Published : 28 Jul 2026, 04:39 PM
আধুনিক রূপচর্চা বা ত্বক পরিচর্যার দুনিয়ায় দিন দিন বেশ জটিল ও বিজ্ঞান-নির্ভর হয়ে উঠছে। রাতারাতি ত্বক ফর্সা বা উজ্জ্বল করার পুরানো ধারণা থেকে বের হয়ে মানুষ এখন ঝুঁকছে ‘রিজেনারেটিভ স্কিনকেয়ার’ বা কোষ পুনরুজ্জীবনের দিকে।
এই ধারায় টিকটক থেকে শুরু করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের ক্লিনিক, সব জায়গায় এখন আলোচিত নাম ‘এক্সোজোম’ থেরাপি।
দামি ফেইশল সেরাম থেকে শুরু করে লেজার পরবর্তী চিকিৎসায়, এটি এখন রূপচর্চার নতুন ধারা।
রিয়েলসিম্পল ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এক্সোজোম আসলে কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক নয়, এটি সরাসরি কোষের নিজস্ব মেরামত ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত এক আধুনিক আবিষ্কার।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের চর্মরোগবিদ্যার সহযোগী ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক ডা. মনা গোহারা এক্সোজোমের বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতা এবং এর সুফল সম্পর্কে তথ্য জানান।
এক্সোজোম আসলে কী?
ডা. মনা গোহারা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে বলেন, “এক্সোজোম’কে মানবশরীরের কোষগুলোর মধ্যকার এক ধরনের প্রাকৃতিক 'কুরিয়ার সার্ভিস' বা পার্সেল প্যাকেজ হিসেবে ভাবা যেতে পারে। এরা এক কোষ থেকে অন্য কোষে বিভিন্ন প্রোটিন, লিপিড এবং জিনগত তথ্য বা ‘বার্তা’ বহন করে নিয়ে যায়, যা পাশের কোষগুলোকে নির্দেশ দেয় তাদের পরবর্তী কাজ কী হবে।”
ত্বক পরিচর্যার ক্ষেত্রে এই এক্সোজোমগুলো মূলত ত্বককে দ্রুত নিজে নিজে মেরামত করতে, কোলাজেন উৎপাদন বাড়াতে এবং ভেতরের প্রদাহ বা ফোলাভাব কমাতে সংকেত পাঠায়।
কেন এটি নিয়ে এত মাতামাতি?
এতদিন পর্যন্ত ত্বক পরিচর্যায় রেটিনল বা ভিটামিন ‘সি’-র মতো উপাদান ব্যবহার করা হত, যা সরাসরি ত্বকের ওপর বাহ্যিক উদ্দীপনা তৈরি করে। তবে এক্সোজোম থেরাপি সম্পূর্ণ আলাদা।
ডা. গোহারা বলেন, “এটি ত্বকে বাইরে থেকে কিছু চাপিয়ে দেয় না, বরং ত্বকের নিজস্ব যে কোলাজেন তৈরির ক্ষমতা রয়েছে, সেটিকে আরও উন্নত ও গতিশীল করে তোলে। এটি যেন একটি নির্মাণাধীন ভবনে নতুন হাতিয়ার যোগ করার বদলে কর্মীদের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার মতো চৌকশ কৌশল।”
এক্সোজোম থেরাপির সুফল
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও গবেষণায় এর বেশ কিছু সুফল পাওয়া গেছে।
দ্রুত ক্ষত নিরাময়: মাইক্রোনিডলিং বা লেজার ট্রিটমেন্টের মতো কসমেটিক সার্জারির পর ত্বকের লালচেভাব ও ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তুলতে চিকিৎসকেরা এক্সোজোম ব্যবহার করছেন।
বয়সের ছাপ দূর করা: এটি ত্বকের গভীরে গিয়ে ‘ফাইব্রোব্লাস্ট’ কোষকে সচল করে কোলাজেন উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা বলিরেখা ও চামড়া ঝুলে যাওয়া রোধ করে।
প্রদাহ ও একজিমা কমানো: সংবেদনশীল ত্বকের দীর্ঘস্থায়ী লালচেভাব বা প্রদাহ শান্ত করতে এই থেরাপি কার্যকর।
রেটিনল ও ভিটামিন-সি কি বাদ দিতে হবে?
এক্সোজোম বাজারে এলেও রূপচর্চার আদি ও আসল নিয়মগুলো পরিবর্তন করার কোনো প্রয়োজন নেই।
ডা. মনা গোহারা স্পষ্ট করে বলেন, “এক্সোজোম একটি আধুনিক সংযোজন হতে পারে, তবে সানস্ক্রিন, ময়েশ্চারাইজার, রেটিনয়েডস এবং ভিটামিন ‘সি’, সব সময় সুস্থ ত্বকের মূল ভিত্তি বা প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে থাকবে।”
এক্সোজোমকে প্রধান উপাদানের পরিবর্তে একটি ‘সাপোর্টিং প্লেয়ার’ বা সহায়তাকারী হিসেবে রুটিনে যোগ করা উপকারী।
যাদের জন্য এক্সোজোম ব্যবহার করা নিষেধ
মেডিকেল সুরক্ষার স্বার্থে কিছু সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এক্সোজোম থেরাপি পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত।
সক্রিয় চর্মরোগ বা সংক্রমণ: ত্বকে কোনো সক্রিয় ব্যাকটেরিয়াল বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণ থাকলে তা পুরোপুরি ভালো হওয়ার আগে এই থেরাপিতে যাওয়া যাবে না।
ক্যান্সারের ইতিহাস: যাদের বর্তমানে ক্যান্সার রয়েছে বা অতীতে ক্যান্সারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও ওনকোলজিস্টের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া এটি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মা: গর্ভাবস্থায় এবং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় এক্সোজোম ব্যবহারের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি, তাই এই সময়ে এটি বর্জন করা নিরাপদ।
পরামর্শ
ক্লিনিক বা ডাক্তারের চেম্বারে ব্যবহৃত এক্সোজোম থেরাপির কার্যকারিতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলেও, বাজারে প্রসাধনী বিক্রি করে এমন প্রতিষ্ঠান বা ওষুধের দোকানে এক্সোজোম সেরাম ও ক্রিম পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর মান ও কার্যকারিতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা করছেন।
তাই কোনো বিলাসবহুল বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে হুট করে দামি এক্সোজোম পণ্য না কিনে, ত্বকের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষায় সাধারণ রূপচর্চার রুটিন ধরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন
ত্বক পরিচর্যায় মস্তিষ্কও থাকে ভালো