Published : 13 Feb 2011, 11:00 PM

নীল নদের পারে কায়রো শহরের 'ময়দানে তাহরি'-র বা তাহরির স্কোয়ারের নাম এতো দিন কারো অজানা থাকলেও এখন আর অজানা নেই। তাহরির – অর্থাৎ মুক্তির ময়দান বা স্বাধীনতা স্কোয়ারে লাখো মানুষের প্রতিবাদের যে দৃশ্য আমরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে টেলিভিশনের পর্দায় দেখছি, তা দেখে আবারও নিশ্চিত হয়েছি যে স্বৈরতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তীব্র আশা জাগছে মনে, পৃথিবীর বদল ঘটবে। মানবিক, গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে জনগণ এক পর্যায়ে প্রতিবাদ লড়াই সংগ্রাম করবেই। সেই প্রতিবাদ-লড়াই-সংগ্রামে সংগঠিত হবার প্রথাগত পথে কাজ না হলে জনগণ নতুন পথ ও কৌশল আবিষ্কার করে নেবে। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণশক্তি নিজের প্রকাশ ঘটাবেই। সেই প্রকাশ প্রাচীন কায়দায় সংগঠিত আন্দোলনের চেয়ে কম তো হবেই না, বরং এর শক্তি আমাদের উজ্জীবিত করবে। মিসরের জনগণকে অভিনন্দন।
আমি এখন নিয়মিতভাবে আল-জাজিরা টেলিভিশন চ্যানেল দেখছি। এবং তাহরির স্কোয়ারে জড়ো হওয়া মিশরের সংগ্রামী জনগণের সংগেও একাত্ম বোধ করছি। নিঃসন্দেহে এই আন্দোলন জনগণের, জনসাধারণের। এখানে নারী-পুরুষ সবাই আছেন, যদিও পুরুষদের সংখ্যাই বেশি; লক্ষণীয়ভাবে রয়েছে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা, যারা তাদের জন্মের পর থেকে বা শিশু বয়স থেকে শুধু একজন প্রেসিডেণ্টই দেখেছেন – 'হুসনী মুবারক'। এরা জীবনে গণতন্ত্র দেখে নি তাই আজ তারা গণতন্ত্র অর্জনের লড়াইয়ে নেমেছে। আমি এই লেখা যখন লিখছি তখন তাহরির স্কোয়ারে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ১৭ দিন অতিবাহিত হচ্ছে কিন্তু হুসনী মোবারক পদত্যাগ না করলে তারাও ঘরে ফিরবে না বলে দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন শ্লোগান দিতে দিতে তাদের গলা ভেঙ্গে গেছে, নাক বা মাথায় ব্যন্ডেজ বাঁধা কিন্তু প্রতিবাদ থামছে না। জয় হোক বিপ্লবী সংগ্রামের।
আমি এখানে প্রতিবাদীদের মধ্যে নারী-পুরুষ সংখ্যায় কে কত ছিলো সে ভাগ করে দেখছি না। তবুও লক্ষ্য করার চেষ্টা করেছি নারীদের অংশ গ্রহন আছে কিনা, থাকলে এর ধরণ কেমন। বেশ অনেক নারী আছেন বোরকা পরে, আবার বোরকা ছাড়া আধুনিক পোশাকে নারীরাও আছেন এই মুক্তির ময়দানে। এই মিশেল আমাকে উৎসুক করেছে। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষমতা নির্মাণের পথ যে জনগণের মধ্যে দূরত্ব, বিভক্তি ও বিভাজন কমিয়ে আনা, এই কৌশলগত দিকটি আমাকে আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু আমার আরও একটু জানার চেষ্টা ছিল মিসরের নারীবাদীদের মতামত কী। কারণ পশ্চিমা দেশের অনেক নারীবাদী তাহরির স্কোয়ারে জনগণের দাবীর দিকটি না দেখে আতংকিত হচ্ছেন মুসলিম ব্রাদারহুড সম্পর্কে। তারা ভয় পাচ্ছেন এই গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের নেতৃত্ব বুঝি বেহাত হয়ে যাবে, চলে যাবে মুসলিম ব্রাদারহুডের হাতে। তারা মনে করছেন আর একটি ইরানী বিপ্লব হচ্ছে কিনা, যা পশ্চিমা বিশ্বের পছন্দ নয়। সৌভাগ্যক্রমে বিখ্যাত নারীবাদী লেখিকা ও মানবাধিকার কর্মী নাওয়াল এল সাদাওয়ীর একটি সাক্ষাৎকার পেয়ে গেলাম। এই লেখায় তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে বক্তব্য তুলে ধরবো, আমার নিজের কথা কিছু কম বলবো।
নাওয়াল এল সাদাওয়ীর কিছুটা পরিচয় দিচ্ছি। তাঁর বয়স এখন প্রায় ৮০ বছর। পেশায় একজন লেখক, চিকিৎসক এবং মনোবিজ্ঞানী। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই তিনি সমাজের অন্যায়, অবিচার, নারীর অবস্থান নিয়ে লিখেছেন খুব অল্প বয়স থেকেই। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৫ সালে ডাক্তারী পাশ করে তার কর্মজীবনে নারীর শারীরিক, মানসিক সমস্যার সাথে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়ম কানুন, শ্রেণী শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের সম্পর্ক দেখেছেন, পর্যালোচনা করেছেন। তিনি মিসরে সরকারের উচ্চ পদে চাকুরী করেছেন এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত জাতিসংঘের আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক নারী কর্মসূচীর উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি বই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি পেয়েছে, যেমন A Woman at Point Zero, The Hidden Face of Eve, God Dies by the Nile, The Circling Song, Searching এবং The Fall of the Imam । আরবী ভাষাও লেখা বইগুলো ইংরেজী ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। সাদাওয়ী তাঁর লেখা এবং কাজের জন্যে সরকারী চাকুরী হারান এবং কারাবরণ করেন। সেখানে বসে তিনি Memoirs from the Women's Prison (১৯৮৩) লেখেন। বিশ্ব জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলনের (১৯৯৪) পুর্বে তিনি বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে উবিনীগ ও ফিনরেজের (Feminist International Network Against Reproductive and Genetic Engineering) আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে এসেছিলেন। তাছাড়া আমার সাথে তাঁর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেখা ও নিবিড়ভাবে কথা হয়েছে। আমি তাঁকে দেখেছি একদিকে নিজের দেশের ধর্ম ও সংস্কৃতির নারী-বিরোধী পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রের সমালোচনা করতে, অন্যদিকে তিনি কখনোই পশ্চিমা এবং সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের খপ্পরে পড়ে তার সমালোচনাকে ব্যবহৃত হতে দেন নি। তিনি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেছিলেন আরব দেশগুলো নারীকে আপাদমস্তক ঢেকে দিয়ে যেমন শোষণ করে একইভাবে পশ্চিমা বিশ্ব নারীকে উলঙ্গ করে দিয়ে উপভোগ করে। দুটো বিষয়ই পুরুষতান্ত্রিকতার এপিঠ আর ওপিঠ । আমাদের মত দেশে নারীর মুক্তির লড়াইয়ের কৌশল ও নীতিকে পাশ্চাত্য চিন্তার আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের বাস্তবতা মেনেই ঠিক করতে হবে এই শিক্ষা আমরা অনেকে নাওয়াল এল সাদাওয়ীর কাছ থেকেই শিখেছি। নারীবাদের প্রশ্নে তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থান আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল।
দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর নওয়াল কায়রো ফিরে এসেছেন মিসরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য। নওয়াল দেখেছেন নারীরা গণতন্ত্রের লড়াইয়ে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, একটি সত্যিকারের গণতন্ত্র, এবং নতুন সংবিধানের জন্য মিসরের জনগণ লড়ছে, যেখানে ন্যায় বিচার থাকবে, নারী-পুরুষ কিংবা মুসলিম-খৃষ্টান ভেদাভেদ থাকবে না। এমন একটি মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষ্যেই আজ মুক্তির ময়দানে মিসরীয়দের লড়াই।
