Published : 09 May 2026, 01:58 PM
বাংলাদেশে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। সম্প্রতি আমাদের শিক্ষামন্ত্রী আবারও কোচিং বন্ধের কথা বলেছেন। এই ঘোষণায় জনমনে সাময়িক স্বস্তি এলেও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। অতীতেও একাধিকবার একই ধরনের ঘোষণা এসেছে, নীতিমালা হয়েছে; কিন্তু কোচিং বন্ধ হয়নি বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর কেবল “কোচিং থাকবে কি থাকবে না”-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সমস্যার প্রকৃত কারণটি ধরতে পারছি?
বর্তমানে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার বড় একটি অংশ গিয়ে পড়ে শিক্ষক সমাজের ওপর। তারা ঠিকভাবে ক্লাসে পড়ান না, ক্লাসের চেয়ে প্রাইভেট কোচিংয়ে বেশি আগ্রহী, শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করেন; এ জাতীয় অভিযোগগুলো একেবারেই অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এই সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের গভীর কাঠামোগত সমস্যার ফল।
বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে স্বীকার করতে হবে—সব শিক্ষক এক রকম নন এবং সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও এক নয়। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে শহরের স্কুলগুলোর মান নির্ধারিত হয়। সেখানে শিক্ষার্থীর চাপ বেশি, প্রতিযোগিতাও বেশি। তাই শ্রেণিকক্ষের বাইরে আলাদা করে পড়াশোনার একটা বড় বাজার তৈরি হয়েছে। অনেক নামকরা স্কুলে ভালো ফলাফল এখন শুধু নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়, বরং সামাজিক মর্যাদার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, সারাদেশে গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী বেশি হলেও সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে কম। অনেক জায়গায় শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা বিদ্যমান। এমনকি চাকরি টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় শিক্ষকদের ছাত্রের পিছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাই এই দুই ভিন্ন বাস্তবতাকে একভাবে দেখলে সমস্যাটি ঠিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিষয়ভিত্তিক চাহিদার পার্থক্য। গ্রেডিং পদ্ধতির কারণে শহরাঞ্চলে সব বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো কয়েকটি বিষয়ের জন্যই কোচিংয়ের চাহিদা বেশি। কারণ এগুলোর ওপর ভবিষ্যৎ চাকরির সম্ভাবনা নির্ভরশীল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের জন্য ওই একই ধরনের চাহিদা বা সুযোগ নেই। ফলে সব শিক্ষক ইচ্ছা করলেও কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, কোচিং নির্ভরতা শুধু শিক্ষকদের কারণে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে শহর-গ্রামের বৈষম্য, বিষয়ভিত্তিক চাহিদার পার্থক্য, শিক্ষা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং সামাজিক প্রতিযোগিতার চাপ। তাই পুরো শিক্ষক সমাজকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দোষারোপ করা বাস্তব সমস্যার সঠিক ব্যাখ্যা নয়।
তবে কোচিং নির্ভরতার পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তিগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান সংকট ও সামাজিক মানসিকতা। দেশে মানসম্মত চাকরির সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, ভালো ফলাফলই ভবিষ্যৎ সাফল্যের একমাত্র পথ। তাই “ভালো ফলাফল = ভালো চাকরি = ভালো জীবন”—এই সরলীকৃত সমীকরণ সমাজে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা। আগে যেখানে শিক্ষা ছিল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম, এখন তা অনেকাংশে হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক অবস্থান নির্ধারণের লড়াই। এই প্রতিযোগিতাই কোচিংকে একটি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে পরিণত করেছে।
এই সংকট নিরসনের জন্য রাষ্ট্র কি যথেষ্ট সচেতনভাবে কাজ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের দিকে তাকাতে হবে। ইউনেসকোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ বা জিডিপির ৪-৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে এই সুপারিশের অনেক নিচে অবস্থান করছে। ফলে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই একটি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। আর এই ঘাটতি সরাসরি প্রভাবিত করছে শ্রেণিকক্ষের মানকে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনেসকোর বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বিবেচনায় মাধ্যমিক স্তরে এই হার গড়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ। নিম্ন মাধ্যমিকে এ হার ৫৪.৭ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৫৫.২ শতাংশ; অর্থাৎ দুই স্তরেই দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি স্পষ্ট।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজিতে মাত্র ১৭ শতাংশ এবং গণিতে মাত্র ১৪.৬৬ শতাংশ শিক্ষকের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। অর্থাৎ যেসব বিষয় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত, সেসব ক্ষেত্রেই দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি প্রকট।
এই সংকটের পেছনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অসংগতি বড় ভূমিকা রাখছে। আমাদের দেশে শিক্ষক হওয়ার পর প্রশিক্ষণ শুরু হয়। অর্থাৎ বাস্তব শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। নতুন কারিকুলাম বা মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কেও শিক্ষকদের আগাম ধারণা থাকে না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। ফলে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই ‘ওপর থেকে চাপানো’ হওয়ায় শ্রেণিকক্ষে গিয়ে তা কার্যকর হচ্ছে না।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। আমাদের সমাজে পেশার মর্যাদা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার আয়-সংক্রান্ত অবস্থানের ওপর। শিক্ষকতার ক্ষেত্রে এই দিকটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহ হারায়। অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য পেশায় ব্যর্থ হওয়ার পর শিক্ষকতায় আসার প্রবণতা দেখা যায়। এটি সামাজিকভাবে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে—“যার নাই কোনো গতি, সে করে পণ্ডিতি।” এই মানসিকতার কারণে অনেক শিক্ষক নিজের পেশাগত অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী নন।
এর পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংকটও কম নয়। শিক্ষক সংকট, বড় ক্লাসরুম, উচ্চ শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ; সব মিলিয়ে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প ক্লাসরুম হিসেবে কোচিং সেন্টারকেই বেছে নিচ্ছে। কোচিং তখন শুধু একটি অতিরিক্ত সহায়তা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে একটি সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় সমাধান খুঁজতে হলে সমস্যাটিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক না দেখে কাঠামোগতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। স্বচ্ছ নিয়োগ, কার্যকর প্রশিক্ষণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত হ্রাস এবং সর্বোপরি শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত ও কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য একটি সম্মানজনক বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হয়।
কেবল কোচিং বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দিয়ে তাই সমস্যার সমাধান হবে না। যতদিন পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষকে কার্যকর, আস্থাশীল এবং আকর্ষণীয় জায়গায় পরিণত করা না যাবে, ততদিন কোচিং সেন্টারগুলো বিকল্প হিসেবেই টিকে থাকবে। আমরা যেন ভুলে না যাই, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই অধিক কার্যকর।