Published : 15 Aug 2021, 09:22 PM
মুক্তিযুদ্ধের যে অন্যতম মূলভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা, তা সর্বক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের ১৯ নভেম্বর দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো- ''স্বাধীন বাংলাদেশে সেকুলার বাঙালী জাতির অস্তিত্বের রক্ষাকারী হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আমি এই ধর্মনিরপেক্ষতার চারা বাংলাদেশের মাটিতে পুঁতে গেলাম। যদি কেউ এ চারা উৎপাটন করে, তাহলে বাঙালী জাতির স্বাধীন অস্তিত্বই সে বিপন্ন করেেব।''
মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক ধরনের বাস্তবিকতা তৈরি করেছে- বিভিন্ন দিক থেকেই, যার ফলে 'বাঙালি' অভিধাও সেই বাস্তবিকতার ভিত্তিমূলে হয়েছে আরও সংহত। ''রাজনৈতিক এবং স্থানিক দিক থেকে বাংলাদেশের অধিবাসীদের বাঙালি পরিচয় আরও জোরদার হয় ১৯৭২ সালে- শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের বাঙালি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেবল জোরদার নয়, এই সংবিধানের সংজ্ঞা অনুযায়ী এ শব্দের অভিধাও আরেকবার বদলে যায়।'' (গোলাম মুরশিদ, 'উজান স্রোতে বাংলাদেশ' ২০০৩ সাল, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা)।
আমরা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে পরিচিত হবো নাকি ভাষা দিয়ে পরিচিত হবো। কয়েক দশক ধরে এমন ছিন্ন-ভিন্ন বিবেচনাবোধ কখনো কখনো 'বাঙালি' ও 'বাংলাদেশি' বিভাজন তৈরি করে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে ক্ষমতাশালীরা নিমগ্ন থেকেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ধর্মীয় পরিচয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার খণ্ডিত প্রয়াসও চলেছে। ''শেখ মুজিবুর রহমান কেবল জাতির জনক ছিলেন না, নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয়। … তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন অন্তত সংবিধান অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষতা তত্ত্ব বজায় ছিল। আইনত আমাদের পরিচয় ছিল আমরা 'বাঙালি'। কিন্তু তিনি যখন ফৌজি বাহিনীর বিদ্রোহী কিছু কর্মকর্তার হাতে নিহত হন, তখন ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ধর্মীয় পরিচয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়।'' (গোলাম মুরশিদ, 'স্বরূপের সংকট, না নব্য-সাম্প্রদায়িকতা' 'উজান স্রোতে বাংলাদেশ' ২০০৩ সাল, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা)।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বাস করলেও নিজেদের মধ্যে ঘৃণার বাস্তবতা ছিল, এখনো রয়েছে- তারই ফলে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ কখনো কখনো দাঙ্গা হিসেবেও দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, ধর্মকে ক্ষমতা পাকা করার হাতিয়ার হিসেবে তা ব্যবহারের ফলে আমাদের বাঙালি সমাজের চরিত্র শুধু বদলে যাচ্ছে না, বদলে যাচ্ছে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতি। কী ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হচ্ছে- উত্তর প্রজন্মের জন্য! সাম্প্রদায়িকার ভেদবুদ্ধি কীভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জোরালো হচ্ছিলো, তা গভীর পর্যবেক্ষণে আমরা বুঝতে পারি। মোশতাকের বিশ্বাসঘাতকতা ও জাতির পরিচয়কে পাল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টা থেকে পরবর্তিতে জিয়ার পর এরশাদ ক্ষমতাকে পাকা করতে ধর্মকে আরও নগ্নভাবে ব্যবহার করে। এরশাদের পতনের পর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলের শাসন নিয়ে পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিতে যদি আমরা লক্ষ করি. তবে দেখবো, কীভাবে এই সময়েও ধর্মান্ধতা রাষ্ট্র-সরকার ও পরিবেশ-প্রতিবেশে দিন দিন প্রবল এক প্রবণতা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
