Published : 29 Mar 2026, 11:58 AM
ডনাল্ড ট্রাম্পের সামনে ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুটি বিকল্প রয়েছে, হয় তাকে একটি ত্রুটিপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত রণাঙ্গন ছাড়তে হবে, নয়তো সামরিক শক্তি বাড়িয়ে এমন এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ঝুঁকি নিতে হবে যা তার প্রেসিডেন্সিকেই ধসিয়ে দিতে পারে। যুদ্ধবিরতির জন্য যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, ইরানের দিক থেকে নির্ধারিত ওই সময়ের মধ্যে চুক্তিতে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। চুক্তি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবের মধ্যেই যে ইরানে মার্কিন স্থল হামলার প্রস্তুতি চলছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যুদ্ধে কৌশলগত এই টানাপোড়েন শুরুর আগেই ট্রাম্প নজর দিয়েছিলেন ইতিহাসের লড়াকু জাতি কুর্দিদের ওপর। স্থল হামলায় মূলত কুর্দিদের ‘প্রতিরক্ষামূলক ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে ইরানকে কাবু করাই ছিল তার ওই পরিকল্পনার অংশ।
তবে এবারের প্রেক্ষাপট একেবারে ভিন্ন। ইরানের পক্ষ হয়ে ইয়েমেনের হুতিরা যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়েছে। কুর্দিরা হতে পারত আমেরিকা ও ইসরায়েলের ভরসা। কিন্তু তারা যুদ্ধে জড়াতে নারাজ। অতীতে একাধিকবার পশ্চিমা মিত্রদের দ্বারা ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা কুর্দিদের আরও সতর্ক করে দিয়েছে। কুর্দি নেতারা এবার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধের পক্ষ হয়ে নিজেদের পাহাড়ের একচ্ছত্র স্বাধীনতা বিসর্জন দেবেন না। পুরনো ফাঁদে পা না দেওয়ার এই দৃঢ় অবস্থান মার্কিন রণকৌশলকে এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এবারের যুদ্ধে ভাড়াটে শক্তির ভরসায় পার পাওয়া আমেরিকার জন্য প্রায় অসম্ভব।
এমন জটিল পরিস্থিতির দিকে তাকালে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কুর্দি আসলে কারা? আর ট্রাম্প কেন ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে তাদেরকে মাঠে নামাতে চাইছেন? যুদ্ধে কুর্দিদের কেন এই অনিচ্ছা? এই অবিশ্বাসের কারণ কি? এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের বঞ্চনা ও বারবার প্রতারিত হওয়ার ইতিহাসের দিকে। কুর্দিদের এই দীর্ঘ ইতিহাস মূলত এক মরীচিকার পেছনে ছোটার গল্প, যেখানে রাষ্ট্রহীন এই জাতি বারবার পরাশক্তিদের স্বার্থের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
কুর্দিরা নিজেদেরকে প্রাচীন ‘মিডস’ জাতির উত্তরসূরি মনে করে এবং পাহাড় থেকে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে। শেষপর্যন্ত পাহাড়ই তাদের একমাত্র বন্ধু হিসেবে থেকে যায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালের সেভ্রেস চুক্তি ছিল কুর্দিদের জন্য আশার আলো। ওই চুক্তিতে তাদের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তুরস্কের নতুন নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক যখন ওই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করলেন, তখন পরাশক্তিগুলো রাতারাতি তাদের অবস্থান বদলে ফেলে।
১৯২৩ সালের লুসান চুক্তিতেও কুর্দিদের স্বাধীন আবাসভূমির বিষয়টি ইতিহাসের ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। চার থেকে পাঁচ কোটির এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করে রাখা হয়। এখন তাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে পুঁজি করে এক শতাব্দী ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে টিকে থাকার লড়াই করার পরও তারা কেন বারবার অন্যদের স্বার্থের বলি হবে?
কুর্দিদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে জন্ম নিয়েছে পিকেকে, পিজেএকে কিংবা সিরিয়ার ওয়াইপিজির মতো সশস্ত্র সংগঠন। তাদের সংগ্রাম কি হারিয়ে গেছে? এমন প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই, কারণ এই লড়াই রীতিমতো তাদের রক্ত আর মাংসে মিশে গেছে।

পেশমার্গা যোদ্ধারা (যাদের নামের অর্থ ‘মৃত্যুকে আলিঙ্গনকারী’) কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ওই বীরত্বের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছ থেকে তারা কী পেয়েছে?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তারা স্বাধীনতার স্বাদ পেতে চেয়েছে। ১৯৪৬ সালে সোভিয়েত সহায়তায় ইরানের মাহাবাদে গঠিত ছোট কুর্দি প্রজাতন্ত্রের আয়ু ছিল মাত্র ১১ মাস। সোভিয়েতরা স্বার্থ আদায় করে পিছু হটতেই ইরানি বাহিনী ওই প্রজাতন্ত্রকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয় এবং কুর্দি নেতা কাজী মুহাম্মদকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়। ওই থেকে কুর্দিরা শিখেছে, পরাশক্তিদের স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে তারা মিত্রদের ছুঁড়ে ফেলতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করে না।
কুর্দিদের সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা ঘটে ১৯৭৫ সালে, যা আজও তাদের জনমনে গভীর ক্ষত হয়ে আছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও ইরানের শাহের প্ররোচনায় ইরাকি কুর্দিরা সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন ভূমির আশায়। কিন্তু ‘আলজিয়ার্স চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের সহায়তা বন্ধ করে দেয়। ফলে সাদ্দামের বাহিনী হাজার হাজার কুর্দিকে হত্যা করার সুযোগ পায়। ওই সময় কিসিঞ্জার দম্ভের সঙ্গে বলেছিলেন, “গোপন অভিযানকে মিশনারি কাজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।”
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় ২০১৯ সালে, যখন ডনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে হঠাৎ মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে কুর্দিদেরকে তুরস্কের কামানের মুখে ঠেলে দেন। মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড জুকিনো তখন বলেছিলেন, “মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের গ্রিন বেরেটরা তাদের মিত্রদের এভাবে ফেলে আসতে গিয়ে নিজেরাই লজ্জিতবোধ করছিলেন।”
পরাশক্তির স্বার্থের খেলায় বারবার দাবার গুটি হওয়ার ক্ষত কুর্দিদের আজ এক কঠিন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দান করেছে। অতীতের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা বুঝেছে, এই অস্থির সময়ে অন্যের হয়ে অস্ত্র ধরার চেয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানই তাদের আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
কুর্দিদের বীরত্বের এক আধুনিক অধ্যায় হলো আইএসের (ইসলামিক স্টেট) বিরুদ্ধে তাদের রক্তক্ষয়ী লড়াই। ২০১৪ সালে আইএস যখন মধ্যপ্রাচ্য গ্রাস করতে এসেছিল, তখন কুর্দি যোদ্ধারাই কোবানি শহরে তাদের গতিরোধ করে এবং শেষপর্যন্ত জয়ী হয়। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের গবেষণায় বলা হয়েছে, আইএসের খিলাফত ধ্বংস করতে কুর্দিরা মূল পদাতিক বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের রক্ত শুকানোর আগেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়। কোবানির ওই বীরত্ব আজ কুর্দিদের জন্য এক দীর্ঘশ্বাস। তারা বুঝে গেছে; যুদ্ধ শেষ হলে তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তখন তারা আর মিত্র থাকে না, বরং দায় হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা বাংলাদেশিরা স্বাধীনতার কষ্ট ও ত্যাগের মূল্য বুঝি। কিন্তু কুর্দিদের কাছে ওই স্বাধীনতা যেন এক মরীচিকা—বারবার কাছে এসেও দূরে সরে যায়। ট্রাম্পের এবারের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার পেছনে সম্ভবত তাদের এই গভীর বোধ কাজ করছে যে, তারা আর কারও দাবার গুটি হতে চায় না।
