Published : 16 Apr 2026, 10:13 AM
‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙ্ক্তিটি যেন আজ আমাদের রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানাগুলোর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবিতায় যেমন সব দোষ ভাগ্যহত ‘কেষ্টা’র ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতার দায়ভার চাপানোর ক্ষেত্রেও এক ধরণের একপাক্ষিক মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়। যুগ যুগ ধরে এই শিল্পগুলো দেশের অর্থনীতির শক্ত খুঁটি হিসেবে কাজ করলেও আজ তাদের কপালে জুটেছে কেবল লোকসানের গ্লানি আর অপবাদ। অথচ যেসব কাঠামোগত ও নীতিগত কারণে শিল্পগুলো মুখথুবড়ে পড়ছে, তার বিচার বিশ্লেষণ যেমন নেই, তেমনি প্রাণসঞ্চারের জন্য কার্যকর পরিকল্পনাও চোখে পড়ার মতো নয়।
যেকোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে তার পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করে সংস্কারের পথ খোঁজাটাই রীতি। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রীয় শিল্পের ক্ষেত্রে দেখা যায় উল্টো চিত্র। বছরের পর বছর ধরে এগুলো মুখথুবড়ে পড়ে থাকলেও কেন পড়ছে, সেই বিচার-বিশ্লেষণের চেয়ে ঢালাওভাবে দোষারোপের সংস্কৃতিই বেশি প্রবল। আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে কার্যকরী কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ে না।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পখাতের বর্তমান অবস্থার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন তিনটি প্রধান করপোরেশনের মোট ৩১টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বর্তমানে লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (BSFIC) অধীনে ১৪টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (BCIC) অধীনে ১২টি এবং বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (BSEC) অধীনে ৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করে সরকার। তাহলে তাদের ব্যর্থতার দায় কি সরকার নেবে না?
এখানে একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান কি নিজে নিজেই লোকসানি হয়ে ওঠে, নাকি তাকে এমন একটি পরিবেশে পরিচালিত করা হয় যেখানে লোকসান অনিবার্য? রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলো কি সত্যিই ওই ‘কেষ্টা’, যারা কেবল অপরের দোষের ভাগীদার হচ্ছে? আমরা যদি চিনি শিল্পের বর্তমান সংকটের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তবে উত্তরটি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। চিনি উৎপাদনের কাঁচামাল, শ্রম, কারখানা এবং বিনিয়োগ সবই আমাদের দেশীয়। উপরন্তু, দেশের অভ্যন্তরেই রয়েছে প্রায় ২০ কোটি মানুষের এক বিশাল বাজার। তবে কেন এই সংকট?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ে বহু কারখানা জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই খাতকে বিকশিত করার উদ্যোগ ছিল নামমাত্র। উল্টো আশির দশক থেকে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির ঋণের শর্ত মানতে গিয়ে কর্মচারী ছাঁটাই, ভর্তুকি কমানো এবং আধুনিকায়নে বিনিয়োগ সীমিত করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পখাতের এই সংকট কেবল বর্তমান ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সুদীর্ঘ ইতিহাস।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রয়েছে। এদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ১.৫ থেকে ২ লাখ টন হলেও দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৮ থেকে ২২ লাখ মেট্রিক টন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন নগণ্য হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি এখন সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। বেসরকারি কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে কাঁচা চিনি এনে রিফাইন করে বাজারে সরবরাহ করছে।
সরকার নির্ধারিত খোলা চিনির দাম কেজিপ্রতি ১১২ টাকা। অথচ শিল্পমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, সরকারি মিলে প্রতি কেজি চিনির উৎপাদন খরচ ১৮১ টাকা এবং সুদসহ তা দাঁড়ায় ২৬০ টাকায়। এই আকাশচুম্বী উৎপাদন ব্যয়ই লোকসানের প্রধান কারণ।
এই সক্ষমতা হ্রাসের মূল কারণ জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি। অধিকাংশ মিল ১৯৩০ থেকে ১৯৬০-এর মধ্যে স্থাপিত। অনেক যন্ত্রাংশ এখন দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় স্থানীয়ভাবে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাতে হয়। আবার আমাদের চিনিকলগুলোতে আখ থেকে চিনি আহরণের হারও অত্যন্ত হতাশাজনক। ব্রাজিলে চিনি আহরণের হার ১৪ শতাংশ, ভারতে ৯–১১ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১২–১৩ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, একই পরিমাণ আখ মাড়াই করে বাংলাদেশ অন্য দেশের তুলনায় প্রায় অর্ধেক চিনি পায়।
