২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

মোবাইল ইন্টারনেট: বাড়তি দামে নিম্নমানের সেবা

গত দেড় বছরে প্রধান চারটি মোবাইল অপারেটরই বিভিন্ন মেয়াদের ডেটা প্যাকেজের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে, কোনো কোনো প্যাকেজে দাম বেড়েছে অর্ধেকেরও বেশি।

মোবাইল ইন্টারনেট: বাড়তি দামে নিম্নমানের সেবা
শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার যেখানে অনেক বেশি, গ্রামে তা এখনো অর্ধেকেরও কম। ফোরজি নেটওয়ার্কের ব্যাপক প্রসারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অনেক গ্রামীণ এলাকায় বাস্তব গতি মেলে থ্রিজি বা টুজির মতো।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

Published : 09 Sep 2026, 12:02 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:28 PM

মোবাইল ইন্টারনেট এখন আর কারও কাছে বাড়তি সুবিধা নয়, এটি প্রতিদিনের জীবনের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। ব্যাংকিং লেনদেন থেকে শুরু করে সন্তানের অনলাইন ক্লাস, চাকরির আবেদন কিংবা ছোট ব্যবসার হিসাব রাখা, সবকিছুই এখন এই একটি সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। অথচ যে খাতটি আজ নাগরিক জীবনের এত কাছাকাছি চলে এসেছে, ওই খাতেই গ্রাহকের ভোগান্তি দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা পড়েছে ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ, যার সিংহভাগই নেটওয়ার্কের দুর্বলতা এবং সেবার মান নিয়ে।

এত বিপুল অভিযোগের পরও গ্রাহকের অবস্থার প্রকৃত পরিবর্তন হয়েছে কি না, ওই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হতাশাই বেশি চোখে পড়ে।

সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা মূল্যবৃদ্ধি। গত দেড় বছরে প্রধান চারটি মোবাইল অপারেটরই বিভিন্ন মেয়াদের ডেটা প্যাকেজের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে, কোনো কোনো প্যাকেজে দাম বেড়েছে অর্ধেকেরও বেশি। মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারকারীদের মাসিক খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে সরাসরি চাপ তৈরি করছে।

এই সময়ে সরকার আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যান্ডউইথের খরচ কমানোর ঘোষণা দিয়েছিল, অপারেটরদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। তারপরও দাম কমার বদলে বেড়েছে, আর অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে যে ফারাক, তার মাশুল শেষ পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহককে।

দাম বেড়েছে, কিন্তু সেবার মান বাড়েনি। স্বাধীনভাবে করা প্রথম মান যাচাইয়ে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। অপারেটরদের নিজস্ব দাবি করা কলড্রপের হার আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন পরীক্ষায় পাওয়া হারের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা গেছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কয়েকগুণ বেশি। দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলায় বড় অপারেটরদেরও কোনো নেটওয়ার্ক কাভারেজ নেই। প্রয়োজনীয় কারিগরি তথ্য সরবরাহেও গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বাধ্য হয়ে অপারেটরের নিজস্ব প্রক্রিয়াজাত তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

এই চিত্র শুধু কারিগরি দুর্বলতার প্রমাণ নয়, এটি তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে। গত এক বছরেই চার অপারেটরের নেটওয়ার্কে কোটি কোটি বার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ফলে কথা বলার মাঝপথে বারবার লাইন কেটে যাওয়া গ্রাহকের নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।

এই সমস্যার একটি বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক আলোচনায় ধরাই পড়ে না। শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার যেখানে অনেক বেশি, গ্রামে তা এখনো অর্ধেকেরও কম। ফোরজি নেটওয়ার্কের ব্যাপক প্রসারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অনেক গ্রামীণ এলাকায় বাস্তব গতি মেলে থ্রিজি বা টুজির মতো। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে একটি পিডিএফ ফাইল ডাউনলোড করতে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান নেটওয়ার্কের খোঁজে, একজন ফ্রিল্যান্সার সারারাত জেগে কাজ শেষ করে সকালে ফাইল আপলোড করতে না পেরে গ্রাহক হারান, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ খুলতে না পেরে বিক্রি হাতছাড়া করেন। এমনকি জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এই দুর্বল সংযোগ প্রভাব ফেলছে, প্রত্যন্ত এলাকার একজন রোগীর পরীক্ষার রিপোর্ট শহরের চিকিৎসকের কাছে পাঠাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে।

