১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

অনুভূতি বোঝেন, তবু মন কেন ভালো হয় না?

নিজের খারাপ লাগার কারণটা বুঝেও শান্ত হতে না পারলে, বুঝতে হবে মন থেকে অনুভব করার বদলে মাথা দিয়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Oct 2026, 04:30 PM

Updated : 14 Oct 2026, 04:30 PM

মন খারাপের কারণ হয়ত জানেন। কে কষ্ট দিয়েছেন, কোন ঘটনা আঘাত করেছে বা পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো উচিত- সবই পরিষ্কার। তবু মনের ভেতরের অস্বস্তি কাটছে না।

বরং একই ঘটনা নিয়ে বারবার ভাবছেন, নিজের প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা খুঁজছেন, যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝাচ্ছেন যে এতটা কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তাতেও স্বস্তি মিলছে না।

এমন অভিজ্ঞতার পেছনে থাকতে পারে অনুভূতিকে যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করার প্রবণতা।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘বুদ্ধিবৃত্তিকীকরণ’। অর্থাৎ, কোনও কঠিন অনুভূতিকে সরাসরি অনুভব করার বদলে যুক্তি, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সামলানোর চেষ্টা করা।

এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও, নিজের অনুভূতি বুঝে নেওয়ার পথও আড়াল হয়ে যেতে পারে।

অনুভূতি বিশ্লেষণ করাই কি যথেষ্ট?

কোনও ঘটনা কেন ঘটেছে, তা বোঝার চেষ্টা করা স্বাভাবিক। সম্পর্ক ভেঙে গেলে দুজনের মধ্যে কোথায় সমস্যা ছিল, কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতা এলে সেটার কারণ কী বা কাছের কেউ কষ্ট দিলে কেন এমন আচরণ করলেন— এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজনীয়ও হতে পারে।

তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রতিটি অনুভূতিকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যক্তি নিজের অনুভূতিটিকেই এড়িয়ে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থতা-বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জেসি গোল্ড রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “কঠিন পরিস্থিতিতে অনেকেই ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করতে, বিশ্লেষণ করতে বা সমাধান খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে সেই মুহূর্তে নিজের অনুভূতির সঙ্গে কোন ধরনের সংযোগই রাখেন না। ফলে শুধু যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টায় অনুভূতিগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় না।”

একইভাবে, কোনও সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর হয়ত বুঝতে পারেন যে, সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। তবু মানুষটিকে মনে পড়তে পারে, ব্যক্তিটির অভাবও অনুভব করতে পারেন।

এক্ষেত্রে সম্পর্কটি শেষ হওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, এ কথা জানা আর বিচ্ছেদের কষ্ট অনুভব করা দুটি আলাদা বিষয়। এভাবে একটি অন্যটিকে বাতিল করে দেয় না।

কোন লক্ষণগুলো খেয়ালের বিষয়?

যুক্তি দিয়ে অনুভূতি সামলানোর প্রবণতা আছে কি-না, তা বোঝার একটি উপায় হল নিজের কথা বলার ধরন লক্ষ করা।

কেউ মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে হয়ত পুরো ঘটনা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে পারেন। কীভাবে সমস্যা তৈরি হল, কার কী ভুল ছিল, ভবিষ্যতে কী করা উচিত— সবই বলতে পারেন।

অথচ নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে আটকে যান। বলতে পারেন না যে নিজেই আসলে আহত, একাকী, অপমানিত কিংবা ভীষণ ভাবে হতাশ।

দম্পতি ও পারিবারিক সম্পর্কবিষয়ক মার্কিন থেরাপিস্ট ডা. নারি জেটার এই ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা করেন যে, “এমন পরিস্থিতিতে অনুভূতির পরিবর্তে সমস্যার বিশ্লেষণে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। ফলে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আবেগগত সংযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।”

আরেকটি লক্ষণ হল, অনুভূতিকে এমন একটি সমস্যা হিসেবে দেখা, যা যত দ্রুত সম্ভব দূর করতে হবে।

মন খারাপ হলেই ভাবছেন, কী করলে এটি চলে যাবে; রাগ হলে সঙ্গে সঙ্গে তার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা খুঁজছেন বা হতাশা কাটাতে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন।

কাজের মধ্যে ডুবে থাকা, অবসর পেলেই অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া বা প্রতিটি ঘটনার পেছনে অতীতের কারণ খুঁজতে থাকাও কখনও কখনও অনুভূতি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় হয়ে উঠতে পারে।

