১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সালমান শাহ: তিন দশকের রহস্য ও শিল্পের অর্থনীতি

মাত্র তিন বছরের অভিনয়জীবন, অথচ তিনি কাঁপিয়ে দিয়েছেন ঢাকাই সিনেমা। সালমানের অসময় হারিয়ে যাওয়া কি কেবল একজন তারকার মৃত্যু, নাকি বাংলাদেশের ধসে পড়া চলচ্চিত্র অর্থনীতির ট্র্যাজেডি?

সালমান শাহ: তিন দশকের রহস্য ও শিল্পের অর্থনীতি
সালমান শাহ (১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১—৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬): মাত্র তিন বছরের অভিনয় জীবনে তৈরি করেছিলেন এক অনতিক্রম্য নিজস্ব বলয়।

সৌমিত জয়দ্বীপ সৌমিত জয়দ্বীপ

Published : 06 Sep 2026, 11:04 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

সালমান শাহ (১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১—৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬) সত্যই এক রহস্যপুরুষ বটে! মৃত্যুতে যেমন, কর্মেও তেমনই। তিন দশক হয়ে গেল, তার মৃত্যু আজও রহস্যের জন্ম দিয়ে চলেছে। সুরাহাহীন, কিন্তু বিপুল কৌতূহল উদ্দীপক।

অন্যদিকে, তার কর্মজীবনটিও বিস্ময়েরই বিকল্প নাম যেন। মাত্র ৩ বছর ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে। অথচ, অভাবনীয় তার সাফল্য। অভূতপূর্ব তার লোকপ্রিয়তা। খুব সম্ভবত সালমান-উত্তর সময়ে এই লোকপ্রিয়তার কাছাকাছি পৌঁছানো অন্য কারও পক্ষেই সম্ভব হয়নি।

কেন সম্ভব হয়নি, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু, সালমান শাহ যে পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে গেছেন অতি অল্প সময়ে এবং যেভাবে তিনি হারিয়ে গেলেন, সেটির গভীর অনুসন্ধান কেবল মৃত্যু রহস্য উদঘাটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না। সালমানের চিরবিলীন হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের অমিত এক প্রতিভারই শুধু মৃত্যু হয়নি। মৃত্যু ঘটেছে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের বিকাশেরও। ফলতঃ সেই শিল্পের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনারও। 

সালমান শাহ চলচ্চিত্রে এলেন ১৯৯৩ সালে। ইমন চৌধুরী নামটা হারিয়ে গেল। ২২ বছর বয়সে তিনি হয়ে গেলেন সালমান শাহ! প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়েই ইন্ডাস্ট্রি কাঁপিয়ে দিলেন। ভাবা যায়, মাত্র তিন বছরেই ২৭টি ছবি আরও কিছু টিভি নাটক! তার পর একদিন সালমান শাহও হারিয়ে গেলেন!

ইমন চৌধুরীর হারিয়ে যাওয়াটা ছিল আনন্দ ভৈরবী গাথার। সালমান শাহর হারিয়ে যাওয়াটা ছিল অন্তহীন বেদনার বুদ্বুদ।

২.

নব্বইয়ের দশকে বাংলার তারুণ্য সালমান শাহ জ্বরে ভুগেছে। সেটা শুধু তার গ্ল্যামারের কারণে নয়। উত্তম কুমারের গ্ল্যামার ছিল অসাধারণ ঈর্ষণীয়। কিন্তু অভিনয় গুণ না থাকলে সেই গ্ল্যামার তো মূল্যহীন। উত্তমের দুটিই ছিল এবং সেটিই তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত মহানায়কে পরিণত করেছে।

সালমানেরও শুধু গ্ল্যামার থাকলে তাকে নিয়ে এত আলোচনা হতো না। তিনি যে তারুণ্যের দেয়ালে দেয়ালে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং অর্জন করেছিলেন লোকপ্রিয়তা, সেটার বড় কারণ ছিল তার অভিনয়।

