Published : 16 May 2026, 12:51 PM
সরাসরি হ্যাঁ বা না বলার আগে জিম্বাবুয়ের একটি প্রবাদবাক্য শোনাই। সেখানে বলা হয়েছে—‘তোমার হাত যদি কারো পকেটে থাকে, তাহলে পকেট যেখানে যাবে তোমাকেও সেখানে যেতে হবে।’
এবার আমাদের দেশের সুশীল সমাজ নামধারীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যাক।
সুশীল হিসেবে যাদের নাম প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হয়, যাদের নাম আমরা অহরহ পত্রিকাতে ছাপা হতে দেখি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাদের নাম উপস্থিত থাকতে দেখি, তাদের মধ্যে সর্বাধিক উচ্চারিত কয়েকটি নামের দিকে তাকালে দেখব তারা কোনো-না-কোনো এনজিওর বাংলাদেশি ‘মালিক’। জিম্বাবুয়ের সেই বিখ্যাত প্রবাদটির মতো—এরা ঠিক ততটুকুই নড়াচড়া করবেন, ততটুকুই বলবেন, বিদেশি দাতারা তাদের যতটুকু করতে এবং বলতে অনুমোদন দেবে। তারা কোন পক্ষ নিয়ে কথা বলবেন সেটিও ঠিক করে দেয় দাতাসংস্থাগুলো। সেই কারণেই দেখা যায় দেশের নিরাপত্তা এবং স্বাধীন নীতি নিয়ে এদের কোনো মন্তব্য নেই। সদ্য ঘটে যাওয়া বাণিজ্য চুক্তি, যা করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, সেখানে যে বাংলাদেশের স্বার্থ শতভাগ বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশের ওপর প্রায় প্রত্যক্ষ আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয় নিয়ে টুঁ শব্দটি এরা করেন না। করবেন বলে আশা করাও দুরূহ।
এখন আমরা অন্তত এই প্রাথমিক সিদ্ধান্তে আসতেই পারি বিদেশি টাকায় দেশীয় স্বার্থের অনুকূল সুশীল সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। যাদের আমরা সুশীল সমাজ বলছি তারা যদি জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়াতেই না পারে তাহলে তাদের সুশীল সমাজ বলা যায় না। তাদের আলোচনা বিবেচনায় নিয়ে জতীয় কোনো নীতি নির্ধারণ করা যায় না। তা উচিতও নয়।
সুশীল সমাজ নামটাই অবশ্য ভুল। এই ধারণাটি এসেছে ইউরোপের সিভিল সোসাইটির আদল থেকে। সমাজের আমূল পরিবর্তন বা শোষণ বা অসাম্যের বিরুদ্ধে কোনো কথা না বলে নাগরিক সমাজের একটি অংশ সরকারের কাছে কিছু সংস্কারের দাবি তোলে। অনেক সময় সরকার নিজেই দাবি তুলবার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করে। এদের কাজ হচ্ছে গরিব-বঞ্চিত মানুষদের একথা বোঝানো যে তোমাদের যা যা দাবি তা পূরণের ব্যবস্থা এই রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই আছে। আমরা তোমাদের পক্ষ নিয়ে সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষি করছি। সরকার তোমাদের দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে সচেতন এবং সহানুভূতিশীল। আলোচনার মাধ্যমে আমরা সরকারের কাছ থেকে তোমাদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায় করে দেব। তার জন্য তোমাদের আন্দোলনে নামার দরকার নেই। বিশেষ করে জনগণের কোনোভাবেই বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়ানো উচিত নয়।
ইউরোপের সিভিল সোসাইটির অংশ হয় প্রধানত আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ধর্মীয় মোল্লা-পুরোহিত-পাদ্রিরা। এরা সরকার বা রাষ্ট্র বদলানোর কথা না বলে কিছু কিছু সংস্কারের বিষয়ে মানুষকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে। সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে যায় না। সংঘাতের প্রয়োজন আছে বলে মনেও করে না। কখনো কখনো মৃদু বিতর্কে অংশগ্রহণ করে। সেই বিতর্ককে তারা এবং সরকার উভয়েই আলোচনার অংশ বলেই মনে করে। কারণ সরকার জানে এই সিভিল সোসাইটি তাদের ক্ষতি হয় বা ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল হতে পারে, এমন কিছু করবে না। এক কথায় তারা সরকারের জন্য নিরাপদ।
এই সিভিল সোসাইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি সমাজের মানুষের সম্মতি উৎপাদন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে রাষ্ট্রের ভূমিকার প্রতি জনসমর্থন আদায়। ধর্মগুরুরা সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই কাজ করে আসছে। স্বয়ং যীশুকেও বলতে শোনা গেছে— ‘ঈশ্বরের পাওনা ঈশ্বরকে দাও, আর সিজারের পাওনা সিজারকে দাও।’ রাষ্ট্র কর বাড়ালে তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা, সরকারের গৃহীত কোনো প্রকল্প নিয়ে জনমনে দ্বিধা তৈরি হলে সেই প্রকল্পের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন, এমনকি সরকার অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালেও জ্বালাময়ী এবং আবেগদীপ্ত ভাষায় জনগণকে সেই যুদ্ধের জন্য অর্থ-সম্পদ এবং প্রাণ বিসর্জনে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা অপরিসীম।
বিনিময়ে রাষ্ট্র এদের নানারকম সুবিধা দিয়ে থাকে। পদ, পদবি, উপাধি, অর্থ পুরস্কারের পাশাপাশি সমাজের উচ্চ আসনে তাদের সমাসীন করে। ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশে রায় বাহাদুর, রায় সাহেব, খান বাহাদুর, খান সাহেব পদবিগুলো এই শ্রেণির মধ্যেই বিতরণ করা হতো।
ইতালির মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি এই অংশের লোকদের অভিহিত করেছিলেন ট্রাডিশনাল ইন্টেলেকচুয়াল বলে। অনেকেই ট্রাডিশনাল শব্দের বাংলা করেন ঐতিহ্যবাহী। ট্রাডিশনালের আসল ব্যঞ্জনা এই ‘ঐতিহ্যবাহী’ শব্দ দিয়ে বোঝা যাবে না। আমি এই ক্ষেত্রে ট্রাডিশনাল শব্দের বাংলা হিসাবে ‘গতানুগতিক’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। এরা সবসময় প্রচলিত পথ, পদ্ধতি, চিন্তাধারা মেনে চলে। কোনো নতুন চিন্তা, বিশেষ করে তা যদি বিপ্লবাত্মক হয়, তাহলে মানুষকে সেই চিন্তা থেকে শতহস্ত দূরে থাকতে বলে।
বোঝাই যাচ্ছে আমাদের দেশে যাদের সুশীল সমাজ বলে ডাকা হয়, তারা ইউরোপের সিভিল সোসাইটি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বর্গ। আসলে আমাদের সুশীল সমাজ একটি ইউনিক গোষ্ঠী। ইউরোপের সিভিল সোসাইটি কখনো দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেবার পক্ষে ওকালতি করে না। কিন্তু আমাদের দেশের সুশীল সমাজ হয় সেই কাজের ওকালতি করে, অথবা সেই বিষয়ে নিশ্চুপ থাকে। ইউরোপের সিভিল সোসাইটি কখনো রাষ্ট্রের রেজিম পরিবর্তনের কাজে বিদেশি দূতাবাসের সঙ্গে লিয়াঁজো তৈরি করে না। কিন্তু বাংলাদেশের সুশীল সমাজ বিদেশিদের হয়ে লবিস্টের কাজ করে। যদি সরকার নমনীয় না হয়, তাহলে নানারকম অন্তর্ঘাতমূলক কাজে বিদেশি শক্তিকে সরাসরি সহায়তা করে। সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বঙ্গোপসাগর বা বন্দরকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেবার লবিং করে আসছেন অন্তত দুই যুগ ধরে। আওয়ামী রেজিমের পতনের পরে সরকারের কর্ণধার হয়েও তিনি বন্দর-শ্রমিকদের সর্বাত্মক ও জানবাজি আন্দোলনের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র তিনদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির নামে একটি অধীনতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করে গেছেন। এই চুক্তিতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ক্ষতি স্পষ্ট। তবে তারচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং সম্মান বিকিয়ে দেবার ধারা। বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো দেশ থেকে তালিকাভুক্ত পণ্য কিনতে পারবে না। আজকের পৃথিবীতে এমন সামন্ত চুক্তি, করদ রাজ্যের মতো চুক্তি, কোনো দেশের সরকার করতে পারে তা পৃথিবীবাসীর কাছে অবিশ্বাস্য।
এই চুক্তিটি দিয়েও বোঝা যায় বাংলাদেশের কথিত সুশীল সমাজ আর যা-ই হোক, বাংলাদেশের নয়। বিদেশি টাকার সুশীল সমাজ বাংলাদেশে বাস করলেও তারা আসলে বিদেশিদের লোক।
তারা আমাদের কেউ না।
পুনশ্চ: বাংলাদেশের এই তথাকথিত সুশীল সমাজকে নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠে না। আলোচনাও তেমন হয় না। তাদের চরিত্র, তাদের কাজ, তাদের তহবিল, বিদেশি দূতাবাসের সঙ্গে তাদের মাখামাখি, জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা—এই সবকিছুর গভীর পর্যালোচনা হওয়া উচিত।
তারা নাকি দেশের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করে, জরিপ করে। সেগুলো প্রকাশও করে সাড়ম্বরে। সেগুলো দেশের চাইতে বিদেশের হাততালি পায় বেশি।
এখন দরকার তাদের নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা।