Published : 05 May 2026, 08:08 AM
যে বঙ্গে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম দুর্গের পতন ঘটিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেই পশ্চিমবঙ্গের মাটিই কি শেষ পর্যন্ত সরে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ের তলা থেকে? টানা ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে এখন উড়ছে গেরুয়া নিশান। এই পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং ভারতের রাজনীতির ইতিহাসের এক বিস্ময়কর বাঁক।
প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মাত্র এক দশক আগে ২০১৬ সালে যেখানে মাত্র তিনটি আসনে জয়ী হয়ে রাজনীতির হালখাতা খুলেছিল, সেই দলটির জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক অভাবনীয় সাফল্য।
অবশ্য ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি আসন পাওয়া বিজেপি যে এবার আগের চেয়ে ভালো ফল করবে, তা অনুমেয় ছিল। সে বছর বহু আসনে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই হয়েছিল; তৃণমূল যেসব আসনে জয়ী হয়েছিল, তার অনেকগুলোতেই ব্যবধান ছিল অল্প। কিন্তু রাজ্যের রাজনীতিতে হিসাব-নিকাশ বদলে দেওয়া এই দলটি যে মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে এমন এক ভূমিধ্বস বিজয় ছিনিয়ে আনবে, তা হয়তো অতি বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে।
কিন্তু কীভাবে এল এই ভূমিধ্বস বিজয়? কী ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় দুর্গে পতন ঘটানো এমন জয়ের মূল কারণ?
ভোটারের নাম ‘এসআইআর’
এই ভোটকে সামনে রেখে গত বছরের শেষ দিকে হঠাৎ ভোটার তালিকার একটি বিশেষ শুদ্ধিকরণ অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়, যা সংক্ষেপে ‘এসআইআর’ নামে পরিচিত। এসআইআর এমন একটি অ্যাপভিত্তিক প্রক্রিয়া, যা ভোটার তালিকা থেকে নানা ভুলভ্রান্তি শনাক্ত করে এবং সন্দেহজনক ভোটারদের বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।
প্রথম দফায় প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভোটারের মধ্যে থেকে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়। এটি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক অসন্তোষ। রাজনৈতিক দলগুলোও বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে। দেখা যায়, শুধুমাত্র নামের বানান ভুল বা সামান্য তথ্যগত অসঙ্গতির কারণেও অনেক বৈধ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন।
এরপর শুরু হয় আপিল প্রক্রিয়া। নিজেদের নাম তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে মানুষ হন্যে হয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ছুটতে থাকে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। নানা যাচাই-বাছাই শেষে বাদ পড়ার সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৫১ লাখে!
চূড়ান্তভাবে বাদ পড়া এই ৫১ লাখ ভোটারের মধ্যে মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুর—এই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলোতেই প্রায় ১৬ লাখ নাম বাদ পড়েছে বলে দেখা যায়। এসব নাম এবারের ভোটে প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
এর পাশাপাশি আরও একটি বিষয় আলোচনায় আসে—ভোট না দিলে নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা বা প্রচারের কারণে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক অংশগ্রহণের প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপির বাইরে বাকি দলগুলো যে এ নিয়ে কোনো কার্যকর প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারেনি, এটিও পরাজয়ের একটি বড় কারণ।
মুসলমান ভোটারদের ওপর অতি নির্ভরতা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে মুসলিম ভোটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতাকে দায়ী করা হচ্ছে। অভিযোগ আছে, তিনি মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। এর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ, সামাজিক সুরক্ষামূলক নানা কর্মসূচি, মসজিদ সংস্কার ও সম্প্রসারণে সহায়তা এবং ইমামদের জন্য ভাতা চালুর মতো উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এসব কর্মসূচির প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে ভোটব্যাংকে প্রতিফলিত হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, যেটি আবার হিন্দু ভোটারদের নাখোশ করেছে। অতীতের কোনো কোনো ভোটে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ মুসলিম ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীদের পক্ষে গেছে।
তবে এবারের ভোটে সেই সমীকরণে পরিবর্তন হয়ে গেছে। শুধু মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্য করে গত কয়েকে বছরের মধ্যে নতুন দুটি রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবং মুর্শিদাবাদের প্রাক্তন তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীরের গঠিত আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি)।
ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী ২০২১ সালে আইএসএফ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তার ছোট ভাই নওশাদ সিদ্দিকী দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নওশাদ দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় আসন থেকে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
এজেইউপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় এক বিশাল জনসভার মাধ্যমে তিনি এই নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর হুমায়ুন কবীর এই নিজস্ব রাজনৈতিক মঞ্চটি গড়ে তোলেন।
হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে অযোধ্যায় ধ্বংস করা বাবরি মসজিদের আদলে একটি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দেন এবং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে। হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় কংগ্রেসের হাত ধরে। ২০১১ সালে তিনি কংগ্রেসের টিকিটে রেজিনগর থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হন। ২০১৫ সালে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি কিছুকাল কংগ্রেসে থাকলেও ২০১৮ সালে মুকুল রায়ের হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১৯ সালে বিজেপির হয়ে মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে লড়ে পরাজিত হওয়ার পর ২০২০ সালে আবারও তৃণমূলে ফেরেন এবং ২০২১ সালে ভরতপুর থেকে বিধায়ক হন। তবে দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় ২০২২ সালে তিনি দ্বিতীয়বার তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হন। এবার তিনি নিজের দলের ব্যানারে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও নওদা—এই দুটি আসনেই বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
নওশাদের আইএসএফ বামদের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা করলেও হুমায়ুনকে লড়তে হয়েছে একা। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এই দুটি দল কার্যত বিজেপির পরোক্ষ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে, যাদের লক্ষ্য মুসলিম ভোটারদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা। এই প্রক্রিয়ায় তারা যে সফল, সেটি স্পষ্ট। এবারের ভোটে প্রধান চার দলের বাইরে ‘অন্যান্য’ বা নির্দলীয় প্রার্থীরা যে প্রায় ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই দুটি দলের দিকে গেছে বলে পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে।
রাজনীতির হিন্দুত্ববাদ
একদিকে যখন মুসলমান ভোটে ভাঙন ধরানো সম্ভব হয়েছে, ঠিক উল্টো দিকে হিন্দু ভোটারদের ভোটের মেরুকরণ (কনসলিডেশন) ছিল চোখে পড়ার মতো। মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দুই মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান এবং কোচবিহারের মতো জেলাগুলোতে সংখ্যালঘু ভোটারদের মেরুকরণ থাকায় বিজেপি হিন্দু ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছে। শুধু এবারের বিধানসভা ভোটেই নয়, এই মেরুকরণের ফলে গত কয়েকটি ভোটেই হিন্দু ভোট বিজেপির ব্যালটে পড়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার দল এই মেরুকরণ ভাঙতে পারেননি। বরং মালদহ, মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন অংশে নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেই মেরুকরণের আবহ আরও তীব্র হয়েছে। যেমন—হুমায়ুন কবীরের বাবরি মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের কথা বলেছি। এখন একটি দল যদি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে যায়, তখন তারা জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর সঙ্গে উপমহাদেশের রাজনীতিতে ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করতে থাকা ধর্মের প্রভাব তো আছেই, যেখানে বিজেপির রাজনীতির প্রধান অস্ত্র হিন্দুত্ববাদ। দিলীপ ঘোষের মতো প্রবীণ রাজনীতিকরা প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘ভারত হিন্দুদের দেশ, এখানে হিন্দুরাই শাসন করবে।’ এসব বক্তব্য যে সাধারণ ভোটারদের মানসপটে গভীরভাবে গেঁথে গেছে, তা তো নির্বাচনি ফলাফলেই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটে বাংলাদেশ?
ধর্মীয় মেরুকরণের প্রসঙ্গ থেকেই বারবার উঠে আসে বাংলাদেশের নাম। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছে, যাদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটব্যাংক হিসেবে লালন-পালন করছেন। বিজেপির এই দাবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবর উড়িয়ে দিলেও নানা সমীক্ষায় দেখা গেছে, মুসলমান ভোটের বড় অংশ তৃণমূলের পক্ষে যায়—যা রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
এরই মধ্যে বাংলাদেশে ৫ অগাস্টের ঘটনাবলি সামনে আসে, যখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি এমন কিছু বক্তব্য দিতে থাকেন, যা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এর মধ্যে ‘চিকেন নেক’ দখল করে ফেলা, ফারাক্কার সামনে আরেকটি বাঁধ নির্মাণ, কলকাতা দখল করা—এ ধরনের উসকানিমূলক মন্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া অন্তত হাজারেরও বেশি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা এই বিতর্ককে আরও জিইয়ে রাখে।
দীপু চন্দ্র দাসকে পুড়িয়ে মারার ঘটনার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। দুই দেশের দূতাবাসগুলোতে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা দিতে পারবে না জানিয়ে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেয় ভারত। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অজুহাত হিসেবে নিরাপত্তার ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসে। দুই দেশের ভিসা আদান-প্রদান ও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ভারতের বিভিন্ন শহরে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের সামনে বিজেপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো বিক্ষোভ-মিছিল করে।
এর মধ্যেই বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াতে ইসলামী অভাবনীয় সাফল্য পায়। এই ফলাফলকে বিজেপি তাদের নির্বাচনি প্রচারে ভারতের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে। একাধিক জনসভায় পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী বিস্তারিতভাবে তার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তৃণমূল জিতলে ভারতের সার্বভৌমত্ব কীভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এই সব বক্তব্য ভোটারদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, যার প্রতিফলন ব্যালট বাক্সেও দেখা গেছে বলে অনেকে মনে করেন। তাই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশ যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপাদান হয়ে উঠেছিল, তা বলাই বাহুল্য।
