Published : 27 Aug 2026, 06:09 PM
‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি,
ছড়িয়ে দিল আকাশে আকাশে।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এই লাইনের মতোই শরৎ আসে আলো আর স্বচ্ছতার আবহ নিয়ে।
বর্ষার মেঘলা দিন পেরিয়ে আকাশ যখন নীল হয়ে ওঠে, সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়, কাশফুলে শুভ্র হয় মাঠ, তখন পোশাকেও একটু হালকা আমেজ মানিয়ে যায় অর্থাৎ সরলতায়, পরিমিত ফ্যাশনই হয় শরতের রূপ।
তবে শরতের পোশাক শুধু সাদা শাড়ি বা নীলে আটকে নেই। বরং ঋতুর আবহকে নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই হতে পারে সুন্দর পছন্দ।
শরতের পোশাক হালকাই ভালো
শরৎ এলেও আবহাওয়া পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে যায় না। সকাল ও সন্ধ্যায় স্বস্তি থাকলেও দুপুরে রোদ বেশ তীব্র হতে পারে। তাই পোশাক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কাপড়ের আরামই মূল চাহিদা হতে পারে।
“সেক্ষেত্রে সুতি, খাদি, তাঁত কিংবা পাতলা ও বাতাস চলাচল করতে পারে এমন কাপড় শরতের জন্য বেশ উপযোগী”, বলেন ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ ও বিবিয়ানার প্রধান লিপি খন্দকার।
শাড়ি পরতে চাইলে হালকা তাঁতের বা সুতি শাড়িই মানানসই হবে। আর শাড়ি না চাইলে কুর্তি, সালোয়ার-কামিজ, লম্বা জামা, কাফতান কিংবা ঢিলেঢালা পোশাক তো আছেই।
“অর্থাৎ শরতের ফ্যাশনে পোশাক যেন শরীরের ওপর বাড়তি ভার হয়ে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখাই মূল কথা”, বলেন তিনি।
সাদা-নীলের বাইরে শরতের রং
শরৎ বললেই সাদা আর নীলের কথা মনে আসে। তবে পোশাকে শরৎকে ধারণ করার জন্য শুধু এই দুটি রংয়ের ওপর নির্ভরতার প্রয়োজন নেই।
কারণ অফ-হোয়াইট, হালকা হলুদ, মাটি রং, কোমল কমলা, ফিকে গোলাপি, হালকা সবুজ বা লালের নরম আভাও শরতের পোশাকে মানিয়ে যায়।
সাদা শাড়ির সঙ্গে নীল পাড় যেমন চোখে প্রশান্তি আনে, তেমনি হলুদ পোশাকের সঙ্গে লাল টিপ এনে দিতে পারে উৎসবের আবহ।
আবার একেবারে একরঙা পোশাকের সঙ্গে বিপরীত রংয়ের ছোট ব্যাগ বা জুতা যোগ করেও সাজে বৈচিত্র্য আনা যায়।
লিপি খন্দকার বলেন, “তবে শরতের পরিমিত ফ্যাশনের মূল কথা হল— সবকিছু একসঙ্গে ব্যবহার না করা। পোশাকে যদি উজ্জ্বল রং থাকে, তাহলে গয়না বা অন্যান্য অনুষঙ্গ একটু সংযত রাখলেই প্রাকৃতিকভাব আসবে।”
নকশায় প্রকৃতির গল্প
“শরতের পোশাকে প্রকৃতির ছোঁয়া আনতে ফুল, পাতা, লতা, মেঘ কিংবা বিমূর্ত নকশাই ভালো মানাবে। তবে নকশা যত বেশি হবে, বাকি সাজ ততটাই সাধারণ রাখতে হবে”, পরামর্শ দেন রূপ বিশেষজ্ঞ ও জারা'স বিউটি লাউঞ্জে অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টারের প্রধান ফারহানা রুমি।
ছোট ফুলের নকশার সুতি শাড়ির সঙ্গে সাধারণ ব্লাউজ, ছোট কানের দুল ও টিপই যথেষ্ট হতে পারে। আবার একেবারে সাধারণ পোশাক হলে একটু নকশা করা ওড়না বা হাতে তৈরি গয়না দিয়ে সাজে আলাদা মাত্রা যোগ করা যায়।
রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’র শরৎ-প্রকৃতির আবহের কথা মনে করলে বোঝা যায়, প্রকৃতির সৌন্দর্য অনেক সময় খুব অল্প উপকরণেই ধরা দেয়। ফ্যাশনেও সেই দর্শনটি কাজে লাগানো যায়— কম, কিন্তু যথাযথ।
অফিসে শরতের সাজ
অফিসের পোশাকে শরতের রং আনার সুযোগ আছে, তবে সেটি হতে হবে সংযত। হালকা নীল, ধূসর, অফ-হোয়াইট, মাটির রং কিংবা কোমল হলুদের পোশাক কর্মক্ষেত্রে মানিয়ে যেতে পারে।
শাড়ি পরলে পাতলা পাড়ের শাড়ি, আর কুর্তি পরলে ছোট নকশার পোশাক বেছে নেওয়া যায়।
