Published : 20 Nov 2025, 08:47 AM
আমাদের দেশে এমন কেউ কি আছেন, যার হাতের মুঠোয় একটি মোবাইল ফোন নেই? আছেন নিশ্চয়ই—তবে তারা বিরল হতে চলেছেন। প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন আছে। কারওটা খুব স্মার্ট, কারওটা তুলনামূলক সস্তা; কেউ ব্যবহার করেন অ্যাপলের আইফোন, আবার কেউ ভরসা করেন গুগলের অ্যান্ড্রয়েডে। কম্পিউটারও এখন অনেকের বাড়িতেই আছে। কোথাও ডেস্কটপ, কোথাও ল্যাপটপ, কারও ম্যাকিনটোশ, কারও উইন্ডোজ, আবার কেউবা আইপ্যাডেই সব সারেন। প্রয়োজন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা আরও কত রকমের ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ব্যবহার করি। নাম বাড়িয়ে কাজ নেই—অনেক কিছুই এখন লাইসেন্স নিয়ে বাংলাদেশেই তৈরি হয়, এটাই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় লক্ষণ।
যে দেশেই এগুলো এখন তৈরি হোক না কেন, এসব প্রযুক্তির আবিষ্কার ও উৎপত্তি হয়েছে এক ছোট্ট জায়গা থেকে—যাকে আমরা বলি সিলিকন ভ্যালি। নবীন-প্রবীণ কত উদ্ভাবক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ সেখানকার ল্যাবে রাতদিন শ্রম দিয়েছেন। তাদের মেধা ও শ্রমে আজকের পৃথিবী এতটা বদলে গেছে। এসব প্রযুক্তি ছাড়া এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবন প্রায় অচল। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদরাও যান সিলিকন ভ্যালিতে, নতুন উদ্ভাবনের ধারা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের যুক্ত করতে। অনেকের কাছে এটি শুধু কর্মস্থল নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির স্পন্দন ছুঁয়ে দেখার এক বিরল সুযোগ।
কোথায় সেই সিলিকন ভ্যালি, যেখানে যেতে দুনিয়ার টেকনোলজিপ্রেমী মানুষজন ব্যাকুল? যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরীয় এলাকার ঠিক দক্ষিণে—সান হোজে, সান্তা ক্লারা, মাউন্টেন ভিউসহ আশপাশের অঞ্চলগুলো ঘিরেই গড়ে উঠেছে সিলিকন ভ্যালি। মজার বিষয় হলো, ভূগোলের দিক থেকে জায়গাটি বিশেষ বড় কিছু নয়, কিন্তু বিশ্ব প্রযুক্তি–বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে ছোট্ট এই জায়গাটিই।
সিলিকন ভ্যালি নাম এসেছে কম্পিউটারের ইলেকট্রনিক সার্কিট তৈরির কাজে ব্যবহৃত পদার্থ সিলিকন থেকে, যা পিরিয়ডিক টেবিলের ১৪ নম্বর উপাদান। খুব বেশি আগে নয়, বিগত শতাব্দীর সত্তরেরদশকের প্রথম দিকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু—যেখানে প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সীমাহীন উদ্ভাবনী চেষ্টার সঙ্গে সাফল্যের জীবনধারা এক নতুন জগতের জন্ম দিয়েছে।
এখানেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, যা প্রযুক্তি–উদ্ভাবনের অন্যতম অন্যতম উৎস। এখানেই জন্ম নিয়েছে হিউলেট-প্যাকার্ড (এইচ-পি), ইন্টেল, অ্যাপল, গুগলের মতো বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি। আবার এখানে অনেকে আশা নিয়ে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু সাফল্য পাননি—নিঃশেষ হয়েছেন আর্থিক ও মানসিকভাবে। সিলিকন ভ্যালি শুধু সাফল্যের গল্প নয়, ব্যর্থতার কাহিনিও কম নয়।

