Published : 29 Apr 2026, 06:45 PM
ইরানের বিপক্ষে যুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করতে না পেরে ডনাল্ড ট্রাম্প দেশটিতে নারকীয় তাণ্ডবলীলা চালানোর জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। তিনি হুমকি দিচ্ছেন, ইরান নিঃশর্তে তার পায়ে লুটিয়ে না পড়লে দেশটিকে প্রস্তর যুগে ফেরত পাঠাবেন কিংবা পুরো সভ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবেন। এই বাস্তবতায় যেকোনো মুহূর্তে তিনি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারেন।
ট্রাম্পের কথা ও কাজ ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আঞ্চলিক শান্তির চরম ক্ষতি করেছে। ইরান যুদ্ধে শামিল হওয়ার পেছনে ট্রাম্পের অভিনবত্ব ছিল, তবে যুদ্ধটা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল না। তিনি প্রেসিডেন্সির দ্বিতীয় মেয়াদে আগের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যুদ্ধ না করার নীতি থেকে সরে আসেন। আর এই সরে আসা তুলে ধরে, আমেরিকার অভ্যন্তরে কিংবা বহির্বিশ্বে সবখানেই তিনি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে ইচ্ছুক। অথচ যুদ্ধের এতদিন পরেও তিনি ইরানকেই মাথা নোয়াতে বাধ্য করতে পারেননি, দেশটি নিজস্ব লক্ষ্যে অবিচল।
ট্রাম্প এখন এমন বিশ্বাসে চলেন যে, তার মনোবাসনা পূরণে যারাই দেয়াল তুলতে চাইবে বা কাঁটা বিছাবে, তাদের ভাগ্যে জুটবে নজিরবিহীন শাস্তি। যেমনটি একসময় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাজুড়ে করেছে। তবে এই গোয়ার্তুমি বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার তেলেসমাতি হঠাৎ করে আকাশ থেকে উদয় হয়নি। এই বিকৃত চর্চা আমেরিকার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্যেই নিহিত ছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি ধারাবাহিক প্রবণতা হলো হুকুম অমান্যকারীদের ওপর দণ্ড আরোপ করা এবং খাণ্ডবদাহন চালানো।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় আমল

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পূর্বেও ট্রাম্প রক্ত নিয়ে হোলি খেলতেন। সেই সাক্ষ্য জমা আছে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে, তিনি ক্যাপিটল ভবন এবং রাষ্ট্রপতির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সাংবিধানিক আইনের ওপর মব উসকে দেন।
এখন তিনি সামরিক ও রাজনৈতিক অস্ত্রের দ্বারা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা এবং জাতিসংঘ পরিচালিত বহুপাক্ষিক কাঠামোকে ধরাশায়ী করছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি গোপন অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা থেকে তুলে আনেন। আবার ক্যারিবিয়ান এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে শুরু করেছেন মাদক পাচার বিরোধী তথাকথিত অভিযান। ওইখানে ইতিমধ্যে ৫০টি হামলাতে ১৬৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
এই দ্বিতীয় আমলে ট্রাম্প দুনিয়া ছারখার করার ফন্দি আঁটছেন। বিশ্ব বাণিজ্যের নেটওয়ার্কে আঘাত হানা, কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার চেষ্টা এবং বারবার ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের জোটসঙ্গীদের হেয় করা, তারই ইঙ্গিত বহন করে।
দেশের ভেতরেও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালানো থেকে ট্রাম্প বিরত থাকেননি। তিনি কংগ্রেসের অনুমোদিত অনেক সংস্থা ও তহবিল কলমের এক খোঁচায় বাতিল করে দেন। এর মধ্যে Environmental Protection Agency (EPA) এবং National Institutes of Health (NIH)-এর প্রায় ৫,৮০০টি গবেষণা প্রকল্পও ছিল। অথচ এসব কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মার্কিন সুশীল সমাজে কোনো সংশয় নেই।
ট্রাম্প প্রশাসন বেসরকারি খাত এবং শিক্ষাঙ্গনে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে, অর্থ্যাৎ আক্ষরিক অর্থেই হোয়াইট হাউসের পূর্ব দিকটা তিনি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন।
আমেরিকান শিকড়
আমেরিকার শত বছরের ইতিহাসটাই ধ্বংসাত্মক ইতিহাসের সাক্ষী এবং এর সঙ্গে অন্তত দুটি জটিল বাস্তবতা যুক্ত।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিমণ্ডলে একটি স্পষ্ট দ্বৈততা দীর্ঘদিন ধরে উপস্থিত। একদিকে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সামাজিক কল্যাণের মতো উচ্চ আদর্শের প্রচার-প্রোপাগান্ডা, অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষমতালিপ্সার স্বার্থপর অথচ নিরঙ্কুশ তাগিদ।
দ্বিতীয়ত, আমেরিকা তিনশো বছর ধরে আটলান্টিক পাড়ে এক শক্তিশালী জাতি গঠন করেছে। পরবর্তীতে, এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়েছে। সবশেষে, অর্থনৈতিক, সামরিক এবং সাংস্কৃতিক পরাশক্তি আকারে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশটির উত্থান ঘটেছে। আর সময়ে সময়ে একই ধ্বংসাত্মক চরিত্র এবং নারকীয় তাণ্ডবলীলা বার বার মাটি ফুঁড়ে বের হয়েছে। সেই বিস্তৃত প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের মতো খেপাটে শাসকদের আচরণ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
আমেরিকার ধ্বংসলীলার অগুনতি দৃষ্টান্তের অন্যতম ছিল, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব জাহির করা। শেতাঙ্গ উপনিবেশবাদীরা জমি ও সম্পদের লোভে আদিবাসীদের সঙ্গে সর্বদা সমঝোতা ও দমনের পথ বেছে নিয়েছিল। যখন জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত করা বা সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে বন্দি রাখা যথেষ্ট মনে হয়নি, সেসময় কামান দাগিয়ে ও বন্দুক উঁচিয়ে আদিবাসীদের নির্মূল করেছে।

আমেরিকার ইতিহাসে এ ধরনের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অ্যাপালাচি গণহত্যা (ফ্লোরিডা, ১৭০৪), স্যান্ড ক্রিক গণহত্যা (কলোরাডো, ১৮৬৪) এবং উন্ডেড নি গণহত্যা (সাউথ ডাকোটা, ১৮৯০)। এ ছাড়া আরও অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ১৪৯২ সালে আমেরিকায় প্রায় পঞ্চাশ লাখ আদিবাসী বাস করত, যা ১৯০০ সালের মধ্যে কমে প্রায় তিন লাখে নেমে আসে। একই ধরনের ঘটনা কানাডা, মেক্সিকো এবং বৃহত্তর লাতিন আমেরিকাতেও ঘটেছে। যুগ যুগ ধরে এরকম নির্মম ঘটনা সংঘটনের দ্বারা আমেরিকা ভারাক্রান্ত অর্থ্যাৎ ট্রাম্পের নারকীয় ধ্বংসাত্মক মানসিকতার পেছনে আমেরিকান শিকড়ের ছাপ সুস্পষ্ট।
দাস এবং মুক্ত মানুষ
কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী উদাহরণ; তাদের ওপর একদা বিশ্বের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল। তাই কালো দাসদের অভিজ্ঞতা ও তাদের বংশধরদের ইতিহাস রক্তে রঞ্জিত হওয়ার ইতিহাস।
ওই দমন-পীড়নের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, সে সময় শ্বেতাঙ্গদের গড় আয়ুর তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গদের গড় আয়ু ছিল অর্ধেকের কম। স্বাধীনতা পাবার পরেও রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনের ফাঁকফোকরে কালোদের জীবন বিপদগ্রস্থই ছিল। তুলসা গণহত্যার কথা ভাবা যাক, ঘটনাটি ১৯২১ সালের। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের ভিটাবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য পুড়িয়ে দেয়, রাতারাতি ধ্বংস হয় কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলো। বিস্তৃত পরিসরজুড়ে এই অসভ্যতা চলতে থাকে।

সময়টা ছিল ১৮৮০ ও ১৯৬৮-এর মাঝামাঝি, বন্দুকের গুলি ও ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে কালো মানুষদের হত্যা করার মহোৎসব চলছিল। ঠিক সেসময় ছিল তথাকথিত শেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ সম্পর্কের পুনর্গঠনোত্তর কাল।
