Published : 23 Jul 2021, 11:41 PM
শহরের কেন্দ্রে একটি পুরনো দালান। চারপাশে দেয়াল ঘেরা। সামনে খোলা মাঠ। আর দশটা ভবনের মত নয়। দু পাশ থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে। সামনে খোলা বারান্দা। খিলানের আঙ্গিকে দরজা আর খড়খড়ি দেওয়া জানালা। রহমতগঞ্জের সড়ক ধরে পথ চলতি দুয়েকজন হয়ত ফিরে তাকান। কেউ চেনেন 'বাংলা কলেজ' নামে। কারো কাছে পরিচয় 'শিশুবাগ স্কুল'।
ঠিক একশ বছর আগে ইতিহাসের কী স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছিল এ বাড়িকে ঘিরে তা অনেকেই বিস্মৃত হয়েছেন। তা না হলে একদিন সকালে হঠাৎ কী করে বাড়ির মালিকানা দাবি করে কেউ একজন এলো বুলডোজার নিয়ে। তারপর সেই বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হলো ইতিহাসের সাক্ষী বাড়িটির উপর। ভেঙে পড়ল সেই ভবনের একাংশ, যেখানে রচিত হয়েছিল এ জনপদের গৌরবের ইতিহাস।
১৯২০-২১ সালে এ বাড়িকে ঘিরেই পরিচালিত হয়েছিল চট্টগ্রামের অসহযোগ আন্দোলন, বার্মা অয়েল কোম্পানির আন্দোলন এবং আসাম-বেঙ্গল রেল ধর্মঘটের মত সাড়া জাগানো সব সংগ্রাম। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের প্রস্তুতি পর্বেও এই বাড়িরই এক সন্তানের অপরিসীম অবদান। তিনি দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত।
এর আগে ১৯০৯ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে কেমব্রিজের পাঠ চুকিয়ে ব্যারিস্টার যতীন্দ্র মোহন দেশে ফেরেন। সঙ্গে স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তা। পিতা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা, আইনজীবী যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত। বাবার ইচ্ছাতেই স্বাধীন আইন পেশা বেছে নেন। প্র্যাকটিস শুরু করেন কলকাতা হাইকোর্টে। যুক্ত হন কংগ্রেসের রাজনীতিতে। ১৯১৯ সালের ২ নভেম্বর যাত্রা মোহন মারা গেলে পুরোদমে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন যতীন্দ্র মোহন।
সময়টা উত্তাল। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানে বৈশাখী উৎসবের দিনে ডাকা প্রতিবাদ সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালালো ব্রিটিশ সেনা। হত্যার প্রতিবাদে ২২ মে নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধী কায়সার-ই-হিন্দ উপাধি ত্যাগ করেন।
অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জয়ী ব্রিটেন মুসলিম দুনিয়ার খলিফা তুরস্কের সুলতানকে বিতাড়িত করে। খিলাফতের মর্যাদা রক্ষায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুসলমিরা শুরু করেন খিলাফত আন্দোলন। নেতৃত্বে মওলানা শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী, মৌলানা আজাদ, হাকিম আজমল খাঁ। ১৯১৯ এর নভেম্বরে দিল্লীতে হলো খিলাফত কনফারেন্স। তার ঢেউ এসে লাগলো চট্টগ্রামেও।
এমন পরিস্থিতিতে ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন বসলো। সম্মেলনে অতিরিক্তি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন যতীন্দ্র। অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা হলেও প্রস্তাবনার বিপক্ষে ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপিন চন্দ্র পাল ও যতীন্দ্র মোহন। তবে অধিবেশনে গান্ধীর অসহযোগ প্রস্তাব গৃহীত হলো। পরের অধিবেশন ডিসেম্বরে নাগপুরে। মহাত্মা গান্ধী দেশবন্ধুকে অসহযোগে উদ্বুদ্ধ করলে তিনি সম্মত হন। ফলে অসহযোগ প্রস্তাব সর্বসম্মতি ক্রমে অনুমোদন পায় এবং বাংলায় চিত্তরঞ্জন দাশের সক্রিয়তা এ আন্দোলনকে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা দেয়।
