২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫ কার্তিক ১৪৩৩

অনাগত বেতনের আগাম দহন: ২০২৬ নোবেলজয়ীদের তত্ত্বে পে স্কেল ও প্রত্যাশার নোঙর

মূল্যস্ফীতি আগে জন্ম নেয় মানুষের মনে, তারপর ছড়ায় বাজারে।

অনাগত বেতনের আগাম দহন: ২০২৬ নোবেলজয়ীদের তত্ত্বে পে স্কেল ও প্রত্যাশার নোঙর

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণার পর বাজারের আগাম প্রত্যাশা কীভাবে অনানুষ্ঠানিক খাতের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তা আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়।

বিকাশ চন্দ্র ঘোষ বিকাশ চন্দ্র ঘোষ

Published : 20 Oct 2026, 10:32 AM

Updated : 20 Oct 2026, 10:32 AM

অর্থনীতিতে কিছু কিছু ঘটনা বাস্তবে ঘটার আগেই ঘটে যায়; সরকারি বেতন বৃদ্ধির মূল্যস্ফীতি তার একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ। গত ১৯ সেপ্টেম্বর নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর গেজেট জারি হয়েছে। এতে গ্রেডভেদে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে, তবে টাকা আসবে ধাপে ধাপে; চলতি বছর বাড়তি অংশের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, আগামী জানুয়ারি থেকে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ, আর পুরোটা ২০২৭ সালের জুলাইয়ে।

অর্থনীতিবিদদের চোখে এটি এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক পরীক্ষা’, অর্থাৎ গবেষণাগার ছাড়াই বাস্তবে ঘটে যাওয়া পরীক্ষণ। ঘোষণা আজকের; প্রথম কিস্তির টাকা বকেয়াসহ আসবে অক্টোবরের শেষে, আর পুরো বাড়তি মূল বেতন গেজেটের প্রায় সাড়ে নয় মাস পর। অথচ মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাজারটি মোটেও অপেক্ষা করে না। ঘোষণার পরপরই গ্রামের মুদিদোকানে চালের দাম বাড়লে তা কেবল ক্রেতার বর্তমান চাহিদার চাপে বাড়ে না, কারণ বেশির ভাগ মানুষের হাতে তখনো বাড়তি টাকা পৌঁছায়নি। দাম বাড়ে বিক্রেতার আগাম হিসাবনিকাশেও, যিনি সামনের দিনগুলোর চাহিদা ও প্রতিযোগীর সম্ভাব্য দাম আজই আন্দাজ করছেন। আর ওই চড়া দাম প্রথম দিনেই গুনতে হয় এমন এক মানুষকে, যার আয় এই গেজেটে এক টাকাও বাড়বে না; সেই দিনমজুর, যার রাতের আহার নির্ভর করে দিনের মজুরির ওপর। আয়ের বণ্টনের দিক থেকে এটি একটি পরোক্ষ হস্তান্তর; অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের বর্তমান পেটের গ্রাস থেকে বিক্রেতার পকেটে, যার ভিত্তি সরকারি বেতনভোগীর ভবিষ্যৎ আয়ের প্রত্যাশা।

ঘটনাটি অবশ্য নতুন নয়, তবে আগেরবারের অভিজ্ঞতা আর এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ২০১৫ সালে অষ্টম বেতন কাঠামোর সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন, অন্যদিকে সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করেছিলেন বাড়িওয়ালাদের নিয়ে। পরের বছর ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের হিসাবে ঢাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছিল ৮.৭৭ শতাংশ, যা আগের প্রায় এক দশকের দুই অঙ্কের বৃদ্ধির চেয়ে কম। অর্থাৎ সেবার বড় কোনো মূল্যস্ফীতির ঢেউ ওঠেনি, যদিও বিশ্ববাজারে তেলের দামের ধসও তখন বড় সহায় ছিল। কিন্তু এবারের সঙ্গে তখনকার পার্থক্যটা ঠিক কোথায়? তখন মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ শতাংশের কাছাকাছি এবং নিম্নমুখী; আর আজ তা ২০২২ সালের অগাস্ট থেকে টানা ৮ শতাংশের ওপরে, মাঝে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে উঠেছিল ১১.৬৬ শতাংশে। তদুপরি, এবার আগাম সতর্কতা এসেছে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই। একই ধাক্কা শান্ত দীঘিতে তেমন ঢেউ তোলে না, কিন্তু উত্তাল সমুদ্রে তুলে দেয় প্রকাণ্ড তাণ্ডব।

