Published : 18 Aug 2026, 12:21 PM
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এখন আর কেবল লোডশেডিংয়ে সীমাবদ্ধ নেই। গ্যাসের ঘাটতি, এলএনজি আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট, শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মিলিয়ে সংকটের অভিঘাত এখন অর্থনীতি ও জনজীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরে পৌঁছে গেছে। অগাস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে। ১৩ অগাস্টের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি সরবরাহ আবার কমে গিয়ে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা পৌঁছে গেছে।
১৪ অগাস্ট সংকটের আরেকটি বড় দিক প্রকাশ পায়, যখন সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে টার্মিনালটি প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পুনর্গ্যাসীকৃত এলএনজি সরবরাহে ফিরে এসেছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে সাময়িক স্বস্তি মিললেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি টার্মিনালের সাময়িক অচলাবস্থাও বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক গ্রাহক পর্যন্ত ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, বর্তমান সংকটের দায় কার? রাজনৈতিক বিতর্কে উত্তরটি সহজ করে ফেলার প্রবণতা আছে। কেউ বলবেন, বর্তমান দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের ভুল নীতির ফল। কেউ বলবেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংকট সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তবতা হলো, দুই বক্তব্যের মধ্যেই আংশিক সত্য রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, যার ওপর বাংলাদেশের কোনো সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই।
বর্তমান বিএনপি সরকার ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা কোনো সুস্থ অবস্থায় ছিল না। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে কমেছে, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে যায়। আমদানি করা এলএনজি মোট গ্যাস ব্যবহারের এক-চতুর্থাংশের বেশি পূরণ করে। ফলে গ্যাস সরবরাহে একটু টান পড়লেই তার বড় ধাক্কা গিয়ে পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
এই কাঠামোগত দুর্বলতা এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমেছে, নতুন অনুসন্ধান প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে যায় মূলত দেশীয় গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন কমে আসা এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে। বর্তমানে দেশে আবিষ্কৃত ৩০টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি উৎপাদনে আছে এবং দেশীয় উৎপাদন প্রায় ১,৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যে জানানো হয়েছে। একই সময়ে দৈনিক গ্যাস চাহিদা প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট।
কাজেই দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দায়ের প্রশ্নে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার ঘাটতিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশীয় উৎপাদন কমার প্রবণতা দৃশ্যমান থাকা অবস্থায় নতুন অনুসন্ধান কতটা হয়েছে, পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখতে কী বিনিয়োগ হয়েছে, সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান কেন দীর্ঘ সময় কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি উৎসের ভারসাম্য কেন যথেষ্ট দ্রুত তৈরি হয়নি; এসব প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন। কারণ জ্বালানি খাতের যে কোনো ভুলের মাশুল দীর্ঘ সময় ধরে পুরো জাতিকে গুনতে হয়।
ওই বাস্তবতা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের দায় শেষ হয়ে যায় না। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। এলএনজি সংগ্রহ, সরবরাহের সময়সূচি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বরাদ্দ, বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা, জরুরি খাতে সরবরাহ এবং লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি থেকে মুক্ত করতে পারে না।
এদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সংকটকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে কাতার থেকে বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, কাতারএনার্জি ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশকে ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত কার্গো সংগ্রহ করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ একাই যে সংকটে আছে তা নয়, তার প্রমাণ সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিতেও রয়েছে। ভারতের পেট্রোনেট এলএনজি জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে কাতার থেকে তাদের নির্ধারিত সরবরাহ নিয়ে এখনো নিশ্চিত পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। কাতারের সরবরাহ সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে এশিয়ার আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজছে। কাতারএনার্জিও হরমুজকেন্দ্রিক বিঘ্ন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্পট এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করেছে।