ইরানের কুর্দিদের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ ও রক্তপাতময়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে কুর্দিরা আয়াতুল্লাহ খোমেনির পাশে দাঁড়িয়েছিল স্বায়ত্তশাসনের আশায়। কিন্তু কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (কেডিপিআই) ওই স্বপ্ন ধুলিসাৎ হতে বেশি সময় লাগেনি। খোমেনি কুর্দিদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন এবং বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায়।
সাদ্দাম হোসেনের আমলে হালাবজায় রাসায়নিক হামলায় কয়েক ঘণ্টায় পাঁচ হাজার কুর্দি নারী ও শিশু মারা যায়। ওই বিভীষিকা আজও কুর্দি জনপদে শোকের ছায়া ফেলে।

ইরানে কুর্দিদের ওপর দমন-পীড়ন কখনো থামেনি, বরং আরও কঠোর হয়েছে সময়ের সঙ্গে। ২০২২ সালে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কুর্দি এলাকাগুলো। বিক্ষোভ প্রশমনে সেখানে দমন-পীড়ন ছিল অত্যন্ত নৃশংস।
কুর্দিস্তান হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্কের (কেএইচআরএন) রিপোর্ট অনুসারে, ইরানের কারাগারে কুর্দি বন্দিদের ওপর জাতিগত পরিচয়ের কারণে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। মাশা আমিনির মৃত্যু যেন ছিল এক শতাব্দীর জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
অথচ, ২০২৬ সালে ট্রাম্প ওই ক্ষোভকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চাইছেন। কিন্তু কুর্দিরা এবার আর কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয়। তারা জানে, মার্কিন স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেলে তাদেরকে একাই তেহরানের কামানের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
এই সংকটময় মুহূর্তে কুর্দিদের নিরপেক্ষ অবস্থান আসলে তাদের অর্জিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ। তারা এখন ট্রাম্পের ফোনের অপেক্ষায় নেই, বরং দেখছে কীভাবে নিজেদের জনগণকে এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ থেকে রক্ষা করা যায়।
এই যুদ্ধ হয়তো একদিন শেষ হবে, অনেক মানচিত্র বদলে যাবে। কিন্তু কুর্দিরা কি তাদের কাঙ্ক্ষিত অধিকার পাবে? পরাশক্তিদের বন্ধুত্ব সাময়িক ও স্বার্থচালিত। আর একটি জাতির অস্তিত্বের লড়াই চিরন্তন। কুর্দিরা আজ ট্রাম্পের ফাঁদ এড়িয়ে পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় আশ্রয় নিয়েছে। এই নীরবতা আসলে এক শতাব্দীর বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে তাদের সরব প্রতিবাদ।
কুর্দিদের এই রাষ্ট্রহীন সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পৃথিবী আজও কতটা নির্মম ও অসম। আজ তারা মিত্র হতে অস্বীকার করে প্রমাণ করেছে, বারবার প্রতারিত হয়ে তারা কতটা ক্লান্ত।
পাহাড়ের নির্জনতা হয়তো তাদের স্বাধীনতা দিতে পারবে না, তবে অন্তত পরাশক্তিগুলোর হয়ে প্রাণ দেওয়ার দায় থেকে মুক্তি দেবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই মরুভূমিতে শান্তির মরীচিকা কোনোদিন সত্য হবে না, যদি না কুর্দিদের মতো বড় জাতিগোষ্ঠী তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পায়।
কুর্দিদের এই নীরব অভিমান ও পাহাড়ে ফিরে যাওয়া বিশ্ববিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে থাকবে। সামনের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন দিকে যায় তা দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট, কুর্দিরা আর কারও স্বার্থে নিজেদের রক্ত ঝরাতে রাজি নয়। তাদের এই নিরপেক্ষতা এক শতাব্দীর রক্ত ও চোখের জলে কেনা অমূল্য শিক্ষা।