ফলে গবেষণার প্রশ্নটিকে তিন ভাগে ভেঙে দেখা যায়। ঘোষিত অথচ অনাগত আয় কত দ্রুত বাজারের দামে প্রবেশ করে, কোন পথ ধরে ঢোকে, আর ওই পথে শেষ পর্যন্ত কে মূল্য পরিশোধ করে? এই তিন প্রশ্নেরই তাত্ত্বিক উত্তর তৈরি করেছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ, আর ওই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর তাদের হাতে উঠেছে অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার। গত ১২ অক্টোবর রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট ই. হল এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল উডফোর্ডকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলকরণের ব্যষ্টিক ভিত্তি নির্মাণের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেয়। সহজ কথায়, মোট উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের ওঠানামা সামলানোর সামষ্টিক নীতিকে তারা দাঁড় করিয়েছেন একক পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ভিতের ওপর, অর্থাৎ ওই মুদি দোকানদার ও দিনমজুরের নিত্যদিনের হিসাবনিকাশের ওপর। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯৬৮ সালে এই পুরস্কার প্রবর্তন করে; ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা দুই অর্থনীতিবিদ সমান ভাগে ভাগ করে নেবেন।

কিন্তু কেন এই ব্যষ্টিক ভিত নতুন করে গড়ার প্রয়োজন পড়েছিল? তা বুঝতে একটি তাত্ত্বিক রেখার উত্থান, পতন ও পুনর্জন্মের গল্প জানা চাই। তিরিশের দশকের মহামন্দার পর কেইনসীয় ব্যবস্থাপত্রটি ছিল বেশ সরল; চাহিদা কমলে সরকার খরচ বাড়াবে ও সুদের হার কমাবে, আর চাহিদা অতিরিক্ত হলে হাঁটবে উল্টো পথে। ১৯৫৮ সালে এ. ডব্লিউ. ফিলিপস যুক্তরাজ্যের প্রায় এক শতাব্দীর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখান, বেকারত্ব কম থাকলে মজুরি দ্রুত বাড়ে; এই বিপরীত সম্পর্কই ‘ফিলিপস রেখা’ নামে পরিচিতি পায়। মজুরি বাড়লে স্বভাবতই পণ্যের দামও বাড়ে, ফলে নীতিনির্ধারকেরা রেখাটিকে হোটেলের মেনুকার্ডের মতো ব্যবহার করতে শুরু করলেন; খানিকটা মূল্যস্ফীতি মেনে নিলে বিনিময়ে কম বেকারত্ব কিনে নেওয়া যায়! তবে মিল্টন ফ্রিডম্যান ও এডমন্ড ফেলপস সতর্ক করেছিলেন, মানুষ মূল্যস্ফীতিতে অভ্যস্ত হলে তাদের প্রত্যাশা বদলে যাবে, আর দীর্ঘমেয়াদে এই আদান-প্রদান টিকবে না।

