Published : 27 Aug 2026, 03:02 PM
গ্রামীণফোন যখন প্রথম ভয়েস এসএমএস চালু করল, তখন চমৎকার একটি বিজ্ঞাপনের আয়োজন করেছিল কোম্পানিটি। বিজ্ঞাপনের গল্পটা এরকম—তিন চার বছরের মেয়ে সন্তান তার বাবাকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে। ভয়েস মেসেজ এমন জ্যান্ত যে, বাবার মনে হচ্ছে মেয়ে বুঝি অফিসের ডেস্কের ওপর বসে বাবার সঙ্গে কথা বলছে। এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক প্রচারিত বিজ্ঞাপনের মধ্যে ওই টিভিসিটি রয়েছে; এর স্থান সহজে কেউ দখল করতে পারবে বলে মনে হয় না।
পাঠকের মনে আছে কিনা, সেই মেয়েটি অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে তার বাবাকে কী বলেছিল! সে বলেছিল, তাদের বাসার টিয়া পাখি তার নাম ধরে ডেকেছে, কিন্তু মা তার কথা বিশ্বাস করেনি। বাবা যেন বাসায় এসে মাকে বকে দেয়। দেখতে এবং শুনতে যতই আদুরে আর আহ্লাদী শোনাক, টিভিসিটির সংলাপটি অত্যন্ত আপত্তিকর। শিশু কখন বাবাকে বলতে পারে মাকে বকে দিতে? শিশুরা যদি এই কথা শিখে বড় হয় যে, বাবা চাইলেই মাকে বকতে পারে, পরিবারে বাবার স্থান মায়ের ওপরে; তাহলে তারা মাকে সম্মান করতে শিখবে কীভাবে?
যা হোক, আজকের লেখাটি পরিবারে নারীর সম্মান কিংবা দ্বিতীয় মাত্রার অবস্থান নিয়ে নয়; সরাসরি শিশুদের নিয়ে। যে সময়ে গ্রামীণফোনের এই বিজ্ঞাপনটি নির্মিত হয়, সে সময়ে দেশে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না; ফলে ভাইরালের যুগও শুরু হয়নি। তবে নাটক, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে শিশুশিল্পীরা কাজ করত। তারা জনপ্রিয়ও হতো। আমাদের শৈশবে ‘বহুব্রীহি’ নাটকের টগর ও নিশা, ‘দীপু নাম্বার টু’ সিনেমার দীপু ও তারেক ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল।
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের নাটক-সিনেমায় শিশু চরিত্রদের বেশ বড় অংশ থাকতে দেখা যেত। হুমায়ূন আহমেদকে শিশু চরিত্রদের ‘অবাধ্য ও বেয়াদব’ হিসেবে দেখানোর জন্য সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়। বলা হতো, হুমায়ূন আহমেদের নাটকে শিক্ষামূলক কিছু নেই। হুমায়ূন আহমেদ এই সমালোচনার জবাবে সুন্দরভাবে বলেছিলেন, আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই থেকে কিছু শিখতে চাই না; শিখতে চাই নাটক-সিনেমা থেকে।