তবে আন্তর্জাতিক সংকটকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিকল্প ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। যুদ্ধ বাংলাদেশের তৈরি নয়, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু বৈশ্বিক ধাক্কা কোনো দেশের ওপর কতটা আঘাত করবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে তার প্রস্তুতির ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ওই প্রস্তুতির দুর্বলতা এখন দৃশ্যমান।
২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এফএসআরইউতে আগুন ও কারিগরি ক্ষতির কারণে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বাদ পড়ে। অগাস্টের শুরুতে টার্মিনালের একটি ইউনিট আংশিকভাবে চালু হয়ে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু করলেও পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে পেতে সময় লেগেছে। পরে ১৩–১৪ অগাস্ট সামিটের টার্মিনালেও আবহাওয়াজনিত বিঘ্ন ঘটে। ফলে দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর ব্যাপক নির্ভরতার ঝুঁকি নগ্নভাবে সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালও মূল্যায়নের বাইরে রাখা যায় না। ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা সরকার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিল। কিন্তু তাদের সময়ে অনুসন্ধান, এলএনজি সংগ্রহ, জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ ও অবকাঠামো সংস্কারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তারও হিসাব থাকা দরকার। দীর্ঘমেয়াদি সংকটের পুরো দায় তাদের ওপর চাপানো যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি ওই সময়ের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখাও সঙ্গত নয়।
তাই দায় নির্ধারণে তিনটি স্তর আলাদা করা প্রয়োজন। প্রথমটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দায়, যেখানে পূর্ববর্তী সরকারের নীতি ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়টি আন্তর্জাতিক অভিঘাত, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা ও কাতারের এলএনজি সরবরাহসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তৃতীয়টি বর্তমান ব্যবস্থাপনার দায়, যার ভার বর্তমান সরকারের ওপর।
এই তিনটি স্তর এক করে ফেললে রাজনৈতিক বক্তব্য সহজ হয়, কিন্তু সমাধান কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার যদি প্রতিটি সংকটের দায় পূর্ববর্তী সরকারের ওপর চাপায়, তবে নিজের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আড়ালে থেকে যেতে পারে। আবার বিরোধী রাজনীতি যদি শুধু বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার কথা বলে, তাহলে সংকটের দীর্ঘ ইতিহাস চাপা পড়ে যায়। জনগণের স্বার্থে দুই ধরনের সরলীকরণই পরিহার করা জরুরি।
কারণ জ্বালানি সংকটের অর্থ শুধু লোডশেডিং নয়। বিদ্যুৎ ঘাটতি শিল্প উৎপাদন কমায়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়, রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল করে। গ্যাসের চাপ কমলে সার, পোশাক, ইস্পাত, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেচে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের মূল্য বাড়ে। অর্থাৎ জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রার সংকটে পরিণত হয়।
বর্তমান সরকারের জন্য তাই প্রথম দায়িত্ব সংকট ব্যবস্থাপনা। কোন কার্গো কখন আসছে, কোন টার্মিনাল কতটা সক্ষম, কোন বিদ্যুৎকেন্দ্রে কত গ্যাস প্রয়োজন, কোন শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, সেচ ও খাদ্য সংরক্ষণের মতো জরুরি সেবাকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে, তার স্বচ্ছ পরিকল্পনা প্রয়োজন। ১৩ অগাস্ট সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যা সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে।
শেষ পর্যন্ত আজকের সংকটের সবচেয়ে ন্যায্য মূল্যায়ন হতে পারে এমন—দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার বড় অংশ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকট বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কিন্তু বর্তমান সংকট সামলানোর তাৎক্ষণিক দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। তিনটি সত্য একই সঙ্গে গ্রহণ না করলে জ্বালানি সংকটের রাজনৈতিক হিসাব কখনো বাস্তবতার হিসাব হয়ে উঠবে না।
আজকের দিনে ‘কার দায় বেশি’ ওই বিতর্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ‘কীভাবে এই ঝুঁকি দ্রুত কমানো যায়’। কারণ সরকার পরিবর্তন হলেও গ্যাসক্ষেত্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র আর অবকাঠামো বছরের পর বছর থেকে যায়। আজকের নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে আমাদের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ।