Published : 29 Dec 2025, 11:00 AM
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তঝরা দিনগুলোতে রাজপথের মিছিলে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দানা বেঁধেছিল, সেই স্বপ্ন সফল করার অঙ্গীকার নিয়ে জন্ম নেয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই দলটি যখন রাজনীতির মাঠে পা রাখল, তখন তাদের কণ্ঠে ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া, সুশাসন প্রতিষ্ঠা আর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। যদি তাই হতো, তাহলে প্রচলিত দ্বিমেরু রাজনীতির বাইরে এনসিপি হতে পারত সেই কাঙ্ক্ষিত ‘তৃতীয় ধারা’, যারা ক্ষমতার ভাগাভাগি নয়, গুণগত পরিবর্তনে বিশ্বাসী। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক জোটের চোরাবালিতে পড়ে এনসিপি এখন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, তা দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে—এটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা, নাকি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দলটির অকালপ্রয়াণের দিকে যাত্রারম্ভ?
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে এনসিপির পক্ষে কৌশলগত সিদ্ধান্ত বলা হচ্ছে। জোটে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিতে সংবাদ সম্মেলনে এসে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জোট গড়ার এ পদক্ষেপকে ‘নির্বাচনি সমঝোতা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য, ‘নির্বাচনি বৈতরণী উতরা’তে আর ‘বৃহত্তর ঐক্যের’ প্রয়োজনবোধ এবং বিচার ও আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে এক থাকাই জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার কারণ।
জামায়াতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনি বৈতরণী কতখানি উতরাতে পারবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। সর্বোপরি নাহিদ ইসলামের এমন ব্যাখ্যা সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের আশ্বস্ত করা তো দূরের কথা, দলের অভ্যন্তরেই ভাঙন ধরিয়েছে। সাধারণ মানুষ যারা নতুন এই দলটিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে করছিলেন, তাদের কাছে এনসিপি নিজেদের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
একটি রাজনৈতিক দলের জন্মলগ্নে যে আদর্শিক ইশতেহার ঘোষিত হয়, তা-ই মূলত সেই দলের প্রাণশক্তি। এনসিপি যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠ ছিল। তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বলেছিল। অবশ্য তখনই বলা হতো এক লিটার ডানপন্থি, ছয় চামচ সমান বামপন্থি ও আধা চামচ সমান ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু প্রতিনিধি মেলালেই অন্তর্ভুক্তি হয় না। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি একটা রাজনৈতিক দর্শন এবং সেই দর্শনে অনুসরণে এনসিপির ব্যর্থতা প্রকটভাবে প্রকাশ্য হয়, যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর আঘাতের ঘটনা ঘটতে থাকে। তখন এনসিপি রহস্যজনক নীরবতা অবলম্বন করেছে এবং মাঝেমধ্যে দায়সারা বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব সেরেছে।
এমন নীরবতার অর্থ কী? স্পষ্টতই, ক্ষমতার সমীকরণে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তাদের কাছে গৌণ। এর ফলে আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের থেকে আসা নেতাকর্মীরা দল ছেড়ে চলে যান। এনসিপি নামক দলটাকে যে জীবন রক্ষাকারী ‘ওরস্যালাইনে’র সঙ্গে তুলনা করা হতো, সেই ওরস্যালাইনে এক চিমটি লবণের অভাব পড়ায়, লবণ ছাড়া ভালোবাসার গল্প সামনে আসে।
এখন এনসিপির আদর্শিক বিচ্যুতির বড় প্রমাণ হয়ে সামনে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি ধর্মভিত্তিক ও ডানঘরানার দলের সঙ্গে তাদের সাম্প্রতিক নির্বাচনি জোট। যদিও দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন দাবি করেছেন যে, কনসেনসাস কমিশনের আলোচনায় সংস্কারের প্রশ্নে জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐকমত্য হয়েছে এবং একে তিনি 'দেশ পুনর্গঠনের রাজনীতি' হিসেবে দেখছেন, প্রকৃতপক্ষে এই যুক্তি কি দলটির অভ্যন্তরেই বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি করেছে?
