১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বড় অংক ছেড়ে ছোট ঋণে কেন ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো?

ছোট ঋণে খেলাপি বাড়লেও প্রযুক্তিনির্ভর ঋণমান যাচাই হতে পারে সমাধানের বড় চাবিকাঠি।

বড় অংক ছেড়ে ছোট ঋণে কেন ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো?
ঝুঁকি বিকেন্দ্রীকরণের তাড়না থেকেই খুচরা ঋণ তৈরি করছে নতুন সম্ভাবনা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্বের সম্ভাবনা।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

Published : 26 Aug 2026, 01:58 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

ব্যাংকিং খাতে বড় শিল্পকারখানা ও করপোরেটনির্ভরতা ভেঙে নতুন রূপান্তর ঘটছে। ব্যাংকগুলো এখন তাদের নজর সরাচ্ছে বড় ঋণের ঝুঁকি থেকে; মনোযোগ বাড়াচ্ছে ব্যক্তিগত, গাড়ি ও গৃহঋণের মতো খুচরা খাতে। এই পরিবর্তনকে কেবল ঝুঁকি এড়ানোর তড়িঘড়ি কোনো পদক্ষেপ নয়, সময়ের প্রয়োজনে গৃহীত দূরদর্শী ও পরিণত কৌশলগত পুনর্বিন্যাস বলা যায়।

সংখ্যাগুলো দেখলেই বদলের গতি বোঝা যায়। বর্তমানে দেশের মোট ঋণের প্রায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ ভোক্তা ঋণ, এক বছর আগে যা ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের মোট ঋণের ২১ শতাংশ এখন খুচরা ঋণ, পাঁচ বছর আগেও যা ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ, আর ২০২৫ সালে খুচরা ঋণ পোর্টফোলিও বেড়েছে ২৬ শতাংশ। ব্র্যাক ব্যাংকের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ১৮ শতাংশ বা প্রায় সাড়ে তেরো হাজার কোটি টাকা এখন খুচরা ঋণ। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মোট ঋণের সোয়া ২২ শতাংশ ভোক্তা ঋণ, আর পূবালী ব্যাংক তিন বছরে এই হার ত্রিশ শতাংশে নিতে চায়। এই পরিসংখ্যান নিছক প্রতিযোগিতার খেলা নয়। ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার ইতিবাচক চেষ্টা।

ব্যাংকগুলো কেন এই পথ বেছে নিচ্ছে, তার পেছনের যৌক্তিকতা বেশ জোরদার ও সময়োপযোগী। বড় শিল্পগোষ্ঠির ওপর নির্ভরতা ব্যাংকের ঝুঁকিকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে, আর বিস্তৃত খুচরা গ্রাহকভিত্তি সেই ঝুঁকিকে সহজেই ছড়িয়ে দেয়। সঙ্গে যোগ হয় নীতিগত সহায়তা। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তিগত ঋণের সর্বোচ্চ পরিশোধের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করেছে এবং ভোক্তা ঋণ বৃদ্ধির ওপর থাকা পুরোনো বিধিনিষেধও তুলে নিয়েছে। ব্যক্তিগত ঋণের সর্বোচ্চ সীমাও কুড়ি লাখ থেকে বাড়িয়ে চল্লিশ লাখ টাকা করা হয়েছে। এই নীতিগত উদারতা খুচরা ঋণের বাজারকে বাড়তি অক্সিজেন জুগিয়েছে বলা যায়।

প্রযুক্তির অবদানও এখানে উল্লেখযোগ্য। ব্র্যাক ব্যাংক ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে ব্যাংকবহির্ভূত মানুষকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে, সমন্বিত আর্থিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলা কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থাও এই প্রবণতাকে গতি দিচ্ছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ আবেদন, পরিচয় যাচাই ও গ্রাহকসেবা এখন অনেক সহজলভ্য, যা খুচরা ব্যাংকিংকে শহর ছাড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কাছেও পৌঁছে দিচ্ছে।

এখানেই একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে আসে। খুচরা ঋণের এই দ্রুত বিস্তার কি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে?  এক কথায় উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে উত্তরটা নেতিবাচক নয়, এটি নির্ভর করছে ব্যাংকগুলো কতটা গোছানো ও সুসংহত পদ্ধতিতে এই সম্প্রসারণ পরিচালনা করছে তার ওপর। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ছোট অঙ্কের ঋণে খেলাপি হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে, যা প্রমাণ করে খুচরা ঋণের প্রসার শুধু বিতরণের গতির ওপর নির্ভর করে করা ঠিক নয়, একে ঋণমান যাচাইয়ের মজবুত কাঠামোর সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে। ভালো খবর হলো, প্রযুক্তি এখানেও সমাধানের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বায়োমেট্রিক যাচাই, মোবাইল ওয়ালেটের লেনদেনের তথ্য এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণের বিকল্প মডেল গড়ে তোলা গেলে জামানতহীন গ্রাহকদের ঝুঁকিও অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। এই পথে হাঁটলে খুচরা ব্যাংকিং শুধু ঝুঁকি বণ্টনের কৌশল না থেকে প্রকৃত অর্থে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি হাতিয়ারে পরিণত হবে।

খুচরা ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহক সম্পর্ক তৈরির সুযোগে। একজন গ্রাহক ঋণ সম্পর্ক দিয়ে ব্যাংকিং সম্পর্ক শুরু করলে পরে কার্ড, বিমা, বিনিয়োগ কিংবা সঞ্চয় ব্যবস্থাপনার মতো নানা সেবাও নিতে পারেন। এতে একদিকে ব্যাংকের ফি-ভিত্তিক আয় বাড়ে, অন্যদিকে গ্রাহকের আমানতের ভিত্তিও বিস্তৃত হয়। বড় করপোরেট গ্রাহক সীমিতসংখ্যক হওয়ায় তাঁদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিস্তৃত খুচরা ভিত্তি গড়ে তোলা আসলে এক ধরনের দূরদর্শী কৌশল, যা স্বল্পমেয়াদি মুনাফার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে পারে।

পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও অনেকে করেন, কারণ বিপুলসংখ্যক ছোট গ্রাহকের হিসাব পরিচালনা, ঋণ আবেদন যাচাই ও নিয়মিত সেবা দেওয়ার জন্য বাড়তি অবকাঠামো প্রয়োজন। তবে এই ব্যয়কে আমি সমস্যার চেয়ে বিনিয়োগ হিসেবেই দেখতে চাই। শাখাভিত্তিক সেবার বদলে অ্যাপনির্ভর সেবায় রূপান্তর ঘটাতে পারলে প্রাথমিক খরচ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, আর গ্রাহকও দ্রুত ও ভোগান্তিহীন সেবা পাবেন। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো যদি নিজেদের মধ্যে একটি অভিন্ন ঋণমান তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারে, তাহলে একই গ্রাহকের একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার প্রবণতাও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

তাহলে করপোরেট ঋণ থেকে সরে খুচরা ঋণে ঝোঁকা কি টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ খুলে দেবে? আমার বিশ্বাস, হ্যাঁ দেবে যদি এই সম্প্রসারণের সঙ্গে ঋণমান যাচাইয়ের প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো, শাখাবহির্ভূত সেবার সম্প্রসারণ এবং আন্তঃব্যাংক তথ্যবিনিময়ের ব্যবস্থা একসঙ্গে গড়ে ওঠে। নীতিগত সুবিধা ও প্রযুক্তির অগ্রগতি ইতিমধ্যে এই পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বাকি কাজটা এখন ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও পরিকল্পিত বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে, আর এই জায়গাটায় সচেতন হলে খুচরা ব্যাংকিং সত্যিকার অর্থে হয়ে উঠতে পারে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন চালিকাশক্তি।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com