এই সিলিকন ভ্যালিতে গ্যারেজ থেকেই জন্ম নিয়েছে কত কোম্পানি, যেগুলো পরে বিশ্বের বৃহত্তর ও সম্মানিত হাইটেক কোম্পানির মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির কুপারটিনোতে অ্যাপলের সুরম্য প্রধান কার্যালয়ের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছিলাম—এই কোম্পানিটি মাত্র কয়েক দশক আগে স্টিভ জবসের বাবা-মায়ের গ্যারেজে জন্ম নিয়েছিল। দুই বন্ধু, স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াক, ছিলেন অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা। গ্যারেজের ছোট্ট পরিবেশ থেকে উঠে আসা এই কোম্পানি আজ কোটি কোটি মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে—এটাই প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য ক্ষমতা।
বর্তমান সময়ের আরেকটি বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানি হলো গুগল। গুগলের জন্মও এক গ্যারেজেই। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক সুজানা ওজসিকি তার পালো ওল্টো বাড়ির গ্যারেজ ভাড়া দিয়েছিলেন একটি স্টার্টআপ কোম্পানির জন্য—সেখানেই গুগলের জন্ম।
সুজানা নিজেও একসময় গুগলের ১৬তম কর্মচারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে ইউটিউবের সিইও হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

ফ্লোরিডা থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাস্টার্স করার পর, আশির দশকের মাঝামাঝি আমি নিজেও সিলিকন ভ্যালিতে কাজ খুঁজতে গিয়েছিলাম। এক বন্ধুর মাধ্যমে সিলিকন ভ্যালিতে অস্থায়ী আবাস খুঁজে পেলাম, এক অপরিচিত ভারতীয়ের বাড়িতে। একদম অপরিচিত আরেক তরুণ, নাম শ্রীধার বেগুর, কাজ করছিল ইন্টেলে—চাকরি পেয়েছিল মাত্র ছয় মাস আগে। সিলিকন ভ্যালিতে এমন ছোট ছোট পরিচয়, অস্থায়ী আবাস এবং নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে প্রত্যেকেই যেন এক নতুন জীবন শুরু করে—এটাই এখানে কাজ করার সত্যিকারের রূপ।
এটা হয়তো আজগুবি ঠেকবে—এক সম্পূর্ণ অজানা বাংলাদেশিকে শ্রীধার তার বাড়িতে ঠাঁই দিয়ে দিল! এটা হলো সিলিকন ভ্যালির ঔদার্য্য ও রীতি—‘তুমি যখন নতুন হিসেবে সিলিকন ভ্যালিতে আসবে, অন্য কেউ তোমাকে আশ্রয় দেবে। আর যখন তুমি চাকরি পেয়ে যাবে, তুমি আশ্রয় দেবে আরেকজন চাকুরি প্রার্থীকে।’ এই সৌজন্য বছরের পর বছর ধরে সিলিকন ভ্যালিতে চলে আসছে। তাইতো কত কত চাকুরি প্রার্থী ছুটে আসে সিলিকন ভ্যালির অচেনা গন্তব্যে, জানে কোথাও না কোথাও তাদের একটি ঠাঁই হয়ে যাবে।
শ্রীধার ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও স্বচ্ছ মনের এক তরুণ। কতভাবে যে সে আমাকে সাহায্য করেছিল! আমি তখনই অনুভব করেছিলাম, ও একদিন অবশ্যই অনেক বড় হবে। পরে একসময় সিলিকন ভ্যালিতে ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে টেরেনেটিক্স নামে একটি স্টার্টআপ কোম্পানি দাঁড় করিয়েছে।
এই সিলিকন ভ্যালিতে আমার আরও পরিচয় হলো অরুণ বিয়ানীর সঙ্গে। তিনি তখন ডেইজি সিস্টেম নামে একটি কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজার। তার আমন্ত্রণে সান্তা ক্লারায় তার বাড়িতে গেলাম। বিরাট ও আলিশান বাড়ি—কথায় কথায় তিনি বাড়ি কেনার গল্প বললেন।
তিনি যখন স্টার্টআপ ডেইজিতে চাকরি পেলেন, খুব যে খুশি হলেন তা বলা যাবে না। তাকে শুরুতে অনেক কম বেতন দেওয়া হয়েছিল, অন্যদিকে তার বন্ধুরা বড় বড় কোম্পানিতে অনেক বেশি বেতনে কাজ করছিলেন। কিন্তু তার কোনো বিকল্প ছিল না, তাই তিনি নিয়েছিলেন ডেইজির চাকরি।