বাংলায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জনপ্রিয়তা তখন আকাশচুম্বী এবং তার অনুসারীর সংখ্যাও বিপুল। তিনি এলেন চট্টগ্রামে। উঠলেন যতীন্দ্রের এ বাড়িতে। গান্ধী ময়দানে বিরাট সভা হলো। দেশবন্ধু, যতীন্দ্র মোহন ও শেখ-এ-চাটগাম কাজেম আলীর উপস্থিতিতে সভায় দলে দলে লোক পেশা ত্যাগ করে আান্দোলনে যোগ দিল।
পেশাগত সাফল্যের শিখরে থেকেও আইন পেশা ত্যাগ করলেন যতীন্দ্র। আন্দোলনের কারণে টানা দু বছর তিনি পেশার বাইরে ছিলেন। মাস্টারদার বিপ্লবী দলের সদস্যরাও যোগ দিলেন অসহযোগ আন্দোলনে। সরকারি চাকরি ছেড়ে এলো বিভিন্ন পেশার মানুষ। সরকারি স্কুল-কলেজ ছেড়ে ছাত্ররা এলো জাতীয় স্কুল-কলেজে। বিলাতি কাপড় পোড়ানো শুরু হলো।
এর মধ্যে চট্টগ্রামে বার্মা অয়েল কোম্পানির (পরিচালনা করত বুলক ব্রাদার্স) শ্রমিকদের সংগঠিত করে ইউনিয়ন গঠন করলেন যতীন্দ্র। তিনিই সভাপতি। এক কর্মচারী শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। শ্রমিক ইউনিয়ন ধর্মঘটের ডাক দিল। অহিংস আন্দোলনের ঘোষণা দিলেন যতীন্দ্র। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ করে দেয় খালাসিরা। পুরো শহরে ১৪৪ ধারা জারি করলো জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।
১৯২১ সালেল ৪ মে পুরো চট্টগ্রামে হরতাল পালিত হয়। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ হামলা করলো। কয়েকজন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হলেন। গর্জে উঠলো চট্টগ্রাম। পরদিন ১২ হাজার মানুষের মিছিল হল যতীন্দ্রের নেতৃত্বে। গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের আদালতে নেওয়া হলে আদালত ভবন এলাকা ঘিরে ফেলে জনতা। 'বন্দে মাতরম' ও 'আল্লাহু আকবর' ধ্বনিতে প্রকম্পিত শহর। হার মানতে বাধ্য হলা বুলক ব্রাদাস। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যস্থতায় আপস হলো আন্দোলনকারীদের সব দাবি মেনে নিয়ে। প্রত্যাহার হয় ১৪৪ ধারা।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা তিন-চতুর্থাংশই ছিল মুসলিম। তাদের সর্বজনস্বীকৃত নেতা ছিলেন যতীন্দ্র। চট্টগ্রামে অসহযোগ-খিলাফত যুগপৎ যাত্রায় যে হিন্দু-মুসলমান রাজনৈতিক ঐক্যের সূচনা হয়েছিল তা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যতীন্দ্রকে চট্টগ্রামের 'মুকুটহীন রাজা' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বিপরীতে ইংরেজরা যতীন্দ্রকে 'চট্টগ্রামের ভয়ানক বালক' (ইনফেন্ট টেরিবল অব চিটাগাং) নামে আখ্যায়িত করে।