দূরবর্তী ইতিহাসের কথা বাদ দিয়ে নিকটবর্তী সময়ের কথা বলি- গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাট দশকে যে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তারই ভিত্তিমূলে এ-ভূখণ্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের চেতনা বিকশিত হয়েছিল, এ চেতনার ভিত্তিতেই আমরা সকল ধর্মের মানুষ ধর্মীয় বিবেচনার বাইরে এসে যূথবদ্ধ হয়ে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়ে একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা অর্জনে সক্ষম হই। মুক্তিযুদ্ধের মূলভূমির অন্যতম ধারা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল- ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা যেন বেদনাবিহ্বল হয়ে এক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পিছুহটা দেখেছি, যে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের জন্য হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ও মুসলিমরা একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও, ক্ষমতায় আসতে পারেনি। মানুষের মতামত ও আকাঙ্ক্ষা ভূলুণ্ঠিত করার ফলে এবং অন্যান্য কারণে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বিভিন্ন দিক থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশটিতে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে গণতান্ত্রিক চেতনায় মাত্র নয় মাসে সংবিধান রচনা, নতুন সংবিধান অনুয়ায়ী ছয় মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান, এক বছর ছয় মাসের মধ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন- এইসব উদ্যোগ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
১৯৭৫ সালে বাকশালের ১১৫ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয় এবং ২১ জুন ১৯ জেলাকে ৬১ জেলায় রূপান্তরিত করে প্রত্যেক জেলায় গভর্নর নিয়োগ করে এক নতুন ধরনের শাসনপদ্ধতির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই পদ্ধতি সেই সময়ে বহু দেশের মডেল হয়ে উঠেছিল, তারই অনুসরণে ও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এ মডেল গ্রহণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়- দেশের কালগত সংকট ও সমস্যা উপলব্ধি করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে মহান নেতারা এগিয়ে আসেন। মানুষের আস্থাবান নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু কালের সংকট মোকাবেলায় 'বাকশাল'-এর মত একধরনের শাসনপদ্ধতির প্রবর্তন করার উদ্যোগ নেন। সাধারণ মানুষের আস্থাভাজন ও পরীক্ষিত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর এই উদ্যোগ মানুষ ও দেশ বাঁচানোর পথ-পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হতো কি-না, তা প্রমাণে বঙ্গবন্ধু হাতে সময় পাননি। তবে, আমাদের মনে হয়- বঙ্গবন্ধু জনগণের স্বার্থ থেকে দূরবর্তী অবস্থানে থাকেননি, বেঁচে থাকলে সেই সময়ে বরং জনগণের ত্রাণকর্তা হিসেবেই ভূমিকা রাখতেন। বঙ্গবন্ধুর মধ্যে সেই কালপোযোগী যোগ্যতা ও স্বপ্ন ছিল বলেই মনে হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তার যে অঙ্গীকার, মানসচেতনা ও ভূমিকা দেখেছি, তা থেকে তিনি দূরবর্তী হতেন না বলেই মনে হয়।
''শেখ মুজিবের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের তুলনা করলে বলা যায় যে, উভয়ই নিজেকে মুসলমান বলে শনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু মুজিব এই পরিচয় ভাঙিয়ে সামান্যতম রাজনৈতিক মুনাফা অর্জন করতে চাননি, অপরপক্ষে, জিয়া এই মুলধনকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন।'' (গোলাম মুরশিদ, 'উজান স্রোতে বাংলাদেশ' ২০০৩ সাল, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা)।
''এখানে একটা কথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, আওয়ামী লীগ আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলেও, তাঁদের আমলে দেশটা মৌলবাদী চেহারা নেয়নি। কিন্তু শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ইসলামী মৌলবাদ বাংলাদেশে এত শক্ত এবং মোটা শিকড় গেড়ে বসেছিল যে, মধ্যপন্থি দলগুলোকে আপস করে কমবেশি ধর্মের গীত গাইতে হয়। মনে আছে, মোটামুটি এ সময়েই মস্কোপন্থি মোজাফফর ন্যাপও সংসদের কয়েকটি আসন পাওয়ার লোভে অনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য ঘটিয়ে ধর্ম, কর্ম ও সমাজতন্ত্রের শ্লোগান তুলেছিল। শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের পতনের পর সাম্প্রদায়িকতার উত্থান আরম্ভ হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণায়। কোনো দেশের দালাল ছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু খোন্দকার মোশতাক এই নীতির সূচনা করেন এবং জিয়াউর রহমান এর বিকাশ ঘটান। এবং কয়েক বছরের মধ্যে সরকারি মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি এবং অযোগ্যতার পরিচয় দিলেও রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলামীকরণের প্রয়াসে অসামান্য সাফল্য অর্জন করে।'' (গোলাম মুরশিদ, 'উজান স্রোতে বাংলাদেশ' ২০০৩ সাল, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা)।
আমাদের ভুললে চলবে না- ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়েছে ধর্মীয় বিভাজনে। আর এ বিভক্তির পরিণামে কত হিংসাশ্রিত ঘটনা ঘটেছে, হত্যা হয়েছে, রক্তপাত ঘটেছে, মানুষ হয়েছে বাস্তুচ্যুত। নারীর প্রতিও হয়েছে জলুম। কী এক কালজ্ঞ-পর্ব। এখনো সেই ভেদবুদ্ধির লোকেরা সময় সময় বিভেদরেখা টেনে নিয়ে রাজনীতির নামে ক্ষমতার লোভে মানুষের মানবিকতাকে হিমাঙ্কের নিচে নামিয়ে আনতে চায়। এর বিপরীতে মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধনকে দৃঢ় করতে হবে। কালজ্ঞশক্তির লোকদের তর্জন-গর্জন যেন মানুষের শুভবোধের কাছে হয়ে না পড়ে অসাড়, সেই ধারাবাহিক ভূমিকা জারি রাখতে হবে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে আদর্শ গড়ে তুললেও মানুষ আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। মানুষ আদর্শের নামে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও হত্যাকাণ্ড-হিংস্রতার সমস্ত জন্তুকে হারিয়ে দিয়েছে। এই সত্যকে তো অস্বীকার করা যাবে না, আমাদের চোখের সামনে একের পর এক ঘটনা ঘটছে- ধর্মের নামে তালেবানরা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে মৌলবাদী গোষ্ঠীর লোকেরা আত্মঘাতি হয়ে নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিরীহ লোকদের প্রতিনিয়ত হত্যা করছেÑযুক্তিহীন আর অন্ধভাবে- কী এক অসূয়া নিয়ে! আজ ধর্মান্ধ কালজ্ঞশক্তির উত্থানের পিছনে তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক' নামে পরিচিত নেতৃত্বের অপরিনামদর্শী ভূমিকা ও জটিলতার কারণে, সারাবিশ্বের সাধারণ ও নিরীহ মানুষ বলি হচ্ছে। আর এদের হাতে গুপ্ত থাকা সুতোর টানে না বুঝে- না জেনে, ধর্মের নামে কিছু বিভ্রান্ত কিশোর-তরুণও নিজেদের ধ্বংস করছে, পাশাপাশি ধ্বংস করছে অন্যদেরও। আর এ-সবের মূলে দায়ী তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক' দেশের নেতা ও নেতৃত্ব। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সারা বিশ্ব আজ জটিল অবস্থানে চলে গিয়েছে। যে যুদ্ধে শুধু সমারাস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে না, মনস্তাত্ত্বিক-অস্ত্র গভীরভাবে ব্যবহার হচ্ছে, এই অস্ত্রের শক্তি আরও ভয়াবহভাবে ক্ষতিকর ও গভীর। এর পরিণাম থেকে অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশও দূরবর্তী থাকছে না, বাংলাদেশের মানুষও না। আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার দিকে চোখ রাখলে-তা আমরাও উপলব্ধি করতে পারি।
বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল অনন্য ও গণমানুষের গণযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধকে সংকীর্ণ ও একরৈখিকভাবে মূল্যায়ন করা কোনোক্রমেই ঠিক নয়। ব্যক্তি, লেখক-শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সংগঠন, রাজনৈতিক দল, সরকার ও রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পটভূমিতে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সচেতন ভূমিকা রাখার মধ্যে দিয়ে আপন সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক সংরক্ষণ ও বিকাশে ভূমিকা পালন করলেই চলবে না, সেইসাথে বঙ্গবন্ধুর অনুভবে দৃঢ়ভাবে থাকা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূলভিত্তি ও বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূল 'ধর্মরিপেক্ষতা'কে সবসময়ে রাষ্টের অন্যতম মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় রাখতেই হবে, না হলে মুক্তিযুদ্ধের সেই বাংলাদেশ আর থাকবে না!