Published : 10 Sep 2026, 08:07 PM
মাস কয়েক ধরে একটা ব্যাপার চোখে পড়ছে বারবার। আমি টেক কোম্পানি চালাই বলে নয়; ‘ডাইরেক্টর এআই বিজনেস অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’ হিসেবে নতুন পদায়ন হওয়ায় আমার চলাচল বেড়েছে অনেক জায়গায়। ফলে টেকি নতুন-পুরানো প্রজন্মের সঙ্গে প্রচুর আলাপ হচ্ছে। সবাই নয়, তবে নতুন প্রজন্মের অনেকের হাতে কোনো বেসিক সমস্যা তুলে দিয়ে দেখছি, তারা ঠিকমতো ভাবতেই পারছে না। প্রথমে ভেবেছিলাম আমারই ভুল। এখন দেখছি প্যাটার্নটা বাড়ছে। এটা আমার জন্য শঙ্কা তৈরি করছে। আমি যেহেতু এআই বিজনেসে (মানে এআই দিয়ে প্রবলেম সলভিং) নেমেছি, মানুষের এই স্কিলটা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। কারণ এআইকে আমরা ডিজাইন করছি শুধুমাত্র রুটিন কাজের জন্য।
কারণটা খুঁজতে গিয়ে একটা সংখ্যা পেলাম। ডেলোয়েট মাইক্রোসফটের বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্র জরিপ অনুযায়ী, প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত নতুন প্রজন্মের কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৬১ শতাংশ তাদের অফিসের কাজে নিয়মিতই এআই টুল ব্যবহার করছেন। শুনতে খারাপ লাগার কথা না, বরং প্রথমে মনে হয়েছিল এটাই তো এফিশিয়েন্সি। কিন্তু আসল সমস্যাটা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। এআই কীভাবে একটা বড় সমস্যাকে ছোট ছোট টুকরোয় ভেঙে সমাধান করছে (চেইন অফ থটস), সেই লজিকটাই মানুষ আর দেখছে না। প্রশ্ন করছে, উত্তর পাচ্ছে, কপি করছে। অনেকে ঠিকমতো পড়ছেনও না। এটা খারাপ ট্রেন্ড। জিজ্ঞাসা করলে অনেকে বলছেন, এআই কেন ভুল করবে? আমার উত্তর—কেন নয়? এআইকে তো সব প্রেক্ষাপট মানে কনটেক্সট দেওয়া হয়নি। এআইও তো ব্লাইন্ডসাইডেড হতে পারে।
এর মানে হচ্ছে, মাঝখানের ধাপটা—যেটাকে বলা যায় আসল চিন্তার জায়গা—সেটা পুরোপুরি বাদ পড়ে যাচ্ছে। ধরুন কেউ একটা এক্সেল শিটে জটিল একটা ফর্মুলা বসাতে চাইলেন। আগে হলে তিনি ভেবে ভেবে বের করতেন, কোন কোন কলাম লাগবে, কোন শর্তে কী হবে, স্টেপ বাই স্টেপ। এখন সে শুধু লিখে দেয় সে কী চাচ্ছে, এআই ফর্মুলা বানিয়ে দিচ্ছে। কাজ হয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পরের বার একই সমস্যা একটু ঘুরিয়ে আসলে আটকে যাচ্ছে। কারণ তার মাথায় ফর্মুলার লজিকটা কখনো ঢুকেইনি।