এছাড়া কষ্টের মধ্যেও বাইরে থেকে অতিরিক্ত শান্ত ও সংযত দেখানো আরেকটি লক্ষণ। হয়ত বিচ্ছেদ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা কর্মক্ষেত্রের চাপ নিয়ে এমনভাবে কথা বলছেন, যেন ঘটনাটি অন্য কারও জীবনে ঘটেছে।

সবকিছু বিশ্লেষণ করছেন, তবে নিজের কষ্টের কথা বলছেন না।

ডা. জেসি গোল্ড মন্তব্য করেন, “অনুভূতি থেকে এমন দূরত্ব তৈরি হলে অন্যদেরও, আপনার প্রয়োজন বোঝা কঠিন হতে পারে।”

সব অনুভূতির কি ব্যাখ্যা প্রয়োজন?

কোনও কারণে কষ্ট পেলে সেই কষ্টের যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকতে হবে এমন ধারণা অনেকের কাছেই স্বাভবিক।

কেউ ইচ্ছা করে আঘাত না দিলেও খারাপ লাগতে পারে। ঘটনাটি অন্যদের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সেটি নিজের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

আবার কোনও সম্পর্ক ক্ষতিকর জেনেও, সেই সম্পর্কের মানুষটির জন্য মন খারাপ হতে পারে।

এধরনের অনুভূতিকে ভুল প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। যুক্তি দিয়ে বোঝা যায় ঘটনা কেন ঘটেছে; কিন্তু সেই বোঝাপড়া অনুভূতির তীব্রতা সঙ্গে সঙ্গে কমিয়ে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ডা. নারি জেটার মনে করিয়ে দেন, “অনুভূতি সব সময় নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই নিজেকে বারবার বোঝানো যে রাগ করা উচিত নয়, কষ্ট পাওয়ার কোনও কারণ নেই বা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া দরকার— এসব চিন্তা কখনও কখনও মানসিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।”

নিজেকে বলা যেতে পারে, ‘আমি জানি ঘটনাটি কেন ঘটেছে, তবু আমার কষ্ট হচ্ছে।’ এই স্বীকারোক্তিতে সমস্যার সমাধান নেই, তবে অনুভূতিকে অস্বীকার না করার সুযোগ রয়েছে।

নিজের কষ্টকে স্বীকার করা মানে সেই কষ্টের কাছে হেরে যাওয়া নয়; বরং কী ঘটছে, তা বুঝতে শুরু করা।

অনুভূতি সামলানোর অভ্যাস গড়বে যেভাবে

অনুভূতি বিশ্লেষণের পরিবর্তে, সেটা অনুভব করতে শেখার প্রথম ধাপ হল- নিজের মনের অবস্থাকে নির্দিষ্ট করে চেনা।

শুধু ‘ভালো লাগছে না’ বলার বদলে নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন, ‘আমি কি হতাশ, অপমানিত, প্রত্যাখ্যাত, উদ্বিগ্ন, একাকী নাকি ক্ষুব্ধ?’

একই সঙ্গে একাধিক অনুভূতিও কাজ করতে পারে। সেগুলোর নাম দিতে পারলে নিজের অভিজ্ঞতা বোঝা সহজ হতে পারে।

এরপর সঙ্গে সঙ্গে সমাধান খোঁজার তাগিদ থেকে একটু বিরতি নিতে হবে। মন খারাপের কারণ খুঁজে বের করা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা প্রয়োজন হতে পারে, তবে প্রতিটি মুহূর্তেই সেটা করতে হবে না।

ডা. নারি জেটার পরামর্শ দেন, “কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা, ধীরে শ্বাস নেওয়া বা শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা লক্ষ করা যেতে পারে। বুক ভার লাগছে কি-না, পেশিতে টান অনুভব করছেন কি-না বা কান্না পাচ্ছে কি-না, এসব লক্ষ করা নিজের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করতে পারে।”

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?

নিজের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করেও যদি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অস্বস্তি না কাটে, সম্পর্কের মধ্যে বারবার একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয় বা উদ্বেগ ও মন খারাপ কাজকে ব্যাহত করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে।

পুরানো খবর:

সারাদিন শান্ত ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল
মানসিক স্বস্তিতে দেয়ালচিত্র শোভিত পথ
দয়ালু আর ভালো মানুষ হওয়া এক বিষয় নয়
পুরুষ যে কারণে বয়সে বড় নারীর প্রেমে পড়েন