চাটগাঁর বিস্মৃত বাঘেরা

'লেপার্ড পাস' এলাকাটির নামকরণ আর বাজারে আক্রমণ করে মানুষ মারার ঘটনা চিতাবাঘের দিকেই নির্দেশ করে। সঙ্গে কি রয়েল বেঙ্গল টাইগারও ছিল? নাকি অন্য কোনও প্রজাতির বাঘেরাও ছিল চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ি জঙ্গলে?

মিঠুন চৌধুরীমিঠুন চৌধুরী
Published : 29 July 2022, 11:17 AM
Updated : 29 July 2022, 12:01 PM

সুন্দরবনে একসাথে চার বাঘ দেখার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। এর কয়েকদিনের মধ্যে কাছাকাছি স্থানে দেখা গেছে আরেক কিশোর বাঘকে। সুন্দরবন অনেক দূর। এই চট্টগ্রাম শহরেই একসময় রীতিমত বাঘের উৎপাত ছিল। দিনে দুপুরে বাঘের আক্রমণে বাজারে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আর রাতের বেলায় শহরের কোনো কোনো এলাকার মানুষ বাঘের হুঙ্কারে রীতিমত থর হরি কম্প অবস্থায় থাকতো। সেসব এক থেকে দেড়শ বছর আগের কথা। এখন অবশ্য বাঘ দূর অস্ত তেমন কোনও প্রাণীর দেখাই মেলেনা শহর এলাকায়। কেমন ছিল তখনকার জঙ্গলাকীর্ণ চাটগাঁ শহর, কতটা দাপট ছিল বাঘের- ইতিহাসের পাতায় তার কিছু দৃষ্টান্ত আছে।

ইংরেজ নাগরিক এ এল ক্লে চট্টগ্রামে কয়েক বছর বসবাসের অভিজ্ঞতায় রচনা করেন ‘লিডস ফ্রম এ ডায়েরি ইন লোয়ার বেঙ্গল’ নামের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ। কয়েক দফায় তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন। প্রথমবার ১৮৬২-৬৩ সালে এবং দ্বিতীয় দফায় ১৮৬৭-৬৮ সালে। কেমন ছিল তখনকার চট্টগ্রাম শহর? আজ থেকে দেড়শ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৬২ সালে চট্টগ্রাম শহরে বাঘের আনাগোনা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

চাটগাঁ ছিল তখন জঙ্গলাকীর্ণ। দিনেদুপুরেও বাঘের গর্জন শোনা যেত। ক্লে যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি বাঘ মেরে আনা হলো সরকারি পুরষ্কারের জন্য। চাঁটগার সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা ছিল তখন ‘টাইগার পাস’- দু পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সমুদ্র বরাবর। লেপার্ড পাস নামেও এ রকম একটি রাস্তা ছিল। ক্লে জয়েন করার কয়েক দিনের মধ্যে, খোলা বাজারে বাঘ আক্রমণ করলো দুজন নেটিভকে। এ আক্রমণে প্রাণ হারালো একজন।

১৮৬৭ সালে চট্টগ্রামে ফিরে ক্লে দেখেন শহরে জঙ্গল আরো বেড়ে গেছে। সেসময় জঙ্গল পরিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। বাঘের উপদ্রব তখনও কমেনি চাটগাঁয়। একদিন দুপুরে কাচারির সামনে দেখা গেল বাঘ। ‘বাঘ’ ‘বাঘ’ বলে উর্ধ্বশ্বাসে সবকিছু ফেলে পালালো সবাই। বাঘও অবশ্য এই হুলুস্থূলে কেটে পড়লো। কিন্তু ক্লে তক্কে তক্কে রইলেন।

শহরের জঙলি পথে টোপ গেঁথে রাখতে লাগলেন এবং এক চন্দ্রালোকিত রাতে দেখা পেলেন বাঘের। গুলিও করলেন কিন্তু ফস্কে গেল। গুলিতে ফসকালেও ফাঁদে বাঘ আটকের ঘটনা প্রায় নিয়মিতই ছিল এই শহরে। আবার বাঘের জন্য ফাঁদ পেতে শিকারি নিজেই সেখানে আটকে পড়েছিলেন বাঘভেলীর পাহাড়ে। দুদিন পর কাঠুরিয়ারা গিয়ে তাকে রক্ষা করেছিলেন।