অভিনয়ের কৌশল বিবেচনায় সালমান অবশ্যই মহানায়ক উত্তম কুমার বা নায়করাজ রাজ্জাকের ঘরানার ছিলেন না। নিশ্চিতভাবেই, সালমানের নিজস্ব একটা ঘরানা গড়ে উঠেছিল। তবে, তাদের মতোই রোমান্টিক-ঘরানার চরিত্র ছিল তার। এর সঙ্গে ছিল তার নিজের তৈরি করা বিবিধ স্টাইল। ফলে, তারুণ্য তাকে আপন করে নিতে খুব বেশি সময় নেয়নি।

রোমান্টিকতার সঙ্গে মারদাঙ্গা একটা ভাব ও স্বভাব—নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক বাতাবরণ, সামাজিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্খলনের প্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নেওয়া একক ব্যক্তির ক্যারিশমার যুগে এই মারাদাঙ্গা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি ইন্ডাস্ট্রি তার রোমান্টিক গ্ল্যামারাস নায়কের কাছে ডিমান্ড বা দাবি করছিল—সালমান সেটাই এনে দিলেন ঢাকাইয়া বাংলার চলচ্চিত্রকে।

মনে হচ্ছিল, নতুন একজন তরুণের পালে হাওয়া তুলে বলিউডের বাতাস থামাবে ঢালিউড। আর চ্যালেঞ্জ করবে টালিউডকে। মাত্র তিন বছরেই সেই দীপটা নিভ গেল চিরতরে‍! এরপর ঢালিউডের শুধুই এক্কা-দোক্কা খেলার পর্ব।

তাই, সেদিনের যে তারুণ্য আজ ঢের বয়সে পৌঁছেছে, সে জানে সালমান কেন এখনও সেই সময়ের অদ্বিতীয়, সেই সময়ের সেরা। শুধু তাই নয়, সালমান আসলে তার জীবনের ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সের ওই ছোট্ট সময়ে বিশাল এক সময়কে অতিক্রম করে গেছেন। যেটা প্রায় অনতিক্রম্য। কোনদিনও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। কারও পক্ষেই না।

৩.

নব্বইয়ের দশকে, যখন মুক্ত বাজার অর্থনীতি কেবল পাখনা মেলা শুরু করেছে এদেশে, তখনও আজকের মতো শুধু টিভিতে মুখ দেখিয়ে জনপ্রিয়তা সহজলভ্য ছিল না। বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টিভি নেটওয়ার্কের বয়স সালমানের অকাল মৃত্যুর প্রায় সমবয়সী। ফলে, তখনও এদেশে চলচ্চিত্রের কিংবা পর্দাকেন্দ্রিক বিনোদনের দুটি মাত্র মাধ্যম খোলা ছিল: বিটিভি ও সিনেমা হলের রূপালি পর্দা।

ভুলে গেলে চলবে না, সালমান সেই সময়ে মাত্র তিন বছরেই কাঁপিয়ে গিয়েছিলেন বক্স অফিস। একই সঙ্গে একদম বাঙালি মধ্যবিত্তের মান-অভিমান-ভাব-ভালোবাসার গণ্ডি ছাপিয়ে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন কৃষক-শ্রমিক-নিম্নবিত্তের চাঁদের আলো ঢোকা কুটিরে। অথচ, ধূমকেতুর মতো উত্থিত হওয়া এই নক্ষত্র হঠাৎই মৃত্যুলোকে হারিয়ে গেলেন আরও অনেক কিছু দেওয়ার আগেই।

তার ‘মৃত্যু’কে অবশ্য ‘আত্মহত্যা’ বলতে অনেকেরই কষ্ট হয়। সালমান ‘আত্মহত্যা’ করেছিলেন, এটা তার কোটি কোটি ভক্ত আজও বিনাশর্তে বিশ্বাস করেন বলে মনে হয় না। তাই সত্যই এই লেখাতেও ‘আত্মহত্যা’ শব্দটা লেখা গেল না। আগেও বহুবার তার ‘মৃত্যু’ নিয়ে রহস্যজনক কথাবার্তা চালু ছিল।

এই মৃত্যু নিয়ে যতবারই কথা উঠেছে, তার পরিবার সেটিকে আত্মহত্যা বলতে অস্বীকার করেছে। তারা এটাকে হত্যাকাণ্ডই বলেছে বারংবার। কিন্তু, রহস্যজনক এক কারণে সেটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘আত্মহত্যা’রই স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে। কিন্তু, জনমানসে তা আদতে ‘আত্মহত্যা’ হয়ে উঠতে পারেনি। এও কি কম বড় রহস্যের কথা?

আদৌও কি আত্মহত্যা করেছিলেন সালমান? বহু মানুষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা এর আগে বলেছেন, তাদের প্রিয় নায়কের মৃত্যু-রহস্য জানতে। সালমানের ‘অপমৃত্যু’র কোনো সুরাহা কেন রাষ্ট্র করতে চায়নি অতীতে সেটিও এক রহস্য। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব রহস্যাবৃত আলোচনা দিগবিদিগ ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এই রহস্যের উন্মোচন জরুরি। সত্য যে, সে সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। নানান সময়ে ও বিভিন্ন সরকারের আমলে জল ঘোলা হওয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালত এই ঘটনায় ‘হত্যা মামলা’ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সালমানের প্রাক্তন স্ত্রীসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। নতুন করে এই মৃত্যুর তদন্ত শুরু হয়েছে। এখন অপেক্ষা প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত হওয়ার। আদৌ কি হবে?   

নামটা সালমান শাহ বলেই শুধু নয়, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও সঠিক তথ্যটি জনগণের জানা দরকার। আবার, নামটি সালমান শাহ বলেই এই রহস্যের উদ্‌ঘাটন অতীব জরুরি। মনে রাখতে হবে, এটা সেই মৃত্যু, যে মৃত্যুটি বাংলাদেশের একটা সম্ভাবনাময় শিল্পকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই মৃত্যু যে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলেছে, সেটা নিয়েও উৎসুকজন গবেষণা করতে পারেন।

একটু গভীরে ঢুকলেই বুঝতে পারবেন, বাংলাদেশের সিনেমা হলের হালের মন্দা-ব্যবসার মূল কারণ এই মৃত্যুর অন্দরে হাবুডুবু খায়। হলের ব্যবসা তো শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছিল সেই নিম্নবিত্তই, যারা গ্ল্যামারাস ও পর্দার অতি উচ্চবিত্তীয় নায়ক সালমানকেও নিজের ঘরে আশ্রয় দিতে কার্পণ্যবোধ করেননি।

ভাবা যায়, একজন তরুণের মৃত্যু সেই নিম্নবিত্তের আবেগকেও টলিয়ে দিল! নিম্নবিত্ত হল থেকে মুখ সরিয়ে নিল, হল-ব্যবসাতেও মন্দা বাজার এসে গেল। কত হল যে বন্ধ হয়ে গিয়েছে স্রেফ এই মৃত্যুর পর, তা নিয়ে বলতে গেলে গবেষণালব্ধ আলোচনাই হয়নি কোথাও। আহ, কত মানুষের মানসিক বেদনা শুধু নয়, বাণিজ্যিক বেদনারও কারণ হয়ে থাকল এই একটি মৃত্যু!

৪.

সালমান শাহ এমনই এক ‘রহস্যময়’ শক্তি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু শক্তিটা ফুটতে না ফুটতেই বিলীন হয়ে গেল। ৩০ বছর বড়ই দীর্ঘ সময়। ৩০ বছর মানে ২২-এর আট ঘর বেশি। ভাবুন, ২২ বছরে এসেই এক তরুণ মুমূর্ষু ঢালিউডের ‘ত্রাতা’ হয়েছিলেন। অথচ, আজ ৩০ বছর ধরে তিনি অনুপস্থিত! এই সময়ে ইন্ডাস্ট্রি এগোয়নি, এমন নয়। এগিয়েছে। কিন্তু, সালমান শাহের ওই তিন বছরের প্রভাবকে দীর্ঘ ক্যারিয়ার দিয়েও কেউ টপকাতে পেরেছেন, এমন জোর দাবি করা যাচ্ছে না।

দীর্ঘ তিন দশক ধরে বাংলাদেশ আরেকজন সালমান শাহ খুঁজছে, যার ক্যারিয়ার বা কর্মজীবন থেমে গিয়েছিল মাত্র তিন বছরে। পায়নি। সালমানরা যুগে যুগে জন্মান না!

সৌমিত জয়দ্বীপ সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: sowmit.joydip.lekhalekhi@gmail.com