এ আন্দোলনের রেশ না কাটতেই চা বাগান শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দিলো। হাজার হাজার শ্রমিক বাগান ছেড়ে নিজ গন্তব্যে ফিরতে আসাম থেকে পায়ে হেঁটে চাঁদপুর স্টিমার ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। অসহযোগের শুরুতে গঠিত আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি যতীন্দ্র। কিছু কুলি স্টিমারে গোয়ালন্দ পৌঁছালেও বেশিরভাগই পারেনি। শ্রমিকদের বাগানে ফেরাতে চাঁদপুর স্টিমার ঘাট বন্ধ করে দিলে তারা চাঁদপুর স্টেশনে অবস্থান নেয়। ১৯২১ সালের ২০ মে রাতের আঁধারে শ্রমিকদের উপর ঝাপিয়ে পড়লো গুর্খা সৈন্যরা। বহু শ্রমিক নিহত ও আহত হয়। প্রতিবাদে চাঁদপুর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে হরতাল পালন হলো। খবর পেয়ে যতীন্দ্র ছুটলেন চাঁদপুর।
চা শ্রমিকদের সমর্থনে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন ২৫ মে থেকে ধর্মঘটের ডাক দিলো। শুরু হলো ইতিহাস বিখ্যাত আসাম বেঙ্গল রেল ধর্মঘট। ২৭ মে নৌপথেও ধর্মঘট শুরু করলো সারেং এসোসিয়েশন। ধর্মঘটের দায়িত্ব নিলেন যতীন্দ্র। চট্টগ্রাম শহরে হরতাল পালিত হয় শান্তিপূর্ণভাবে। প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মচারী ধর্মঘটে অংশ নিলেন।
রহমতগঞ্জের এ বাড়ি ও অদূরের জে এম সেন হল হয়ে উঠল ধর্মঘটের কেন্দ্রস্থল। ধর্মঘটে সামিল হলেন মাস্টারদা সূর্য সেন, অনুরূপ সেন, চারুবিকাশ দত্ত ও গিরিজা শঙ্কর চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিপ্লবী দলের সদস্যরা। ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে খরচ মেটাতে ৪০ হাজার টাকা ধার করেন যতীন্দ্র।
শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট যখন তুঙ্গে তখন ব্রিটিশ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। সমাবেশের উপর এক মাসের নিষেধাজ্ঞা দিল সরকার। কোয়ার্টার ছাড়ার নির্দেশ পেয়ে সেখান থেকে নিজেদের জিনিসপত্র আনতে গেলে শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করলো পুলিশ। প্রতিবাদে নিষেধাজ্ঞা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলেন যতীন্দ্র।
১৯২১ সালের ২১ জুলাই। মিছিলের জন্য সাত হাজার মানুষ জড়ো হলো। সিদ্ধান্ত হয় মিছিল যাবে চট্টেশ্বরী কালী বাড়ি, অলি খাঁ মসজিদ ও শিখ মন্দিরে এবং তিন ধর্মস্থানে, প্রার্থনা করবেন আন্দোলনকারীরা। নেতৃত্বে যতীন্দ্র মোহন, নৃপেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, কাজেম আলী, শিখ মন্দিরের মোহন্ত কৃপালদাম উদাসী, শাহ বদিউল আলম, আবদুল করিম নিজামপুরী ও ত্রিপুরা চরণ চৌধুরী। মিছিল যতই এগোতে থাকলো তত লোক বাড়তে লাগল। ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের বাধার মুখে পড়ে মিছিল।
ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ যতীন্দ্র, মহিম চন্দ্র দাশসহ ১৫-১৬ জন গ্রেপ্তার হন। মিছিল ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে নেতাদের জেলে নেওয়া হলো। উত্তেজিত জনতা জেল গেইটে জড়ো হয়। হাজার মানুষের সমাগমে ভীত জেল কর্তৃপক্ষ যতীন্দ্রের শরণাপন্ন হলো। তাদের অনুরোধে জেল গেটের সামনে চেয়ারে বসলেন যতীন্দ্র। নেতাকে দেখতে পেয়ে জনতা আশ্বস্ত হয়।
সেদিন আদালত ব্যক্তিগত জিম্মায় যতীন্দ্রকে জামিন দিতে চাইলেও তিনি অস্বীকার করেন। পুরো চট্টগ্রামে হরতাল শুরু হয়ে যায়। দুদিন পর আবার শুনানি। নিজেদের 'ব্যরিস্টর' সাহেবের গ্রেপ্তারের খবর শুনে চাঁদপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা এমনকি ত্রিপুরা থেকেও জনস্রোত ছুটলো চট্টগ্রাম পানে। কর্ণফুলীর ঘাটে নৌকার জট লেগে যায়।