চাকরিতে যোগদানের সময় তারা তাকে কোম্পানির শেয়ারের কিছু কাগজ দিয়েছিল, যেগুলোর তখন মূল্য শূন্য ডলার। কয়েক বছর পর কোম্পানি দাঁড়ায় এবং ডেইজি তখন সিলিকন ভ্যালির একটি দামি ও সফল কোম্পানি হয়ে ওঠে। তাদের শেয়ারের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। অরুন তখন সব শেয়ারগুলো বিক্রি করে একটি বিশাল বাড়ি কিনে ফেলেন।
ডেইজি সিস্টেম এখন আর নেই। তবে অরুণ বিয়ানীরা এখনও প্রতিবছর আসেন সিলিকন ভ্যালিতে, তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে—হাই টেকে কাজ করবেন বা নিজের কোম্পানি গড়বেন। সিলিকন ভ্যালির এই স্বপ্নে যোগ দিয়েছেন আমাদের বাংলাদেশি এক প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তা, যার নাম মোয়াজ্জেম হোসেন। আমি যখন সৌদি আরবের কিং ফাহদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম, তখন মোয়াজ্জেম ওখানকার ছাত্র ছিলেন।
সিলিকন ভ্যালিতে তিনি বেশ কয়েকটি উদ্যোগে সাফল্য অর্জনের পর, পাঁচ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘অটোমোসেন্স’—যা আমাদের পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং কৃষিকাজে বিপুল অবদান রাখতে সক্ষম হবে। মোয়াজ্জেমের এই গল্প প্রমাণ করে, সিলিকন ভ্যালি শুধু প্রযুক্তি ও ব্যবসার কেন্দ্র নয়, এটি স্বপ্ন ও উদ্ভাবনের একটি বিশ্বব্যাপী মঞ্চ।

অটোমোসেন্স এর মধ্যে ওজোন, নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, ফরমালডিহাইড–এই ধরনের অনেকগুলো বিষাক্ত গ্যাস সনাক্ত করার সেন্সর উদ্ভাবন ও বাজারজাত করেছে। তাদের উদ্যোগ শুধু আর্থিক সফলতায় সীমাবদ্ধ নয়—পরিবেশ রক্ষা ও কলকারখানার নিরাপত্তায়ও তাদের প্রযুক্তি প্রশংসা কুড়াচ্ছে। মোয়াজ্জেম হোসেন ‘অটোমোসেন্স ইন্ক্’ কোম্পানিরও সিইও এবং সহপ্রতিষ্ঠাতা।
সিলিকন ভ্যালির বড় বড় কোম্পানির নাম এবং তাদের সাফল্যের গল্প আমরা মোটামুটি সবাই জানি। ছোটোখাটো সাফল্যগুলোও বন্ধুবান্ধব বা লিঙ্কডইন প্রোফাইল খুঁজলে দেখা যায়। কিন্তু যেসব উদ্ভাবক বা বিনিয়োগকারী অনেক চেষ্টা করেও সাফল্য পাননি, তাদের কাহিনী প্রায়ই হারিয়ে যায় অন্যান্য সাফল্যের শ্বেত পাথরের নিচে, অজানা থেকে যায়।
সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করা অত্যন্ত স্ট্রেসফুল এবং এখানে লম্বা সময় ধরে কাজ করতে হয়। ওখানকার পরিবেশ প্রযুক্তিবিদ ও বিনিয়োগকারীদের জন্য খুবই প্রতিযোগিতামূলক। এই চাপের কারণে অনেকে ভারসাম্য হারান। আমি ওখানে থাকাকালেই একটি সংবাদ বের হয়েছিল—একজন সিইও ‘হিটম্যান’ লাগিয়ে তার স্ত্রীকে খুন করিয়েছিলেন। কারণ, তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন হয়েছিল কিছু অর্থ এবং সমস্ত স্টক তিনি স্ত্রীর নামে রেখেছিলেন। যখন প্রয়োজনের সময় স্ত্রী সেসব স্টক দিতে অস্বীকার করেন, তখন তিনি চরম দুঃখজনক সিদ্ধান্ত নেন। এমন কত দুঃখজনক ঘটনা সিলিকন ভ্যালির প্রদীপের আলোয় লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে উদঘাটন করে।
মানুষের ব্যর্থতা সবসময় থাকবে। সভ্যতার অগ্রগতিতে সাফল্য যতটুকু অবদান রেখেছে, ব্যর্থতা তার চেয়েও বেশি। নিঃসন্দেহে বলা যায়, সিলিকন ভ্যালির জয়গান ও জয়যাত্রা আগামীতেও মানুষকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে এবং আমাদের জীবনকে সহজ, সমৃদ্ধ ও উদ্ভাবনী উপাদানে সমৃদ্ধ করতে অবদান রাখবে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক