো বই-আলোচনা, আমার বিষয় না। সাহিত্যপাতার সম্পাদক বলবেন, এটা তো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বা বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা, সাহিত্য নয়। অতএব সেখানেও জায়গা নেই। কেবল যিনি বা যারা ‘গ্রন্থ আলোচনা’ বলে কোনো জায়গা বরাদ্দ রাখেন সেখানে ছাড়া আর কোথাও এর জায়গা নেই। যেখানে সম্পাদকদের দৃষ্টিভঙ্গি এই সেখানে ভালো বই এবং সে কারণে ভালো চিন্তা ও লেখা কীভাবে প্রচারিত ও সম্মানিত হবে? তবে বইয়ের আলোচনায় পাঠকদেরও উৎসাহ প্রকাশ করতে হবে, যা সম্পাদকের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে সাহায্য করবে।
বিস্তারিত আলোচনা-সমালোচনাসহ ভালো বইয়ের কথা প্রচারিত না হলে পাঠক সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন কী করে? এরকম পরিস্থিতিতে লেখা যার বা যাদের সাধনা তারা ও সৎ প্রকাশক উভয়েরই টিকে থাকা কঠিন। আর মানসম্মত প্রকাশনা না টিকলে একটি জাতির মেধাবী হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। বইয়ের, চলচ্চিত্রের, নাটকের ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গির আলোচনা-সমালোচনা তাই একটি গুরু ও পবিত্র দায়িত্ব। একে বিকশিত করতে লেখক, পাঠক, সম্পাদক, প্রকাশকসহ সকলের অকুণ্ঠচিত্তে সহায়তা করা উচিত।
তবে প্রকাশকের ও গণমাধ্য্যমের দায়িত্ব এক্ষেত্রে সর্বাধিক। আমাদের দেশের বেশিরভাগ প্রকাশক বই ছাপানোতেই দায়িত্ব শেষ করেন, তা প্রচারের কোনো উদ্যোগ নেন না বললেই চলে। তার প্রয়োজনও মনে করেন না, যেহেতু ব্যবসার কাজটা তারা লেখকের ওপর দিয়েই সেরে নেন। বই-আলোচনা নিয়ে গণমাধ্যমের দৃষ্টিও সংকীর্ণ হওয়ায় তারা একে পৃষ্ঠপোষকতা করে না বললেই চলে।
এই ভাষার মাসে কিছু পত্রপত্রিকা নিয়মিত কিছু ভালো বইয়ের প্রচ্ছদ ও দাম ছাপবে। কিন্তু যেসব ভালো বই বেরুবে সেগুলো নিয়ে তেমন কোনো দীর্ঘ আলোচনা প্রকাশ হবে খুব কম। সম্পাদকদের এ ব্যাপারে আরও উদার হওয়া প্রয়োজন যা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব না। নতুন-পুরনো অনেক ভালো বই-ই বেরুবে। কিন্তু একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমি ভালো বইয়ের মোটামুটি ধারণা কোথায় পাব বই-আলোচনা ছাড়া? আর এই আলোচনা ছাড়া বিকশিত হবে না মানসম্মত প্রকাশনা শিল্প, জ্ঞানচর্চা, পাঠকের মান—উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে না আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বহুল পরিমাণে ও দীর্ঘ বইয়ের আলোচনা তাই ভাষার মাসে অতীব জরুরি।