এনসিপির অন্তত ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে লিখিতভাবে সমঝোতার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। কেবল তা-ই নয়, জামায়াতের সঙ্গে জোটের খবর প্রকাশ্য হওয়ার পর দলটির নারীনেত্রী তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনসহ একাধিক নেতা পদত্যাগ করেছেন। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন স্পষ্টভাবেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে জামায়াতের সঙ্গে গেলে এনসিপিকে চড়া মূল্য দিতে হবে এবং জামায়াত নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়। তবে তিনি পদত্যাগ না করে দলের ভেতর থেকেই বিরোধিতা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, এনসিপির নেতৃত্ব তৃণমূলের বা দলের মূল সংগঠকদের আবেগ-অনুভূতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। শর্টকার্টে ক্ষমতায় যাওয়ার তাড়নায় তারা আদর্শকে বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। যদিও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে পেছনে ফেলে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় যাওয়ার কোনো সহি রাস্তা নেই।
এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলে পরিচিত সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পক্ষ থেকে। মাহফুজ আলম স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে তিনি এনসিপির অংশ নন এবং জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে তাকে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—এই তথ্য সত্য নয়। তিনি এ-ও বলেছেন, যদি এমন প্রস্তাবও আসত তা তিনি গ্রহণ করতেন না, তার দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থান বজায় রাখাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মাহফুজ আলমের বক্তব্য এনসিপির নৈতিক পরাজয়কে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। তিনি মনে করেন, এনসিপিকে ‘বিগ জুলাই আম্ব্রেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আন্দোলনের কারিগররাই যখন মুখ ফিরিয়ে নেন, তখন সেই দলের নৈতিক ভিত্তি যে নড়বড়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নাহিদ ইসলাম বিষয়টিকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও বাস্তবতা ভিন্ন। যে আদর্শের কথা বলে তরুণদের সংগঠিত করা হয়েছিল, তার বিপরীতে গিয়ে করা সমঝোতা দলের গ্রহণযোগ্যতাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তথাকথিত 'মধ্যপন্থী' বা 'তৃতীয় শক্তি'র উত্থান ও পতনের ইতিহাস বেশ পুরনো। ২০০৭ সালের জুলাইয়ে, ১/১১-এর সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর নেতৃত্বে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি (পিডিপি) নামে একটি মধ্যপন্থী প্ল্যাটফর্ম গড়ার চেষ্টা হয়েছিল। তৎকালীন 'কিংস পার্টি' হিসেবে পরিচিত সেই প্ল্যাটফর্মটি সুশাসন ও সংস্কারের বুলি আওড়ালেও জনগণের প্রাণের দাবির সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ ছিল না। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগেই তাদের জোট ভেঙে যায় এবং দলটি রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারায়। ২০২০ সালে ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর মৃত্যুর পর একই বছরের নভেম্বরে নির্বাচন কমিশন ও দলটির রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে দেয়।
এনসিপি আজ যে পথে হাঁটছে, তা যেন সেই ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর ব্যর্থ ইতিহাসেরই এক সাম্প্রতিক সংস্করণ। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, পিডিপি ছিল একটি চাপিয়ে দেওয়া শক্তি, আর এনসিপি হলো একটি গণ-অভ্যুত্থানের ফসল। ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর দলটির অন্তত কোনো নৈতিক দায়বদ্ধতা ছিল না, অথচ এনসিপি কাঁধে নিয়ে চলেছে হাজারো শহীদের রক্ত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের নৈতিক বোঝা। এনসিপির এই পদস্খলন তাই কেবল দলীয় ব্যর্থতা নয়, একটি প্রজন্মের বিশ্বাসের অমর্যাদাও। এনসিপিও কি পিডিপর মতো একই পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে?
রাজনীতিতে কৌশল প্রয়োজন সত্য, তবে সেই কৌশল যদি মূল আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তা হিতে বিপরীত হতে বাধ্য। এনসিপি আধিপত্যবাদবিরোধী ঐক্যের কথা বললেও, সেই ঐক্যের আড়ালে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি সুসংগঠিত দলের সঙ্গে জোট না করেও এনসিপি হয়তো কয়েকটি আসন পেয়েও যেতে পারে, কিন্তু বিনিময়ে জুলাইয়ের প্রজন্ম যে ‘তৃতীয় ধারা’র স্বপ্ন দেখেছিল, সেই দলে পরিণত হওয়ার যোগ্যতা চিরতরে হারাবে।
আখতার হোসেন বা নাহিদ ইসলামের বক্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, তারা সংস্কারের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বাস্তবতা হলো, সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় জনসমর্থন কেবল জোটের গণিতে আসে না। মাহফুজ আলমের মতো নেতারা যখন বলেন যে বিকল্প ও মধ্যপন্থী তরুণ শক্তির উত্থান অত্যাসন্ন, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে এনসিপি আর সেই বিকল্প শক্তির প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে না। তারা এখন কেবল একটি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের ছোট শরিকে পরিণত হতে চলেছে, যাদের কোনো স্বকীয়তা অবশিষ্ট থাকবে না।
এনসিপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকে সুবিধাবাদের এক চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করা যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, কোনো দল যখন তার মৌলিক আদর্শ ও জন্মের প্রেক্ষাপট বিস্মৃত হয়, তখন সময়ের বিচারে তারা অনিবার্য পতনের দিকে ধাবিত হয়। জামায়াতের সঙ্গে এই নির্বাচনি জোট করে এনসিপি কেবল ভুলই করেনি, জুলাইয়ের আন্দোলনের তেজোদীপ্ত তরুণদের হৃদয়ে তাদের যে সম্মানের স্থান ছিল, তা ধূলিসাৎ করার পথ বেছে নিয়েছে। আদর্শিক এই বিচ্যুতি এনসিপির এনসিপির লজ্জাজনক পরিসমাপ্তি বা শেষের সূচনা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।