১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

স্মৃতির আঙিনায় যতীন সরকার: একটি অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

দলকানা বুদ্ধিজীবিতার ভিড়ে যিনি আত্মবিক্রয় করেননি কখনো। সাধারণ মানুষের লোকায়ত দর্শন ও ঐতিহাসিক সত্যের ধারক যতীন সরকারের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার।

স্মৃতির আঙিনায় যতীন সরকার: একটি অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার
যতীন সরকার (১৮ অগাস্ট ১৯৩৬—১৩ অগাস্ট ২০২৫); যার প্রজ্ঞা আমাদের পথ দেখায়, আর যার অনাবিল হাসি শেখায় সহজ জীবনবোধের পরম সত্য। প্রতিকৃতি: গৌতম কুমার দেবনাথ

বনশ্রী ডলি বনশ্রী ডলি

Published : 18 Aug 2026, 05:05 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:58 PM

প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ এবং উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক যতীন সরকার শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার এক জীবন্ত বাতিঘর। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি একজন ক্ষুরধার গবেষক ও লেখক।

বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোকায়ত দর্শন, রাজনীতি ও মুক্তচিন্তা নিয়ে তার অসংখ্য মৌলিক গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রয়েছে। তার বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’, ‘সংস্কৃতির সংগ্রাম’, ‘বাঙালির সমাজভাবনা’ ও ‘স্মৃতির পথরেখা’ অন্যতম।

দলকানা ‘বুদ্ধিজীবীর দেশে’ তিনি ছিলেন সেই দুর্লভদের একজন, যিনি কখনও নিজের বুদ্ধিজীবিতাকে ‘আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ’ সঞ্চয়ে ব্যবহার করেননি।

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১০ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।

পারিবারিক কারণেই যতীন সরকারের কথা জানা ছিল ছোটবেলা থেকে। কলেজে পড়ার সময় দেখতে পাই মুখোমুখি। তারপর কখনও তার বক্তৃতা শোনা, কখনও আবার আড্ডায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। সেই থেকে তার কাছে গল্প শোনার, ইতিহাসকে নতুন করে চেনার এবং তার জীবনদর্শনের গভীরে যাওয়ার ইচ্ছে মনে পুষে রেখেছিলাম। সেই সুবাদেই ২০১৯ সালের ৮ অক্টোবরের এক ঝলমলে দুপুরে নেত্রকোণায় তার বাসভবনে যাওয়া। আমি সেদিন সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলাম মোস্তাফিজুর রহমান, তিনি যতীনদার কাছের মানুষ, নেত্রকোণার  সাংস্কৃতিজন,  এখন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক  করমকরতা, অন্যজন  কলেজ শিক্ষক বিপ্লব সাহা।

গাছপালায় ঘেরা শান্ত সেই আঙিনায় লাঠিতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে এসে বসার ঘরে আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন প্রিয় ‘যতীন দা’। তার সেই গমগমে হাসি কিছুটা ম্লান হলেও আড্ডার আমেজে বিন্দুমাত্র ঘাটতি ছিল না। রাজনীতি, সমাজতন্ত্র, ধর্ম, দর্শন কিংবা বদলে যাওয়া সময়—সবকিছু নিয়েই অত্যন্ত সাবলীল ও অনন্য এক প্রজ্ঞার আলোয় কথা বলেছিলেন তিনি।

সেই দিনের আড্ডা আর টেপে রেকর্ড করা কথাগুলোই তার সঙ্গে আমার শেষ দীর্ঘ কথোপকথন হয়ে রয়েছে। এরপর করোনাকাল এবং তার দীর্ঘ অসুস্থতায় কাটে হাসপাতালের শয্যায়। ঢাকায় হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের শয্যায় যন্ত্রপাতি পরিবেষ্টিত অবস্থায় তার আকুলতা ছিল—“এখানে ভালো লাগছে না, বাড়ি যাব!” পরবর্তীতে ময়মনসিংহে চিকিৎসাধীন অবস্থায়, ২০২৫ সালের ১৩ অগাস্ট অনন্তলোকের উদ্দেশে পাড়ি জমান এই চিন্তার মহীরুহ।

অসুস্থতার কাছে শরীর হেরে গেলেও তার চিন্তার দ্যুতি আজও অমলিন। সেই দিনের আড্ডার রেকর্ড থেকে বর্ণে বর্ণে সাজিয়ে লেখাটি তৈরি করার বিলম্বহেতু এটি অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার হিসেবে রয়ে গিয়েছে এতদিন।

তার জন্ম: ১৮ অগাস্ট ১৯৩৬। তার জন্মদিন উদযাপনের মূল অর্থই হলো তার প্রজ্ঞার আলোয় নিজেদের আলোকিত করার প্রয়াস নেওয়া। শ্রদ্ধেয় যতীন সরকারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতিতর্পণের অর্ঘ্য হিসেবেই পাঠকদের জন্য অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

যতীন সরকারের সঙ্গে বনশ্রী ডলি।

যতীন সরকারের সঙ্গে বনশ্রী ডলি।

বনশ্রী ডলিদাদা কেমন আছেন?

যতীন সরকারএক কথায় কী বলা যায় কেমন আছিতা মন ভালো আছেতবে শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না।

বনশ্রীআচ্ছা দাদা ‘মন’ আর ‘শরীরমন ভালো থাকলে কি শরীর ভালো থাকেমনের সাথে এই যে শরীরের ব্যাপারটা আপনার কাছে এটা কী মনে হয়?

যতীন সরকারশোনোমন আর শরীরশরীরের বাইরে তো মন বলে কোনো জিনিস নাই। মন শরীরের জিনিস। মন মানে কীমন হলো মস্তিষ্কের অ্যাকশন। এখন এই অ্যাকশনটা বিভিন্ন কারণে বিপর্যস্ত হয়। যদি বাইরে কোনো ভালো কিছু দেখি তা আমার মস্তিষ্কে প্রতিফলিত হয় তখন আমার মনটা ভালো হয়। মন বলে আলাদা কোনো জিনিস আছে তা অন্তত ফিজিওলজিক্যালি সত্যি নয়। মন কোথায় থাকেমন বলে কোনো কিছু কি দেখা যায়হো হো হো।

বনশ্রীদাদা খবর শোনেনটেলিভিশন দেখেনদিনকাল কেমন দেখছেনআগের আর এখনকার সময় আপনার কাছে আলাদা কোনো বার্তা হয়ে আসে কি?

যতীন সরকার: টেলিভিশন খুব কম দেখিতবে স্ক্রলে খবরগুলো দেখি। জানার চেষ্টা করি। আমার কাছে সব কালই ভালোসব কালই মন্দ। অবিমিশ্র ভালো, পুরাই মন্দ কখনো হয় না। আমরা করি কী— আগের দিনকে আইডিওলজি বানিয়ে ফেলিযে দিন গেছে সে দিন ভালো ছিল। কিন্তু যে দিনগুলো গেছে সেগুলো যদি ফিরিয়ে আনা যায়তাহলে কেউ আগের দিনে ফিরে যেতে চাইবে না। কোনো কালেই আইডিওলজি ছিল না। এই যে এখন আমার যা অবস্থাতাতে আমি কি আগের অবস্থায় যেতে পারব বা আদৌ কি ফিরে যাওয়া সম্ভবআর আমিই-বা কেন চাইব ফিরে যেতেতুমিই বল, তোমার ছোটবেলাটা ভালো নাকি এখনকার অবস্থায় ভালো আছছোটবেলায় বকা খেতেএখন তো আর বকা খাও না।

বনশ্রী: তার মানে সব কালেরই একটা সৌন্দর্যভালো লাগা আছেবাস্তবতা আছেযৌক্তিকতা আছে। সময়  কালের নিরিখে তখন যা ছিল সেটাই ঠিকআবার এখন যা আছে তাও বাস্তব?

যতীন সরকার: হ্যাঁ হ্যাঁঠিক তাইওই তো বলে ফেলছবুঝে গেছে গো বনশ্রীবুঝে গেছেএবার মিষ্টি খাওপরে চা দেবে। নাওনাও। আমি তো মিষ্টি খাই নাতোমরা খাও।

বনশ্রী: আজকাল রাজনীতির খবর রাখেনকী অবস্থা এখনকার রাজনীতির?

যতীন সরকার: রাজনীতিকী আর অবস্থারাজনীতির অবস্থা তো ক্যাসিনো। এই ‘ক্যাসিনো’ শব্দটাই আমার কাছে নতুন। নাএই শব্দটি কখনো শুনিনিহে হে হে। এই যে সম্রাটের সাম্রাজ্য বের হয়ে আসলঅনেকে যে সন্দেহ প্রকাশ করেআমিও সন্দেহ করি যেকত দিনকত জনের বিরুদ্ধে এমন অভিযান হবেরাঘববোয়ালরা ধরা পড়বে কি নাকম্বলের লোম বাছতে গেলে তো কম্বলই থাকে নাকে যে এর বাইরেতা বের করা মুশকিলহা হা হাআগের রাজনীতি আগের পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেআর এখনকার রাজনীতি এখনকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেভালো-মন্দ দুটোই আছে। কাজেই আগেরটা আর এখনকারটাকোনো অবস্থাতেই আমি কোনোটাকে এককভাবে ভালো বা মন্দ বলি না।

বনশ্রী: ছাত্ররা কি আগের মতো আন্দোলন করতে পারছেপরিস্থিতি মোকাবিলা কি তারা করতে পারছেছাত্র  যুবারা কি এখন রাজনীতি করতে পারছে?

যতীন সরকার: শোনোযখন আইয়ুব খানের রাজত্ব ছিলসবাই মনে করত আইয়ুব খানকে সরানো যাবে না। এই শাসনটাই চূড়ান্ত। কিন্তু কয় বছর টিকলএখনকার এই যে অবস্থাভেতরে ভেতরে প্রতিটি বিষয়কে ডায়ালেকটিক্যালি দেখতে হবে। আমি ডায়ালেক্টিকসে বিশ্বাস করি। একটা বিষয় ভেতরে ভেতরে কাজ করতে থাকেযা সব সময় বাইরে থেকে দেখা যায় না। বিষয়গুলো ভেতরে ভেতরে ডায়ালেকটিক্যালি সংঘাত করে বা চলতে থাকে। এটাকে দ্বন্দ্ব বলেএই দ্বন্দ্বটা হয় পরিমাণগত। যেমনএই যে আমার দুটি হাত কাজ করছেকিন্তু নতুন কিছু তৈরি করছে না। পরিবর্তন আসছে ঠিকইকিন্তু সেই পরিবর্তনটা নতুন কিছু তৈরি করছে না। এই পরিবর্তনটা যখন গুণগত পরিবর্তন হয়যেমন এই যে হাততালি দিলামএকটা আওয়াজ তৈরি হলোএটাই পরিবর্তন হতে হতে একটা গুণগত রূপ নেয়। এমন পরিমাণগত পরিবর্তন সব সময় চলতে থাকে। হঠাৎ করেই সেই গুণগত পরিবর্তনটা ঘটেসেটা ভালোর দিকেও হতে পারেআবার খারাপের দিকেও হতে পারে। তবে তা কারও জন্য ভালো হয়আবার কারও জন্য খারাপ হয়। এই যে ক্যাসিনোআমার কাছে আশ্চর্য লাগেএতদিন ধরে এত কিছু ঘটছেহচ্ছেচলছেঅথচ এতদিন সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের খবরের ধারেকাছেও যেতে পারল না!

বনশ্রী: সংবাদমাধ্যম কি বিক্রি হয়ে গেছে এসবের হোতাদের কাছে?

যতীন সরকার: না নাআমি বিশ্বাস করি না গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যম বিক্রি হয়ে গেছে। সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম অনেক কিছুর খবর বের করে। তবে সংবাদমাধ্যমে এই সম্রাটের কথা বা অমুকের কথা কি এতদিন এসেছেআসেনি!

বনশ্রী: সংবাদ তো পণ্য। এসব খবর সাংবাদিকরা তৈরি করে সম্রাটের কাছে যখন গেছেতখন সম্রাট তাদেরকে কিনে নিয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

যতীন সরকার: এসব কথা আমার কাছে খুব অ্যাবস্ট্রাক্ট মনে হয়। সব সাংবাদিক বিক্রি হয়ে গেছেএটা আমি মানতে পারছি না। সাংবাদিকদের মধ্যে তো কম্পিটিশন থাকেকে আগে এসব খবর বের করতে পারবে। কেউ কেউ বিক্রি হতে পারেকিন্তু সেই সুযোগে অন্য কেউ তা বের করবে নাতা তো হয় নাতবে  ক্ষেত্রে বলবসংবাদমাধ্যম ব্যর্থ হয়েছে।

বনশ্রী: এখনকার রাজনীতি তো দেখছেন। আপনারা যে রাজনীতির কথা বলেছিলেনছাত্ররা রাজনীতি করবেভবিষ্যতের নেতা হবেসমাজে গণতন্ত্রসুষম বণ্টন  সমাজতন্ত্র আসবেমানুষে মানুষে সমতা নিশ্চিত হবেদিন বদলে যাবেএই রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা এখন কতটা?

স্ত্রী কানন সরকারের সঙ্গে যতীন সরকার।

স্ত্রী কানন সরকারের সঙ্গে যতীন সরকার।

যতীন সরকার: হুমনিয়ম তো পরিবর্তনের জন্যই। ১৯৯০ সালের আগে যা ছিলনব্বুইয়ের পরে মানুষের ধারণা বদলে গেছে। এই পরিবর্তনটা হয়েছে  কারণে যেঅনেকে ধরে নিয়েছিল সমাজতন্ত্র যখন প্রতিষ্ঠা পেয়েছেতা সব সময় একই রকম থাকবে। আমি তো কমিউনিস্ট পার্টি করেছি। তখন সেন্ট্রাল কমিটিতে ৭৭ জনের মধ্যে আমিও একজন সদস্য ছিলাম। তখন সবাই তো সোভিয়েত ইউনিয়নের নামে পাগল। কেউ কেউ হয়তো সোভিয়েতের সমালোচনা করেছে ঠিকইকিন্তু তারা সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করেনি যেসমাজতন্ত্রের ভেতরেও এমন অবস্থা তৈরি হতে পারে। অনেকে আবার সমালোচনাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেনা নাসমাজতন্ত্র একটি বিশুদ্ধ ব্যবস্থা। কিন্তু পরবর্তীতে যখন বিপর্যয় ঘটে গেলতখন তারা সত্যটা বুঝতে পারল। আসলে এটা তো মানুষের চিন্তার বা মস্তিষ্কের বিষয়আমি এটাকে এভাবেই দেখতে চাই। মজার বিষয় হলোঘটনার পর আমরা যারা সমালোচনা করেছিলামবিপর্যয়ের পর সেই আমরাই আবার সোভিয়েতের সমাজতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ালাম। কিন্তু বিপর্যয়ের পরের পরিস্থিতিতে দেখা গেলসেই ৭৭ জনের মধ্যে মাত্র ১৪ জন সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলামআর বাকি সবাই দল থেকে বের হয়ে গেল। কেন বের হয়ে গেলকারণসমাজতন্ত্র তাদের মস্তিষ্কের ভেতরেই কখনো ছিল নাচিন্তা-ভাবনা করার যে ক্ষেত্রটাসেটাও তো জানতে হবে। আমি তো এমন অনেককে দেখেছি। আমাদের দর্শন হলো ডায়ালেকটিকস। কিন্তু এই ডায়ালেকটিকস কতজন বোঝেপার্টি যখন ভেঙে যায়তখন আমি এক ঘণ্টা বক্তৃতা করেছিলাম। আমাকে যখন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য করা হয়তখন আমি নিজে আশ্চর্য হয়েছিলাম। সেখানে জানতে চেয়েছিলামএত এত বড় বড় নেতা থাকতে আমাকে কেন সদস্য করা হলো!

বনশ্রী: আপনি কি আগে থেকেই আন্দাজ করেছিলেন বা বাস্তবতার অভিজ্ঞতা কি আপনাকে জানান দিয়েছিল যে—সোভিয়েতের সমাজতন্ত্র কোনো চিরস্থায়ী বিষয় নয়, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে?

যতীন সরকারহতে পারে, তা বুঝতে পারছিলাম। লেখাপড়া না করলে এসব বোঝা যায় না। এ প্রসঙ্গে একটা বইয়ের কথা বলছি, শোনো—১৮৪৬ সালে এঙ্গেলস লিখেছিলেন, যা পরে প্রকাশিত হয়েছে; বইটার নাম ‘জার্মান আইডিওলজি’। এতে তিনি লিখেছেন, পৃথিবীতে একসময় সাম্যবাদ আসবে। তিনি যখন বই লিখেছেন, তখন ধনতন্ত্র বিদ্যমান। সাম্যবাদ আসতে হলে ধনতন্ত্রের অবসান হতে হবে। ধনতন্ত্র আর চলতে পারে না—এমন একটা অবস্থায় আসতে হবে। কিন্তু কেবল স্থানিক বা সাময়িক সমাজতন্ত্র হতে পারে না। সে প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সাময়িকভাবে কোথাও সমাজতন্ত্র আসতে পারে, তবে তা টিকে থাকতে পারবে না। সেই ১৮৪৬ সালে এ কথা তিনি বলে গেছেন। কেন সমাজতন্ত্র টিকে থাকতে পারবে না? কারণ ধনতন্ত্র বর্ধিত হওয়ার সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে নেয়। এর বড় কারণ হলো, ধনতন্ত্র যেমন একটা বিশ্বব্যবস্থা, সমাজতন্ত্রকেও একটি বিশ্বব্যবস্থা হতে হবে। যে পর্যন্ত বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে ধনতন্ত্রের সম্ভাবনা শেষ না হবে, সে পর্যন্ত বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে সমাজতন্ত্র আসতে পারবে না। সমাজতন্ত্র আঞ্চলিকভাবে আসতে পারে, তবে টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু সমাজতন্ত্র ভবিষ্যতের জন্য মানুষকে অনেক কিছু দিয়ে যাবে। সমাজতন্ত্র কি পৃথিবীকে অনেক কিছু দিয়ে যায়নি? আজ ধনতন্ত্র কি সমাজতন্ত্রের ‘টিকা’ গ্রহণ করছে না? তাহলে? এভাবে বুঝতে হবে। ডায়ালেকটিককে বুঝতে হবে, লেখাপড়া করে ডায়ালেকটিকসটাকে পরিপূর্ণভাবে চর্চা করতে হবে। এখন এই ঘটনা কেন ঘটল, এর পেছনের কারণ কী—তা যদি বুঝতে না পারি, দেখতে না জানি, নিজেকে যদি একটা জায়গায় বন্ধ করে রাখি, তাহলে মেকানিস্ট হয়ে গেলাম। মেকানিস্ট তো ডায়ালেকটিকের বিরুদ্ধে।

বনশ্রীধনতন্ত্র এখন কী অবস্থায় আছেকোন অবস্থায় ধনতন্ত্র শেষ পর্যায়ে পৌঁছবে বলে মনে করেন আপনি?

যতীন সরকারসেই অবস্থায় অনেকটা পৌঁছে গেছে ধনতন্ত্র। ধনতন্ত্র এখন সাম্রাজ্যবাদ হয়ে টিকে আছে সারাবিশ্বে। তা একমাত্র মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। পৃথিবীর অনেক দেশে ভেতরে ভেতরে কাজ চলছে এর বিরুদ্ধে। কারণ সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা সকলেই নিগৃহীত হচ্ছে। নিগৃহীত মানুষগুলো বিভিন্নভাবে নানানভাবে এর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে।

বনশ্রীমুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন হয়েছে চারটি মৌলিক নীতির ভিত্তিতে। এর চার নীতির একটি সমাজতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশে কেমন সমাজতন্ত্র চেয়েছিলেনঅনেকে বলেন বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রের ভাবনাটা ছিল এদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য তার নিজস্ব সমাজতন্ত্র ভাবনা ব্যাপারে আপনি কী বলেন?

যতীন সরকার: কথা সেটা নয়। তখন পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র ছিল। সমাজতন্ত্র আসতে পারে ধারণাটা বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে ছিলবিশেষ করে আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র তো চাই- চাই। সে সময়টাতে অনেক দেশেই সমাজতন্ত্র অনেকাংশে এগিয়ে গিয়েছিল। তবে সোভিয়েতে এত তাড়াতাড়ি সমাজতন্ত্রের পতন হবেতা ভাবেনি অনেকে। তবে ১৮৪৬ সালে এঙ্গেলস বিষয়টিকে বুঝেছিলেন। আমি একে পতন বলব নাসাময়িক বিপর্যয় বলা যায়। কারণ এটা তো মানতেই হবে যেএকটা অবস্থার চলতি পথে বিপর্যয় ঘটেছে। যেমন রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যাচ্ছিতাতে কখনই বিপর্যয় ঘটবে নাতা হয় না। এখানে ওই যে কথাটা আছেবিশ্বব্যাপী ধনতন্ত্র সমাজতন্ত্রকে গিলে খাবার চেষ্টা করেছে সর্বত্র। এমনকি প্রথম যখন সমাজতন্ত্র হয়তা একটিমাত্র দেশে হতে পারেনি। ভাবনা ছিল এই দেশে সমাজতন্ত্র আসতে পারেবলা হয়েছিল আমরা চেষ্টা করবকিন্তু তা হয়নি। সেই চেষ্টাই তো তিনি করেছেন। ১৮৭১ সালে প্যারিস কমিউন হয়েছিলযাকে প্রথম সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যায়তা ৭০ দিনও টিকতে পারেনি। আর সোভিয়েতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় ১৯১৭ সালেবহাল ছিল ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। সেখানে ৭০ বছর টিকেছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অবশ্যই এটি একটি বড় সফলতা। শুধু সফলতাই নয়সেই সময়ের ধনতান্ত্রিক দেশগুলো এই সফলতার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেবিশেষ করে কল্যাণ রাষ্ট্রগুলো। এর মানে হলোসমাজতন্ত্রের টিকা নিয়ে আমরা টিকে থাকতে পারি। সমাজতন্ত্র ব্যবস্থার আগে কল্যাণ রাষ্ট্র বলতে কোনো কিছু ছিল না। কল্যাণের ভাবনা-চিন্তাটাই তো ছিল নাকেবল ছিল উৎপাদন আর ভোগবাদী চিন্তা।

বনশ্রী: এখনো আপনি কি স্বপ্ন দেখেন বা ভাবেন যে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির বাস্তবতায় সমাজতন্ত্র আসতে পারেসেই বাস্তবতা কি আছে?

যতীন সরকার: বাস্তবতা আছেআমি স্বপ্ন দেখি নাবাস্তবেই ভাবি সমাজতন্ত্র আসছেআসবেহয়তো আমার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব নাসেটা কোনো কথা নয়। দার্শনিক কার্ল মার্কসের জীবনে কি সমাজতন্ত্র এসেছেকিন্তু তিনি তো এর চিন্তামতাদর্শ  ভাবনার খোরাক দিয়ে গেছেন। এর জন্য নির্বাসন দণ্ড নিয়ে তাকে দেশে দেশে ঘুরে জীবনধারণ করতে হয়েছেকত কিছু করে বেঁচে থাকতে হয়েছে তার।

বনশ্রী: বর্তমান  এর একটু আগের সময়ের ছেলে-মেয়েরা রাজনীতিবিমুখ। তারা কি লেখাপড়া কম করে বলে এমনটা মনে করেনআবার অনেকে তো মার্কস  এঙ্গেলসের উক্তিও আওড়ায়।

যতীন সরকার: লেখাপড়া কম করে এটাই শুধু নয়কার্ল মার্কস-এঙ্গেলসের থিওরিও খুব কম আওড়ায়। তারা ধরেই নিয়েছে সমাজতন্ত্র বাতিল ব্যবস্থাতারা কার্ল মার্কস আর এঙ্গেলসকে বাতিল করে দিয়েছে। এটা অস্বাভাবিক নয়। যখন একটা বিপর্যয় ঘটেতখন এমন মানসিকতা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ছোটখাটো ব্যাপারেও এমনটা হতে পারে। ওই যে বললামআইয়ুব খান যখন ক্ষমতায় এলতখন তাকে সরানো যাবেএমনটা পাঁচ বছর পর্যন্ত কেউ ভাবতেই পারেনি। তেমনি জিয়াউর রহমানজেনারেল এরশাদের শাসনকালএমন প্রতিটি ঘটনা একই। চোখের সামনে এসব ঘটনা ঘটেতখন দেখতে পাই না আমরাকিন্তু ভেতরে ভেতরে কাজগুলো ঘটতে থাকেপরিবর্তন চলতে থাকে। তা কারও নজরে আসে নাকারণ সেগুলো পরিমাণগত পরিবর্তন। গুণগত পরিবর্তন যখন হয়তখন তা সবার চোখে পড়ে।

বনশ্রী: আপনার চিন্তায় ধর্ম কীএর প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলুন।

যতীন সরকার: শোনো শোনোআমার প্রবন্ধে বলেছিআমি ধর্ম আর রিলিজিয়নকে এক মনে করি না। অনেকেই ধর্ম  রিলিজিয়নকে এক করে ফেলে। এই বাংলা শব্দটা সমস্যা করেছে। ধর্ম বলতে আমরা কী বুঝিহিন্দুমুসলমানখ্রিস্টানএসব বুঝিনাতা বুঝি নাআবার একরকম বুঝিও। গ্রামাঞ্চলে বা আগে আমাদের ঠাকুরমা বলতেন যেএসব করা ঠিক নাধর্মে সইবে না। যে লোকটা খুব খারাপ কাজ করততার উদ্দেশে বলা হতোধর্মে সইবে না। খারাপ কাজ করা মানুষটি হিন্দুনা মুসলিম বা খ্রিস্টানএটা বিবেচ্য বিষয় নয়। এখনো মনে আছেএক লোক মারা যাওয়ার সময় শরীরে খুব জ্বালা-পোড়া হচ্ছিল। তখন আমার ঠাকুরমা বলছেনএমন হবে নাঅমুকের বাড়িটা যে পোড়াইছিলমনে নাইএখন সেই জ্বালাটা জ্বলতেছে। কোনো ধর্মে কি বলে যে মিছা কথা ভালোচুরি করা ভালোসত্য কথা বলা ভালো নয়মানুষের প্রতি অন্যায় অবিচার করা ভালোতা তো বলে না। এই যে বলে না সুতরাং সব ধর্মে এটা আছে। সুতরাং রিলিজিয়নের পার্ট হলো এটাই টলস্টয়ের ভাষায় অ্যাসেনসিয়েল রিলিজিয়নের বাংলা ধর্ম বলতে পারি।

বনশ্রী: তাহলে ধর্মকে কি জীবনাচার বলবেন?

যতীন সরকার: হ্যাঁতাই তো। টলস্টয় বলছেনধর্মের তিনটা পার্ট বা ভাগ আছে— এসেনশিয়াল অব রিলিজিয়নফিলসফি অব রিলিজিয়নআরেকটা হলো রিচুয়াল অব রিলিজিয়ন। এসেনশিয়াল অব রিলিজিয়নটাকে ধর্ম বলা যেতে পারে। ধর্মের কোনো ইংরেজি নেইতেমনি রিলিজিয়নের কোনো বাংলা নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন ‘মানুষের ধর্ম মানুষের ধর্ম কীমানুষের ধর্ম হলো মনুষ্যত্ব। যখন তিনি এটা ইংরেজিতে প্রকাশ করতে চাইলেনতখন তিনি এর কোনো ইংরেজি শব্দ খুঁজে পাননি। তিনি লিখলেন ‘রিলিজিয়ন অব ম্যান ইজ দিস রিলিজিয়ন অব ম্যানতাহলেধর্মকে যখন যেভাবে চাইব্যবহার করি আমরা। কখনো বিশ্বাসকখনো আচার। ধর্ম বিশ্বাস বলা যায়। ধর্ম কোনো ফিলসফি নয়ফিলসফি তো জ্ঞানবুদ্ধি  যুক্তির দ্বারা হয়। তুমি মনে করোতোমার আগে একটা জন্ম হয়েছেপরে আরেকটা জন্ম হবে। যে মুসলিমসে মনে করে এই জন্মই চূড়ান্ত। এই মনে করাটা কি যুক্তি  বুদ্ধি দিয়ে হয়েছেএটাই বিশ্বাস। এই বিশ্বাস একজনের সঙ্গে আরেকজনের মেলে না। এই বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানের তফাত কী? —এটা সব ক্ষেত্রে সবার জন্যই সত্য।

বনশ্রীপুরস্কার তো আনুগত্যের বিনিময়ে পাওয়া যায়। আপনার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ পাওয়ার পেছনের গল্পটি কেমন ছিল? কোনো সরকারই তো আপনাকে পুরস্কার দেওয়ার কথা নয়আপনি তো অনুগত নন।

যতীন সরকার: আমার কাগজপত্র বারবার জমা দেওয়ার পর তিনবার কমিটিতে নাম যায়। তখনকার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক  মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফসৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে, তালিকায় আমার নামের পাশে টিক চিহ্ন দিয়ে নাকি বলেছিলেন, ‘এই নামটিকে পুরস্কার দিয়ে পরে অন্য যাদের ইচ্ছা দিন।’ এভাবেই মূলত স্বাধীনতা পুরস্কারটি পাই।

বনশ্রী: সৈয়দ নজরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলুনআপনার সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

যতীন সরকার: মানুষ তাকে রাজনীতিবিদ হিসেবে চিনলেও তিনি একজন অসাধারণ সাহিত্য অনুরাগী  সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন। ১৯৬৮ সালে আমি যখন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে পড়িতখন শুক্রবারের ‘সাহিত্য মজলিশ’- তিনি সংস্কৃতি  সাহিত্য নিয়ে চমৎকার আলোচনা করতেন। একবার কবীর চৌধুরীর সভাপতিত্বে ‘সমুদ্র পথিক’ সংগঠনের লেখা একটি নাটক শেষ হওয়ার পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আমি আছি আপনাদের সঙ্গে। অর্থকড়ি যা প্রয়োজন বলবেনকিন্তু আমাকে এটাতে রাখবেন না। কারণ এখন আমি রাজনীতি করিএতে রাজনীতি ঢুকলে অন্যরকম হয়ে যাবে। এটা রাজনীতির চেয়েও বড় কাজ।’ অনেক বড় কথা বলেছিলেন সেদিন তিনি আমাকে।

বনশ্রী: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে পরিবর্তন এসেছিল, সেটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

যতীন সরকার: ১৯৫৮ সালে যখন আওয়ামী লীগ থেকে বামপন্থিরা বের হয়ে ন্যাপ গঠন করেনতখন শেখ মুজিব ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথেই। সোহরাওয়ার্দীর প্রতি মুজিবের আনুগত্য ছিল সীমাহীন। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরই শেখ মুজিবের ভেতরে প্রকৃত পরিবর্তন আসে। সোহরাওয়ার্দী বেঁচে থাকলে ছয় দফা বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এতটা সহজ হতো নাকারণ তিনি আপসকামী নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু প্রকারান্তরে বাঙালি জাতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বনশ্রী: স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কমিউনিস্ট পার্টি  শেখ মুজিবের অবস্থান কেমন ছিল?

যতীন সরকার: আইয়ুব খানের মার্শাল  সময় সোহরাওয়ার্দী ট্রাইব্যুনালে যেতে বা আন্দোলন করতে চাননি। তখন শেখ মুজিব  তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং ‘সংবাদ’-এর সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীর মাধ্যমে গোপন বৈঠকে কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ  খোকা রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। বৈঠকে শেখ মুজিব সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলেন। কমিউনিস্ট নেতারা কৌশলগত কারণে তখন আইয়ুব-বিরোধী গণআন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। শেখ মুজিব সেখান থেকে বের হয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘স্বাধীনতা ছাড়া কিছু হবে না।’ পরবর্তীতে কমিউনিস্ট নেতারাও প্রতিশ্রুতি দেন যেতিনি স্বাধীনতার ডাক দিলে তারা পাশে থাকবেন।

বনশ্রী: বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং আপনার ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ বইয়ের মূল বক্তব্যটা একটু সংক্ষেপে বলবেন কি?

যতীন সরকার: ক্ষমতার মোহে পড়ে সোহরাওয়ার্দী সাম্য  এক-ইউনিট নীতি মেনে নিয়েছিলেন। পরে ইয়াহিয়া খান তা বাতিল করে এক ব্যক্তি এক ভোটের নীতি আনেনযা থেকে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। শেখ মুজিবও ছয় দফা থেকে এক চুল নড়েননি। আমার বই ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’- আমি সাধারণ কৃষক  গ্রামের মানুষের ইতিহাস এবং রাজনীতিবিদদের এই ঐতিহাসিক ভুল-ত্রুটির নানা দিক তুলে ধরেছিযা সাধারণ কোনো ইতিহাস বইয়ে পাওয়া যায় না। এতক্ষণ ধরে রেকর্ড করতেছ আমার কথাআচ্ছা। আমার নিজের বইয়ে এই বিষয়গুলো আছেএখন যখন পড়িতখন এসব যেভাবে ভেবেছিএখন আর সেগুলো ওইভাবে ভাবতে পারি না। কিন্তু অন্যরা এই বইটি নিয়ে অনেক কিছু বলে। এর কারণ আছেএই বইয়ে যে কথাগুলো এসেছেতা কোনো ইতিহাস বইয়ে নেই।

বনশ্রী: পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টিতে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা কেমন ছিল?

যতীন সরকার: হ্যাঁ কে ফজলুল হকও ছিলেন এর মধ্যে। আর নাশুধু তাই নাসোহরাওয়ার্দীকে দিয়ে তারা আরও কাজ করিয়েছেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গণপ্রতিনিধিত্ব বিষয়ে তাদের হিসাব ছিলএখানে ৫৬ শতাংশ বাঙালি আর ৪৪ শতাংশ পাকিস্তানিএর ভিত্তিতে। ওই হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানিরা কম পায়। তবে এই চিন্তাটাকে সংখ্যা সাম্য করেছে কাকে দিয়েওই যে সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে বা পদ দিয়েপরে এক ইউনিট করেছে। সোহরাওয়ার্দীকে দিয়ে করিয়ে পরে তাকে ছুঁড়ে ফেলেছে। সোহরাওয়ার্দীর তো ক্ষমতার লোভ ছিল। আমি আমার বইতে লিখেছিপ্রতিক্রিয়াশীলদের হাত দিয়ে অনেক সময় অনেক প্রগতিশীল কাজ হয়ে যায়। যেমন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করার পর শেখ মুজিবুরের এই নীতিগুলো বা দাবিগুলো সবই তো মেনে নিলেন ইয়াহিয়া। এক ইউনিট ভেঙে গেল। তখন তাদের গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল তেমন কিছুই হবে না। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ কিছু বেশি সিট পাবে আর অন্যরা কিছু পাবেপশ্চিম পাকিস্তানে তো কোনো সিট পাবে না। তাতে সংখ্যা সাম্য বাদ দিলেও কোনো ক্ষতি হবে না। এই যে ভুলগুলোইয়াহিয়ার অনেক ভালো কাজ করিয়ে নিয়েছে। যদি ইয়াহিয়ার সংখ্যা সাম্য বজায় থাকততাহলে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বের হয়ে আসতে পারত নাযুদ্ধ করে বাংলাদেশ হতে পারত না। মাত্র দুইটা সিটে পাস করেছিলএকজন নূরুল আমীন  আরেকজন। নুরুল আমীনের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল রফিক ভুঁইয়াতার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। কেন এমন হলোএর কারণ বিশ্লেষণ করেছি আমার বইয়ে—‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ বইয়ে। বইটাতে তোমার অনেক প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবে। এই বইটার বিষয়ে ‘প্রথম আলো’ সেরা সাহিত্য পুরস্কার দিয়েছিল। এর প্রশংসাপত্র লিখেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের উপ-উপাচার্য জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। আমি যখন পুরস্কার গ্রহণ করতে গেছিজিল্লুর রহমান আমাকে বললেন, ‘এই প্রশংসাপত্র আমি নিজের হাতে লিখেছি।’ বসোআমি তোমাকে দেখাচ্ছিবইয়ের পেছনে এটা ছাপিয়ে দিয়েছে। এর পেছনের লেখাটা পড়ো। নাওএবার মিষ্টিটাও খাও। যে কথা বলছিলামএকটা জায়গায় বঙ্গবন্ধু ঠিক থেকেছেনছয় দফা থেকে একচুলও নড়বেন না। তিনি এমনও করেছেন যেআওয়ামী লীগ ছয় দফার এই রাজনীতি থেকে যেন সরে না যেতে পারেসেজন্য তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা করেছেনকোনোমতেই এই ছয় দফা থেকে সরে আসা যাবে নাআমিও যদি সরে আসিতাহলে আমাকেও তোমরা কবর দিয়ে দিও। কথা হচ্ছেজনগণ যখন সাথে এসে যায়তখন নেতা অনেক কিছু করতে পারে।

বনশ্রী: আপনার নিজের লেখা বইয়ের কোনো লেখা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন বা পছন্দ করেন?

যতীন সরকার: আমার লেখা একটি বই আছে যা অন্যরা কোনো পাত্তাই দেয় না, ‘প্রাকৃতজনের জীবন দর্শন এই বইতে মনে করি আমার নিজের মতে নিজের বক্তব্য সঠিকভাবে এসেছে।

বনশ্রী: নিজের বইয়ের প্রশংসাপত্র নিজে পড়ে শোনালেন আপনিএটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।

যতীন সরকার: হা হা হাতাই নাকিভালোই তো হলো।

বনশ্রী: দাদাএতক্ষণ তো অনেক ভারী ভারী কথা হলোএবার বলবেনআপনার কাছে জীবনবোধ কী?

যতীন সরকার: এটা তো আরও ভারীভারীর চেয়েও বেশি ভারীহে হে হে। জীবনের বোধভারীর চেয়েও ভারী। শোনোআমি জীবনবোধ সম্পর্কে ভাবিরবীন্দ্রনাথের দুইটা কথা দিয়ে জীবনবোধ ভাবি। রবীন্দ্রনাথ ক্ষণিকাতে লিখেছেন, ‘মন রে তাই কহ যেভালো-মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে।’ এটা যৌবনেআর মৃত্যুর তিন মাস আগে লিখেছেন, ‘রূপনারানের কূলে জেগে উঠিলামজানিলাম  জগৎ স্বপ্ন নয়। সত্য যে কঠিনকঠিনেরে ভালোবাসিলামসে কখনো করে না বঞ্চনা।’ আমি মনে করিসত্যরে সহজে নিতে হবেকিন্তু সত্য অনেক কঠিন। যদি বলো এটাই আমার জীবন দর্শনবলে যদি কিছু থাকেতাহলে তা-ই।

বনশ্রী: ভালোবাসা কীএই যে মানুষ ভালোবাসার অনেক ব্যাখ্যা করেআপনার কাছে এর ব্যাখ্যা কীভালোবেসে কখনো মনে হয়েছে যে এটা না পেলে হবে না?

যতীন সরকার: ভালোবাসাভালোবাসা শব্দটাতোমরা তো আমার তুলনায় ছেলেমানুষতাই এই শব্দ নিয়ে তোমার সাথে কোনো কথা বলতে চাই না। আর যদি বলো মানুষের প্রতি মানুষেরযে তোমাকে আমি ভালোবাসিএমন অনেককেই ভালোবাসি। তো যাকে ভালো মানুষ মনে হয়তাকে ভালোবাসি আর যে ভালো মানুষ নয়তাকে ঘৃণা করি। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহেতব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’ ব্যসএটুকুইআর কিছু জানতে চেয়ো না।

বনশ্রী:  জীবনে কী পাননি মনে হয়?

যতীন সরকার: আমার নামে কেইস করবা নাকিহা হা হাকী পাইনি। কী পাইনি তার হিসাব মিলাতে মন মোর নয় রাজি। রবীন্দ্রনাথের কাছে সব পাওয়া যায়হা হা হা। আমি জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি। যা পাওয়ার কথা নয়তাও পেয়েছিএত কিছু পেয়েছি। তাহলে কতটা পাইনি কথা মনে হবে কেনএটা বলতে পারোতোমার প্রশ্নের জবাবে আমার প্রশ্নকী পাইনি জীবনেমনে হয় সব পেয়েছি।

বনশ্রী: আরেকটা বিষয় জানতে চাইছিনেত্রকোণা বানান নিয়ে আপনার নিজস্ব একটা যুক্তি আছে। বানানটা নিয়ে বিতর্ক বা বিভিন্ন মত আছেআপনি কী বলেন?

যতীন সরকার: এই বিষয়টা খুব মুশকিল। এটা নিয়ে আমার এক বিশিষ্ট ছাত্র নির্মলেন্দু গুণসে পর্যন্ত আমার ওপর চেইত্যা গেছেআমাকে খুব শ্রদ্ধা করে সে। বানানের একটা নিয়ম আছেব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট করা আছে। সেই ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে কলকাতায় একটা বানান সংস্কার কমিশন হয়েছিল। সেখানে পরিষ্কারভাবে লেখা আছেমূর্ধন্য  এটা সংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রে। নত্ব বিধানের নিয়ম মেনে শুধু সংস্কৃত শব্দ যেখানে যেখানে আছেসেখানে মূর্ধন্য  হবে। সংস্কৃত ছাড়া অন্য যে কোনো শব্দেপ্রাকৃত হোকদেশি বা বিদেশি হোকতাতে মূর্ধন্য  ব্যবহৃত হইবে না। এখানে ‘কোণ’ শব্দটা সংস্কৃততাতে -ওকারের সাথে মূর্ধন্য —‘কোণ’ ঠিক আছেকিন্তু ‘কোনা’ শব্দটা সংস্কৃত নয়তাহলে ‘কোনা’ শব্দটা কখনো মূর্ধন্য  হতে পারে নাদন্ত  হওয়া উচিত। এখন কেউ যদি প্রপার নেম মূর্ধন্য  দিয়ে লেখেতাকে জেল দেওয়া যাবে নাফাঁসিও দেওয়া যাবে না। দেখা যাবে নেত্রকোনা শহরের দোকানে বা প্রতিষ্ঠানে তিনটা সাইনবোর্ডে একটাতে দন্ত  আর দুইটাতেই মূর্ধন্য  লেখা আছে। বাংলা একাডেমি  বিভিন্ন বইয়ে এবং বাংলাপিডিয়াতেও ‘নেত্রকোনা’ বানান দন্ত  লিখেছে। এখন নাম হিসেবে কেউ যদি লেখেতাহলে কিছু করার নেইলিখতেই পারেএদিক থেকে দুটোই ঠিকতবে ব্যাকরণগতভাবে দন্ত  হবে।

বনশ্রী:  প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের জন্য কি আপনার কোনো কথা বলার আছেলেখাপড়ারাজনীতিদর্শনজীবনবোধ  মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকাএসব নিয়ে কিছু বলবেন?

যতীন সরকার: প্রত্যেকেরই নিজেকে জানতে হবে। ‘নো থাইসেলফ’—নিজেকে জানো। তুমি কোনটা করতে পারবাসেটা নিজে বুঝে নাওআর অন্যের কথায় চলবা নাসোজা কথা। যেমন বাবা-মা ছেলে-মেয়েদেরকে ডাক্তারি  ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বলেকিন্তু তার ইচ্ছা হলো সে ভালো করবে চিত্রশিল্পেতা পড়তে চায়তখন তারা বলেএই চিত্রশিল্পে পড়ে কী হবে। মা- বাবার জোর করে চাপিয়ে দেওয়া একটা কিছুএমনটা যেন না হয়।

বনশ্রী: এটাও তো বলা হয় যেশৈশবে বা কৈশোরে মানুষের মনে স্কুলে বা সংগঠনে স্বপ্ন দেখাতে হয়। আপনি জীবনে কী হতে চেয়েছেন?