১৮৭৮ সালে এ এল ক্লে চট্টগ্রামের কালেক্টর ছিলেন। তিনি লিখেছেন, এক দুপুরে খোলা বাজারে বাঘের আক্রমণে একজন নেটিভের প্রাণ হারানোর কথা। তখন চট্টগ্রাম শহরে বাজার ছিল চকবাজার, দেওয়ান বাজার ও ফিরিঙ্গি বাজার। তবে তখন চট্টগ্রাম শহরে জমজমাট বাজার ছিল চকবাজার, সেটা ক্লে সাহেবের অফিসের সন্নিকটবর্তী। তাই ইতিহাস গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর ধারণা অনুসারে, চকবাজারেই দিনদুপুরে বাঘে মানুষ মেরেছিল; যে ঘটনা ক্লে সাহেব নিজে দেখেছিলেন। চকবাজারের সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঘভেলু বা বাঘভেলীর অবস্থান। আবদুল হক চৌধুরীর মতে চট্টেশ্বরী রোডের ওয়ার সিমেট্রি সন্নিহিত অঞ্চলটির নামই বাঘভেলী।

বাঘভেলু এলাকার নিকটবর্তী স্থানের অধিবাসী অ্যাডভোকেট সুনীতি বিজয় হাজারী ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীকে বলেছিলেন, “প্রাচীন কাল থেকে আমাদের কিশোর সময় পর্যন্ত দুপার্শ্বে সুউচ্চ পাহাড়-শ্রেণির মধ্যবর্তী আজকের বাঘভেলী এলাকাটি জনমানবহীন গভীর বনজঙ্গল আবৃত ছিল। সেখানে দিন দুপুরে বাঘ গর্জন করে বেড়াত। সেকালে কাঠুরেরা দলবদ্ধভাবে ছাড়া বাঘের ভয়ে কেউ একাকি বাঘভেলুর জঙ্গলে কাঠ, বাঁশ, ছন ইত্যাদি কাটতে যেতো না। তৎকালীন শহর চট্টগ্রামের অধিবাসীরা সর্বদা বাঘের আক্রমণের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতো। তখন শহরে বাঘের উৎপাত বন্ধ করার উদ্দেশ্যে সরকার শহর চট্টগ্রামের বাঘ শিকারিকে পুরস্কৃত করতো, তাই সেকালে শিকারিরা বাঘ মেরে অথবা ফাঁদ পেতে জীবন্ত বাঘ ধরে তদান্তীন ইংরেজ কালেক্টরের কাছে নিয়ে গিয়ে নগদ টাকা পুরস্কার লাভ করতো। আমাদের কৈশোরে শিকারির গুলিতে মৃত বাঘ ও ফাঁদ পেতে ধরা জীবন্ত বাঘ প্রায় দেখতাম।”

চট্টগ্রাম শহরের কয়েকটি স্থানের নামের সাথে মিশে আছে বাঘ। এর একটি হলো বাঘঘোনা। লালখান বাজার মোড় থেকে উত্তর পশ্চিমে কোণাকুণি ঝাউতলা ওয়ারলেস কলোনি পর্যন্ত সমতল এলাকাটির নাম বাঘঘোনা। বিশ শতকের তিন দশক অবধি সেখানকার পাহাড়শ্রেণিসহ সমতল এলাকাটি গভীর অরণ্যে আবৃত ছিল। তখন ঐ সমতল এলাকাটিতে বাঘ বিচরণ করতো বলে এলাকাটি বাঘঘোনা নামে খ্যাত হয়।

এরকম আরেকটি এলাকার নাম ‘টাইগার পাস’। পাহাড়ি শহরের কয়েকটি রাস্তার সংযোগস্থল এই ‘টাইগার পাস’। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘটনার সাক্ষীও এলাকাটি। এখানকার রাস্তার দুপাশে ছিল উঁচু পাহাড়। উনবিংশ শতকের শেষার্ধেও এসব পাহাড় গভীর বনজঙ্গলে আবৃত ছিল, ছিল জনবসতিহীন। সেখানে দিনেদুপুরে বাঘ চলাচল করত এবং মানুষ ও গরু-ছাগল মারত। এখনো টাইগারপাসের আশেপাশে কিছু পাহাড় অবশিষ্ট আছে। আর টাইগার পাসের নামের সাথে মিল রেখে রাস্তার মাঝে সড়কদ্বীপে ঠাঁই হয়েছে একটি বাঘের ভাস্কর্যের। অদূরে সড়কের দুপাশে পাহাড়ের পাদদেশে আছে আরো দুটি বাঘের মূর্তি।

চাটগাঁ শহরের আরেকটি এলাকার নাম ছিল ‘লেপার্ড পাস’। লেপার্ড বা চিতাবাঘের উৎপাত থেকে ওই নাম হয়। লিওপার্ড শব্দটির উচ্চারণ বিকৃত হয়ে ‘লেপার্ড পাস’ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে সময়ের সাথে সেই নামটিও হারিয়ে গেছে।

