Published : 02 Apr 2026, 03:50 PM
চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন অফলাইন ক্লাস চালুর একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই ‘ব্লেন্ডেড’ পদ্ধতির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব হবে। তবে প্রশ্ন হলো, এই সাশ্রয়ের বিপরীতে আমাদের কী মূল্য দিতে হবে? কেবল কিছু জ্বালানি বাঁচাতে গিয়ে যদি একটি প্রজন্মের শিক্ষাগত ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়, তবে ওই সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক?
অনলাইনে ক্লাস করার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে নতুন নয়। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ২০২০ সালের মার্চে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। তখন শিক্ষার্থীরা অনলাইনে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তব শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এই ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের অভাব, দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল সাক্ষরতার সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষকদের প্রস্তুতির ঘাটতি; সব মিলিয়ে অনলাইন শিক্ষা একটি অসম ও বৈষম্যমূলক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল।
নগর অঞ্চলের মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা কিছুটা কার্যকর হলেও দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী এই ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। ফলে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষার সুযোগে অসমতা তৈরি হয়। এতে কেবল শেখার মানই কমে না, বরং শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সহপাঠী ও শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভাব তাদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনলাইন শিক্ষা কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না।
কোভিড-১৯ মহামারীর সময় বেশ কয়েকটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। কোথাও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, আবার অনেক শিক্ষার্থীকে ‘অটো-পাস’ দেওয়া হয়। মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময়ও দীর্ঘদিন শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। এই দীর্ঘ অস্থিরতার পর যখন শিক্ষাকে স্বাভাবিক ধারায় ফেরানোর প্রয়োজন, তখন নতুন করে অনলাইন নির্ভরতার পরিকল্পনা স্বাভাবিকভাবেই গভীর উদ্বেগ তৈরি করে অংশীজনদের মাঝে।
এখন মূল প্রশ্ন, এই আংশিক অনলাইন ব্যবস্থায় আসলে কতটুকু জ্বালানি সাশ্রয় হবে? বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, রমজানের ছুটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশের মাসিক তেলের চাহিদা ৩ লক্ষ ৮০ হাজার টন থেকে কমে ২ লক্ষ ৭০ হাজার টনে নেমে আসে। অর্থাৎ, প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার টন সাশ্রয় হয়। তবে এটি ছিল সম্পূর্ণ বন্ধের প্রভাব। আংশিক অনলাইন বা ব্লেন্ডেড ব্যবস্থায় এই সাশ্রয় অর্ধেকেরও কম হবে।
উল্টো দিকে, শিক্ষার্থীরা ঘরে থেকে অনলাইন ক্লাস করলে গৃহস্থালিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়বে। কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেট রাউটার, ফ্যান বা এসি—সবকিছুর অতিরিক্ত ব্যবহারে নিট সাশ্রয়ের পরিমাণ নেমে আসবে বড়জোর ৩০ হাজার টনের কোঠায়। অর্থাৎ, সামান্য জ্বালানি সাশ্রয়ের বিনিময়ে আমরা যে শিক্ষাগত ক্ষতির ঝুঁকি নিচ্ছি, তা দীর্ঘমেয়াদে বহুগুণ বেশি ব্যয়বহুল হবার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
বিশ্ব ব্যাংকের ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স-২০২০’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন শিশু ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত স্কুলে গেলেও মানসম্মত শিক্ষার হিসেবে সে আসলে মাত্র ৬ বছরের শিক্ষা পায়। এর মধ্যে ৯ মাস স্কুল বন্ধ থাকলে এই কার্যকর শিক্ষার সময় কমে মাত্র ৫.৩ বছরে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ, প্রতিটি বন্ধ বা ব্যাঘাত শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। কোভিড-১৯ মহামারী ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে আমাদের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পিছিয়ে গেছে। এই ক্ষতি অপূরণীয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি ও জনশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিলেও শিক্ষাকে লক্ষ্যবস্তু করেনি। ফিলিপাইন চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে সরকারি অফিসে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহন সহজ করেছে। থাইল্যান্ড ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, কারপুলিং এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের দিকে জোর দিয়েছে। কম্বোডিয়া সরকারি সভা অনলাইনে করছে এবং এসির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ভিয়েতনামে ব্যক্তিগত গাড়ি সীমিত করে গণপরিবহন উন্নত করেছে। এই দেশগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রেখে অন্যান্য খাতে জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশেও একই পথ অনুসরণ সম্ভব। শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, দেশের গ্যাস ও বিদ্যুতের একটি বড় অংশ ব্যবহার করে। গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৪৭.৩ শতাংশ এবং বিদ্যুতের ২৭ শতাংশ এই খাতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়ে এই খাতে ২০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব, যা বছরে প্রায় ৭৩.৪ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সাশ্রয়ের সমান।
আমাদের সরকারও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের তেলের বরাদ্দ কমিয়েছে। সরকারি অফিসে এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি বা তার বেশি রাখা, দিনের আলো ব্যবহার বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলো আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
পরিবহন খাতেও বড় ধরনের সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। ঢাকার অভিজাত এলাকায় শিক্ষার্থী ও গাড়ির অনুপাত প্রায় ১:১; অর্থাৎ প্রায় সকল শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত গাড়িতে স্কুলে যায়। একটি ৪০ সিটের স্কুল বাস অনায়াসেই ১৫-২০টি ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প হতে পারে। এই ব্যবস্থা চালু করলে শিক্ষার ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলেই বিপুল জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব।
সবশেষে বলতে হয়, জ্বালানি সংকট একটি বাস্তবতা, কিন্তু তার সমাধান হিসেবে শিক্ষাকে ‘সফট টার্গেট’ বানানো কোনোভাবেই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নয়। শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। সাময়িকভাবে সামান্য জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য যদি আমরা শিশুদের শেখার সুযোগ কমিয়ে দিই এবং তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করি, তবে ওই সাশ্রয় ভবিষ্যতে অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
সুতরাং, শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্প, সরকারি খাত এবং পরিবহন ব্যবস্থায় কার্যকর ও উদ্ভাবনী কৌশল গ্রহণই হতে পারে টেকসই সমাধান। এতে জ্বালানি সাশ্রয়ও নিশ্চিত হবে, আবার দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশও সুরক্ষিত থাকবে।