যতীন সরকার: হ্যাঁস্বপ্ন দিতে হয়কিন্তু ‘নো থাইসেলফ’—একটা মানুষের মধ্যে কী আছেসেটাই বড় কথা। সবাই সবটা পারে না। মা-বাবা মনে করে সন্তান ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে। কেউ কেউ হতেই পারেআবার সে অন্য কিছু হতে পারে। আমি বাংলা নিয়ে লেখাপড়া করেছিকারণ সাহিত্য নিয়ে আমার ধ্যান-ধারণা  যুক্তিএর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলে নাই আমার পরিবারে। যদি এটা না পড়তামতাহলে যতীন সরকার কেনকিছুই তো হইতে পারতাম না। আমি সবসময় বলিনিজে কোনটা পারবেসেটা করো। আমার মেয়ের সন্তানের ক্ষেত্রেও সেটা বলেছি। আমি খুব খুশি যেযা হতে চেয়েছিতা- হতে পেরেছি। বিশ্বাস করবে কি না জানি নাআমি যখন নেত্রকোণা চন্দ্রনাথ স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হবএক বছর পড়েছি সেখানে। স্কুলে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে একজননাম সুধেন্দু চক্রবর্তীবক্তৃতা করেন। এত চমৎকার বক্তৃতা দেন। আমি তো ছোটবেলা থেকেই ইচড়ে পাকাআমার বইয়েও লিখেছি সে কথা। ইচড়ে পাকা বলে ছোটবেলায় শোনা সেই বক্তৃতার অনেক কথাই এখনো মনে আছে। খুবই ভালো বক্তৃতা শুনেছি। তো উনি কী করেনজানলাম তিনি প্রফেসর। কলেজের মাস্টারকে প্রফেসর বলে। তখন আমার মনে হয়েছেকলেজের মাস্টারের চেয়ে পৃথিবীতে বড় কেউ নেইআমার কলেজের প্রফেসর হতে হবে। এই স্বপ্ন আপনা-আপনি হয়ে যায়নিবড় কষ্ট করে এই জায়গাটিতে যেতে হয়েছে। এই কষ্টের খবরগুলো এই বইয়ে কিছু কিছু পাবেঅত্যন্ত কষ্ট করে আসতে হয়েছে।

বনশ্রী: দাদাএখন যে ‘নো থাইসেলফ’ বলছেনএমনিতেও পৃথিবী এখন সেলফ আর সেলফি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেকিন্তু তার আশপাশের জানা-শোনার দায়-দায়িত্ব থেকে ক্রমেই উদাসীন হচ্ছে। এই অবস্থায় নিজেকে জেনে অন্যের জন্য এই জানাটাকে কাজে লাগানোর মানসিকতা কীভাবে গড়ে তুলবে?

যতীন সরকার: এই পরিস্থিতিতে ছেলে-মেয়েদেরকে নিজেকে জানার পরিবেশটা তৈরি করতে হবে মা  বাবাকে। মা  বাবা তাদের সন্তানদের জানার বিষয়টিকে ধরিয়ে দিতে পারছেন না বা করছেন নাএর জন্য দায়ী মা-বাবারা।

বনশ্রী: রাষ্ট্রের করার কিছু নেইশিক্ষক বা সমাজের দায়িত্ব নেই?

যতীন সরকার: রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবেআর সমাজ তো এসব মানুষেরই তৈরি। স্বশিক্ষিত মানেই সুশিক্ষিত। শিক্ষকের দায়িত্ব আছেতবে শিক্ষক কোনো বিষয়ে শিক্ষা দিতে পারে বলে মনে করি না। হ্যাঁঠিক তাইভাবনা দিতেপথ দেখাতে পারে। সে কে আর কী করতে পারেসে পথ চেনার  নিজেকে জানার পদ্ধতি সম্পর্কে জানাতে পারে মাত্র। শিক্ষকের কাছ থেকে এসব গ্রহণ করতে পারে তারাকেবল ফর্মুলা দিয়ে শেখানো যায় না।

যতীন সরকারের সঙ্গে বনশ্রী ডলি, মোস্তাফিজুর রহমান ও বিপ্লব সাহা।  

যতীন সরকারের সঙ্গে বনশ্রী ডলি, মোস্তাফিজুর রহমান ও বিপ্লব সাহা।

এরপর যখন যতীন সরকারের কাছ থেকে ধন্যবাদ বিদায় নিতে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি নিজের স্বাভাবিক রসবোধ আর অপার সহজতায় হেসে বলে উঠেছিলেন, “আমার ওপরের দাঁত নেই, নিচের দাঁতও নেই, কিন্তু কথা বলার সময় মনে হয় না যে আমার এই অবস্থা।”

কথাটা বলেই ভেসে গেলেন প্রাণখোলা উদ্দাম হাসিতে—যে হাসি যেন 'মুক্ত দেদার নদীর মতো' বয়ে যাচ্ছিল থমকে থাকা সময়টার ওপর দিয়ে। সাক্ষাৎকার নেওয়ার পুরোটা সময়জুড়ে সেই অনাবিল ও স্পন্দিত হাসির জাদুতে শুধু আমি নই, আমার সাথে থাকা দুই সঙ্গী মোস্তাফিজুর রহমান ও বিপ্লব সাহাও মুগ্ধ হয়েছিলেন নিশ্চয়ই।

হাসির আবেশটুকু বজায় রেখে তিনি মৃদু সুরে আবার বললেন, “আর কিছু পারি না, কেবল বকবক করি। তোমাদের সাথে কথা বলতে পেরে আর আমার সব কথা এত মনোযোগ দিয়ে শুনেছ, সত্যিই খুব ভালো লাগল। আমার তো আর কোনো কাজ নেই! এসব কি আসলেই লিখবা? তাহলে আবার আইসো, অন্তত লেখাটা নিয়ে হলেও আসবা। আর কবে আসবা কে জানে!”

তার সেই বিদায়বেলার নিমন্ত্রণটি এখনো বুকের গহীন কোণে বাজতে থাকে। কেমন এক অপরাধবোধ জমা হয়ে থাকে নিঃশব্দে। সত্যি, আমাদের আর যতীন সরকারের কাছে, আমাদের প্রিয় যতীনদা’র কাছে ফিরে যাওয়া হলো না। সাক্ষাৎকারটি ছাপা হওয়ার পর তা হাতে নিয়ে তার কাছে যাওয়ার সেই নিমন্ত্রণটি রাখবার আর সুযোগ রইল না। তিনি আর নেই।

বনশ্রী ডলি লেখক ও সাংবাদিক। ই-মেইল: dolly.banasree@gmail.com