Published : 21 Mar 2026, 10:31 AM
সারা দেশ আজ যখন ঈদ, ঈদের নামাজ শেষ করে কোলাকুলিতে মেতে উঠছে মানুষ। তার একদিন আগে, এই দৃশ্য গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে চাঁদপুরের ৪০টিরও বেশি গ্রামে প্রতি বছর পুনরাবৃত্ত হয়ে আসছে।
চাঁদপুরের ওই গ্রামগুলোর অর্ধলক্ষ মুসল্লি প্রতি বছর দেশের ঘোষিত তারিখের একদিন আগে ঈদ পালন করেন। এই ধারা শুধু চাঁদপুরেই সীমাবদ্ধ নেই। পটুয়াখালীর প্রায় ৩৫টি গ্রামের ২৫ হাজার মানুষও একই পথে হাঁটছেন। চট্টগ্রাম, বরিশাল, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, শেরপুর, সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে একটি স্থানীয় আমল জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।
তাহলে এই মানুষেরা কেন এটা করেন? কোন বিশ্বাসের ভিত্তিতে দেশের বাকি মানুষের চেয়ে একদিন আগে উৎসব পালন করেন তারা?
তাদের যুক্তিটা সহজ, কিন্তু গভীর বিশ্বাসে প্রোথিত। পৃথিবীর আকাশে চাঁদ একটাই, পৃথিবীর সব মানুষের জন্য একটাই। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সেই চাঁদ একবার দেখা গেলেই নতুন মাস শুরু হয়ে যায়। আজকের যুগে সৌদি আরবে চাঁদ দেখার সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বে পৌঁছে যায়, তাহলে আর অপেক্ষার কী অর্থ? হানাফি ফিকহের একটি সুপরিচিত মত অনুযায়ী, পৃথিবীর যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখা গেলে সেই ভিত্তিতে ঈদ উদযাপন করা যায়। এই ফিকহী অবস্থানকে সামনে রেখেই এই মানুষেরা দশকের পর দশক ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে এই আমল পালন করে আসছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আন্তরিক অনুসরণের দিক থেকে এই মানুষের একনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
তবে ইসলামি ফিকহের ভেতরেই এ বিষয়ে আরেকটি সুদৃঢ় মত আছে, যেটা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের অবস্থান। সেই মত অনুযায়ী চাঁদ দেখার বিধানটি ভৌগোলিক অঞ্চলভিত্তিক। প্রতিটি এলাকার নিজস্ব দিগন্তে চাঁদ উদয়ের ওপর নির্ভর করেই সেই এলাকার মানুষ রোজা ও ঈদ পালন করবেন। সৌদি আরব বাংলাদেশের পশ্চিমে অবস্থিত। পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তিত হয় বলে পশ্চিমের দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই আগে চাঁদ দেখে। সৌদিতে চাঁদ দেখার পর বাংলাদেশের দিগন্তে সেই চাঁদ দেখা যেতে আরও সময় লাগে, তাই বাংলাদেশে পরের দিন মাস শুরু হওয়াটাই এই মতের আলোকে স্বাভাবিক। এই অবস্থানের পেছনেও হাদিসের ভিত্তি আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা শুরু করবে না এবং চাঁদ না দেখা পর্যন্ত ঈদ করবে না। এই বর্ণনার ব্যাখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ বলেছেন, এখানে নিজের অঞ্চলে চাঁদ দেখার কথাই উদ্দেশ্য।
বিষয়টি তাহলে কোন দিকে যাচ্ছে? আসলে এটি ইসলামি ফিকহের একটি দীর্ঘকালীন ইখতেলাফ বা বিদ্বানদের মতভেদের বিষয়, যেখানে দুটি পক্ষেই নির্ভরযোগ্য দলিল আছে। যে মানুষটি সৌদির চাঁদ দেখে ঈদ পালন করছেন, তিনি তার বিশ্বাস ও ফিকহি বোঝাপড়া অনুযায়ী আমল করছেন। আর যিনি দেশের ঘোষণা মেনে চলছেন, তিনিও তার দলিলের ভিত্তিতে আমল করছেন। দুজনের নিয়তই বিশুদ্ধ, দুজনই আল্লাহর সন্তুষ্টি চাইছেন।
উদ্বেগের জায়গাটা ধর্মীয় নয়, সামাজিক। একই পরিবারে দুটি ঈদ, একই মহল্লায় ঈদের দুটি জামাত, একই গ্রামে দুটি আনন্দ। একজন বাবা ঈদের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছেন আর তার ছেলে তখনো রোজায়। এই চিত্রটা পারিবারিক ও সামাজিক একতার প্রশ্নটি সামনে এনে দেয়। ঈদের মূল সৌন্দর্য তো একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠার মধ্যে। সেই একসঙ্গে থাকার জায়গাটা যদি সংকুচিত হয়, তাহলে ক্ষতিটা সবার।
আকাশে একটাই চাঁদ। সেই চাঁদের আলোয় কোটি মানুষ ঈদের আনন্দ খোঁজে। যিনি একদিন আগে ঈদ করছেন, তার বুকেও সেই একই আনন্দ, একই ভালোবাসা। আর যিনি দেশের ঘোষণা মেনে পরের দিন করছেন, তার মনেও একই আবেগ। দুজনেই আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। পার্থক্যটা পথের, মনের নয়। সেই পথের ভিন্নতাকে যদি বৈরিতায় পরিণত না করে, পারস্পরিক শ্রদ্ধায় ধারণ করা যায়, তাহলেও ঈদের মিলন ও একতার বার্তা হারিয়ে যায় না।