এ ধরনের ঘটনাকে কি আর নিছক অনভিপ্রেত ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে? লাখো মানুষের জন্য এটি এখন নিত্যদিনের হয়রানির গল্প। বিশেষত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় এখনো অপ্রতুল। অবকাঠামোর এই ঘাটতিই মূলত শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্যের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মূল সমস্যার শেকড় খুঁজতে গেলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতার অভাব এবং নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করছে। দেশে মোবাইল অপারেটরের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় গ্রাহকের হাতে বিকল্প কম, ফলে অপারেটররা নিজেদের শর্তে অসংখ্য ধরনের প্যাকেজ তৈরি করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। এত রকমের প্যাকেজের ভেতর থেকে সবচেয়ে উপযোগী ও ন্যায্য অপশনটি খুঁজে বের করা একজন সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে কার্যত অসম্ভব একটি কাজ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি হলো অব্যবহৃত ডেটার ভবিষ্যৎ। একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট অর্থ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডেটা কেনেন, কিন্তু মেয়াদ শেষ হলে অবশিষ্ট অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। কর্মব্যস্ততা, অসুস্থতা, বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক সমস্যা কিংবা একাধিক সিম ব্যবহারের কারণে অনেক গ্রাহকই কেনা ডেটার পুরোটা ব্যবহার করতে পারেন না। মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অব্যবহৃত ডেটার সুবিধাও শেষ হয়ে যায়। ফলে গ্রাহকের কেনা ডেটার একটি অংশ কোনো কাজে আসে না।

দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের ক্ষেত্রে এই হিসাব প্রতিবছর বিশাল অঙ্কে পৌঁছায়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও শর্ত হলো একই প্যাকেজ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবার কিনতে হবে, যা বাস্তবে খুব কম গ্রাহকই মনে রাখতে পারেন। ফলে সুবিধাটি কাগজে-কলমেই থেকে যায়, বাস্তবে গ্রাহকের কোনো উপকারে আসে না।

এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ অস্পষ্ট নয়। বিশ্বের অনেক দেশে 'ডেটা রোলওভার' সুবিধা চালু আছে, যেখানে অব্যবহৃত ডেটা পরবর্তী মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে যায়, কোনো শর্তের বেড়াজালে আটকে থাকে না। বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে যেমন কেনা ইউনিট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকে, মোবাইল ডেটাও একটি ডিজিটাল ব্যালেন্স হিসেবে সংরক্ষিত রেখে মেয়াদহীনভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে মেয়াদযুক্ত ছাড়মূল্যের প্যাকেজ এবং মেয়াদবিহীন পূর্ণমূল্যের ডেটা—এই দুই ধরনের বিকল্প পাশাপাশি রাখা যেতে পারে, যাতে গ্রাহক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। প্রতিটি অপারেটরের বিলিং ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নিরপেক্ষ অডিট চালু করা দরকার, যাতে গ্রাহক নিশ্চিত হতে পারেন প্রতিটি মেগাবাইট ও প্রতিটি মিনিট সঠিকভাবে হিসাব হচ্ছে।

একটি স্বাধীন ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও জরুরি, যেখানে গ্রাহক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিকার পাবেন, শুধু অভিযোগ জমা রাখার একটি খাতা নয়। নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাকেও প্রকৃত অর্থে ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে, কেবল কাগজে-কলমে কাভারেজ দেখালেই চলবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেবার মান খারাপ হলে তার জন্য দৃশ্যমান ও কার্যকর জরিমানার ব্যবস্থা থাকা উচিত; কেবল কারণ দর্শানোর চিঠি পাঠিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। প্রযুক্তিগতভাবে এসব বাস্তবায়ন কঠিন নয়, কারণ সকল গ্রাহকের ব্যবহারের তথ্য এমনিতেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকে। প্রয়োজন কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত আর গ্রাহকবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির সদিচ্ছা।

দেশ যখন আধুনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন এই স্বপ্নের ভিত্তিই তো টেলিযোগাযোগ খাত। ওই ভিত্তি যদি অস্বচ্ছতা, মূল্যবৃদ্ধি আর নিম্নমানের সেবায় দুর্বল থেকে যায়, তাহলে ওপরের কাঠামো যত চকচকেই হোক না কেন, তা দাঁড়িয়ে থাকবে না। এই ধরনের ভোগান্তি আর চলতে দেওয়া যায় না। গ্রাহকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা আর অপারেটরের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এতদিন প্রথমটিই অবহেলিত থেকে গেছে। এই ভারসাম্য এখনই ফিরিয়ে আনতে হবে, নইলে আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল স্বপ্নেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com