গয়না খুব বেশি না রেখে ছোট কানের দুল, ঘড়ি, পাতলা চুড়ি বা সাধারণ মালা ব্যবহার করা যায়। চুল নিচু করে বাঁধা, সাধারণ খোঁপা কিংবা পরিপাটি করে খোলা রাখা যেটিতে স্বাচ্ছন্দ্য, সেটিই ভালো।
তবে অফিসের সাজে জরুরি হল, পোশাক যেন কাজের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
ঘুরতে গেলে সাজ হোক মুক্ত
শরতের নীল আকাশ, কাশফুল বা গ্রামের পথ দেখতে বের হলে পোশাকে একটু বেশি রংয়ের খেলা রাখা যায়। লম্বা পোশাক, কুর্তি, আরামদায়ক প্যান্ট বা হালকা শাড়ি সবই হতে পারে ঘোরাঘুরির সঙ্গী।
তবে ভ্রমণের পোশাক শুধু ছবিতে সুন্দর দেখালেই হবে না, হাঁটাচলা করা যায় কি-না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সঙ্গে রাখা যেতে পারে সানগ্লাস, ছোট ব্যাগ, হালকা ওড়না এবং আরামদায়ক জুতা। কাশফুলের মাঠে ছবি তুলতে গিয়ে পোশাক সামলাতেই যেন ব্যস্ত থাকতে না হয়, সেটা খেয়ালে রাখা জরুরি।
আড্ডার সাজে নিজের মতো
বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলের আড্ডায় সাজের ক্ষেত্রে খুব বেশি হিসাব করার প্রয়োজন নেই। সাধারণ কুর্তির সঙ্গে পছন্দের প্যান্ট, ছোট টপের সঙ্গে আরামদায়ক নিচের পোশাক কিংবা সাধারণ শাড়ির সঙ্গে ছোট কানের দুল—এমন সাজই যথেষ্ট।
চুল খোলা রাখা যায়, চাইলে সাধারণ পনিটেল বা অগোছালো খোঁপাও হতে পারে। আড্ডার সাজে একটু ব্যক্তিগত ছোঁয়া বরং বেশি সুন্দর। এক্ষেত্রে প্রিয় রংয়ের টিপ, পুরানো কোনো গয়না কিংবা বহুদিনের পছন্দের ব্যাগ—এসব ছোট বিষয়ই সাজকে নিজের করে তোলে।
দাওয়াতে একটু বাড়তি আয়োজন
দাওয়াত বা সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে শরতের পরিমিত ফ্যাশনে কিছুটা উৎসব যোগ করা যায়। তাঁত বা সুতি শাড়ির সঙ্গে নকশা করা ব্লাউজ, কানের দুল এবং পরিমিত গয়না যথেষ্ট হতে পারে।
“সন্ধ্যার সাজে দিনের তুলনায় ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টক ব্যবহার করা যায়। চোখে কাজল বা হালকা চোখের সাজও মানিয়ে যাবে। তবে পোশাক, গয়না, চুল ও মুখের সাজ—সবকিছুকে একসঙ্গে ভারী করে তোলা যাবে না”, পরামর্শ দেন ফারহানা রুমি।
গয়নায় ফিরিয়ে আনা মাটির টান
শরতের পোশাকে দেশীয় গয়নার ব্যবহার বেশ মানানসই। মাটির তৈরি কানের দুল, কাঠের বা হাতে তৈরি গয়না সাধারণ পোশাকেও আলাদা চরিত্র এনে দিতে পারে।
সাদা বা একরঙা পোশাকের সঙ্গে মাটির রঙের গয়না আবার রঙিন পোশাক হলে ছোট গয়না ব্যবহার করাই ভালো।
চুলে শরতের সরলতা
শরতের সাজে চুলের ক্ষেত্রে খোলা চুল, হালকা ঢেউ, সাধারণ বেণি কিংবা নিচু করে বাঁধা খোঁপা ঋতুর আবহের সঙ্গে যায়।
শাড়ির সঙ্গে খোঁপায় সাদা ফুল ব্যবহারে শরত আবহ তৈরি হয়। তবে বেশি ফুলের বদলে একটি বা দুটি সাদা ফুলই যথেষ্ট।
বৃষ্টির রেশ মাথায় রেখে
শরৎ এলেই বর্ষার সব রেশ শেষ হয়ে যায় না। হঠাৎ বৃষ্টি নামতে পারে, রাস্তায় পানি বা কাদা থাকতে পারে। তাই বাইরে যাওয়ার সময় পোশাক বাছাইয়ে বাস্তবতাও মাথায় রাখা দরকার।
অতিরিক্ত লম্বা পোশাক বা সহজে নষ্ট হয়ে যায় এমন কাপড় এড়িয়ে চলা ভালো। আর জুতার ক্ষেত্রেও এমন কিছু বেছে নেওয়া ভালো, যা ভেজা রাস্তায় হাঁটার জন্য সুবিধাজনক।
নিজের জন্যও সাজ
সব সাজের পেছনে কোনো অনুষ্ঠান বা সামাজিক কারণ থাকতে হবে—এমন নয়। শরতের এক বিকেলে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও নিজের পছন্দের শাড়ি পরা যায়। চুলে ফুল দেওয়া যায়, টিপ পরা যায় বা আলমারিতে পড়ে থাকা পোশাকটি আবার বের করে নেওয়া যায়।
যে পোশাকে নিজেকে ভালো লাগে, সেটিই হতে পারে সুন্দর পোশাক।
ছবি: সজল অলক।
আরও পড়ুন
গুটিপার ব্যাগে দেশীয় নান্দনিকতার ছোঁয়া