যতীন্দ্রসহ অন্য নেতাদের আদালতে আনা হলে পুরো পরীর পাহাড় কানায় কানায় ভরে ওঠে। লালদীঘির পাড়, ফিরিঙ্গি বাজার, কোতোয়ালী মোড় পর্যন্ত মানুষ ভিড় করে। এত মানুষের ভিড় দেখে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ভীত হয়ে পড়ে। এটা প্রমাণিতই ছিল যে, কেবল যতীন্দ্র মোহনই শান্তি ও অহিংসা বজায় রেখে আন্দোলন পরিচালনা করতে পারেন। জামিন হলো যতীন্দ্রসহ সব নেতার। মুক্তির পর গান্ধী ময়দানে বিরাট সভা হয় তুমুল বৃষ্টির মধ্যে।
চট্টগ্রামে অসহযোগ আন্দোলনের কার্যক্রম দেখতে খিলাফত নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলীকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে এলেন মহাত্মা গান্ধী। রেলস্টেশন থেকে রহমতগঞ্জের এ বাড়ি পর্যন্ত স্বেচ্ছসেবকরা সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে তাঁদের স্বাগত জানয়। ফিরে গিয়ে চট্টগ্রামের অসহযোগ আন্দোলনের প্রশংসায় ইয়াং ইন্ডিয়া পত্রিকায় গান্ধী লিখলেন 'চিটাগাং টু দ্য ফোর' ও 'চিটাগাং স্পিকস' নামের দুটি নিবন্ধ। 'চট্টগ্রাম এগিয়ে' গান্ধীর এই প্রশংসা বাণী চট্টলার মানুষের কপালে জুটেছিল মূলত যতীন্দ্র মোহনসহ চট্টগ্রামের নেতাদের অবিচল নেতৃত্বে সফল এসব আন্দোলনের কারণেই।
কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রথম মেয়র ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। ১৯২৫ সালের জুনে দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের মেয়র হন।প্রথম তিন মেয়াদে ১৯২৫ সালের ১৭ জুলাই থেকে ১৯২৭ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে আবার দুই মেয়াদে ১৯২৯ সালের ১০ এপ্রিল থেকে ১৯৩০ সালের জুলাই পর্যন্ত মেয়র ছিলেন তিনি। এরপর কলকাতা করপোরেশনে মেয়র হন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস।
বীর চট্টলার আরেক গৌরবের ইতিহাস চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ। এর প্রস্তুতি পর্বে দ্বিতীয় আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা, নাগরখানা পাহাড় যুদ্ধ, রেলওয়ের টাকা ছিনতাই ও পুলিশ কর্তা প্রফুল্ল হত্যা মামলায় আইনজীবী হিসেবে যতীন্দ্রের ভূমিকা আজও প্রবাদ প্রতিম। তার ক্ষুরধার বুদ্ধি ও অসামান্য দক্ষতার কারণে প্রতিটি মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাস পান বিপ্লবী দলের সদস্যরা।
সবশেষ বিপ্লবীদের হাতে আসানুল্লা দারেগা হত্যা পরবর্তী পরিস্থিতিতে বর্বর পুলিশী ও লেলিয়ে দেওয়া গুণ্ডাদের হামলাকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে স্থানীয় প্রশাসন। খবর পেয়ে কলকাতা থেকে ছুটে আসেন যতীন্দ্র। সরেজমিন পরিদর্শন শেষে তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানান। কলকাতা ও বিলেতে গিয়ে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। ফলে পরবর্তীতে চাকরি হারান চট্টগ্রামে বিভাগীয় কমিশনার নেলস ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কেম।
বিলেতে অবস্থানরত কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার টেগার্ট অভিযোগ করেন বিপ্লবী ও সন্ত্রাসবাদীদের সাথে যতীন্দ্রের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। জাহাজে দেশে ফেরার সময় ১৯৩২ সালের ২০ জানুয়ারি বম্বে বন্দরে গ্রেপ্তার হলেন যতীন্দ্র। অনেক দেনদরবারেও অসুস্থ যতীন্দ্র মুক্তি পেলেন না। ১৯৩৩ সালের ২৩ জুলাই রাচিতে অন্তরীণ অবস্থায় মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তার জীবনদীপ নিভে গেল।