এটাই ইদানিং আমার কাছে ছোট সমস্যা মনে হচ্ছে না। যারা এমপ্লয়ার, তাদের সামনে খুব শিগগিরই একটা সোজা প্রশ্ন এসে দাঁড়াবে। অফিসের কাজটা করাব কাকে দিয়ে—এআই এজেন্ট, নাকি মানুষ? এতদিন এই প্রশ্নের উত্তর বেশ সহজ ছিল, কারণ মানুষের হাতে ছিল বোঝাপড়ার ক্ষমতা, প্রেক্ষাপট (কনটেক্সট) ধরার ক্ষমতা, আর প্রবলেম সলভিং স্কিল। এআই যত ভালোই হোক, এই জায়গাগুলোয় মানুষের ওপরই ভরসা করতে হতো। মানুষেরও একটা ইগো ছিল, মাথার জায়গায় মানুষই সেরা। কিন্তু সেটা তো আর থাকছে না। সেখানেই আমার ভয়। মানুষ যদি নিজেই এই স্কিলটা হারিয়ে ফেলে, তাহলে তুলনাটা আর টিকবে না। কারণ এআই এজেন্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মানুষের বাড়তি কিছু দেওয়ার থাকবে না। উল্টো এআই এজেন্ট অফিস কামাই করে না, ক্লান্ত হয় না, ভুল কম করে, দিনশেষে এআই এজেন্টকে চালাতে খরচও কম। তখন এমপ্লয়ার হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়ে পড়বে।
তাহলে সমস্যাটা আসলে কোথায়? এআই ব্যবহার করাটা সমস্যা না। এআই তো একটা টুল মাত্র, টুল ব্যবহার করাটা দোষের কিছু নয়। সমস্যা হলো এআইকে শুধু উত্তর বের করার মেশিন হিসেবে দেখা, অনেকেই চিন্তার সঙ্গী হিসেবে দেখছেন না। যে মানুষ এআইকে জিজ্ঞেস করে ‘কেন এভাবে হলো’, ‘আর কী উপায় ছিল’, ‘এই সমাধানটা বাদ দিয়ে অন্যভাবে করলে কী হতো’—তার প্রবলেম সলভিং স্কিল বাড়ে। কারণ তিনি এআইয়ের উত্তরটাকে শেষ কথা হিসেবে ধরে নিচ্ছেন না, সেটাকে দিয়ে নিজের চিন্তাটাকে যাচাই করছেন। এই যাচাই করার অভ্যাসটাই আসলে স্কিল।
কারণ, প্রতিদিন একটু একটু করে এই অভ্যাসটা মাথার ভেতর একটা কাঠামো তৈরি করে দেয়—কোন সমস্যাকে কীভাবে ভাঙতে হয়, কোথায় গিয়ে আটকাতে পারে, কোন প্রশ্নটা করলে সমাধান কাছে চলে আসে। আর যারা শুধু উত্তরটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, তাদের স্কিলটা প্রতিদিন একটু একটু কমতে থাকে, নিজের অজান্তেই। এটা এক দিনে বোঝা যাবে না। আমার ধারণা, সামনের কয়েক বছরে এই পার্থক্যটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য হয়ে দাঁড়াবে। ডিগ্রি দিয়ে হবে না, সার্টিফিকেট দিয়ে হবে না, এমনকি অভিজ্ঞতা দিয়েও পুরোপুরি হবে না। যারা এআইয়ের সঙ্গে চিন্তা করতে শিখবেন, তারা টিকে থাকবেন। এআইকে ব্যবহার করবেন ঠিকই, কিন্তু নিজের মাথাটাকে বসিয়ে রাখবেন না। প্রতিটা উত্তরকে উল্টো প্রশ্ন দিয়ে যাচাই করবেন।
আর যারা শুধু এআইয়ের ওপর চিন্তাটা ছেড়ে দেবেন, তাদের জায়গাটা এআই এজেন্ট নিজেই নিয়ে নেবে। কারণ তখন সেই তুলনাটা মানুষ বনাম এআই থাকবে না। তুলনাটা হবে এআই বনাম এআই—একজন মানুষ যে শুধু এআইয়ের উত্তর বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিচ্ছেন, বনাম একটা এআই এজেন্ট যে সরাসরি কাজটা করে দিচ্ছে। এই তুলনায় সেই মানুষগুলো হেরে যাবেন, কারণ তাদের কাছে বাড়তি দেওয়ার কিছু থাকবে না।
রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক লেখক। ই-মেইল: rakibul.hassan.