Published : 02 Feb 2026, 03:03 PM
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশ ছিল কার্যত রাজনীতিবিহীন একটি রাষ্ট্র। প্রতিনিধিত্বহীন শাসন আর জনসম্মতিহীন সিদ্ধান্তই ছিল সেই সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্র পরিচালনার এই কাঠামোগত সংকটই শেষপর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। মানুষ স্বভাবতই ভেবেছে, এত আত্মত্যাগ আর আশাবাদের বিনিময়ে রাজনীতি এবার শূন্যতা থেকে পূর্ণতার দিকে যাবে; ‘নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ মাধ্যমে ‘নতুন বাংলাদেশের’ বিনির্মাণ ঘটবে। কিন্তু হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো দ্রুতই এইসব উচ্চারণ আর আশাবাদ মানুষের চেতনা থেকে মিলিয়ে যেতে শুরু করে। আর, এই হতাশাজনক রূপান্তরের দায় একক কোনো পক্ষের নয়; অভ্যুত্থানজাত অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক অংশীদারের।
কারণ, ঐতিহাসিক মহাজাগরণের মধ্য দিয়ে অর্জিত শাসনভারকে অন্তর্বর্তী সরকার নৈতিক অঙ্গীকার না ভেবে, অনেকটাই রুটিন প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছে। জনতার রক্ত ও আত্মত্যাগের দায় পরিণতি পেয়েছে নথি, নিয়ম আর প্রজ্ঞাপন নির্ভর এক আমলাতান্ত্রিক শাসনচর্চায়। এর ফল রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তে দৃশ্যমান। অদূরদর্শিতা, অপ্রয়োজনীয় দ্বিধা এবং অবিমৃষ্যকারী সময়ক্ষেপণ সংস্কারের সম্ভাবনাকে যেমন দুর্বল করেছে, তেমনি সামাজিক সংহতিকেও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। অথচ এই সরকারকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা প্রশাসনিক দক্ষতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, আহতদের সুচিকিৎসা, শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার মতো বিষয়গুলো এক ধরনের নৈতিক সামাজিক চুক্তির মর্যাদা পেয়েছিল। বাস্তবে জনতার এই প্রত্যাশা এবং সরকারের সক্ষমতার ব্যবধানই দ্রুত জনআস্থার ক্ষয় ঘটায়।
এই আস্থাহীনতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার। রাজনীতিকে নাগরিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে যান্ত্রিক আনুগত্যের কাঠামোতে বন্দি করা হয়েছিল। বিরোধিতা ছিল অপরাধের নামান্তর, ভিন্নমত ছিল জীবনবিনাশী ঝুঁকি, আর প্রশ্ন করার সাহস মানেই ছিল রাষ্ট্রের সন্দেহের তালিকায় নাম উঠা। এর ফলে সমাজে তৈরি হয়েছিল গভীর এক অবসাদ, এক ধরনের নীরব আত্মসমর্পণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই পাথরচাপা অবসাদেরই বিস্ফোরণ। প্রত্যাশা ছিল, এই গণজাগরণ রাজনীতিতে নতুন নৈতিক বর্ণমালা তৈরি করবে, যেখানে নাগরিক হবে অংশীদার। কিন্তু দীর্ঘদিন সম্মতিহীন শাসিত হওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চা আত্মস্থ করা কতটা কঠিন, বাস্তবতা দ্রুতই তা স্পষ্ট করে দেয়।
এই নেতৃত্বশূন্যতা ও রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নেয় দেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ। ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের দোহাই দিয়ে শতাধিক মাজার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা, উদারমনা নারী-পুরুষকে নিপীড়ন এবং উচ্চারণের অযোগ্য অমানবিক সহিংসতার ঘটনাগুলো একাধারে বাংলাদেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেই সঙ্গে খোদ জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে মৌলবাদের উত্থানের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। রাষ্ট্র তার আইনগত ও নৈতিক কর্তৃত্ব হারাতে শুরু করায়, সহিংসতা কেন্দ্রীভূত না থেকে সামাজিক জীবনের নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। উপরন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের নীরবতা, অজুহাত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মব সহিংসতাকে ‘জনরোষ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য করার প্রবণতা সামাজিক সংহতিকে ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
এই সহিংস বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের বাম, প্রগতিশীল, উদারমনা এবং ইসলামের সুফি ঘরানার মানুষজন। ইতিহাসের এক নির্মম প্রহসন হলো, এই শ্রেণির একটি বড় অংশ অতীতে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছিল মূলত এই ধরনের মৌলবাদী সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শক্ত রাজনৈতিক দেয়াল হিসেবে। এটি আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের কোনো আদর্শিক আনুগত্যের প্রকাশ ছিল না। তা ছিল ভয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং আত্মরক্ষার তাগিদ থেকে গড়ে ওঠা একধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা। আওয়ামী লীগের পতনের পর সেই দেয়াল ভেঙে গেলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা স্বভাবতই নতুন কোনো আশ্রয়ের সন্ধান করে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে সামনে আসে বিএনপি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তি এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিশমা বিএনপিকে প্রাথমিকভাবে সেই বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে হাজারো নেতাকর্মীকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর ভাষ্য সত্ত্বেও বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে তার সামগ্রিক ভাবমূর্তি দৃশ্যমানভাবে উন্নত করতে পারেনি। তারেক রহমানসহ শীর্ষ নেতারা ক্ষমতায় এলে চাঁদাবাজি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, চাঁদাবাজি ছাড়া বিএনপির মতো বৃহৎ সংগঠন এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করবে–এই প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা এখনো চোখে পড়ে না। ফলে মানুষের কাছে বিএনপি পুরোনো অভ্যাস থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারবে–এমন আস্থা এখনও তৈরি হয়নি।