সত্তরের দশকের তেল সংকটে ঠিক সেটাই ঘটল। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে লাফিয়ে বাড়ল, জন্ম নিল ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দাস্ফীতি। ঐতিহ্যবাহী এই মেনুকার্ড কেন অচল হলো, ১৯৭৬ সালে তার গভীর কারণ ব্যাখ্যা করেন রবার্ট লুকাস। তিনি দেখান, পুরোনো মডেলগুলো অতীতের পরিসংখ্যান দেখে সম্পর্কগুলোকে স্থায়ী ধরে নিত, অথচ নীতি বদলালেই যে মানুষের আচরণও বদলে যায়, সে কথা ভুলে যেত। যেমন, রাস্তার মোড়ে পুলিশ দেখলে চালকেরা গতি কমান; পুলিশ সরিয়ে নিয়ে চালকদের আগের গতি দেখে দুর্ঘটনার পূর্বাভাস দিলে তা ভুল হতে বাধ্য। 'লুকাস সমালোচনা' নামে পরিচিত এই যুক্তির মূল শিক্ষা ছিল, সামষ্টিক মডেল গড়তে হবে একেবারে নিচ থেকে, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতের কথা ভেবে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর ভিত্তি করে। সেখানে মানুষের প্রত্যাশা হবে 'যৌক্তিক', অর্থাৎ হাতের কাছের সব তথ্য তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাবে। নীতিটি বলা যত সহজ, গাণিতিকভাবে দাঁড় করানো ছিল ততটাই কঠিন।

প্রথম কঠিন বাধাটি ছিল পরিবারগুলোকে ঘিরে, কারণ মোট চাহিদার সিংহভাগই আসে পারিবারিক ভোগব্যয় থেকে। মিল্টন ফ্রিডম্যানের 'স্থায়ী আয় অনুকল্প' এবং ফ্রাংকো মডিগ্লিয়ানির 'জীবনচক্র তত্ত্ব' বলত, মানুষ শুধু আজকের আয় দেখে খরচ করে না, পুরো জীবনের প্রত্যাশিত আয় হিসাব করে খরচ ঠিক করে। কিন্তু মনের প্রত্যাশা সরাসরি মাপা যায় না, তাই তত্ত্বটি যাচাই করা কঠিন ছিল। রবার্ট হল প্রশ্নটিকে একদম উল্টে দিলেন। তিনি বললেন, মানুষ যদি সত্যিই ভবিষ্যতের কথা ভেবে খরচ করে, তবে আজকের ভোগই তার ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিচ্ছবি! এই ভোগে বদল আসবে কেবল সম্পূর্ণ নতুন কোনো খবর বা ধাক্কা এলে, কারণ আগে থেকে জানা খবর তো আর নতুন নয়।

ভোক্তার 'অয়লার সমীকরণ' (Euler equation), অর্থাৎ আজকের ও আগামীকালের খরচের ভারসাম্যের শর্ত থেকে তিনি দেখান, ভোগ মূলত 'এলোমেলো পদচারণা' বা Random Walk অনুসরণ করে। অতীত দেখে ভবিষ্যতের ভোগের পূর্বাভাস দিতে না পারাই তাই এই তত্ত্বের সাফল্যের লক্ষণ! ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত গবেষণায় মার্কিন উপাত্ত থেকে তিনি এর জোরাল সমর্থন পান; আজকের ভোগ জানা থাকলে অতীতের আয় ভবিষ্যৎ ভোগ সম্পর্কে বাড়তি কোনো তথ্য দেয় না। ব্যতিক্রম ছিল শেয়ারবাজারের দর, যা রবার্ট হল নিজেই তুলে ধরেছিলেন।

ঠিক এখানেই মেলে আমাদের প্রথম প্রশ্নের ('কত দ্রুত?') উত্তর, খবরটি নতুন হওয়ার মুহূর্তেই! ধরা যাক, একজন পোশাকশ্রমিক আজ জানলেন তিন মাস পর তার কারখানা বন্ধ হবে; হলের তত্ত্ব অনুযায়ী তিনি খরচের হাত গুটিয়ে নেবেন আজই, কারণ তিন মাস পর খবরটি আর নতুন থাকবে না। একইভাবে বেতন কাঠামোর ঘোষণা বিশ্বাসযোগ্যতা পেলে ভবিষ্যতের বাড়তি বেতনের একটি অংশ আজকের বাজারেই চাহিদা হয়ে হাজির হয়। ফলে দাম বাড়ে দুই পথে; বিক্রেতার প্রত্যাশায় এবং সচ্ছল বেতনভোগীর আগাম কেনাকাটায়। তবে সবাই তো এভাবে চলার সামর্থ্য রাখেন না, আর এখানেই লুকিয়ে আছে তৃতীয় প্রশ্নের ('কে এর মূল্য দেয়?') সূত্র। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত গবেষণায় হল ও ফ্রেডরিক মিশকিন দেখান, মোট ভোগের প্রায় এক পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) স্থায়ী আয়ের সঙ্গে নয়, চলতি আয়ের সঙ্গে ওঠানামা করে। এর পেছনে মূলত সঞ্চয়হীন, ঋণসুবিধাবঞ্চিত ও 'দিন আনে দিন খায়' ধাঁচের পরিবারগুলোর আচরণ; আমাদের গল্পের দিনমজুর এই দলেরই প্রতিনিধি।

এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নের ('কোন পথ ধরে?') উত্তরে, যা লুকিয়ে আছে মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণায়। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তার আকর গ্রন্থ ‘ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস: ফাউন্ডেশনস অব আ থিওরি অব মনিটারি পলিসি’ অনেক গবেষকের কাজের ধারাবাহিকতায় 'নিউ কেইনসীয়' মুদ্রানীতি বিশ্লেষণকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়, যা আধুনিক 'ইনফ্লেশন টার্গেটিং' বা মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক নীতির মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি। এই কাঠামোর স্তম্ভ তিনটি সমীকরণ। প্রথমটি 'গতিশীল আইএস রেখা', যা হলের ভোগতত্ত্বকে সুদের হারের সঙ্গে জোড়ে; প্রকৃত সুদহার কমলে সঞ্চয়ের আকর্ষণ কমে, মানুষ আজই বেশি খরচ করে। দ্বিতীয়টি 'নিউ কেইনসীয় ফিলিপস রেখা', পুরোনো রেখার আধুনিক পুনর্জন্ম এবং ওই মুদি দোকানদারের আচরণের ব্যাখ্যা। প্রতিদিন দাম বদলানো ব্যয়বহুল, তাই দাম সহজে নড়তে চায় না বা স্টিকি থাকে।

এর জনপ্রিয় গাণিতিক রূপ 'ক্যালভো মডেলে' প্রতিটি সময়ে কেবল কিছু বিক্রেতা দাম বদলানোর সুযোগ পান; ফলে যিনি সুযোগ পান, তিনি সামনের দিনগুলোর কথা মাথায় রেখেই দাম ঠিক করেন। ক্রেতার আয় বাড়বে আর প্রতিযোগীও দাম বাড়াবে, এমন বিশ্বাস থাকলে তিনি আজই দাম বাড়িয়ে দেন। পুরোনো ফিলিপস রেখা তাকাত অতীতের দিকে, নতুনটি তাকায় ভবিষ্যতের দিকে। আজকের মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রধান চালক ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আজকের প্রত্যাশা! তৃতীয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের 'সুদহারের নিয়ম', মূল্যস্ফীতি ১ শতাংশ বিন্দু বাড়লে নীতি সুদহার বাড়াতে হবে তার চেয়েও বেশি, যা 'টেইলর মূলনীতি' নামে পরিচিত। নইলে প্রত্যাশা নোঙর ছিঁড়ে ভেসে যেতে পারে, আর মূল্যস্ফীতি নিজেই নিজেকে উসকে দেয়। ২০১৫ আর ২০২৬ সালের বাংলাদেশের প্রধান ফারাক এখানেই। নোঙর শক্ত থাকলে ধাক্কাটি অর্থনীতি নিজেই শুষে নেয়, না থাকলে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যাশার এই নোঙর ধরে রাখতে উডফোর্ড মুদ্রানীতির কেন্দ্রে আনেন 'আউটপুট গ্যাপ' এবং নুট উইকসেলের 'স্বাভাবিক সুদহারের' ধারণা। ২০০৩ সালে জাপানের শূন্য সুদহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে উডফোর্ড ও গাউতি এগার্টসনের যৌথ গবেষণা দেখায়, ভবিষ্যতের সুদহার নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য ঘোষণাই আজকের বাজারে চাহিদা বাড়াতে পারে। তবে মডেলটি নিখুঁত নয়। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো সব পরিবারকে একই ছাঁচে দেখা। তাই গবেষকেরা এখন বিভিন্ন শ্রেণির বৈচিত্র্য মাথায় রেখে 'হেটেরোজিনাস এজেন্ট নিউ কেইনসীয়' মডেল গড়ছেন, যার অন্যতম পূর্বসূত্র হল ও মিশকিনের সেই ২০ শতাংশের পর্যবেক্ষণ। কাজেই এই নোবেল শেষ কথা নয়, বরং এক নতুন যাত্রার স্বীকৃতি।

মডেলগুলোর ওই যাত্রার পরের অধ্যায় লেখার জন্য বাংলাদেশের চেয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্র কমই আছে, প্রধানত তিনটি কারণে। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আধুনিক 'সুদহার করিডোর' ব্যবস্থায় যায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে তোলা হয়, আর চলতি বছরের ৩০ জুলাই তা নামানো হয় ৯.৫ শতাংশে। তবে সক্রিয় বন্ড বাজার আর খেলাপি ঋণের বোঝামুক্ত সুস্থ ব্যাংক খাত না থাকলে সুদের সংকেত মাঝপথেই হারিয়ে যায়। অথচ গত জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২.৭৮ শতাংশ। দ্বিতীয় কারণ নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা। গত ৩০ জুনের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণার মাত্র এক মাসের মাথায় উল্টো পথে হেঁটে তা কমানো হয়। অন্যদিকে বেতন কাঠামোর আর্থিক ধাক্কাও ছোট নয়। অর্থ বিভাগের প্রাথমিক প্রাক্কলনে প্রথম দুই ধাপে কেবল মূল বেতন বাড়াতেই বাড়তি লাগবে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের জিডিপির প্রায় ০.৬ শতাংশ এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বার্ষিক বরাদ্দের প্রায় আড়াই গুণ। আর বেতন ও ভাতা পুরোপুরি কার্যকর হলে বার্ষিক বাড়তি ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকায়।

ভারতে সপ্তম বেতন কমিশনের সময় রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া সরকারি বাড়িভাড়া ভাতার সম্ভাব্য প্রভাব আগাম প্রাক্কলন করে মুদ্রানীতিতে প্রকাশ করেছিল। বাংলাদেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন ধাপের সঙ্গে মিলিয়ে একটি শর্তসাপেক্ষ 'আগাম নির্দেশনা' দিতে পারে, যেমন ২০২৭ সালের জুলাইয়ের আগে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে না নামলে নীতি সুদহার আর কমানো হবে না। উডফোর্ডের মূল যুক্তি এখানেই, অঙ্গীকার বিশ্বাসযোগ্য হলে প্রত্যাশাই অর্ধেকের বেশি কাজ করে দেয়, ফলে সুদহার অত চড়া রাখতে হয় না।

তৃতীয় কারণটি আমাদের সেই দিনমজুর, যিনি ঘোষণার পর বাজারে গিয়ে বাড়তি দামে চাল কিনেছিলেন। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৪ শতাংশই তার মতো অনানুষ্ঠানিক খাতে, কৃষিতে এই হার ৯৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মজুরি হার সূচকের বৃদ্ধি টানা ৫৬ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির নিচে; ফলে ২০২২ সাল থেকে এই শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। হল ও মিশকিনের ওই এক পঞ্চমাংশের বাংলাদেশি প্রতিরূপ সম্ভবত আরও অনেক বড়, যার ইঙ্গিত মেলে ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২’ থেকে; পরিবারগুলোর গড় আয় ও ব্যয় প্রায় সমান এবং ৩৭ শতাংশ পরিবারকে ঋণ নিতে হয়েছে, যা ২০১৬ সালে ছিল ২৯.৭ শতাংশ। নীতি সুদহারের প্রত্যক্ষ প্রভাব এই দিনমজুরের ওপর সামান্য হলেও ফ্যামিলি কার্ড বা নগদ সহায়তার টাকা তার হাত হয়ে সরাসরি বাজারে আসে বলে এখানে রাজস্ব নীতির প্রভাব জোরাল।