এমি গুডম্যান Democracy Now! নামক আমেরিকার স্বতন্ত্র রেডিও ও টেলিভিশন সংবাদ মাধ্যমের নির্বাহী প্রযোজক; তাঁর অনুষ্ঠান প্রায় ৯০০ রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়, । তিনি নিজে একজন সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতার জন্যে বিকল্প নোবেল পুরষ্কার নামে খ্যাত Right Livelihood Award পেয়েছেন। এমি মিসরে গণবিদ্রোহের এক সপ্তাহ পর টেলিফোনে একটি সাক্ষাৎকারে নওয়ালের কাছে জানতে চাইলেন মোবারকের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহে যোগ দিতে এসে তাঁর কেমন লাগছে। নওয়াল জানালেন, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করছে। তাঁর বয়স ৮০ বছর, অথচ এর মধ্যে অর্ধ শতাব্দী কেটেছে মোবারক ও সাদাতের গণবিরোধী শাসনের মধ্যে। এই দুই শাসক নারী ও পুরুষ উভয়ের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, ধনী–গরিবের মধ্যে বিরাট ফারাক সৃষ্টি করেছে। তারা ব্যবসায়ীদের দ্বারা দেশ পরিচালনা করিয়েছে, এবং মিশরকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছে। এদেশের ৮ কোটি মানুষের কোন মতামত গ্রাহ্য করা হয় নাই। এর প্রমাণ, এতো প্রতিবাদের পরও যেখানে জনগণ পরিস্কারভাবে বলে দিচ্ছে মোবারক তুমি চলে যাও, তাও সে যাচ্ছে না, অর্থাৎ জনগনের কথার মুল্য দিচ্ছে না।শেষ পর্যন্ত অবশ্য চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদী আরব এই বিপ্লবকে নষ্ট করতে চাইছে, তারা এমন ধারণার সৃষ্টি করছে যে মিসরে চুরি লুটতরাজ হচ্ছে, খাবার পাওয়া যাচ্ছে না, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে – এভাবে তারা মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার দোহাই দিয়ে জনগণকে তারা ত্রাসে ভড়কিয়ে দিতে চাইছে। ভয় দেখাচ্ছে, যেন মানুষ ভাবতে শুরু করে নিরাপত্তার জন্যে মোবারককেই দরকার। ঘরে বসে থাকলে এমন কথা বিশ্বাস হলেও রাজপথে জনসমাবেশে গেলে এই ভয় আর থাকে না। নওয়াল মনে করেন বিপ্লব সফল হতে চলেছে এবং জয় তাদের হবেই। হয়েছেও তাই।
এমি গুডম্যান নওয়ালকে সেই প্রশ্ন করলেন যা পশ্চিমা নারীবাদীদের একটু চিন্তিত করেছে। তিনি জানতে চাইলেন এই বিপ্লব কি ইরানের বিপ্লব কিংবা মৌলবাদীদের বিপ্লব হতে যাচ্ছে কিনা। নওয়াল জানালেন, তিনি বর্তমান বিপ্লবের চরিত্রের মধ্যে এমন কিছুই দেখছেন না। তিনি বলেন, মোবারক আমাদের ধারণা দিচ্ছে যেন বা সে মৌলবাদীদের হাত থেকে নারীদের রক্ষা করছে। এটা মিথ্যা। স্বৈরতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ মৌলবাদী জুজুর ভয় দেখিয়ে শাসন ও শোষণের ব্যবস্থাটা টিকিয়ে রাখতে চায়, এই দিকটা মিশরের জনগণের কাছে পরিষ্কার। এই বিপ্লব সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণে হচ্ছে, তরুণ নারী ও পুরুষদের অগ্রগামী ভূমিকা রয়েছে, সেটা তো পরিষ্কার। সকল ধর্মের মানুষ মুক্তির ময়দানে অংশগ্রহণ করছে অথচ এখানে কোন ধর্মীয় শ্লোগান নেই। প্রত্যেকেই ন্যায়, সমতা ও স্বাধীনতার দাবী করছে। বর্তমানে যেভাবে দেশ চলছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে দুর্নীতি, বেকারত্ব, মিথ্যে নির্বাচন, নারীর ওপর দমন নিপীড়ন চলছে বহুকাল ধরে। কাজেই বিপ্লব আসতোই, যদিও অনেক দেরিতে এসেছে। তবুও এসেছে, এটাই ভাল।
এই বিপ্লবে নারীরা পুরুষদের সাথে একই শ্লোগান দিচ্ছে, তারা গণতন্ত্র চায়, নারী-পুরুষের সমতা চায়, নতুন সংবিধান চায় এবং সর্বোপরি বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়।
বিপ্লবের পর কী হবে এই জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকবে, বিশেষ করে তিউনিশিয়ার পরিবর্তনের পর স্বৈরশাসনের অধীন আরব দেশগুলো ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে নাকি ইসলামী হবে এই কথা নিয়ে যারা মাথা বেশি ঘামাচ্ছেন, নওয়ালের এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তারা তার জবাব পাবেন। এই কথা স্পষ্ট হয়েছে যে মিসরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমস্যা এতো প্রকট, অন্যায়-অবিচার এতো বেশি হয়েছে যে এখানে কোন ধর্মীয় কারণ প্রাধান্য পাচ্ছে না। মৌলবাদীদের ভয় দেখিয়ে মিসরের বিপ্লব ঠেকাবার কোন সুযোগ নেই।
ফরিদা আখতার: নারীনেত্রী ও কলামলেখক।