Published : 28 Feb 2026, 04:44 PM
শহুরে কোলাহল আর যান্ত্রিকতার দেয়াল ভাঙতে খুব বেশি দূরের পথ পাড়ি দিতে হয়নি। ঢাকার একদম কাছেই গাজীপুরের শ্রীপুরে কালমেঘা গ্রাম, সেখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এক রিসোর্ট।
গ্রামের নামেই দেওয়া হয়েছে ‘কালমেঘা কান্ট্রি ক্লাব এবং রিসোর্ট’। বাইরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে খুব একটা অনুমান করা যায় না রিসোর্টের বিশালতা কতটুকু।
গেইটে প্রবেশ করতেই রক্ষীদার জানালেন, আমাদের বরণ করা হবে ঢোল ও বাঁশির সুরে। পল্লীবাংলার সেই চিরচেনা বাঁশির সুর, আর ঢাক-ঢোলের তাল মিলিয়ে যখন আমাদের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হল- মনে হচ্ছিল যান্ত্রিক জীবনের জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে প্রকৃতি আমাদের বরণ করছে এক রাজকীয় আভিজাত্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের আবহ তৈরি করার চেষ্টা চলেছে রিসোর্টটিতে। প্রধান ফটক থেকে কিছুটা ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখ পড়বে ‘হোয়াইট হাউজ’। প্রথমে একটু অবাক হলেও, পরক্ষণেই বুঝলাম- ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউজের আদলে তৈরি করা এই ভবনের কাজ এখনও চলছে।
ডেস্টিনেইশন ওয়েডিংয়ের সুবিধা দিতেই তৈরি করা হচ্ছে এই ‘হাউজ’টি।
১৭ একর বনভূমির ওপর গড়ে ওঠা এই রিসোর্টে প্রায় একই রকম দেখতে ২০টি ভিলা রয়েছে। যেগুলোর রয়েছে পাঁচটি ধরন- রয়্যাল ভিলা, প্রেসিডেনশিয়াল ভিলা, সুপার লাক্সারি ভিলা, লাক্সারি ভিলা, ডিলাক্স ভিলা।
প্রতিটি ভিলা আলাদা, ব্যক্তিগত এবং প্রশস্ত। তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার বর্গফুটের এই ভিলাগুলোতে আলাদা ‘পুল’ ও ‘জাকুজি’ সুবিধা রয়েছে।
আমাদের থাকার জায়গা ছিল ৫৪ নম্বর ভিলা। ডুপ্লেক্স ঘরানার এই ভিলার দরজা খুলতেই চোখ পড়ল প্রশস্ত কক্ষ, পরিপাটি আসবাব, আর বনভূমির দিকে খোলা বারান্দা। পাশেই সুইমিং পুল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখা গেল তিনটি বড় বেডরুম।
অবসরে নানান বৈচিত্র্য
রমজান মাস থাকায় দুপুরের খাবারের চিন্তা ছিল না। জানা গেছে, এইখানে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো মানেই শুধু বিশ্রাম নয়, আছে নানান আয়োজন।
গলফ, ঘোড়ায় চড়া, লন টেনিস, ফুটবল, বাস্কেটবল, ক্রিকেট, সাইক্লিং, কায়াকিং, বোট রাইড, জঙ্গল ওয়াক, মাছ ধরা, আর্চারি, লাইভ ফোক মিউজিক, শিশুদের ‘প্লে জোন’, টেবিল টেনিস, ক্যারম বোর্ডসহ সব বয়সের জন্য কিছু না কিছু রয়েছে। এমনকি রয়েছে ‘পামিস্ট্রি’র মতো ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা।
আমাদের ভিলা থেকে পাঁচ মিনিট হেঁটে গেলেই রয়েছে ‘বোট রাইডিং’য়ের সুবিধা। পড়ন্ত বিকেলে লেকে ‘বোট রাইডিং’ ও কায়াকিং করে ঘোড়ায় চড়তে গেলাম। রোজার ক্লান্তি ভুলে মনটা যেন ভরে উঠেছিল নিখাদ প্রশান্তিতে।
ইফতারের আগে ভিলাতে এসেই দেখা গেল খাবারের আয়োজন ছিল বৈচিত্র্যময়। ইফতার, ডিনার, সেহেরিতে সব মিলিয়ে প্রায় ৫৪ ধরনের খাবারের পদ ছিল।
রমজান ঘিরে কালমেঘা রিসোর্ট ভিন্ন ধরনের প্যাকেজ সুবিধা দিচ্ছে।
রিসোর্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তারেক বলেন, “এই রমজান মাসে একটা ভিন্ন ধরনের প্যাকেজ আমরা চালু করছি। কেউ ৩৫শ’ টাকার ইফতার মেন্যু কিনলে আমরা তাদের রাতের জন্য ভিলা, প্রাইভেট সুইমিং পুলসহ সব অ্যাক্টিভিটিস উপভোগ করার সুযোগ করে দিচ্ছি। সাথে আমাদের ডিনার এবং সেহরির খাবারের প্যাকেজটা নিলে একদিনের রিসোর্টে থাকার অভিজ্ঞতা পাবেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের এইখানে এখন প্রায় ২০টির মতো ভিলা চালু আছে, বাকিগুলোর কাজ চলছে। একটা ভিলাতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ জন মানুষ থাকতে পারে। বড় ভিলায় ১৮ থেকে ২০ জন থাকতে পারে। অতিথিদের প্রাইভেসি মেনটেইন থেকে খাবারের কোয়ালিটিতে আমরা নজর রাখছি।”
ঢাকায় এই সময় শীতের তীব্রতা না থাকলেও কালমেঘায় এখনও শীতের আবহ রয়েছে। ইফতারের পর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে খোলা আকাশের নিচে ব্যাডমিন্টন খেললাম।
জানতে পারলাম আমাদের জন্য গানের আসরের আয়োজন করা হয়েছে। রাত ৯টায় এল ‘মন বাউল’ দল; যারা রিসোর্টের পাশেই থাকেন। কোনো দর্শনার্থী এলে তারা চলে আসেন গান শোনাতে। দলের প্রধান ঢোল বাদক মোহাম্মদ মোস্তফা।
তিনি বলেন, "আমরা এই কালমেঘা রিসোর্টেই গান করি। রিসোর্টের এই কোম্পানিতে আমরা চাকরি করি। সাত বছর ধরে এইখানে দর্শনার্থীদের আমরা গান শুনিয়ে যাচ্ছি।”
“আগে তো গ্রামে সন্ধ্যা হলে এমন গানের আসর বসত। অনেকেই গানের আসরের সেই সৌন্দর্য কখনও দেখেনি। এইখানে এসে গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী গানের আসরের আমেজটা যেন মানুষ নিতে পারে তাই এই আয়োজন”- ব্যাখ্যা করেন মোস্তফা।
রাতের সবচেয়ে মায়াময় মুহূর্ত ছিল এই গানের আসর।
রিসোর্টে রয়েছে ‘কালামেঘা স্পা’ এবং সিগনেচার ট্রিটমেন্ট। সবুজ প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে আয়ুর্বেদ সমন্বিত মাসাজ, নিজস্ব অয়েল ব্লেন্ড। তিনটি ট্রিটমেন্ট রুম, রিফ্লেক্সোলজি এরিয়া, হোলিস্টিক থেরাপি।
প্রকৃতির মাঝখানে সাজানো এই আধুনিক অবকাশযাপন কেন্দ্রটি পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে স্বস্তিময় মুহূর্ত কাটানোর জন্য এটি হতে পারে আদর্শ গন্তব্য হতে পারে।
আরও পড়ুন
পদ্মার বুকে ঘুরে আসাই যায় হাউজবোটে চড়ে