পাশাপাশি রয়েছে জনবল সংক্রান্ত সমস্যা। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রতি টন আখ মাড়াইয়ের জন্য ০.৩৩–০.৫ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হলেও আমাদের দেশে এই অনুপাত ১.২৫ জন। অতিরিক্ত জনবল ও চার মাসের মাড়াই মৌসুমের বিপরীতে সারা বছরের বেতন-ভাতার বোঝা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণের জালে আবদ্ধ করছে। এভাবে চিনি কলগুলো লোকসানের এক অনন্ত চক্রে আবর্তিত হচ্ছে।
আখ চাষ ও কৃষকের অনাগ্রহ
চিনিকলগুলোর সংকটের অন্যতম কারণ কাঁচামালের অভাব। এর পাশাপাশি কৃষকেরা ক্রমেই আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে আখ চাষ হতো, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৪০ হেক্টরে। অর্থাৎ এক দশকে আখ চাষ কমেছে প্রায় ৫২ শতাংশ।
কৃষকদের এই বিমুখতার পেছনে বেশ কিছু বাস্তব ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, আখের দীর্ঘ উৎপাদন চক্র একটি বড় বাধা; যেখানে একটি আখের ফসল ঘরে তুলতে ১৪–১৮ মাস সময় লাগে, সেখানে কৃষক একই জমিতে ৩-৪ বার স্বল্পমেয়াদী ফসল ফলিয়ে দ্রুত নগদ অর্থের মুখ দেখতে পারেন। দ্বিতীয়ত, বিএসএফআইসির তীব্র তহবিল সংকটের কারণে কৃষকদের পাওনা টাকা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমানে প্রায় ৩৩০ কোটি টাকার বিশাল বকেয়া ঝুলে থাকায় কৃষকরা চরম হতাশায় ভুগছেন।
পাশাপাশি, সার, ডিজেল এবং শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আখ চাষ এখন আর আগের মতো লাভজনক অবস্থানে নেই। এর ফলে চরাঞ্চল ও উঁচু জমিগুলোতে কৃষকরা আখের পরিবর্তে ভুট্টা, কলা বা বিভিন্ন সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন, যা তুলনামূলক অনেক বেশি মুনাফা নিশ্চিত করছে। মূলত এই বহুমুখী সংকটের কারণেই মাঠপর্যায়ে আখের আবাদ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
গবেষণা ও বাস্তবতার ব্যবধান
বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট (BSRI) বিএসআরআই-৪৫-এর মতো উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে, যার চিনি আহরণ সক্ষমতা প্রায় ১৩.৯ শতাংশ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন সামান্যই। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রশিক্ষণের অভাবে উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি কৃষকদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত আখের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর একটি বড় বাধা হলো অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিকতা। সামান্য যন্ত্রাংশ ক্রয় বা মেরামতের জন্যও দীর্ঘ টেন্ডার প্রক্রিয়া ও একাধিক দপ্তরের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার দক্ষ টেকনিশিয়ান নিয়োগে দেরি হলেও মাথাভারী প্রশাসনে অপ্রয়োজনীয় পদের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায়। অর্থ বরাদ্দের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কৃষক ও শ্রমিকদের পাওনা সঠিক সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হয় না।
সম্ভবনা ও সমাধানের পথ
রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্পকে সংকট থেকে বের করে আনতে হলে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিতে হবে সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা প্রয়োজন। যা করা যেতে পারে:
১. আধুনিকায়ন: পুরোনো যন্ত্রপাতি ধাপে ধাপে প্রতিস্থাপন করে স্বয়ংক্রিয় মাড়াই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এতে চিনি আহরণের হার বাড়লে উৎপাদন ৪ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব।
২. দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনা: দক্ষ প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় পদের বোঝা কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে।
৩. কৃষকের আস্থা ফেরানো: আখের ন্যায্যমূল্য ও বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল জাত কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে।
৪. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: টেন্ডার ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে মিল কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।
৫. পণ্য বহুমুখীকরণ: ‘কেরু অ্যান্ড কোম্পানি’র ডিস্টিলারি ইউনিট থেকে অর্জিত মুনাফা একটি সফল উদাহরণ। অন্যান্য মিলেও চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি উপজাত ব্যবহার করে বিদ্যুৎ, জৈব সার ও ডিস্টিলারি গড়ে তুলতে হবে যাতে আয়ের উৎস কেবল চিনির ওপর নির্ভর না থাকে।
সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবভিত্তিক সংস্কারই পারে এই শিল্পকে লোকসানের চক্র থেকে বের করে একটি কার্যকর ও লাভজনক খাতে পরিণত করতে। আমাদের মনে রাখতে হবে, চিনি শিল্প শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।