ভারততত্ত্ববিদ এবং এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোনস চট্টগ্রামে এসেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের অকৃত্রিম প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রশংসা করেছিলেন। ১৭৮৬ সালে স্যার উইলিয়াম জোনস চট্টগ্রামকে প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র বলে মন্তব্য করেছিলেন। এখানকার জঙ্গলে জীবজন্তুর মধ্যে বাঘ, চিতা বাঘ, ভালুক, হরিণ, খরগোশ, বনবিড়াল, বানর ছিল বলেও জানান তিনি।

অষ্টাদশ বা উনবিংশ শতাব্দীতে শুধু নয় বিংশ শতাব্দীতেও চট্টগ্রাম শহরে বাঘের আনাগোনা ছিল প্রাত্যহিক ঘটনা। গোয়ালের গরু বাঘে ধরে নিয়ে মেরে ফেলত। রাতের বেলা অন্যতম আতঙ্ক ছিল বাঘ। তাহলে কোথায় হারালো শহর দাঁপিয়ে বেড়ানো সেই বাঘেরা?

সাহিত্যিক আবুল ফজল শৈশবে নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকায় থাকতেন। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘রেখাচিত্র’ এ তিনি চট্টগ্রাম শহরে সেসময়ে বাঘের উপদ্রবের বর্ণণা দেন-

“শীতকালে এ কাজীর দেউড়ি অঞ্চলে নাকি প্রায়ই বাঘ নামত। কাজী বাড়ির গোয়াল ঘরে ঢুকেও দু’একবার নাকি গরু মেরেছে বাঘে। অনেক শীতের রাতে বাইরে পাতা নড়ার শব্দে গা ছম ছম করে উঠত। বিশেষ করে যেদিন একলা থাকতে হয় আমাকে দেউড়ি ঘরে। টাইগার পাসে খাঁচা পেতে বাঘ ধরতে আমরাই দেখেছি। কাজেই ভয়টা একেবারে অমূলক ছিল না। কনকনে শীতের সময় মাঝে মাঝে বাঘের ডাক ভেসে আসত নাসিরাবাদের পাহাড় অঞ্চল থেকে। ... পাকিস্তান হওয়ার আগে থেকেই শুরু হয়েছে জঙ্গল কাটা। এখন তো আট দশ মাইলের মধ্যে ঝোপঝাড় নিশ্চিহ্ন। দূর দূর পাহাড়ের মাথায়ও উঠে গেছে বড় বড় বাড়ি। বাঘের কেন, এখন চট্টগ্রাম শহরে শিয়ালের ডাকও দুর্শ্রাব্য।”

মূলত পাহাড় ঘেরা চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ি জঙ্গলে ছিল সেই বাঘেদের আবাস। শহরের পরিসর ও জনবসতি বাড়ার সাথে সাথে শুরুতে পাহাড়ের উপরিভাগ কেটে বাড়িঘর বানানো শুরু হয়। তারপর বড় কয়েকটি পাহাড়ে সরকারি বেশকিছু স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়। বসতি স্থাপনের জন্য অনেক ছোট টিলা আর পাহাড় কেটে ফেলা হয় পুরোপুরি। এতে বাঘের খাদ্যচক্রের নিচের দিকের প্রাণিদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয় বলেই ধারণা করা যায়। সঙ্গে ছিল আগে থেকেই বাঘ নিধনের প্রবণতা। তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। চট্টগ্রামের হারিয়ে যাওয়া সেই বাঘেরা আসলে কোন প্রজাতির? চাটগাঁ শহরে যে চিতাবাঘের বসত ছিল তা মোটামুটি নিশ্চিত। লেপার্ড পাসের নামকরণ আর বাজারে আক্রমণ করে মানুষ মারার ঘটনা চিতাবাঘের দিকেই নির্দেশ করে। সঙ্গে কি রয়েল বেঙ্গল টাইগারও ছিল? নাকি অন্য কোনও প্রজাতির বাঘেরাও ছিল চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ি জঙ্গলে? পাহাড় কাটা, নিধন আর খাদ্য সংকট ছাড়া অন্য কোনো কারণ ছিল কী শহুরে বাঘ বিলীন হওয়ার নেপথ্যে? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়ত প্রাণিবিজ্ঞানী আর ইতিহাসবিদরা দিতে পারবেন। চলতে পারে অনুসন্ধানও। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, চাটগাঁ শহরে বাঘ ছিল। আর প্রকৃতি বিধ্বংসী মানুষের আগ্রাসনে হারিয়ে গেছে আমাদের বাঘ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক