Published : 22 Apr 2026, 12:28 AM
ইরানের মিনাবের একটি স্কুলে মার্কিন বোমা হামলায় ১৬৮ জন নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই ছিল নিষ্পাপ শিশু। সেই মর্মান্তিক স্মৃতি বুকে নিয়ে যুদ্ধবিরতির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছায়। তারা আসে ‘মিনাব-১৬৮’ নামের একটি বিমানে। এই নামটি কেবল শোকের স্মারক নয়; ইরানের ক্ষোভ ও অটল অবস্থানের চিহ্ন। একই সঙ্গে তা বুঝিয়ে দেয়, এই আলোচনা এমন এক সংঘাতের অংশ, যার জন্য তেহরান ইতিমধ্যেই বিপুল মূল্য চুকিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটই বোঝায়, ইরানি কর্মকর্তারা কোন ভাষায় আলোচনা এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং বর্তমান স্থবিরতাকে কীভাবে দেখছেন। তাদের কাছে কূটনীতি মূলত লড়াইয়ের একটি বিস্তৃত ফ্রন্ট, যেখানে তারা নিজেদের মূল শক্তি হারায়নি। ফলে তাদের আচরণে দুর্বলতা বা তড়িঘড়ির কোনো ছাপ নেই।
এদিকে বুধবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এখনো কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি না হওয়ায় পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
ইরানের দিক থেকে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, সামরিক চাপ তাদের টলাতে পারেনি; তাদের প্রধান শক্তিগুলো এখনো অটুট। এর মধ্যে রয়েছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হরমুজ প্রণালিতে ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষমতা এবং টানা ৪০ দিনের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা সহ্য করেও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে পাল্টা আঘাত চালানোর অভিজ্ঞতা। এই পাল্টা আঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যবহার যেমন ছিল, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে তাদের মিত্র বাহিনীগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণও ছিল দেখার মতো।
এই অবস্থান ওয়াশিংটনের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমান ছিল, চাপ বাড়লে ইরান দ্রুত ছাড় দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান সময়ক্ষেপণ করে মূল শক্তি ধরে রাখতে চাইছে। দেশটি তাৎক্ষণিক সমঝোতার বদলে বৃহত্তর কৌশলগত সমাধান খোঁজে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে তার অবস্থানকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করবে।
সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষের এই ভিন্ন ধারণা আসলে আরও গভীর বিভাজনকে তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মূল প্রশ্ন হলো, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে কীভাবে ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক জোটকে সীমিত করতে বাধ্য করা যায়। অন্যদিকে ইরানের কাছে সেই প্রশ্নটি হলো, এই দাবিগুলোর বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তার মৌলিক ভিত্তিগুলো আদৌ ত্যাগ করতে হবে কি না।
যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে এই শঙ্কা আরও দৃঢ় হয়েছে। এখন ইরানে হরমুজ প্রণালিতে ব্যাঘাত ঘটানোর সক্ষমতা, পারমাণবিক কর্মসূচির সীমিত কিন্তু কার্যকর অবস্থান, ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি এবং আঞ্চলিক জোট, এসব আর আলোচনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানের মূল্যায়ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা প্রত্যাহার যেকোনো সময় পরিবর্তনযোগ্য একটি কৌশল, কিন্তু সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি থেকে সরে আসা মানে সম্ভাব্য যুদ্ধকে আমন্ত্রণ করা। তাই লক্ষ্য কোনো ধরনের ছাড় নয়, নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতায় বৈধ শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া।
বিপ্লবী গার্ড-ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রধান সম্পাদক কিয়ান আবদোল্লাহি মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিকে এভাবে তুলে ধরেন: “যদি আমরা যুদ্ধ করে ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে পারি, তাহলে আলোচনার প্রয়োজন কী?” তার মতে, এখন যেকোনো সমঝোতা চুক্তিই কার্যত ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সমান। কেননা যেসব লক্ষ্য ওয়াশিংটন যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে পরাস্ত করে অর্জন করতে চেয়েছিল, সেই কৌশল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
আবদোল্লাহির দৃষ্টিতে, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, ইউরেনিয়ামের মজুদ দখল করা এবং হয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো, নতুবা তেহরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা ছিল ওয়াশিংটনের ইরান অভিযানের মূল লক্ষ্য। ওয়াশিংটন মনে করত, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হলে, তা হবে এই ভিত্তির ওপর। ইসলামাবাদে প্রথম দফার আলোচনা ব্যর্থ হবার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্পষ্টভাবে বলেন, “আমি ৯০ শতাংশ বা ৯৫ শতাংশ চাই না, আমি সবকিছু চাই।” ফলে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন এমন কোনো আস্থা তৈরি করেনি যে, তাদের পূর্বের ধারণায় কোনো পরিবর্তন এসেছে।
তবুও ইরানি প্রতিনিধিদল নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখেই আলোচনায় অংশ নেয়। ইরান যুদ্ধে ওয়াশিংটন প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। উপরন্তু প্রমাণিত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব আঘাত সহ্য করেও ইরান তার মূল শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম। তাই যেকোনো ভবিষ্যৎ চুক্তিতেই ইরানের স্বার্থের প্রতিফলন থাকতে হবে, এটাই এখন ইরানের চাওয়া।
