Published : 01 Dec 2011, 11:37 AM

এবার উপহাসের পাত্র কারা হলেন? যদি বলি সরকারের নীতি নির্ধারক মহল, একটুও ভুল হবে না। ঝলক ধানের ক্ষতিপূরণ নিয়ে উপহাস করতে যেয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল নিজেরাই শেষ পর্যন্ত উপহাসের পাত্র হলেন। নোয়াখালির কৃষকেরা জানান দিলেন বুকে চিনচিনে ব্যাথা নিয়েও উপহাসের জবাব দেওয়া যায়। এবং দেওয়া যায় উপহাস করেই।
এবছর আগস্ট মাসে চীন থেকে আসা ঝলক ধান, চিনচিনে ব্যথায় কৃষক শিরোনামে বিডি নিউজ টোয়েন্টি ফোরএ একটা মতামত বিশ্লেষণ লিখেছিলাম। আজকে সরাসরি নোয়াখালী থেকে আসা তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে সরকার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও নোয়াখালীর কৃষকেরা ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। আজকে এই লেখাটি না লিখলে মতামত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই লিখতেই হচ্ছে।
চলতি বছর এনার্জি প্যাক এগ্রোর হাইব্রিড ধান ঝলক বীজ ব্যবহার করে হাজার হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। জুলাই এর ১১ তারিখ একটি সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী ধানবীজ 'ঝলক-১' চাষ করে চলতি বছর ১০ হাজার কৃষকের প্রায় ২৩ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। বৈশাখের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতিপূরণ দাবী করে কৃষকেরা বিক্ষোভ প্রকাশ করে। বছরের প্রায় শেষে এসে নভেম্বর মাসের এক তারিখ কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ শাখা থেকে তিনটি বীজ বিক্রেতা কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকার বীজ ও সার কৃষকদের দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী বীজ বিক্রেতাদের অর্থাৎ এনার্জি প্যাক এগ্রো ও মেসার্স মেটাল এগ্রো মিলিতভাবে নোয়াখালী, গোপালগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত দুই হাজার কৃষককে দুই কেজি করে ধানবীজ, ২৫ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ১৫ কেজি মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সার সরবরাহ করার কথা। কিন্তু নোয়াখালীর কৃষকেরা এই নামেমাত্র ক্ষতিপূরণ নিতে মোটেই আগ্রহী নন। যেই কৃষকেরা বছরের শুরুতে কোম্পানি ও সরকারের উপহাসের শিকার হয়েছিলেন সেই কৃষকেরা ক্ষতিপূরণ না নিয়ে এবার সরকারকে উপহাস করলেন।
ক্ষতিপূরণের নির্দেশ ফলাও করে জাতীয় দৈনিকে ছাপানোর পর অনেকেই ভেবেছেন ক্ষতিপূরণ তো দেওয়া হল। এখন তো কৃষক খুশী। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা ক্ষতিপূরণ নিল কিনা এই নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। কারণ ধরেই নেওয়া হয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক গরীব মানুষ, ক্ষতিপূরণ না নিয়ে যাবে কই। কিন্তু নোয়াখালীর কৃষকেরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন ক্ষতিগ্রস্তের অধিকার শুধু নামেমাত্র ক্ষতিপূরণ নয়, ক্ষতিগ্রস্তের অধিকার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ। ন্যায্য ক্ষতিপূরণ কত তার হিসাব করতে গেলে হিসাব করতে হবে কৃষকের শ্রমের মূল্য, বিনিয়োগকৃত পুঁজির পরিমান, পুঁজি ঋণ হিসাবে পেয়ে থাকলে ঋণের পরিশোধেয় সুদ, এবং আবাদের পর আকাঙ্খিত ফসলের মূল্য। সেই হিসাবে ক্ষতির পরিমান হওয়ার কথা কয়েক কোটি টাকা। অথচ দেশব্যাপী দশ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মধ্যে মাত্র দুই হাজার কৃষকের জন্য পরবর্তী বছরে বীজ, সার দিয়ে প্রদর্শনী প্লটের ব্যাবস্থা করে দিতে চাওয়ার মধ্যে দিয়ে বীজ বিক্রেতা এনার্জি প্যাক বিপুল পরিমান ক্ষতিপূরণ দেওয়া থেকে এই দফা নিস্তার পেয়ে গেল।
