Published : 26 Jun 2025, 01:09 PM
২০২৫ সালের ১২ মে মধ্যরাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্তির একটি অধ্যাদেশ জারি হলে তা ঘিরে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ কর্মসূচি শুরু করে। এই চাপের মুখে সরকার ২৫ মে ঘোষণা দেয়—এনবিআর বিলুপ্ত করা হবে না; বরং এটিকে সরকারের একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত বিভাগ হিসেবে আরও শক্তিশালী করা হবে এবং রাজস্ব নীতি প্রণয়নের জন্য একটি নতুন, আলাদা প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। সেই সঙ্গে জানানো হয়, প্রয়োজনীয় সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত পূর্বে জারি করা অধ্যাদেশ কার্যকর হবে না। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কার ঐক্য পরিষদ তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। আন্দোলন প্রত্যাহারের ১৩ দিন পর সারা দেশে এনবিআর সব দপ্তর আবারও সচল হয়ে ওঠে এবং অফিসে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে।
উল্লেখ্য গতমাসে তড়িঘড়ি করে বিলুপ্তির যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল তাতে ‘অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ’ (আইআরডি) বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলেও এই বিভাগের সকল শাখা নিয়ে বিলুপ্তি সংক্রান্ত যথাযথ কোনো নির্দেশনা ছিল না। আইআরডি অধীনস্থ দপ্তরগুলোর মধ্যে ‘জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তর নিয়ে কিছুমাত্র নির্দেশনা অধ্যাদেশে ছিল না। একজন গ্রেড-১ পদমর্যাদার মহাপরিচালক দ্বারা ‘দি পাবলিক অ্যাক্ট, ১৯৪৪’-এর অধীনে আটটি ভিন্ন ভিন্ন বিধিমালা দ্বারা পরিচালিত ‘জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তর’ আইআরডি বিলুপ্ত হওয়ার পর কোথায় যাবে, কি হবে এর পরিণতি, কীভাবে পরিচালিত হবে, একেবারেই অবলুপ্ত হবে, নতুন আলাদা বিভাগ হবে নাকি আগের মতো নিয়মে চলবে–সেসব কিছুই উল্লেখ ছিল না। এমন কি যে অ্যাক্টের আওতায় পরিচালিত হতো এবং যা থেকে বিলুপ্ত করা হলো, সেই অ্যাক্ট সম্পর্কেও কিছু উল্লেখ ছিল না এনবিআর বিলুপ্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশে।
দেশের শীর্ষ রাজস্ব আদায় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে যে প্রতিষ্ঠান তার বিলুপ্তি সংক্রান্ত এমন অসমাপ্ত ও অসঙ্গতিপূর্ণ অধ্যাদেশ নিজে থেকেই জানান দেয়, গোটা ব্যাপারটা যে আনাড়ি ও উদ্দেশ্যমূলক একটা প্রচেষ্টা বৈ আর কিছুই ছিল না। দেশের অর্থনীতিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সুশীল ও প্রাজ্ঞজনেরা তাই সঙ্গত কারণেই অধাদেশটি নিয়ে সমালোচনামুখর হয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ আহুত কলম বিরতির মুখে সরকার অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের পথ থেকে সরে আসে। সরকার বাস্তবায়ন স্থগিত করে দাবি অনুযায়ী অংশীজনদের সম্পৃক্তিতে সকলের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে সংস্কার করবার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ঘোষণা যা-ই হোক, তারপর বাস্তবে ব্যাপারগুলো ঘোষণা অনুযায়ী এগোচ্ছিল না। স্থগিত করা অধ্যাদেশের সিদ্ধান্তগুলোই বাস্তবায়নের পথ ধরে এগোচ্ছিলেন এনবিআরের শীর্ষ পদাধিকারী তার গুটিকয় অনুসারীর সহযোগিতায়।
সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের মতামত নেওয়া, সকল পক্ষ এবং বিভাগ ও শাখার অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং আলোচনা-পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে প্রয়োজন ছিল—তা একেবারেই উপেক্ষিত হয়েছে। সরকার গঠিত সংস্কার-সম্পর্কিত কমিটির সুপারিশ ও পরামর্শ প্রতিবেদনও পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা হয়। জারি করা অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের পথ সহজ করতে কর্তৃপক্ষ এমন এক নীতি গ্রহণ করে, যার ফলে সংস্কার ঐক্য পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আলোচনা থেকে বাদ দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। অথচ ঠিক এই একপাক্ষিকতা ও গোপনীয়তার কারণেই এনবিআর বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে পিছু হটতে হয়েছে আগে। এর আগেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত একটি আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভেটিং প্রক্রিয়ায় এনবিআরকে না জানিয়ে গোপনে খসড়াটির মৌলিক কাঠামোতে ইচ্ছেমতন পরিবর্তন আনা হয়।
পরামর্শক কমিটির সুপারিশ আমলে না নিয়েই এনবিআর পৃথকীকরণের খসড়া অধ্যাদেশ আরোপ করার ফলেই সরকারকে জারি করা অধ্যাদেশ স্থগিত করতে হয়। এরপর এনবিআর বিলুপ্ত করার অধ্যাদেশ রহিত করে স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত বিভাগের মর্যাদায় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যে ঘোষণা ছিল–অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পৃক্তিতে সকল বিভাগ ও স্তরের এবং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কার নীতিমালা নির্ধারণ করা হবে–নির্ধারিত সেই নীতি প্রণয়নে শুরু থেকেই ফের বৈষম্য চর্চিত হচ্ছিল আরো জোরালোভাবে।