ইরান কী ধরনের চুক্তি মেনে নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি কাঠামোর মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের কাছে স্বীকৃত বিষয়। তেহরান এখনই সেই অধিকার থেকে সরে আসতে প্রস্তুত নয় বলে আভাস পাওয়া যায়; বরং তারা মাত্র কয়েক বছরের জন্য একটি অস্থায়ী স্থগিতাদেশ মেনে নিতে চায়। এই সময়ের মধ্যে ইরান পারমাণবিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করবে এবং সম্ভব হলে আঞ্চলিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের একটি যৌথ মডেল প্রস্তাবের দিকে অগ্রসর হবে।
এই প্রেক্ষাপটে স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মাজিদ শাকেরি বলেন, প্রথম দফার আলোচনা মূলত একে অপরের অবস্থান ও মনোভাব যাচাইয়ের পর্যায় ছিল; তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতার দিকে অগ্রসর হওয়া উদ্দেশ্য ছিল না।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেন যে, তাদের প্রতিনিধিদলের লক্ষ্য ছিল অস্পষ্ট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল সীমিত। তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো একটি প্রাথমিক বোঝাপড়া সম্ভব ছিল। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিজেও স্বীকার করেন, আলোচনার সময় মার্কিন দলকে বারবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানি পক্ষের দাবি, তাদের হাতে যেকোনো ধরনের চুক্তি করার পূর্ণ ক্ষমতা ছিল।
শাকেরির মূল্যায়ন ছিল যথেষ্ট সংযত। তার মতে প্রথম দফার আলোচনা না ব্যর্থ ছিল, না সফল। কোনো পক্ষই তৎক্ষণাৎ বিশাল কোনো অগ্রগতি আশা করেনি। তবে আলোচনার পর ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেন, যার ফলে পুরো পরিস্থিতি দ্রুতই আরও ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতির পর ইরান আংশিকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়, যা ছিল আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির বৃহত্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবরোধ প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানালে ইরান আবার প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। যদিও কিছু তেলবাহী জাহাজ তখনও চলাচল করছিল, কিন্তু একটি ইরানি জাহাজ জব্দ হলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনায় ভরপুর হয়ে ওঠে। ফলে ইরান আবার আলোচনায় ফিরবে কি না, তা অনিশ্চিত। এই অবস্থানই দেখায়, চলমান যুদ্ধবিরতি কতটা ভঙ্গুর এবং পরিবর্তনশীল।
অন্যদিকে, এই অবরোধ পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের ধারণা হলো, দেশটি দীর্ঘমেয়াদি চাপ সহ্য করতে সক্ষম। শাকেরির মতো বিশ্লেষকদের মতে, ভাসমান তেল বিক্রি, পর্যাপ্ত স্থল মজুদ এবং বিকল্প বাণিজ্যপথের প্রস্তুতি ইরানের হাতে রয়েছে।
তাই আসল কথা হলো, এই অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে মোকাবিলা করতে গিয়ে ওয়াশিংটন এখন ইরানের তেল বাণিজ্য লক্ষ্যবস্তু করছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজার আরও সংকুচিত হবে এবং জ্বালানি মূল্য বাড়বে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত উল্টোভাবে ইরানের জন্য সুবিধা তৈরি করবে।
ওয়াশিংটনের কাছে এই পদ্ধতি চাপ বাড়ানোর একটি কৌশল, কিন্তু তেহরানের দৃষ্টি ভিন্ন। ইরান মনে করে, তারা এই চাপ দীর্ঘ সময় ধরে সহ্য করতে পারবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর দ্রুত এবং বেশি মাত্রায় পড়বে।
কিন্তু মার্কিন নীতি তেহরানের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আদৌ কোনো সমঝোতা চায় কি না, নাকি বাস্তব বিকল্প না থাকায় কেবল উত্তেজনা বাড়িয়েই চলেছে। ইরানের মূল্যায়নে, ট্রাম্প এখন ব্যয়বহুল যুদ্ধের চাপ ও কার্যকরহীন আলোচনার দ্বন্দ্বে বন্দী।
তাদের ধারণা, সময়ক্ষেপণে ইরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে যদি সংঘাত লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে পড়তে থাকে। ইরানি কর্মকর্তারা মনে করেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটা অস্তিত্বগত যুদ্ধে টিকে আছে। তাই বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার কোনো মানে হয় না। তাদের লক্ষ্য বড় কোনো চুক্তি নয়, বরং যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো এবং হরমুজ থেকে পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যন্ত মূল শক্তি ধরে রাখা। স্বল্পমেয়াদে এর অর্থ হলো শক্তিশালী চুক্তি নয়, বরং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো।
এর বাইরে সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হবে একটি অস্থায়ী সমঝোতা অথবা একটি সমঝোতা স্মারক গোছের কাঠামো, যেখানে মূল বিষয়গুলো এখনই চূড়ান্ত না করে পরে ধীরে ধীরে আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ইরান এই যুদ্ধকে কোনো স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছে না, সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে মাত্র। ইরানিরা বিশ্বাস করে, সময়ের সঙ্গে তাদের অবস্থান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হবে। কেননা জ্বালানি সরবরাহে বিচ্যুতির ফলে বিশ্বজুড়ে ক্ষতি এত বেশি হবে যে, কোনো দেশ তা বহন করতে রাজি হবে না।
এই সংঘাতের মাধ্যমে ইরানের একঘরে অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার বৃহৎ লক্ষ্যটি স্পষ্ট হয়েছে। তেহরান বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে চায় যে, ইরানের স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তি ছাড়া, উপসাগরীয় অঞ্চল বা বিশ্ব অর্থনীতি কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকতে পারে না।
লেখাটি দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত; এর লেখক সিনা তুসি একজন ইরানি-আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক এবং ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’র সিনিয়র ফেলো। তিনি মূলত মার্কিন-ইরান সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিশেষজ্ঞ।