এই শূন্যতার ভেতরেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাজপথের অভিজ্ঞতা, দমন-পীড়নের মুখে অবস্থান নেওয়ার স্মৃতি এবং পুরোনো দলীয় কাঠামোর বাইরে থাকার সুবিধা তাদের প্রতি স্বাভাবিক আস্থা তৈরি করেছিল। প্রত্যাশা ছিল, এই নেতৃত্ব রাজনীতিতে নতুন ভাষা, নৈতিক সংযম এবং ক্ষমতার সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করবে। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর দ্রুতই এনসিপির আদর্শিক অস্পষ্টতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং সিদ্ধান্তহীনতা প্রকাশ পায়। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ কিংবা রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নে তাদের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় তারা ধীরে ধীরে একটি প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম থেকে অপরিণত রাজনৈতিক দলে রূপ নিতে থাকে।
এই সংকট আরও ঘনীভূত হয় ধর্মাশ্রয়ী সহিংসতার প্রশ্নে এনসিপির নীরবতা এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে। মাজার ভাঙচুর, ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকির প্রশ্নে স্পষ্ট ও সাহসী অবস্থান না নেওয়া তাদের নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যে দল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলেছিল, তারাই শেষপর্যন্ত পুরোনো রাজনীতির কৌশল, আপস ও হিসাব-নিকাশের মধ্যেই নিজেদের আটকে ফেলে। ফলে জনগণের চোখে এনসিপি আর নিশ্চিত আশার প্রতীক না থেকে রাজনৈতিক অপচয়ের একটি সতর্ক উদাহরণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী হাজির হয় এক জটিল রাজনৈতিক ধাঁধা হিসেবে। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১-এর মানবতাবিরোধী ভূমিকা এবং দলীয় গঠনতন্ত্রে নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধান প্রতিষ্ঠার অবস্থানের কারণে দলটি ন্যায্যভাবেই সমালোচিত। তবুও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও আর্থিক শুদ্ধতার ভাবমূর্তি অনেক মানুষের কাছে দলটির সীমাবদ্ধতাকে গৌণ করে তুলছে। জামায়াত দাবি করছে, ক্ষমতায় গেলে তারা প্রচলিত সংবিধান ও আইনের মাধ্যমেই দেশ পরিচালনা করবে। কিন্তু ক্ষমতার আগের ভাষা আর ক্ষমতার পরের আচরণের ব্যবধান বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুবার দেখা গেছে, আর এই জায়গাতেই সচেতন নাগরিকদের ভয় সবচেয়ে বেশি।
এই ভয়, অনিশ্চয়তা ও প্রতিনিধিত্বহীনতার মধ্যেই নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন বা এনপিএ-এর মতো প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব ঘটে। এটি একদিকে বিদ্যমান দলগুলোর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিবাদ, অন্যদিকে জনসম্পৃক্ত রাজনীতির প্রশ্নে দিশাহীনতারও প্রকাশ। তবে, অনেকের মতে এনজিওসুলভ কাঠামো, শহুরে মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক ভাষা এবং মাঠপর্যায়ে সংগঠনের দুর্বলতা এই প্ল্যাটফর্মের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় তৈরি করছে।
দিনশেষে তাই ঘুরেফিরে আমরা ফের সেই পরিচিত জায়গাতেই এসে দাঁড়াই। যে রাজনৈতিক শূন্যতা আওয়ামী লীগের পতনের আগে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তার অনুভব আজও স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। পরিবর্তন ঘটেছে মূলত দৃশ্যমান স্তরে- মুখ বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সরে গেছে, কিন্তু রাজনীতির অন্তর্গত নৈতিক কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। অর্থাৎ শাসকের নাম ও চেহারা পাল্টালেও রাজনীতি এখনো গণমানুষের মুক্তির সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারেনি, বরং এটি ধীরে ধীরে ভয়, আপস, হিসাব-নিকাশ আর আত্মসমর্পণের এক প্রাত্যহিক সাংস্কৃতিক অভ্যাসে রূপ নিয়েছে।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যতদিন নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নৈতিক ও দায়বদ্ধ কাঠামোর বাইরে নিছক ক্ষমতা প্রয়োগের যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করবেন, ততদিন এই শূন্যতা পুনরুৎপাদিতই হতে থাকবে। ব্যক্তি বা দল বদলে সমাধান আসবে না; বদলাতে হবে ক্ষমতার কাঠামো, আচরণ ও মানসিকতা। রাস্তার বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে হলে বিপ্লবীদের ব্যক্তিগত বিপ্লবেও সফল হতে হবে। অন্যথায়, এত আত্মত্যাগ আর অর্জনের পরও দায়িত্ববোধ, সংযম ও সততার অভাবে রাজনৈতিক শূন্যতাই বাংলাদেশের নিয়তি হয়ে থাকবে।