এক যাত্রী বলেন, “সমস্যাগুলো যেন স্থায়ী হয়ে না যায়, তাদেরও প্রস্তুতির ঘাটতি থাকতে পারে; তারাও শিখুক, আমরাও শিখি।”
Published : 29 Dec 2022, 09:04 PM
যাত্রী পরিবহনের প্রথম দিন বেশ কিছু বিভ্রাটে পড়েছে দেশের প্রথম মেট্রোরেল; তবে উৎসবমুখর যাত্রীরা ভোগান্তিকে আমলে নেননি খুব একটা।
মাত্র ১০ মিনিটের যাত্রার জন্য একেকজন যাত্রীকে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়েছে; টিকেট পেয়ে ট্রেনে চড়ার পর অপেক্ষার কষ্ট মনে রাখেননি তারা। তবে সবারই প্রত্যাশা, প্রথম দিনের ছোটখাটো সমস্যা যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় উত্তরার দিয়াবাড়ি স্টেশন থেকে আগারগাঁওয়ে সরাসরি যাত্রীপরিবহন শুরু করে মেট্রোরেল। তবে আগারগাঁও প্রান্তে স্টেশনের টিকেট প্লাজার স্বয়ংক্রিয় ফটক খুলতে গিয়ে দেখা দেয় বিভ্রাট।
প্রায় আধঘণ্টা চেষ্টার পরও ফটক খুলতে না পেরে ‘টেনেহিঁচড়ে’ তা উন্মুক্ত করেন স্টেশন-কর্মীরা। ততক্ষণে উত্তরা প্রান্ত থেকে আসা অনেক যাত্রী আগারগাঁও থেকে আবার টিকেট কেটে ফিরেও যান।
শুরুতেই বিলম্বের মুখে পড়া আগারগাঁওয়ের যাত্রীরা কাউন্টারে গিয়ে টিকেট সংগ্রহের সময় দ্বিতীয় দফা বিপত্তিতে পড়েন। ভেন্ডিং মেশিনগুলোতে টাকা জমা দেওয়ার পর টিকেট বের হচ্ছিল না কারও কারও, আবার কাউন্টার কর্মীরাও ডেটা ইনপুট দিয়ে টিকেট বিক্রির সময় সার্ভারে ধীরগতির কারণে বিপত্তিতে পড়ছিলেন।
মেট্রোরেলে চড়তে ভোর ৫টা থেকে আগারগাঁও প্রান্তে অপেক্ষমাণ কামরুল ইসলাম বলেন, লাইনে সবার আগে দাঁড়িয়ে টিকেট পেতে একটু দেরি হল। মেট্রোরেল সবার জন্যই সম্পূর্ণ নতুন। শুরুর দিকে কাউকে দোষারোপ না করাই ভালো।
আগারগাঁও থেকে প্রতি ১০ মিনিট বা তার সামান্য বেশি সময় পর পর দিয়াবাড়ির উদ্দেশে বৈদ্যুতিক ট্রেনগুলো ছেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু টিকেট সরবরাহে ধীরগতিতে কোচের অধিকাংশ বগিই ছিল ফাঁকা।
সকাল ৯টার দিকে আগারগাঁও থেকে মেট্রোরেলে চেপে দিয়াবাড়ি যাওয়া সময় দেখা গেল, প্রতিটি কোচে যাত্রী ১০/১২ জন। তারা কেউ ফেইসবুকে লাইভ করছেন; কেউ এদিক-সেদিক তাকিয়ে নানা ভঙ্গিতে সেলফি তুলতে ব্যস্ত।
মেট্রোরেলে চড়তে কেমন লাগছে? মোহাম্মদপুর থেকে আসা আল আমিন বললেন, “এটা সত্যিই অন্যরকম অনুভূতি। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক গতি ওঠে যাচ্ছে। মনে হয় আমরা কোনো বিমানে বসে আছি, এক্ষুণি উড়াল দেবে।”
অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিন্নাত আলী মোল্লাকে পাওয়া গেল উত্তরার দিয়াবাড়ি স্টেশনে। সকালে কাওলা থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই মেয়েকে নিয়ে আগারগাঁও গিয়েছিলেন তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “এক কথায় চমৎকার। মেট্রোরেল আধুনিক পরিবহন। এটা নগরবাসীকে যানজট থেকে স্বস্তি দেবে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এখন সেই মেট্রোরেল বাস্তব রূপ নিয়েছে। মেয়েদের নিয়ে নিজেই ঘুরে আসতে পেরে স্বপ্নের মতো লাগছে।”
টিকেট সরবরাহে ধীর গতির কারণে আগারগাঁওয়ের মত দিয়াবাড়িতেও যাত্রীদের পড়তে হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষায়; স্টেশন এলাকায় অপেক্ষমাণ যাত্রীদের লাইন ছিল প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ। সেখানে কাউন্টারের দেখা পেতে দুই ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হয়েছে।
বেলা ১১টার দিকে শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের সংকেত পেয়ে জনা-ত্রিশেক যাত্রী হুড়মুড় করে ওঠেন দ্বিতীয় তলায় টিকেট কাউন্টারে।
এমনই একজন সাইফুল ইসলাম বলেন, “অনেক মানুষ, অনেক ভিড়। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর কাউন্টারে টিকেটের লাইনে দাঁড়াতে পারলাম। একটু কষ্ট হলেও প্রথম দিনে মেট্রোরেলে ওঠার সুযোগ পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। কারণ যেই লম্বা সারি, তাতে মনে হচ্ছে অনেকেই আজকে সুযোগ পাবে না।“
তিনিও বললেন, “শুরুর দিকে কিছু সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু এই সমস্যাগুলো যেন স্থায়ী হয়ে না যায়। তাদেরও প্রস্তুতির ঘাটতি থাকতে পারে। তারাও শিখুক, আমরাও শিখি।”
স্বামী-সন্তানসহ উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে আগারগাঁওয়ের উদ্দেশে মেট্রোরেলে চেপেছেন রাজধানীর ফার্মগেটের বাসিন্দা লতা মোস্তাফিজ।
লতার প্রথম মেট্রোরেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাসে আমাদের, বিশেষ করে মহিলাদের নানাপ্রকার হয়রানির শিকার হতে হয়। আমি নিজে তার ভুক্তভোগী। কিন্তু আজকে মেট্রোরেলে চড়ার পর মনে হচ্ছে মেট্রোরেলে মনে হয় হয়রানির ভয় নাই।”
প্রায় একই অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যাশার কথা বললেন অনেক নারী যাত্রী। মেয়েকে টিকেট কাটার জন্য পাঠিয়ে স্টেশনের এককোণে বেঞ্চে বসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ শামীমা সাত্তার। তাদের দুজনের গন্তব্যও আগারগাঁও।
তিনি বললেন, “পায়ে অনেক ব্যথা। দাঁড়াইয়া থাকতে কষ্ট হয়, তাই একটু বসছি। এইখানের এই বিষয়টা ভালো যে অসুস্থ লাগলে বসা যায়। আমরা বয়স্ক মানুষ। আমাদেরও তো মন চায় কোথাও যাই, একটু বাইর হই। কিন্তু সবসময় পারি না কারণ বাসে গেলে জ্যামে বইসা থাকতে হয়।”
দিয়াবাড়ি প্রান্তে সার্বিক বিষয়ে আলাপ করতে গিয়ে মেট্রোরেলের এক প্রকৌশলী সফটওয়্যারের ধীর গতির বিষয়টি জানালেন।
তিনি বলেন, “টিকেট ব্যবস্থাপনার জন্য যে সফটওয়্যার নির্মাণ করা হয়েছে সেটি এখন স্লো হয়ে যাচ্ছে। এগুলো আমরা ধীরে ধীরে ঠিক করছি। এর জন্য কয়েকদিন সময় দরকার। সার্ভারের সমস্যার কারণেই এমনটি হচ্ছে।”
কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষার পরও দুপুরে অনেক দর্শনার্থীকে মেট্রো ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছাড়াই ফিরে যেতে হয়েছে; কারণ পূর্ব ঘোষিত সময় অনুযায়ী ১২টার সময় এদিনের জন্য ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।