Published : 11 Sep 2025, 08:14 AM
প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনের রোডম্যাপও ঘোষণা করেছে। তবে নির্বাচনের দিন-তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি এখনও। অবশ্য রাজনৈতিক অঙ্গন ও আমলাতন্ত্রের অন্দরমহলে একটি সম্ভাব্য তারিখ ঘুরছে বলে শোনা যায়। নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং সেই তথ্য সরকার নিজেই প্রচার করছে ফলাও করে।
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। মানুষ কেন যেন এখনও ঠিক আস্থায় নিতে পারছে না যে দেশে একটা সত্যিকারের নির্বাচন হবে। যার কারণে রাজনীতির মাঠে নির্বাচনকেন্দ্রিক আলাপ জোরদার থাকলেও গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে টং দোকানের নির্বাচনি চা এখনও জমতে শুরু করেনি।
এর মানে এই নয় যে জনগণ নির্বাচন চায় না। বরং উল্টো। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সতের বছর ধরে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য একটি সত্যিকারের নির্বাচন অন্যতম প্রধান চাওয়ায় পরিণত হয়েছে। তাহলে কেন এই আশা-আকাঙ্ক্ষার অবণিবনা দৃশ্যমাণ হচ্ছে?
আমাদের মনে আছে, খুবই মনে আছে, গতবছর অগাস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপর নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করতেন, তখন এই অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টাই বেশ ক্ষেপে যেতেন। বলতেন, তারা শুধু নির্বাচনের জন্য সরকারে আসেননি। আরও অনেক দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন, দায়িত্ব শেষ করেই চলে যাবেন। সংস্কার করবেন, বিচার করবেন এবং এগুলো যথাযথভাবে করতে যতটুকু সময় লাগে, ততদিনই দায়িত্বে থাকবেন। এর একদিনও বেশি নয়।
তখন জনগণ অনেকটা আশাহত হয়েছিল। মনে করেছিল, নির্বাচন হয়তো হবে না। কারণ নির্বাচনের বিষয়টি তখন অনেকটাই অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছিল, অন্তত উপদেষ্টাদের কারো কারো কথাবার্তায়।
কিন্তু পরিস্থিতি এখন অন্য রকম। সরকারের আগ্রহ নির্বাচনের প্রতি রয়েছে, তবে জনগণ আর বিশ্বাস করতে চায় না যে নির্বাচন সত্যিই হবে।
জনগণ কেন এমন ভাবছে? এটি শুধু শঙ্কা নয়; এটি দীর্ঘ দিনের অসন্তুষ্টি ও আস্থাহীনতার ফল, যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের বিশ্বাসকে দুর্বল করেছে।
শুধু জনগণই নয়, সরকারও মনে করছে নির্বাচন করাটা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তা না হলে কেন গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেলেন, “নির্বাচন যে করেই হোক ফেব্রুয়ারির (২০২৬ সালের) প্রথমার্ধে হবে। পৃথিবীর কোনো শক্তি এই নির্বাচনকে ঠেকাতে পারবে না।”
এতে মনে হচ্ছে সরকারও জানে যে কেউ না কেউ এই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কারা?
আমাদের সামনে সংবাদমাধ্যম যা উপস্থাপন করছে, তা থেকে বলা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আস্থাহীনতার মূল ধাক্কা এখানেই লুকিয়ে আছে।
বিএনপি আপাতত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে–এই নিশ্চয়তা পেয়েই বেশ খুশি বলে মনে হচ্ছে। যদিও নির্বাচনি জোয়ারে এখনও তারা পুরোপুরি ভাসছে না। দলটি এখনও এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, সামনে-পেছনে দেখছে। সংশয় আছে, হয়তো নির্বাচন নিয়েই এই সংশয়, কিন্তু তা তারা প্রকাশ করছে না।
নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণাকে প্রথমে স্বাগত জানায়নি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ফলে সন্দেহের তীর তাদের দিকেও রয়েছে। জামায়াত বারবার বলছে, পিআর মানে সংখ্যানুপাতিক আসন বিন্যাস ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশে এখনও নির্বাচন করার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। যদিও পরে জামায়াত ফেব্রুয়ারির ভোট নিয়ে তাদের অনাপত্তির কথা বলেছে, তবে পিআর নিয়ে তাদের দাবি থেকে একচুলও নড়েনি।
কিছুদিন আগে মালয়েশিয়া সফরকালে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সেখানে তিনি বলেছেন, “জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির মাধ্যমে আমরা নির্বাচনে (গণপরিষদ) অংশগ্রহণ করতে চাই। এর বাইরে কেনো নির্বাচন হবে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে না।”
এনসিপি অবশ্য বেশ আগ থেকেই বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের আগে তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না।
নাহিদের আগেই, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
তাহলে আসি নির্বাচন নিয়ে সরকারের ভয়ের আলাপে। সরকার বলছে, কেউই নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু যে দুই দল নিজেদের দাবি-দাওয়া সামনে এনে বলছে নির্বাচন হবে না, তারা তো সরকারের কাছের দল। একটি জামায়াতে ইসলামী, অন্যটি এনসিপি।
এনসিপি যে সরকারেরই দল, তা বিভিন্নভাবে প্রতীয়মাণ হয়েছে। তাদের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা, সহায়তা ও ‘খায়েশ’ পূরণের নানা ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়েছে; কখনও কখনও দাবি আদায়ে আন্দোলনের মাঠেও নেমেছে দলটি, কখনও সরাসরি তাদের দাবি মেনে নিয়েছে সরকার।
কিন্তু এখন তারা নির্বাচনের বিপক্ষে। সরকার কি এদিকে ইঙ্গিত করছে যে তারই কাছের দল নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে? এই প্রশ্নই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আস্থাহীনতার মূল দিককে আরও জোরালো করে তুলছে।
সরকার আবার একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করছে। যখনই কোনো জটিল সমস্যা সামনে আসে তখন রাজনৈতিক দলগুলোকে ডেকে একটা বাক্য উৎপাদন করে আর তা হলো, ‘পতিত ফ্যাসিস্টকে ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে’। তো এখন পর্যন্ত সবাই জানে যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবু তারা মাঝে মধ্যে ঝটিকা মিছিল করছে। পুলিশ মিছিলের পর গ্রেপ্তার করে। অবশ্য আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেককেই এর আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। দেশে আটকা পড়েছেন যারা, তারাও রয়েছেন কড়া নজরদারিতে। তবে এটিও কী সরকারকে চিন্তায় ফেলছে? এই গুটিকয়েক বিক্ষিপ্ত মিছিলকেও কি নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাবার মতো যথেষ্ট শক্তি বলে মনে করছে সরকার?
সেনাবাহিনীকে নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার মতো কারণ দেখা যায়নি এখনও। যদিও বেশ কিছুদিন ধরেই অন্তবর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের ‘গুজব’ চাউর রয়েছে। সেটি নির্বাচনকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।
ইতোমধ্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সেই সভার বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রধান উপদেষ্টাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘পুরো সেনাবাহিনী সরকারের সব উদ্যোগ ও কর্মসূচি সফল করতে প্রতিশ্রুতিদ্ধ’। সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য প্রধান উপদেষ্টার ফেইসবুক পাতা থেকেও শেয়ার দেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনীকে এই প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি কেন করতে হচ্ছে? তার মানে হলো নির্বাচন হওয়া না হওয়া নিয়ে যেসব ‘গুজব’ বাজারে নিত্য আসা-যাওয়া করছে তা প্রধান উপদেষ্টা এবং সেনা প্রধানকেও ‘ভোগাচ্ছে’।
তাহলে সরকার নির্বাচন না হওয়া বা বানচাল করার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে যাদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে, তারা কারা? সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকারের উপদেষ্টাদের সাম্প্রতিক প্রতিবাদ, নিন্দা প্রকাশ এবং প্রেস সবিচের নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া দেখে মনে হয়, সরকারের খুব নিকটেই রয়েছে সরকারের প্রতিপক্ষ। যার প্রতি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা পরোক্ষ ইঙ্গিত করে একের পর এক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তবে এই বক্তব্য কাকে উদ্দেশ্য করে তা শুধু জানছে না একটি পক্ষ, আর সে পক্ষটি হলো এদেশের জনগণ। কারণ আপাতভাবে তো জনগণ জানছে কারা এই মুহূর্তে নির্বাচন চাচ্ছে না। এবং তারা সরকারের নিকটজন। তাহলে কী ঝিকে মেরে বউকে শিখাচ্ছে সরকার? নাকি এর মধ্য দিয়ে জনগণকেই বোঝাতে চাইছে যে সরকারের আসলেই সদিচ্ছা আছে নির্বাচন আয়োজনের। কারণ সরকারও বুঝতে পারছে যে নির্বাচনের বিষয়টি জনগণ আমলে নিচ্ছে না এবং আস্থায় জায়গা দিচ্ছে না।
তাহলে সরকারের এই ‘নিশ্চিত’ নির্বাচনের প্রতিজ্ঞা কী জনগণের আস্থা ফেরাতে? যদি তাই হয় তা হলে তো সরকারের প্রতি জনগণের অনাস্থার সূচকগুলো দূর করতে হবে সবার আগে। সেটির দিকেই মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে। আর অদৃশ্য শত্রুকে চিহ্নিত করে বা ইঙ্গিত করে, তাদের প্রতি গুলতি ছোঁড়ে কোনোভাবেই যে সরকারেকর প্রতি আস্থা ফেরত আনা যাবে না সেটিও সরকারকেই বুঝতে হবে।