Published : 06 Aug 2026, 03:39 PM
ওজন কমানো বা মেদ ঝরানোর ডায়েট বলতে সাধারণত কী খাওয়া হচ্ছে এবং কতটা ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সেটাই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।
তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও কালানুক্রমিক জীববিদ্যা বা ‘ক্রোনোবায়োলজি’-র চিকিৎসকদের মতে, শুধু ‘কী’ খাওয়া হচ্ছে তা নয়, খাবার ‘কখন’ খাওয়া হচ্ছে, সেটাও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বজুড়ে এখন স্বাস্থ্য সচেতনদের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে ‘সারকাডিয়ান ফাস্টিং’ বা ‘জৈবিক ঘড়ি মেনে উপবাস’।
এর প্রধান বিষয় হল, শরীরের অভ্যন্তরীণ ২৪ ঘণ্টার প্রাকৃতিক ঘড়ি বা সারকাডিয়ান রিদমের সঙ্গে মিল রেখে সূর্য ডোবার আগেই রাতের খাবার শেষ করা এবং রাতভর শরীরকে সম্পূর্ণ বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া।
নোবেলজয়ী গবেষণা ও সারকাডিয়ান ফাস্টিংয়ের বিজ্ঞান
২০১৭ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী তিন মার্কিন বিজ্ঞানী জেফ্রি হল, মাইকেল রসব্যাশ এবং মাইকেল ইয়ং, তাদের গবেষণায় প্রমাণ করেন যে, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের শরীরের ভেতরে কোষ স্তরে একটি নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় ঘড়ি কাজ করে, যা সূর্যের আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে আবর্তিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘সাল্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিজ’-এর অধ্যাপক এবং কালানুক্রমিক পুষ্টিবিজ্ঞানের প্রধান গবেষক ডা. সাচিন পান্ডা, দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষের পাচনতন্ত্র বা মেটাবলিজম দিনের আলোতে বেশি সক্রিয় থাকে এবং সূর্যাস্তের পর প্রাকৃতিকভাবেই তা ধীর হয়ে যায়।
যখন কেউ রাত ৯টা বা ১০টায় রাতের খাবার গ্রহণ করেন, তখন শরীর সেই খাবার সঠিকভাবে হজম করতে পারে না।
ফলে ইনসুলিন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে রক্তে অতিরিক্ত চিনি সরাসরি পেটের জেদি চর্বি বা ‘ভিসেরাল ফ্যাট’ হিসেবে জমা হতে শুরু করে।
সারকাডিয়ান ফাস্টিংয়ের প্রধান ৩ সুফল
চিকিৎসা সাময়িকী ‘সেল মেটাবলিজম’-এ প্রকাশিত ডা. সাচিন পান্ডা ও তার দলের এক মানব ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই ফাস্টিংয়ের ৩টি সুফল প্রমাণিত হয়েছে।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ
দিনের আলো থাকতে থাকতে অর্থাৎ সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করলে শরীরের অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়। এটি রক্তে ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এবং মেদ কমাতে ভূমিকা পালন করে।
কোষের অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা বা ‘অটোফেজি’
সারকাডিয়ান ফাস্টিংয়ে সাধারণত প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টার একটি স্বাভাবিক উপবাসের চক্র তৈরি হয় (যেমন: সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৯টা)। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, উপবাসের ১২ ঘণ্টা পার হওয়ার পর শরীরের কোষগুলো প্রাকৃতিকভাবেই নিজেদের ভেতর জমে থাকা মৃত কোষ, টক্সিন এবং ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান নিজে নিজেই ধ্বংস করতে শুরু করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ‘সেলুলার ক্লিন-আপ’ প্রক্রিয়াকে ‘অটোফেজি’ বলা হয়।
গভীর ঘুম ও হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস
ঘুমানোর অন্তত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করলে, পরিপাকতন্ত্রকে খাবার হজম করার জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় না। ফলে শরীরের মূল তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পায় এবং মস্তিস্কে ‘মেলাটোনিন’ নামক ঘুমের হরমোন সঠিক মাত্রায় নিঃসৃত হয়।
এটি গভীর ঘুম নিশ্চিত করার পাশাপাশি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি এক ধাক্কায় অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
সারকাডিয়ান ফাস্টিং করার ৩টি সহজ নিয়ম
এই ফাস্টিং বা উপবাসের রুটিন দৈনন্দিন জীবনে সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে চিকিৎসকেরা ৩টি নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
সূর্যাস্তের সঙ্গে রাতের খাবারের সমন্বয়: প্রতিদিনের রাতের খাবার অবশ্যই সন্ধ্যা ৬টা থেকে সর্বোচ্চ ৭টা ৩০ মিনিটের মধ্যে শেষ করা উপকারী। সূর্য ডোবার পর ভারী কোনো খাবার, নাস্তা বা চা-কফি পুরোপুরি বর্জন করতে হবে।
রাতের উপবাসে পর্যাপ্ত পানি পানের নিয়ম: রাতের খাবার শেষ করার পর থেকে সকালের প্রাতঃরাশ বা নাস্তা করার পূর্ব পর্যন্ত কোনো ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না। তবে এই সময়ে শরীরের অভ্যন্তরীণ দূষিত পদার্থ দূর করতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে পর্যাপ্ত পরিমাণ সাধারণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
সকালের নাস্তায় পুষ্টির ভারসাম্য: উপবাসের চক্র শেষ করে সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে প্রাতঃরাশ বা সকালের নাস্তা করা ভালো। সকালের খাবারে জটিল কার্বোহাইড্রেইটের (যেমন: ওটস বা লাল আটার রুটি) সঙ্গে উচ্চ প্রোটিন (ডিম বা ডাল) এবং ভালো চর্বি, যেমন- অলিভ অয়েল, রাখলে সারাদিন মেটাবলিক রেট বা বিপাক প্রক্রিয়া ভালো থাকে।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্যকর হলেও ওজনের বারোটা বাজায় যেসব খাবার