গনমাধ্যমে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ প্রচার করাতে কোম্পানি এ যাত্রা ব্যাবসায়ে নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন তথা সরকারের নির্দেশ মান্য করার আগ্রহ প্রকাশের মধ্যে দিয়ে কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষনে কোম্পানির দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার প্রমাণ করল। জনগণ জানলো কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি । জনগণ জানল না কৃষক ক্ষতিপূরণ নিতে রাজি না। প্রশ্ন উঠতে পারে নোয়াখালীর কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা ক্ষতিপূরণের বীজ ও সার তাহলে কী হবে? আসলে কি এই বীজ ফেরত যাবে নাকি অন্য নামে, নতুন প্যাকেটে, অন্য কোন অঞ্চলে বিক্রি হবে? আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি যে যেকোন বীজের চাহিদা এমনি এমনি তৈরি হয় না, বীজের বাজার তৈরি করে নিতে হয়। যেমন তৈরি করা হয়েছিল ঝলক ধানের বাজার – মাঠ কর্মীদের পরামর্শে, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন তৈরি করে, ও কৃষি সম্প্রসারন কর্মীদের উৎসাহে।
নভেম্বর মাসে একটি জাতীয় দৈনিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ এম এম শওকত আলী সম্পাদকীয়তে লিখেছেন "সার্বিকভাবে হাইব্রিড বীজ বনাম উফশী বীজের কোনটা ব্যাবহারে কৃষকেরা অধিকতর আগ্রহী – এ বিষয়টি নির্ধারণের জন্য মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন। তবে এর ব্যাবহারের মাত্রা অধিকতর করার জন্য অহেতুক আশঙ্কিত হওয়ারও কোন কারণ নেই"। নীতি নির্ধারক মহলের একজন ব্যাক্তির কাছ থেকে এধরনের বক্তব্য শুনে ভীষণ শঙ্কিত হই। যেই দেশে লোকবল নিয়োগ দিয়ে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে বাজার তৈরি করার জন্য মার্কেটিং কর্মীরা এবং কৃষি সম্প্রসারন কর্মীরা মাঠে যেয়ে, লোকাল চ্যানেলে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে, নানান কায়দা কানুন করে হাইব্রিড বীজকে জনপ্রিয় করে, সেখানে কৃষকেরা হাইব্রিড বীজ চায় কি চায় না তা নিয়ে গবেষণা করলে কি সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে? মার্কেটিং করে চাহিদা তৈরি করে তারপর চাহিদা নির্ণয় করতে গেলে তো গবেষণার ফলাফলে দেখা যাবেই যে কৃষক হাইব্রিড চায়। তাহলে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চাহিদা অনুযায়ী বীজের যোগান দেওয়ার যেই কৌশল অবলম্বন করার উপদেশ দেওয়া হচ্ছে তাতো আসলে ব্যাবসায়ীদের বীজ বিক্রির চাহিদা নিশ্চিত করারই একটি কৌশল। অথচ হাইব্রিড বীজের যতটুকু চাহিদা বিদ্যমান সেটা কতটুকু কৃষকের সত্যিকার চাহিদা আর কতটুকু মার্কেটিং আর ভালো বীজ সংকটের ফলাফল সেটা নির্ধারণ করার পাশাপাশি হাইব্রিড বীজ আসলে কতটুকু নিরাপদ সে বিষয়টাও যাচাই করা জরুরী। কেননা শুধু এনার্জি প্যাক এগ্রো লিমিটেডের ঝলকই নয়, গত বছরে সিনজেন্টার টমেটো বীজ 'সবল' এবং এ বছর সিনজেন্টার ভুট্টাবীজ 'সানশাইন' চাষ করেও হাজার হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।
যেই বাজারে বীজ সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা হয়, বীজের মান ও গুণাগুণ নিয়ে কোন গবেষণা হয় না, বীজের মানের কোন ঠিক ঠিকানা থাকেনা, বীজ নষ্ট হলে কোম্পানিকে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হয়না বরং কোম্পানির ইচ্ছা অনুযায়ী বীজের চাহিদা নিয়ন্ত্রন করা হয়, সেখানে কৃষকের চাহিদা নিরূপণের জন্য যত গবেষণাই করা হোক না কেন তার ফল হবে বিভ্রান্তিকর। নীতি নির্ধারকেরা যতদিন মুক্তবাজার অর্থনীতির সুফলের দোহাই দিয়ে বা কৃষকের চাহিদার দোহাই দিয়ে বীজ বাণিজ্যিকিকরনের পক্ষে অবস্থান নেবেন ততদিন কৃষকদের দুর্ভোগ দূর হবে না। যেই নীতি নির্ধারকেরা বীজ বাণিজ্যিকিকরনের পক্ষে কথা বলেন ঝলক ধানের দৃষ্টান্ত তাদের জন্য একটি দৃষ্টান্তই বটে। বিনামূল্যে বিতরন করার জন্যও কোন কৃষককে পাওয়া যাচ্ছে না। এই উপহাস কি করে সইবেন তারা?
মোশাহিদা সুলতানা ঋতু:ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-এর অর্থনীতির প্রভাষক।