Published : 02 Aug 2026, 08:16 AM
বর্তমানে দেশে প্রতিদিনকার খবরের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকছে বিভিন্নজনকে বাধ্যতামূলক অবসর, অব্যাহতি এবং নানারকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থার খবর। কয়েক মাস ধরে এই প্রক্রিয়া সচিবালয় ও পুলিশসহ নানা সংস্থায় চলমান থাকলেও এখন তার আছর পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে সেখানে বহিষ্কারের মতো বিষয় ঘটেনি, যেমনটা ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সর্বশেষ সিন্ডিকেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে অস্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া চার শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ধরনের সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে শ্রেণিকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে অশিক্ষকসুলভ আচরণ এবং নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধকে হাজির করা হয়েছে। যদিও শ্রেণিকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে অশিক্ষকসুলভ আচরণ ও নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের ধরন, প্রকৃতি এবং কীভাবে সেটি ৭৩- এর অধ্যাদেশের নিয়ম অনুযায়ী ‘চাকুরিচ্যুতি’ বা বহিষ্কারের আওতায় পড়ল, তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
‘অশিক্ষকসুলভ আচরণ ও নৈতিক স্খলন’—এগুলো আসলে অনেক বড় ক্যানভাসের বিষয়। এর পাশাপাশি নীলদলের (আওয়ামীপন্থি) ২৩১ জন শিক্ষকের শাস্তি দাবি করেছে সাদাদলের (বিএনপি ও জামায়াতপন্থি) শিক্ষকরা। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট থেকে গঠিত হয়েছে নতুন কমিটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এগুলো নিয়ে নানা ধরনের সংবাদ, প্রতিবেদন এবং মতামত প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে এগুলোর পেছনে সাদাদল কারণ হিসেবে হাজির করেছে ‘জুলাইয়ের স্পিরিটের’ বিপরীতে অবস্থানকে। তবে অভিযোগ-প্রমাণের বাইরে বিষয়গুলোতে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আলামত আছে, তা স্পষ্টত বোঝা যায় অতি তড়িঘড়ি করে অধ্যাপক সাদেকা হালিমকে সাময়িক বহিষ্কার করায়। কারণ ২ অগাস্ট থেকে তার শিক্ষকতা থেকে অবসরে যাওয়ার কথা। তাই অবসরে যাওয়ার তিন দিন আগেই সিন্ডিকেট তাকে সাময়িক বহিষ্কার করে। অতি তড়িঘড়ি এবং অবসরে যাওয়ার তিন দিন আগে তার বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণেই হয়তো অনেকের কাছেই এই ঘটনা অনেক বেশি রাজনৈতিক ‘আদল’ পেয়েছে।
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, এর আগে ২০২৪-এর ৫ অগাস্টের পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অংশের মবের (আমি খুব সতর্কভাবে শিক্ষার্থীদের মব বলছি না, কারণ আমি নিশ্চিত জানি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বাধিক অংশ শিক্ষার্থী এগুলোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং এখনও নন) কারণে এবং তাদের বিভিন্ন অভিযোগের কারণে প্রায় ৮০ জন শিক্ষককে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়। এখন এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
পরিষ্কারভাবে বলা যায়, সব মবের পেছনে যে শুধু শিক্ষার্থীদের অংশ ছিল তা নয়, তার পেছনে ছিল এবং আছে শিক্ষক রাজনীতিও। তারা শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেছেন, আগের আমলেও এগুলোর নজির ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে প্রতিশোধের রাজনীতিতে জ্বলছে সব কিছুই।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জমাট বেঁধেছে ভয়, চারদিকে বের হচ্ছে নানা তালিকা। নজর রাখা হচ্ছে কার নাম কোন তালিকায় যাচ্ছে? তালিকা থেকে নাম কাটানোর জন্য অনেকেই ধর্না দিচ্ছেন এর-ওর কাছে। প্রতিবাদের স্বরও মৃদু, পাছে আবার রোষানলে পড়ে যায় কি না—এ হিসেবও করতে হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত এবং অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকদের সাবেক এবং বর্তমান অনেক শিক্ষার্থীরা লিখছেন শিক্ষকদের নানা দিক নিয়ে। পক্ষ-বিপক্ষ আলোচনা জোরালো হলেও, তার চেয়ে জোরালো হয়ে আলোচনায় থাকছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক অবস্থা।
স্পষ্টতই এগুলো রাজনৈতিক কারণে হচ্ছে, আগের আমলগুলোতেও হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দফায় দফায় বিভিন্নজনকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিচ্যুতির ঘটনা খুব কম হয়েছে। অবশ্য কোণঠাসা করে রাখা ও নানাভাবে ঠেকিয়ে রাখা—সেগুলো কম-বেশি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল ২০২০ সালে সাদাদল নেতা মোর্শেদ হাসান খানকে পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে করা মন্তব্যকে তার প্রতি অবমাননা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি হিসেবে সাব্যস্ত করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তবে ২০২৪ সালে তাকে চাকরিতে ফেরত নেওয়া হয়। এর বাইরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে প্রধানত যৌন হয়রানির অভিযোগে। সেখানে নীল এবং সাদা উভয় দলের শিক্ষক ছিলেন। তবে সেই শিক্ষকদের কেউ কেউ (যারা সাদা দল করেন এবং আওয়ামী ভিক্টিম হিসেবে নিজেদের হাজির করেন) ২০২৪-এর পর আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন।
শিক্ষকদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যবস্থা গ্রহণের ভয়ের রাজনৈতিক আবহাওয়া তৈরির পাশাপাশি দাবি উঠেছে নীল দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, তাই আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে—এই যুক্তি সামনে আসলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল এবং শিক্ষক সমিতির নির্বাচনকে মাথায় রেখে যে শিক্ষকদের নানা তালিকা এবং নীলদল নিষিদ্ধের দাবি আসছে, সেটি নিয়েও এই রাজনৈতিক কড়াকড়ির মধ্যেও কানাঘুষা চলছে। স্থানীয় নির্বাচনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব নির্বাচনেও যেন আওয়ামীপন্থি কোনো শিক্ষক নির্বাচন না করতে পারেন, এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও যেন না প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, সেই পরিকল্পনা থেকেই এতো তোড়জোড় হচ্ছে বলে আড়ালে-আবডালে ফিসফাস হচ্ছে।
বিষয়টি এখন অনেকটা এরকম দাঁড়িয়ে গেছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা শিক্ষকতা করবেন, অন্যপন্থিরা বাইরে থাকবেন, অব্যাহতি পাবেন, বহিষ্কার হবেন। আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি এবং জামায়াতপন্থিদের একই অবস্থা করা হবে। এ যেন এক প্রতিহিংসার টানটান লড়াই, কে কার চেয়ে বেশি প্রতিহিংসা দেখাতে পারেন, কে কার চেয়ে বেশি অমানবিক এবং প্রতিশোধপরায়ণ হতে পারেন সেটিরই এক নির্মম প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন শুধু একে ধর, তাকে মার, ওকে অব্যাহতি দাও, ওকে বহিষ্কার কর—এসব দাবি আসছে ছাত্র সংসদগুলো থেকে, উচ্চারিত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষক সংগঠন থেকে।
অথচ নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, শিক্ষাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে, প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করতে হবে। কিন্তু ঘটনা ঘটছে একেবারেই বিপরীত। এই বৈপরীত্যের কারণ কী? এই আশ্বাস কি ছিল ভোট পাওয়ার জন্য, নাকি অন্য কোনো রাজনীতির হিসেব-নিকেশ রয়েছে?
প্রশ্ন হলো, দফায় দফায় আমলাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে, শিক্ষকদের বহিষ্কার, অব্যাহতি, বিচার ও শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা—এগুলোর মধ্য দিয়ে কি আসলে ক্ষমতা পোক্ত হয়? আওয়ামী লীগও এভাবে চেষ্টা করেছে, তবে হয়তো শিক্ষাঙ্গনে এ পর্যায়ে হয়নি। কিন্তু বিএনপির গত পাঁচ মাসে বাধ্যতামূলক ছুটি, অব্যাহতি ও বহিষ্কারের যে হিড়িক পড়েছে, তাতে মনে হচ্ছে বিএনপির মনোযোগ এসব দিকেই বেশি এবং এগুলোকেই আপাতভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার মনে করছে।
সমস্যা হলো যারা একবার ক্ষমতায় যায়, তারা মনে করে এই ক্ষমতা থেকে তাদের আর কেউ নামাতে পারবে না এবং তারা আজীবনই ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু বাস্তবে হয় উল্টো। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে আওয়ামী লীগও আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। আওয়ামী লীগের দেখানো কৌশলেই বিএনপি হাঁটছে। এই কৌশল আসলে কারো ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে না, ঘটে উল্টোটা।
জোবাইদা নাসরীন অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com