আজ থেকে এক শতাব্দী আগে চট্টগ্রামের সব কয়টি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যতীন্দ্র। এই পরিবারের হাতেই আধুনিক চট্টগ্রামের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গোড়া পত্তন। অথচ ১৯৭০ এ নেলী সেনগুপ্তা দেশ ছাড়ার পর রহমতগঞ্জের বাড়িটি হয়ে গেল 'শত্রু সম্পত্তি'। হয়ে যায় বেদখলও। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর নেলী সেনগুপ্তাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতায় আর ফিরতে পারেননি নেলী।
এরপর শত্রু সম্পত্তি হিসেবেই বছরের পর বছর বাড়িটি লিজ নিতে থাকে বাংলা কলেজ ও শিশুবাগ স্কুলের প্রতিষ্ঠান শামসুদ্দিন মো. ইসহাক ও তার সন্তানেরা। আর ২০২১ সালে এসে সেই 'অর্পিত সম্পত্তি'ই ক্রয়সূত্রে মালিকানা দাবি করে বসে ফরিদ চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি। ৪ জানুয়ারি বুলডোজার চলল চট্টগ্রামের ইতিহাসের বাঁক বদলকারী প্রায় প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী ও অন্যতম সূতিকাগার বাড়িটিতে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রাণা দাশগুপ্ত সেদিন ছুটে না এলে বুলডোজারের ধ্বংসলীলা থামতো না। কবি সাংবাদিক আবুল মোমেন ও সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেনের সক্রিয়তায় ইতিহাস সচেতন কয়েকজন মানুষের প্রাণান্ত চেষ্টায় সেদিন শেষ রক্ষা হয়েছিল। তারপর চট্টগ্রামের মানুষ প্রতিবাদে মুখর হলে সরকার বাড়িটিকে 'মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা জাদুঘর' হিসেবে সংরক্ষণের ঘোষণা দেয়।
এরপর ছয়মাস পেরিয়ে গেছে। বাড়ির সামনের অংশ তেমনই ভাঙা পড়ে আছে। চট্টগ্রামের বাতাসে এখনো ভেসে বেড়ায় দখলকারীদের নানা ষড়যন্ত্রের ফিসফাস। জাদুঘরের কার্যক্রম শুরুর কোনো তৎপরতাই নেই। এভাবে অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকলে শতবর্ষী প্রাচীন বাড়িটির শেষ রক্ষা হবে তো?
চট্টগ্রাম এবং বিভাগপূর্ব ভারতের হিন্দু-মুসলমান আপামর মানুষের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করে জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে যিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন সেই যতীন্দ্রকে বিস্মৃত হলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। বীর চট্টলার মুকুটহীন রাজার শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষা করবই। যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের প্রয়ান দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
(তথ্যঋণ: বিল্ডার্স অব মর্ডান ইন্ডিয়া- দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত- পদ্মিনী সেনগুপ্ত; স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম- পূর্ণেন্দু দস্তিদার; অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম- অনন্ত সিংহ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম চট্টগ্রাম বিদ্রোহ ও বিপ্লবী মহানায়ক সূর্য সেন- শরীফ শমশির এবং আধুনিক ভারত- বিপান চন্দ্র।)