এই গল্পে প্রকৃতপক্ষে তিন ধরনের চরিত্র আছে। প্রথম চরিত্র ক্যালভো মডেলের মুদি দোকানদার, দ্বিতীয় চরিত্র হলের অয়লার সমীকরণ মানা সচ্ছল বেতনভোগী এবং তৃতীয় চরিত্র আমাদের দিনমজুর, যিনি চলতি আয়ের বাইরে যেতে পারেন না। এখানে পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তত্ত্বের পূর্বাভাসটি আসলে প্রথম দুই চরিত্রের জন্যই প্রযোজ্য; তৃতীয় চরিত্র কেবল তার ফলাফল ভোগ করেন, প্রক্রিয়ায় অংশ নেন না। যে প্রক্রিয়া প্রত্যাশার নোঙরকে পরীক্ষা করবে, তার বোঝা সবচেয়ে বেশি চাপবে ঠিক ওই দলের ওপর, যারা ওই প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকাই রাখেন না। তবে সতর্কতার বিষয় হলো, সেপ্টেম্বরের শেষে বেতন কাঠামোর ঘোষণা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বকেয়ার আগমন, তিনটি ধাক্কা একসঙ্গে পড়েছে। আর এই তিনটি আলাদা করার মতো উপাত্ত বিবিএসের মাসভিত্তিক প্রকাশনায় নেই। ফলে নভেম্বরে প্রকাশিত অক্টোবরের সূচকে খাদ্য বা বাড়িভাড়ায় বাড়তি গতি দেখা গেলেই তা প্রত্যাশার নোঙর আলগা হওয়ার প্রমাণ নয়, জ্বালানির সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাবও হতে পারে, এমনকি মাসের বেশির ভাগ সময় বাড়তি বেতন কারও হাতে না পৌঁছানোর কারণে বকেয়ার প্রভাবও দেরিতে ধরা পড়তে পারে। প্রকৃত পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন সূক্ষ্মতর তুলনা, যেমন সরকারি কর্মচারীর ঘনত্ব বেশি এমন এলাকার সঙ্গে কম এলাকার মূল্যবৃদ্ধির তুলনা, অথবা বকেয়া হাতে আসার আগে ও পরে একই পণ্যের দামের তুলনা। এমন উপাত্ত তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নভেম্বরের সংখ্যা একটি দিকনির্দেশক সংকেত মাত্র, চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

নোঙর অক্ষত থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্য ঘোষণাই বেশিরভাগ কাজ সেরে ফেলে, সুদহার সেক্ষেত্রে বেশিদূর বাড়াতে হয় না, এটিই উডফোর্ডের মূল যুক্তি। নোঙর আলগা হলে একই লক্ষ্য অর্জনে সুদহার বাড়াতে হয় অনেক বেশি, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ওই দিনমজুরের ওপর। মূল্যস্ফীতি আগে জন্ম নেয় মানুষের মনে, তারপর ছড়ায় বাজারে। হল ও উডফোর্ডের এই পাঠ তাই স্টকহোমের একাডেমিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়; ঢাকার মতিঝিলে মুদ্রানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এর সমান প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কারণ শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাফল্য শুধু কতটা সুদহার বাড়ানো হলো তার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে মানুষ নীতিনির্ধারকদের কতটা বিশ্বাস করে এবং ওই নীতির ব্যয় কার কাঁধে গিয়ে পড়ে, তার ওপরও।

বিকাশ চন্দ্র ঘোষ: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: bikasheco@pust.ac.bd