ডিম্বাণু হিমাগারে রাখলেই কি পরে গর্ভধারণ করা যায়?

ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রেখেছেন এমন অসংখ্য মানুষ গর্ভধারণ করতে পারছেন না বলে জানাচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 Nov 2022, 10:05 AM
Updated : 19 Nov 2022, 10:05 AM

পরিসংখ্যান অনুসারে যুক্তরাজ্যে ডিম্বাণু হিমাগারে রাখার প্রবণতা বেড়ে গেলেও তাতে সন্তান ধারণের শতভাগ সফলতা দেখছেন না স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা । 

গর্ভে সন্তান নিতে আইভিএফ পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কথা এতদিন গোপন রাখলেও, কিছুদিন আগে তা খোলাখুলি জানিয়েছেন হলিউড তারকা জেনিফার অ্যানিস্টন।

’কেউ যদি তখন ডিম্বাণু সংরক্ষণ করার বুদ্ধি দিত’, এমন আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি অ্যালুর ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে।

হলিউড তারকার এই অকপট হওয়াকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকেই।

তবে ডিম্বাণু সংরক্ষণকে আগামীর জন্য সঞ্চয় বলে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একমত নন বলে জানাচ্ছে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন।  

এ নিয়ে লন্ডনের কিংস ফার্টিলিটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ইপ্পোক্রাটিস সারিস বলেন, “জেনিফার অ্যানিস্টনের মতো একজন তারকা যখন এ নিয়ে কথা বলেন, তখন তাকে সত্যিই স্বাগত জানাতে হয়।

”কিন্তু ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা (গর্ভধারণের) কোনো ধরনের নিশ্চয়তা দেয় না।”

যুক্তরাজ্যে ডিম্বাণু জমিয়ে রাখার প্রবণতা এক দশকেই বেড়ে গেছে ১০ গুণ। দেশটির হিউম্যান ফার্টিলাইজেশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি অথরিটি (এইচএফইএ) সংস্থার হিসেবে, ২০০৯ সালে ২৩০ সাইকেল ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সেসময় শুধুমাত্র চিকিৎসার জন্যই ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হত।

২০১৯ সালে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হয়েছে দুই হাজার ৪০০ সাইকেল বলে জানাচ্ছে এইচএফইএ।

এখনকার ধারণা, নারী যদি ৩০ বছর বয়সে ডিম্বাণু হিমাগারে রাখেন তবে ৪০ বছর বয়সে আইভিএফ পদ্ধতিতে গর্ভধারণ করতে সফল হবেন।

ইউসিএলের নারীস্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষক ডা. জেইনেপ গারটিন অবশ্য এই ধারণাকে সঠিক মনে করেন না।

তার ভাষ্যে, ডিম্বাণু জমিয়ে রাখার এই চর্চা একটি ভ্রান্ত ধারণা গড়ে তুলছে।

”ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রেখেছেন এমন অসংখ্য মানুষ কিন্তু গর্ভধারণ করতে পারছেন না।”  

যুক্তরাজ্যের এইচএফইএ বলছে, ডিম্বাণু জমিয়ে রাখা সব বয়সী নারীর বিবেচনায় নিয়ে মাত্র  দুই শতাংশের বেলায় গর্ভধারণ সফল হতে দেখা গেছে।

৩৫ বছর বয়সের আগে যারা ডিম্বাণু জমিয়ে রেখেছেন, তাদের বেলায় আইভিএফের প্রতি চক্রে ২৭ শতাংশ সম্ভাবনা থাকে সন্তান জন্মদানের।

৩৫ বছরের পরে যারা ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন, তাদের বেলায় এই সম্ভাবনা কমে আসে ১৩ শতাংশে।

যুক্তরাষ্ট্রে ৩৮ বছর বয়সীদের মধ্যে ডিম্বাণু জমিয়ে রাখার প্রবণতা বেশি দেখা যায় বলে জানাচ্ছে দ্য গার্ডিয়ান। 

