Published : 04 May 2026, 12:40 PM
প্রতিদিন সকাল সাতটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আমার ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে যায় ছেলে শরাফ সিদ্দিকের চঞ্চলতায়। ও আমার একমাত্র সন্তান। ওর ছোট্ট পিঠে যখন স্কুলব্যাগটা ওঠে, তখন মনে হয় ও কেবল বইয়ের ভার নয়, বরং আগামীর স্বপ্ন বহন করছে। কিন্তু ওকে স্কুলে যেতে দেখলে ভবিষ্যতের কথা ভেবে অজান্তেই এক অজানা দুশ্চিন্তা কাজ করে। ওর মায়ের হাত ধরে যখন ও স্কুলের গেটের দিকে এগিয়ে যায়, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে থাকি। মনে মনে ভাবি, আজ টিফিন বক্সে যা দেওয়া হলো, তা কি ওকে প্রাণশক্তি দেবে, নাকি ধীরে ধীরে ওর সুস্থতাকে ক্ষয় করে দেবে?
আমি একজন সরকারি চাকুরিজীবী। দিনভর নথিপত্র আর হিসাবের মারপ্যাঁচে ডুবে থাকলেও দিনশেষে যখন ঘরে ফিরি, তখন ওই হিসাবগুলো আর শুধু অফিসের থাকে না; সেগুলো হয়ে ওঠে জীবনের হিসাব। গত রাতে স্ত্রীকে যখন টিফিনের কথা জিজ্ঞেস করলাম, ও সহজভাবেই বলল বাজারের পাউরুটি আর জ্যাম দেবে। ঝামেলাহীন সহজ সমাধান! কিন্তু আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আমরা যা ‘সহজ’ মনে করছি, তা কি আমাদের সন্তানদের জন্য সত্যিই নিরাপদ? কবে থেকে আমরা নিরাপদ আর সহজকে এক করে ফেললাম?
গত সপ্তাহে বাজার থেকে টকটকে হলুদ কলা কিনে এনেছিলাম। দেখতে নিখুঁত, যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা। কিন্তু কাটতেই বেরিয়ে এল আসল রূপ। ভেতরটা অস্বাভাবিক নরম ও স্বাদহীন। কার্বাইডের বিষে মাখানো ওই ফল মুখে দিয়ে যখন আমার অবুঝ সন্তানটি বলল, ‘বাবা, এটা মিষ্টি না’, তখন নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলাম। আম, লিচু কিংবা তরমুজ, আজ রাসায়নিকহীন কোনো ফল মেলা ভার। চাল থেকে সবজি, সর্বত্রই কীটনাশকের তীব্র উপস্থিতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিষাক্ত উপাদানগুলো শিশুদের অটিজমের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং গর্ভবতী মায়েদের ঠেলে দিচ্ছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। একসময় আমাদের খাবার নিয়ে গর্ব ছিল, এখন তা ভাবলেই আতঙ্ক জাগে। আমার মতে, আমরা যে খাবার খাচ্ছি তা কতটা নিরাপদ এই প্রশ্নটা এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।
স্কুলের গেটে সাজিয়ে রাখা রঙিন চিপস আর চকোলেটের দিকে যখন শরাফের মতো শিশুরা হাত বাড়ায়, তখন বুকটা ভারী হয়ে আসে। কৃত্রিম রঙ, ক্ষতিকর প্রিজার্ভেটিভ আর অতিরিক্ত লবণে ঠাসা এই প্যাকেটগুলো আকর্ষণীয় হলেও আদতে স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। বাইরের চাকচিক্য থাকলেও এর গুণমান অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। বাইরে দেখতে ভালো হলেও ভেতরের খাবারটা তেমন ভালো না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ অনিরাপদ খাবার খেয়ে অসুস্থ হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত ৪৫০টি নমুনার মধ্যে প্রায় ৯০টি অত্যন্ত ক্ষতিকর। বাজারের ১৫টি পাউরুটির নমুনার মধ্যে ১১টিতেই পাওয়া গেছে পটাশিয়াম ব্রোমেট, যা সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। লিচুতে ২৩ রকমের কীটনাশক, দুধে ইউরিয়া আর মুরগিতে আর্সেনিক; বাজারের খাবারে ভরসা করা আজ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যানসার, কিডনি বিকল ও লিভার সিরোসিসে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, অথচ আমরা এখনো নীরব।
আমাদের এই নীরবতার মাসুল দিচ্ছে আমাদের শিশুরা। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে রাসায়নিকযুক্ত খাবার খেলে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা সন্তানকে ভালো স্কুলে পাঠাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তার খাবারের মান কি নিশ্চিত করতে পারছি? এই ব্যর্থতার দায় কি কেবল সরকারের? অবশ্যই না। আমাদের দেশে আইনের অভাব নেই। ১৯৫৯ সালের পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স থেকে ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইন, এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজালের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের ওই কঠোর প্রয়োগ কি আমরা দেখি? ২০০৭ সালের নির্ভীক ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ্দৌলার অভিযানের কথা আজও মানুষ মনে রেখেছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো। আজও অভিযান হয় বটে, তার বেশিরভাগই যেন লোকদেখানো।
তবে আমরা ভোক্তারাও দায় এড়াতে পারি না। আমরা ভেজাল খাবার কিনেও প্রতিবাদ করি না। প্রতিবার যখন নীরবে ঘরে ফিরে আসি, কার্যত বলে আসি যে চলতে থাকুক। কৃষক বিষ মেশায় ন্যায্য দাম না পেয়ে, মধ্যস্বত্বভোগী ও উৎপাদকরা মেশায় বাড়তি লাভের আশায়, আর আমরা চাই কম দামে চকচকে পণ্য। এই অসম চাওয়া একসঙ্গে পূরণ হওয়া অসম্ভব। তবে আমরা সচেতন হলে বাজার বদলাতে বাধ্য।
চাইলেই আমরা নিজেরাই কিছু বদল আনতে পারি। বাজার থেকে কিছু কেনার আগে উৎপাদনের তারিখ, উপাদান ও মান যাচাই করার অভ্যাস গড়তে হবে। চিপসের বদলে ঘরে ভাজা আলু, বাইরের জুসের বদলে তাজা ফলের রস; এটুকু বদলই অনেক। সামান্য জায়গা থাকলে ছাদ বাগানে নিজের সবজি চাষ এখন শৌখিনতা নয়, বেঁচে থাকার তাগিদ। আমার এক আত্মীয়ের কথা মনে পড়ে, যিনি ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার পর গ্রামে ফিরে জৈব চাষ শুরু করেছিলেন। আজ তার পুরো পরিবার সুস্থ। ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর বা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রতিবেশীকে জানাতে হবে, সন্তানের স্কুলের অভিভাবক সভায় বিষয়টি তুলতে হবে।
খাদ্যে ভেজাল শুধু অপরাধ না, এটা আমাদের ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে নষ্ট করছে। সমস্যাটা এতটাই বিস্তৃত যে, প্রতিদিনের খাবারের মধ্যেই আমরা এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। ওই বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন দেখি ছেলেটা স্কুলের গেটে মিলিয়ে যায়, তখন মনে মনে একটাই প্রতিজ্ঞা করি, এই প্রজন্মকে বিষ থেকে বাঁচাতে হবে। এটি রাষ্ট্রের দায়, ব্যবসায়ীর দায়, কিন্তু সবার আগে আমার, আপনার—আমাদের প্রত্যেকের দায়। আসুন, নিজে সচেতন হই এবং চারপাশকে সচেতন করি।