সংস্কার ঐক্য পরিষদের আন্দোলনে সংশ্লিষ্টদের প্রাপ্য যোগদানকাল না দিয়ে তাৎক্ষণিক বদলি আদেশ, সংস্কার ঐক্য পরিষদের পূর্বঘোষিত সকল অংশীজনদের নিয়ে ‘কেমন এনবিআর চাই’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠানের পথ রুদ্ধ করতে কক্ষ বরাদ্দ না দেওয়া, প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকর্তাকে জ্যেষ্ঠতাক্রম উপেক্ষা করে সমন্বয়কারী এবং যৌক্তিক সংস্কার পদ্ধতির সমর্থক সকলকে মতামত প্রদানের সুযোগ রহিত করে দূরে সরিয়ে রাখা–এসব বিবিধ নৈমিত্তিক বিপরীতমুখী কর্মকাণ্ডে এনবিআর সংস্কারের সঠিক পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে, এমনটাই প্রায় সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ। এমনকি শীর্ষ কর্মকর্তা সভা-সমাবেশে খোলাখুলিভাবে এই অভিব্যক্তিগুলো উচ্চারণ করছেন এবং পরোক্ষ হুমকির মুখে ফেলছেন আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের।
বিদ্যমান সত্য দৃশ্যগুলো সবার কাছে স্পষ্টত দৃশ্যমান থাকলেও কোনো স্বার্থান্বেষী মহল থেকে রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ে ভুল তথ্য ও ব্যাখ্যা প্রদান করায় এহেন পরিক্রমার পরও উপদেষ্টা মহোদয় বলছেন, “অধ্যাদেশ অনুযায়ী এনবিআরের রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথক করা হবে। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই।” রাষ্ট্রপক্ষ আরো বলেছে যে, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ইন্ধনে এনবিআরে আন্দোলন হচ্ছে। বাস্তবেই কি ব্যাপারটা তাই? প্রাজ্ঞজনেরা মনে করেন, ব্যাপারটা আসলে ঠিক উল্টো। সম্ভবত কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ হাসিল করতেই ঐকমত্যের খসড়া উপেক্ষা করে অসঙ্গতিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল। জারিকৃত এবং পরে স্থগিতকৃত অধ্যাদেশে বরং সংশ্লিষ্ট খাতে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা সম্পন্নদের বাদ দিয়ে অন্য খাত থেকে রাজস্ব নীতি বিভাগে নিয়োগের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছিল।
এতকিছুর পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এনবিআর বিলুপ্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশ স্থগিত করলেও এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সদিচ্ছার বিপরীতে উল্টো কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে যাওয়া মানে সরকারকে ফের প্রশ্নবিদ্ধ করারই পাঁয়তারা। এর পেছনে কে বা কারা কাজ করছে, এর ভেতর দিয়ে কার বা কাদের স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করা হচ্ছে তার গভীর অবধি খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। একই অভিযোগে এনবিআর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ বা অপসারণ চেয়ে আন্দোলনের মুখে বিদ্যমান অস্থিরতা কাটিয়ে বাজেট ঘোষণা এবং বাজেট পাশের মাসে, একটা জটিল অর্থবছর সমাপ্তির মুখে, স্থিতাবস্থা ফিরে এলেও চেয়ারম্যান ফের সেই প্রসঙ্গটিই চাঙ্গা করে দিলেন তার আপন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

এমতাবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ফের জমে উঠছে অস্থিরতা, আন্দোলন, চেয়াম্যানের পদত্যাগ দাবি। সংস্কার ঐক্য পরিষদের সদস্যদের সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা, সকল অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাবনা এবং এর বাস্তবায়নজুড়ে বিস্তর তফাৎ আশঙ্কাজনকভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ফের আন্দোলনের ডাকে ২৩ জুন দেশব্যাপী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে কলম বিরতির পর ২৪ জুন দুপুর দুইটা পর্যন্ত কলম বিরতির পরদিনও কলম বিরতি চলেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২৮ জুন থেকে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা ব্যতীত কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সকল দপ্তরে লাগাতার কমপ্লিট শাটডাউন চলবে মর্মে ঘোষণা দিয়েছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।
দেশের সিংহভাগ রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকা একমাত্র প্রতিষ্ঠান এনবিআরের কার্যক্রম ব্যাহত হলে তার পরিণতিতে যে মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচিত—এই ধরনের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের শেকড় চিহ্নিত করে বারবার অচলাবস্থা সৃষ্টির নেপথ্যের শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কলম বিরতির মতো আন্দোলনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মেধা ও শ্রম ব্যয় করার মতো যে নৈরাজ্যমূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার পেছনের প্ররোচক ও লাভবান মহলকে চিহ্নিত করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যাতে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সদিচ্ছা এবং সরকারের ঘোষণার সমান্তরালে একটি ইতিবাচক সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারে—বিক্ষুব্ধ আন্দোলন নয়, যৌথ সমাধান হয়ে ওঠে উত্তরণের পথ। তা না হলে এসব ঘটনা বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা ও সমালোচনার খাতায় আরও বড় একটি সংযোজন হয়ে উঠবে এবং সরকারকে গভীর সংকটে ফেলবে। গোটা দেশ আজ তাকিয়ে আছে সরকারের দ্রুত, দৃঢ় এবং বিচক্ষণ পদক্ষেপের দিকে—যে পদক্ষেপ বারবার ফিরে আসা এই সংকটচক্রকে চিরতরে রুখে দিতে সক্ষম হবে।