গণমাধ্যম কিংবা বিনোদনমাধ্যমের কাছ থেকে কিছু শেখার আছে কি নেই, সেই তর্ক এখন আগের চেয়েও অনেক জটিল হয়ে গেছে। প্রযুক্তির উল্লম্ফন, মিডিয়ার বিচিত্র ধরনের ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, এআই ইত্যাদি পুরো সমাজব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। এই প্রভাবের ভালো-মন্দ নানা দিকই রয়েছে। একা একা ফ্ল্যাটবাড়িতে বড় হওয়া শিশুটিও ইউটিউবের রাইমস শুনে কথা বলা শিখে ফেলতে পারছে, গড়গড় করে গল্প-কবিতা আবৃত্তি করে ফেলছে—এমন নানা ইতিবাচক সুবিধা তো আর অস্বীকার করা যাবে না।
তবে সমস্যা সেখানে নয়; সমস্যা হচ্ছে মানুষের মনোজগতের বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে। নিজের শিশু সন্তানকে সামাজিক মাধ্যম থেকে দূরে রাখার, কিংবা ভার্চ্যুয়াল জগতে তাদের বিচরণকে সীমাবদ্ধ করবার সীমারেখাটা ঠিক কোথায়—তা আমাদের অনেকের মাথাতেই নেই।
উদাহরণ দেওয়া যাক—একজন বিখ্যাত অভিনেতার নাতনি যিনি সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে খুব স্মার্টলি কথা বলতেন, তাকে নিয়ে প্রচুর ট্রোল হলো; কিছুদিন পরে দেখা গেল মেয়েটি বিয়ে করে ফেলেছে। এমনকি আর একটি আন্ডারএজড মেয়ে তার স্কুলের গভর্নিং বডির একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে বিয়ে করে ফেলল, যার সন্তানরাই মেয়েটির চেয়ে বয়সে বড়। এ তো গেল রাজধানীর শিক্ষিত শহুরে বিত্তশালী পরিবারের কথা।
সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে তেরো বছর বয়সী একটি মেয়ের সন্তান নিয়ে আইনি লড়াইয়ের গল্প, একটি পনেরো বছরের মেয়ের নিজের ৩৫ বছর বয়সী খালুর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার গল্প, চৌদ্দ বছরের একটি ছেলের ৩২ বছর বয়সী এক মহিলাকে বিয়ে করে ফেলার গল্প।
কেউ বলতে পারে, এ ধরনের অসম প্রেমের সম্পর্ক কি আগে হতো না? বাল্যবিবাহ কি এই দেশে খুব দুর্লভ ঘটনা? আগে রিলসের যুগ ছিল না বলে জানা যেত না, সামনে আসত না; এখন আসছে। ঘটনা এইটুকুই। তবে না! আমার মতে ঘটনা এইটুকুই নয়; যথেষ্ট পার্থক্য আছে। শিশুদের প্রতি শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতন সবসময়ই ছিল। শিশুরা দুর্বল ও ক্ষমতাহীন বলে তাদের প্রতি নিপীড়ন ও নির্যাতন সবসময় নানাভাবে চলতেই থাকে। তবে এই সময়ে এসে এই নিপীড়নের ওপর সুন্দর মুখোশ পরানো সম্ভব হয়েছে, যা সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। সেই মুখোশটির নাম সম্মতি বা কনসেন্ট।
ব্যাখ্যা করছি—যে শিশুরা নিজের ইচ্ছায় বা নিজের মতামতের ভিত্তিতে ক্যামেরার সামনে চটপট সাংবাদিকের কথার উত্তর দিচ্ছে, বা নিজের ইচ্ছায় দ্বিগুণ বয়সী কাউকে বিয়ে করে ফেলছে, বাবা-মায়ের নামে মামলা করে দিচ্ছে; এমনতর নানা কীর্তিকাহিনি করছে—সেসব কি আসলেই তারা স্বইচ্ছায় করছে, নাকি বড়দের দিয়ে প্রভাবিত হয়ে করছে? বড়দের অনুকরণ করবার জন্য করছে?