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ দুনিয়ার ইতিহাসে ভয়াবহ নিদর্শন হয়ে ওঠে, কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায় ছিল মূল লক্ষ্যবস্তু। হিসাব অনুসারে, ওই যুদ্ধে প্রদেশ ও ইউনিয়ন মিলিয়ে প্রায় সাত লাখ মানুষ নিহত হয়। এভাবে আমেরিকার ইতিহাসজুড়ে কালো মানুষরাই ছিল সাদা আমেরিকানদের তাণ্ডবলীলার শিকার।
বহির্বিশ্বে ধ্বংসযজ্ঞ
মার্কিন শক্তি বিংশ শতাব্দীতেও বহির্বিশ্বে অনেকগুলো ধ্বংসাত্মক ঘটনাতে যুক্ত ছিল। তার কয়েকটা আমাদের জীবদ্দশায় ঘটেছে।
১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সাল, দখলকৃত ফিলিপাইনে বিদ্রোহ দমনে থিওডোর রুজভেল্ট খড়গহস্ত। এই যুদ্ধে এক লাখ বিশ হাজার মার্কিন সৈন্য হাজির ছিল, এর মধ্যে চার হাজার ৩০০ আমেরিকান সৈন্য এবং ২০ হাজার ফিলিপাইনি বিদ্রোহী নিহত হয়। দুই লাখ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এরিয়া বোম্বিং অভিযান ছিল ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মহারণ। মার্কিন বাহিনী শিল্পাঞ্চল ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, যাতে শত্রুপক্ষের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অভিযানটি প্রাথমিকভাবে ১৯৪৫ সালে ড্রেসডেন ও টোকিওর মতো শহরগুলোতে ফায়ারবোম্ব হামলা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার মাধ্যমে তীব্র আকার ধারণ করেছিল।
ভিয়েতনামে এজেন্ট অরেঞ্জ অভিযানে রাসায়নিক ব্যবহার করে পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। মাই লাই গণহত্যা ছিল ১৯৬০-এর দশকে ছিল অন্য আরেকটি আমেরিকান তাণ্ডব।
ইরাক যুদ্ধের হতাহতের পরিসংখ্যানে প্রায় চার হাজার ৫০০ জন আমেরিকান সেনা এবং দুই লাখ ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়।
কোনো লাগাম নেই
সারাবিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীগুলো আমেরিকার দীর্ঘ নির্মমতার শিকার এবং বিস্তৃত বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ইতিহাসের নানা কালপর্বে দেশটি নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পসরা সাজিয়েছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যের সেই অন্ধকার দিনগুলোতেও মার্কিন নেতৃত্ব ও নাগরিকরা কিছু আদর্শ চর্চা করেন। যেমন, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, যুদ্ধ আইন মানা এবং শান্তির জন্য সামরিক নিরাপত্তা তৈরি করা।
যদিও আমেরিকানরা এসব বিষয় হুবহু বাইবেলের মতো মেনে চলেছে, এমন দাবি অবান্তর। তবে দেশের অভ্যন্তরে এক প্রকার নৈতিক লাগাম টানা ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে ওই লাগামগুলো কতটা শক্তিশালী?
এখন ট্রাম্পের কথার ফুলঝুড়ি এবং উল্টাপাল্টা ও বিবেক বর্জিত কর্মকাণ্ডের কাছে মার্কিন নৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শগুলো অনেকটাই সংকটে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ও সিনেটের স্বৈরাচারী প্রবণতা থেকে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটিই আজ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।
অথচ এই প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে, রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার তুলনায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অনেকটাই মামুলি মনে হবে।
লেখাটি এশিয়া টাইমস থেকে অনূদিত; এর লেখক রোনাল্ড ডব্লিউ. প্রুসেন টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক। তার গবেষণা ও শিক্ষাদানের মূল আগ্রহের বিষয় হলো বিংশ শতাব্দীর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। তিনি আমেরিকা-সোভিয়েত শীতল যুদ্ধ, মার্কিন-চীন সম্পর্ক ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করছেন। মূলত ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করাই তাঁর কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য।