Published : 21 Sep 2025, 07:00 PM
জনস্বাস্থ্যকে আরও সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার সেটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে তামাক কোম্পানিগুলোর নানান অপতৎপরতা আমরা দেখতে পাচ্ছি।
আইন সংশোধনের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য জনস্বাস্থ্যকে আরও শক্তিশালীভাবে রক্ষা করা। এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্যকর। এতে মোট ১৭টি অভীষ্ট, ১৬৯টি নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং ১৩৩টি নির্ধারক রয়েছে। এই ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ (এসডিজি-৩) অন্যতম।
সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রথমে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অসংক্রামক রোগ, যেমন ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ।
সরকার যখনই তামাক নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়, তখনই তামাক কোম্পানিগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। তারা নানা অপতৎপরতার মাধ্যমে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
তামাক কোম্পানিগুলো দাবি করছে, আইন সংশোধন হলে সরকারের রাজস্ব কমবে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু এই দাবির কোনো গবেষণালব্ধ ভিত্তি নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাসের পর ২০০৫-০৬ এবং ২০০৬-০৭ অর্থবছরে সিগারেট খাতে রাজস্ব আয় বেড়েছে যথাক্রমে ১৭.৯৭ শতাংশ এবং ৩৭.৫২ শতাংশ। একইভাবে, ২০১৩ সালের সংশোধনের পর ২০১৩-১৪ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয় বেড়েছে যথাক্রমে ২৫.৫১ শতাংশ এবং ৪৬.৫২ শতাংশ।
আইন সংশোধন প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তামাক কোম্পানিগুলো জোরালোভাবে কিছু বিষয়ে কথা বলছে। তাদের একটি দাবি হলো, স্টেকহোল্ডারদের মতামত না নিয়ে মন্ত্রণালয় আইন সংশোধনের খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এই স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে তামাক কোম্পানিগুলোও রয়েছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণ জনস্বাস্থ্য রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সময়ের দাবিতে এর সংশোধনের খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়েছে। তামাক কোম্পানিগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও তামাক কোম্পানির স্বার্থ একে অপরের বিপরীত। তামাক কোম্পানিকে স্টেকহোল্ডার হিসেবে বিবেচনা করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
তারা দাবি করছে, তাদের মতামত শোনা উচিত এবং আইনের প্রস্তাবিত ধারাগুলোর বিরোধিতা করে প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। এর মাধ্যমে তারা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করার সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়। এই দাবিকে সমর্থন করার জন্য কিছু লবিস্ট জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে তামাক কোম্পানির পক্ষে কাজ করছে। এরা সরকারের কাছাকাছি থেকে পেইড লবিস্ট হিসেবে কাজ করছে।
তারা এফসিটিসির (ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল) আর্টিকেল ৫.৩ ভঙ্গ করে এই অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজের জন্য তারা বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে কিছু অনুগত সঙ্গীও জোগাড় করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, তামাক শিল্পের বাণিজ্যিক ও অন্যান্য স্বার্থ থেকে তামাক নিয়ন্ত্রণকে রক্ষা করতে সরকারের সকল শাখায় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ এফসিটিসি’র প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বা কৌশল নির্ধারণে তামাক কোম্পানির মতামত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি করা এফসিটিসি’র আর্টিকেল ৫.৩ ভঙ্গের শামিল।
অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা বাড়াতে গত ২০ অগাস্ট ২০২৫ তারিখে ৩৫টি মন্ত্রণালয় একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের নীতিমালা প্রণয়নে ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য’ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করবে এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।
এই ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী ৩৫টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এনবিআরও রয়েছে। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছি, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন প্রক্রিয়ায় এনবিআর তামাক কোম্পানির সঙ্গে সভার পরিকল্পনা করছে, যা এফসিটিসি এবং যৌথ ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি সম্পূর্ণ অনুচিত।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এখন আবার নতুন তামাক কোম্পানি স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ‘ভয়েস অব ডিসকভারি’ মামলায় তামাক ব্যবহার কমিয়ে আনতে এবং নতুন তামাক কোম্পানিকে লাইসেন্স না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—কেন বিডা এখনো এ ধরনের ক্ষতিকর উদ্যোগে তৎপর? এর বড় কারণ হলো বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর লবিং। তারা নানাভাবে নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে থাকে। বিস্ময়ের বিষয়, বিডার বর্তমান চেয়ারম্যানের পেশাগত যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো থেকে—যা এই প্রভাব বিস্তারের সন্দেহকে আরও জোরালো করে তোলে।
তামাক নিয়ন্ত্রণের একটি প্রধান লক্ষ্য হলো এর সহজলভ্যতা কমানো। লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এই লক্ষ্য পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৪৩টি পৌরসভায় ৪১৫৫টি লাইসেন্স ইস্যু হয়েছে, যা থেকে সরকার ৮৩ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং স্থানীয় সরকার ২০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা রাজস্ব পেয়েছে। দেশে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার তামাক বিক্রেতা রয়েছে। লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব আয়ে ৩০ কোটি টাকা যোগ হবে এবং চোরাচালান ও কর ফাঁকি রোধ সম্ভব হবে।
তামাক কোম্পানির দাবি, লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় ১৫ লাখ নিম্ন আয়ের খুচরা বিক্রেতার জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে। এই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির পরিবর্তে অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করে এই বিক্রেতারা জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি, ব্যবহার ও প্রচার নিষিদ্ধ। এটি তামাক কোম্পানির বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে, কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য কিশোর-তরুণরা। লাইসেন্সিং-এর কারণে তাদের ওই লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গত তিনবছর ধরে চলমান। যারা দ্বৈত লাইসেন্স গ্রহণ না করে তামাক বিক্রি করা ছেড়ে দিয়েছে তাদের কারও জীবন-জীবিকাই বন্ধ হয়ে যায়নি। যেটা হয়েছে তা হলো, ওই এলাকাগুলোতে সিগারেট বিক্রি কমে গেছে। সরকারের লক্ষ্যই তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি কমিয়ে আনা। এজন্যই আইন করে এই বিক্রিকে কঠিন করে আনা উচিত যাতে সিগারেট বা অন্য তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় করতে বিক্রেতা নিরুৎসাহিত বোধ করে।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধন এখন সময়ের দাবি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো যুগোপযোগী এবং বিশ্বের অনেক দেশে এই ধরনের ধারা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে। তামাক কোম্পানির লক্ষ্য জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আর আইনের লক্ষ্য জনস্বাস্থ্য রক্ষা। তামাক কোম্পানি তার অনুগতদের দিয়ে আইনের সংশোধন বিষয়ে যে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে তার উদ্দেশ্যই হলো আইনের নতুন ধারাগুলো যাতে যুক্ত না হয়। কারণ এই ধারাগুলো যুক্ত হলে তামাক কোম্পানির বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। আগামী প্রজন্মকে তামাকের সর্বনাশা ছোবল থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের অপপ্রচার প্রতিহত করে আইনের সংশোধনী সমর্থন করা তাই প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।