শিশুরা অনুকরণপ্রিয় হয়। তিন বছরের বাচ্চা মেয়েটিও মায়ের মতো হাঁড়ি-খুন্তি নিয়ে রান্না করতে বসে। চার বছরের ছেলে শিশুটি বাবার মতো টাই পরে অফিসে যেতে চায়। শিশুশিক্ষা বিশেষজ্ঞরাই বলেন, শিশুরা নির্দেশ শোনে না; তারা দেখে। আপনি যদি চান আপনার সন্তান বই পড়ুক, তাহলে তার সামনে আপনাকে বই নিয়ে বসতে হবে। সন্তানের সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন স্ক্রল করে আপনি আশা করতে পারেন না, সে অবসরে শেক্সপিয়র বা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পড়ে বিদ্যাদিগ্গজ হবে।
যে বিজ্ঞাপনটির কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তেমন কনটেন্ট এখন হাজার হাজার। চার বছরের ছেলে মাকে বলছে, বাপের বাড়ি এসে তোমার অনেক পাখনা হয়ে গেছে, শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তারপর মজা বুঝবে—এমন ধরনের ভিডিও রিলস না চাইলেও রোজ দেখতে হচ্ছে আমাদের। খুঁজতে হয় না, এমনিতেই দেখা যায়। এসব কনটেন্ট থেকে বাচ্চার বাবা-মায়েরা হয়তো অর্থ উপার্জন করতে পারছেন, বা তাদের শিশুটির জনপ্রিয়তায় নির্দোষ আনন্দই পাচ্ছেন; কিন্তু সেই শিশুটির কিংবা অন্যান্য শিশুদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে কেউই ভাবছে না।
যে তেরো বছরের মেয়েটি আইনি লড়াই করে নিজ সন্তানকে ফিরে পেল, সে নিজেই স্বীকার করেছে, দুই মাস সম্পর্কের পর তাকে ফুসলিয়ে নিয়ে বিয়ে করে সেই বাইশ বছরের ছেলেটি। তাদের পরিচয় হয় সামাজিক মাধ্যমে, যেমন—ফেইসবুক বা টিকটকে। খালুর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া পনেরো বছরের মেয়েটির বিষয়েও জানা গেছে স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ইতিহাস। এই শিশুরা কেউই সম্মতি দেওয়ার উপযুক্ত নয়। তবে টিকটক কিংবা ফেইসবুকে মত্ত থাকতে থাকতে তারা তা ভুলে যায়, তাদের বাবা-মায়েরাও ভুলে যান। টনক নড়ে যখন কোনো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে; কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
স্টিভ জবস, বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ, টিম কুক, ড্রিউ ব্যারিমোর, পেনেলোপি ক্রুজ—এমন আরও অনেক সফল ও জনপ্রিয় মানুষেরা তাদের সন্তানদের সামাজিক মাধ্যম, এমনকি স্মার্টফোন পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেন না। অন্যদিকে আমরা যারা শিশুদের যথাযথ শৈশব, এমনকি তাদের নিরাপত্তা পর্যন্ত ঠিকঠাকভাবে দিতে পারছি না; আমরাই শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে বসে আছি! এতে কিছু কিছু প্রডিজি ধরনের শিশু মিউজিক বা গ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রিতে বড় কোনো আবিষ্কার করে বা অভাবনীয় দক্ষতা অর্জন করে হইচই ফেলে দিতে পারছে হয়তো; কিন্তু সে লাখে একজন। এই ধরনের প্রডিজি শিশু সবসময়ই জন্ম নিত; তারা কোনো সাধারণ উদাহরণ নয়।
অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউএসএ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রিয়া ও ডেনমার্কের মতো রাষ্ট্রগুলো শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ দিয়ে রেখেছে। আমাদের দেশ যেন চলছে উল্টো পথে। শিশুদের ভাইরাল করে হাসিতামাশা বা করুণার পাত্রে পরিণত করা আমাদের এখানে ট্রেন্ড হয়ে গেছে। শিশুদের নিরাপত্তা বিধান দূরের কথা; সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করতে দিয়ে ম্যানুফ্যাকচার্ড কনসেন্ট তৈরি করে তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণ, মাদক, খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের দিকে আমরাই কি ঠেলে দিচ্ছি না? এই ভাইরাল শিশুদের ভবিষ্যৎ কী? এদের বাঁচাবে কে?
উম্মে রায়হানা কবি ও সাংবাদিক। ই-মেইল: ummedotrayhana@gmail.