গারটিনের কাছে ডিম্বাণু জমিয়ে রাখা ’আগামীর জন্য সঞ্চয় নয়, বরং লটারির টিকেট কেনার মতো’।

আর লটারি টিকেট কেনার মতো ডিম্বাণু সংরক্ষণ করার খরচও অনেক বেশি।

যুক্তরাজ্যে ডিম সংগ্রহ ও হিমায়িত করার গড় খরচ পড়ে তিন হাজার ৩৫০ পাউন্ড। ওষুধের জন্য আরও খরচ হয় ৫০০ থেকে দেড় হাজার পাউন্ড।

এছাড়া হিমাগারে ডিম্বাণু রাখার জন্য প্রতি বছর ব্যয় করতে হয় ১২৫ থেকে সাড়ে তিনশ পাউন্ড।

ক্লিনিকগুলো সাধারণত পুরো ব্যয় নিয়ে স্পষ্ট ধারণা দিতে চায় না বলেও জানাচ্ছে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন। 

”বিজ্ঞাপনে যা লেখা থাকে তার চেয়েও বেশি ব্যয় করতে হয় অনেক ক্ষেত্রেই। এবং মানুষ এমন খাতে খরচ করছে যা থেকে চটজলদি কোনো ফল পাওয়া যায় না। ...এসব আসলে বড় ধরনের জুয়া খেলায় মেতে ওঠার মতো”, বললেন গারটিন।

”যখন সবাই বলেন, ডিম্বাণু ফ্রিজ করে রাখার এই সুবিধা নারীর জীবনে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে, তখন আসলে প্রশ্ন করা দরকার, কতজন এই সুবিধা নেওয়ার সামর্থ রাখে?”

আগে ১০ বছর পর্যন্ত ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখার সীমাবদ্ধতা ছিল। ফলে যে নারী ৩০ বছর বয়সে ডিম্বাণু জমিয়ে রাখেন, তাকে অবশ্যেই ৪০ বছর বয়সের মধ্যে এই ডিম্বাণু ব্যবহার করতে হবে।

তবে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, গত জুলাই মাসে এই আইনে রদ আনা হয়। ফলে এখন ৫৫ বছর পর্যন্ত ডিম হিমাগারে রাখা যাবে।

সময়সীমা বাড়ানোর এই দাবি তুলেছিলেন এবিসি আইভিএফের মেডিকেল পরিচালক এবং ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক গিটা নারগুন্ড। 

ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ”সময়সীমা বাড়ানোর ফলে এখন নারী তার তরুণ বয়সে ডিম্বাণু জমিয়ে রাখতে পারবে, যে বয়সে ডিম্বাণুর মান অত্যধিক ভালো হয়ে থাকে।

”এতে করে পরে সন্তান ধারণা সফলতার হার বাড়বে।”

ডিম্বাণু সংরক্ষণের সময়সীমা বেড়ে যাওয়ার অন্যদিকটি তুলে ধরলেন গারটিন।

তিনি বলেন, এখন বিজ্ঞাপনে কম বয়সী নারীদের দিয়ে প্রচারণা বেড়ে গেছে।

”যুক্তরাষ্ট্রে আমরা খুব কম বয়সী নারীদের ডিম্বাণু সংরক্ষণের বিজ্ঞাপনে দেখছি, তাতে বলা হচ্ছে কলেজ পাসের সময় এই পদ্ধতি হতে পারে যথার্থ উপহার। এসব আসলে একদম ঠিক নয়।”

ইপ্পোক্রাটিস সারিসের ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, ”নারীকে তার  পছন্দ মতো সময়ে সন্তান নেওয়াতে আমাদের সমর্থন করা দরকার।

”পলিসিতে বদল আনতে হবে যা পরিবারবান্ধব ফলাফল দেবে এবং নারীকে পেশা ও সন্তানের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে আশা করবে না।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক