বাংলাদেশে কি অপরাধের বিচার করা যাবে না?

আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এই তত্ত্বে বিশ্বাস করলে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন বলে কাউকে ফৌজদারি অভিযোগ থেকে রেহাই দেয়ার সুযোগ নেই। নোবেল বিজয়ীদের, বিশেষ করে যারা শান্তির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন, তাদেরকে দুধে ধোয়া তুলসি পাতা ভাবারও কোন কারণ নেই।

শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকশামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক
Published : 31 August 2023, 11:30 AM
Updated : 31 August 2023, 11:30 AM

সম্প্রতি ১৬০ ব্যক্তি, যাদের বিরাট অংশ নোবেল বিজয়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিচার বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত খবরে প্রকাশ। বস্তুত এই তথাকথিত দাবির অর্থ এই দাঁড়ায় যে বাংলাদেশে কোন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার করার আগে সেই ১৬০ ব্যক্তির অনুমোদন নিতে হবে।

এই ১৬০ জনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই জিজ্ঞেস করতে হয়, উল্লেখিত খোলা চিঠি লেখার আগে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কি কি অভিযোগ রয়েছে, কি কি সাক্ষ্য প্রমাণ রয়েছে, কারা অভিযোগ করেছেন, কোন কোন আদালতে বিচার হচ্ছে, এগুলো কি তারা যাচাই করে দেখেছেন? নোবেল বিজয়ী হিসাবে তাদের প্রজ্ঞা সাধারণ মানুষদের থেকে অনেক বেশি হওয়ারই কথা। একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষও কিছু বলার আগে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে থাকেন। কিন্তু এই ১৬০ জন নিশ্চয়ই সে কাজটি করেননি, করলে তারা এ চিঠি লিখতেন না।

বহু শতক আগে থমাস ফুলার নামক এক চিকিৎসক লিখেছিলেন, “আপনি যত বড়ই হোন না কেন, আইন আপনার ঊর্ধ্বে।” বছর ৩০ আগে বিলেতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিচারক হিসাবে স্বীকৃত লর্ড ডেনিং অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে এক মামলায় সেই মহান উক্তিটি পুনঃব্যক্ত করে রায় দিয়েছিলেন। ডা. ফুলারের উক্তিটি নেহায়েত এক টুকরা কাগজে লেখা জিনিস নয়, এর মধ্যে নিহিত রয়েছে আইনের শাসন তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য, অর্থাৎ আইনের চোখে সবাই সমান, যে তত্ত্ব ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদে রয়েছে, রয়েছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানে। এ তত্ত্ব অনুসরণ করলে উঁচু-নিচু নির্বিশেষে সব অভিযুক্ত মানুষকে একইভাবে বিচারের আওতায় আনতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছে, যা প্রমাণিত হলে তাকে বহু বছরের জন্য কারাগারে যেতে হতে পারে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানেরও বিচার চলছে। আরেকজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ভুট্টোরও আদালতের রায়ে ফাঁসি হয়েছে। ইসরাইলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিচার অপেক্ষমাণ। ইহুদ ওলমার্ট নামক আরেকজন প্রধানমন্ত্রীর সাজা হয়েছে। প্রাক্তন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সার্কোজির বিচারও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ধর্ষণ মামলার আসামি হিসেবে বিচার হয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্তন প্রধান, ডোমিনিক স্ট্রস কাহানের। অভিযোগের কথা শোনার পরই ডোমিনিক কাহান হোটেল থেকে পালিয়ে প্যারিসমুখী এক বিমানে উঠে পড়েছিলেন, কিন্তু নিউ ইয়র্ক পুলিশ তাকে বিমান থেকে নামিয়ে নিয়েছিল। বিচার এবং সাজা হয়েছে বিশ্বের বহু নামিদামি জনের।

বহু নোবেল জয়ীরও বিচার, সাজা হয়েছে, যার মধ্যে অং সান সু চির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তদন্তে নেমেছে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত। ১০ বছরের সাজা হয়েছে বেলারুশের নোবেল জয়ী এলেম বেলিয়াটস্কির। ফিলিপিন্সের মারিয়া রেসাকে সে দেশের আদালত ৬ বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার পর দেশটির আপিল আদালতও সাজা অখণ্ডিত রেখেছিলেন। তবে পরে সুপ্রিম কোর্ট তাকে খালাস দিয়েছেন। শুধু নোবেল পুরস্কার জয়ীদেরই নয়, নোবেল প্রদানকারী একজনকেও ধর্ষণের অপরাধে ২ বছর কারাদণ্ড দিয়েছে সুইডেনের আদালত, ২০১৮ সালে। সেই সাজাপ্রাপ্ত জিন ক্লোড আরনল্ট ছিলেন নোবেল পুরস্কারের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত একাডেমির একজন সদস্য।

আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এই তত্ত্বে বিশ্বাস করলে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন বলে কাউকে ফৌজদারি অভিযোগ থেকে রেহাই দেয়ার সুযোগ নেই। নোবেল বিজয়ীদের, বিশেষ করে যারা শান্তির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন, তাদেরকে দুধে ধোয়া তুলসি পাতা ভাবারও কোন কারণ নেই। ড. কিসিঞ্জার, অং সান সু চি ছাড়াও এই পুরস্কার পেয়েছেন ইসরাইলের শিমন পেরেজ, ইসহাক রবিন এবং মেনাহিন বেগিনের মতো  ইহুদিবাদী নেতারা, প্যালেস্টানিদের ওপরে গণহত্যার জন্য যাদের বিরুদ্ধে অখণ্ডনীয় প্রমাণ রয়েছে। নোবেল জয়ী ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের বিরুদ্ধেও রয়েছে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ, যে কারণে তাকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে বিচারে পাঠানোর কথা বিশ্বব্যাপী আলোচনায় ছিল, কিন্তু ইথিওপিয়া রোম চুক্তির পক্ষ নয় বলে তা সম্ভব হয়নি।

মো. ইউসুফ আলি নামক ড. ইউনূসের আইনজীবী মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে যে এফিডেভিট জমা দিয়েছেন, তাতে বেশ কিছু দুর্নীতির স্বীকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে। সেই দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে যে ড. ইউনূস তার সেই আইনজীবীকেই ফি বাবদ ১৬ কোটি টাকা প্রদান করেছেন, যা সারা বিশ্বেই অবিশ্বাস্য। একজন অতি সাধারণ আইনজীবীকে শ্রম আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য ১৬ কোটি টাকার ফি দেয়ার কথা শুনে স্বয়ং মাননীয় বিচারপতিও বিস্ময় এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয় যে সকল শ্রমিক নেতা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছেন, তাদের এবং তাদের আইনজীবীদেরও মোট ১০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে বলে সেই এফিডেভিটে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে ড. ইউনূস তাদের উৎকোচ দিয়েছেন মামলা তুলে নেয়ার জন্য।

ড. ইউনূস কর ফাঁকি দেয়ার জন্য তার নিজেকে সুবিধাভোগী করে কটি ট্রাস্ট খুলে সে ট্রাস্টের টাকা আয়করের বাইরে রাখার দাবি করেছিলেন। একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তার অজানা থাকার কথা নয় যে সেসব ট্রাস্টই আয়কর মুক্ত থাকতে পারে যেগুলোর সুবিধাভোগী বা বেনিফিশিয়ারি হচ্ছেন জনগণ অথবা জনগণের একটি অংশ, যাকে চ্যারিটেবল বা দাতব্য ট্রাস্ট হিসেবে ধরা যায়। যে ট্রাস্টের সুবিধাভোগী ট্রাস্ট সৃষ্টিকারী নিজে, বাংলাদেশসহ অন্য কোন গণতান্ত্রিক দেশেই সে ধরনের ট্রাস্ট করমুক্ত নয়। যাই হোক ড. ইউনূস অবশেষে সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী কর দিতে বাধ্য হয়ে থাকলেও তিনি যে অসততার আশ্রয় নিয়ে কর বিভাগকে প্রতারিত করতে চেয়েছিলেন সেটি প্রমাণিত।

হিলারি ক্লিনটনের মতো একজন প্রভাবশালী বন্ধু পেয়ে ড. ইউনূস অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। যে ১৬০ ব্যক্তি খোলা চিঠিতে দস্তখত করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে, তারা কেউ পুরো বা এমনকি আংশিকভাবে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর কথা জানেন, এমনটি মনে করার অবকাশ নেই। তারা  হিলারি ক্লিনটনের অনুরোধে কিছু না জেনেই দস্তখত দিয়ে দিয়েছেন, পরিস্থিতি এমনটাই বলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ক্ষমতার বিভাজন যে কঠোরভাবে প্রয়োগের কথা রয়েছে, বাংলাদেশের অবস্থাও তাই। এখানে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ যথা প্রশাসন, বিচার এবং আইন প্রণয়ন অঙ্গ একে অন্যের থেকে স্বাধীন। একটির উপর অপরটির নিয়ন্ত্রণ নেই। সে অবস্থায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কোন ক্ষমতা নেই কোনো মামলা বন্ধ করে দেয়ার। তদুপরি শ্রম আদালতের মামলার বাদী সরকার নয়, বরং শ্রমিকগণ। যে ১৬০ জন খোলা চিঠিতে দস্তখত করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তারা মূলত বলতে চেয়েছেন যে বাংলাদেশে আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সেপারেশন অব পাওয়ার (ক্ষমতার বিভাজন) তত্ত্ব চলবে না।

আর এক খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘও নাকি একটি তদন্ত কমিশন করবে। খবরটি বিশ্বাসযোগ্য নয়, কেননা জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী সকল রাষ্ট্রই সমতার ভিত্তিতে সার্বভৌম। ব্যক্তি বিশেষের বিচারের ব্যাপারে জাতিসংঘ তদন্ত করবে এটা সত্য হতে পারে না কেননা জাতিসংঘের এ ধরনের কোন ক্ষমতা নেই। মনে হচ্ছে কিছু স্বার্থান্ধ লোকই এই উদ্ভট কথাটি ছড়াচ্ছে। তাছাড়া এটি করতে হলে সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কোন ব্যক্তি বিশেষের জন্য সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদ মাঠে নেমে যাবে, সে চিন্তা অবান্তর।