অতিমাত্রায় মমতা নির্ভরতা
টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে গোটা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস ক্রমেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-নির্ভর হয়ে পড়েছে—এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত। কালীঘাটের পাশে ছোট একটি ঘরে একা বাস, সাদা শাড়ি ও চটি জুতায় সরল জীবনযাপন—এই চিত্রে তিনি নিজেকে নির্লোভ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হলেও, দলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে ওঠা বড় আকারের দুর্নীতির অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হয়ে আছে।
বিশেষ করে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী অর্পিতা মুখার্জির বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনা রাজ্যজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। এই ঘটনাকে ঘিরে বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে যে, দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও দলকে ‘পারিবারিকীকরণ’-এর অভিযোগ উঠে এসেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দলীয় প্রধান, তখন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেকের বিরুদ্ধেও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। লোকমুখে এমন কথাও শোনা যায় যে, কালীঘাট সংলগ্ন বহু ফ্ল্যাট নাকি মমতার নিকটাত্মীয়দের মালিকানায়—যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রমাণ জনসমক্ষে নেই, তবুও রাজনৈতিক আলোচনায় বিষয়টি ঘুরেফিরে আসে।
এই প্রসঙ্গে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর একটি সাক্ষাৎকারের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি মমতাকে ভারতের সেরা রাজনীতিকদের একজন হিসেবে উল্লেখ করলেও, পরক্ষণেই আবার বলছেন যে, মমতার আশপাশের প্রায় সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত। এমন ধারণা জনমনে মমতা সম্পর্কে দ্বৈত ধারণা তৈরি করেছে, ফলে আস্থায় চিড় ধরেছে বহুদিন থেকেই।
দলের সমস্ত ভার এককভাবে নিজের কাঁধে নিয়ে দলকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েছেন। তার প্রাক্তন সহযোদ্ধা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই চাপকে আরও দৃশ্যমান করেছে। সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভর কাঠামো দলীয় নেতৃত্বের বিস্তারকে সীমিত করেছে এবং এর রাজনৈতিক মূল্যও দলকে দিতে হয়েছে।
ভাতা দ্বিগুণ করার ঘোষণা বিজেপির
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ভাতা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি। বিজেপি ঘোষণা দেয় যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অধীনে যেসব ভাতা দেওয়া হয়, তারা ক্ষমতায় এলে সেসবের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দেবে। এই ঘোষণা বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
উদাহরণস্বরূপ, একটি পরিবারে চারজন সদস্য থাকলে, জনপ্রতি দেড় হাজার টাকা হিসেবে মোট ৬ হাজার টাকা পাওয়া যায়। বিজেপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সেই পরিবার একই হিসেবে ১২ হাজার টাকা পাবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারগুলোর জন্য এই অঙ্কটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আর্থিক প্রতিশ্রুতি ভোটারদের ওপর দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছিল এবং বিজেপির নির্বাচনি প্রচারণায় এটি কার্যকর একটি উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। তাছাড়া বিজেপির কেন্দ্রে যে সরকার, রাজ্যে সেই সরকার—এমন সম্ভাবনা এবং রাজ্যে ব্যাপক বেকারত্ব মমতার প্রতি বিমুখতার বড় কারণ।
মমতার যাবার সময় হলো?
নির্বাচনে পরাজিত হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদ থেকে ছিটকে পড়েছেন। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা দল গঠন করে যিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নিজেকে এক ‘লৌহমানবী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই মমতা নিজেও হেরে গেছেন। হারের পর বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ থেকে শুরু করে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে গণনা কেন্দ্র ত্যাগ করার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যে দাপটের সঙ্গে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ জয় করল এবং উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের যে প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, তাতে কি মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে?
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি আর ভারতের রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন? নাকি এর মধ্য দিয়েই এই বর্ষীয়ান রাজনীতিকের ‘রাজনৈতিক সন্ন্যাস’ দেখে ফেলল ভারতবর্ষ? ভবানীপুর আসনে মমতাকে পরাজিত করার পর শুভেন্দু অধিকারী হিন্দিতে এমনটাই দাবি করেছেন।
অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামটির সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই ও প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তাই শুভেন্দু অধিকারী যতই দম্ভোক্তি করুন না কেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিষয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি। এই পরাজয় আসলেই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের যবনিকাপাত, নাকি কোনো নতুন প্রত্যাবর্তনের শুরু—তা সময়ই বলবে।