১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২ কার্তিক ১৪৩৩

অর্থ সঞ্চয়ের জন্য উপকারী হতে পারে ‘অর্থ বন্ধু’

বন্ধুর কাজ বিচার করা নয়, বরং লক্ষ্য থেকে সরে গেলে সেটা মনে করিয়ে দেওয়া।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 17 Oct 2026, 04:07 PM

Updated : 17 Oct 2026, 04:07 PM

টাকা নিয়ে কথা বলতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন। বন্ধুর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কাজের চাপ বা জীবনের নানান ঘটনা নিয়ে সহজেই আলোচনা করা যায়, কিন্তু মাসের খরচ সামলাতে হিমশিম খাওয়া, ঋণ জমে যাওয়া বা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে না পারার কথা বলতে সংকোচে থাকেন অনেকেই।

অথচ আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে একা একা চিন্তা করতে গিয়ে পিছিয়ে পড়তে হতে পারে। আর অবস্থা যদি এমন হয় তবে পাশে দরকার হতে পারে একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর; যিনি অর্থের হিসাব করে দেবেন না, বরং লক্ষ্য ঠিক রাখতে উৎসাহ দেবেন, অগ্রগতি জানতে চাইবেন এবং ব্যর্থ হলে দোষারোপ না করে আবার চেষ্টা করতে সাহায্য করবেন।

এমন বন্ধুকে বলা যায় ‘অর্থ-সঙ্গী’। তার সঙ্গে সঞ্চয়ের লক্ষ্য, খরচ কমানোর পরিকল্পনা বা ঋণ পরিশোধের অগ্রগতি ভাগ করে নেওয়া যায়। অর্থ নিয়ে কথা বলার উদ্দেশ্য একে অপরের আয় বা সম্পদের তুলনা করা নয়; বরং নিজের আর্থিক অভ্যাস বুঝে ধীরে ধীরে উন্নতি করা।

একসঙ্গে লক্ষ্য পূরণের পেছনে আছে গবেষণা

লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যের সহায়তা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আচরণ-বিষয়ক গবেষণা হয়েছে।

মার্কিন অর্থনীতিবিদ এমিলি ব্রেজা এবং অরুণ চন্দ্রশেখরের একটি মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা উল্লেখ করে, জীবনযাপন-বিষয়ক ওয়েবসাইট রিয়েলসিম্পল-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সঞ্চয়ের অগ্রগতি অন্য কাউকে জানানো বা তার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করানোর ব্যবস্থা থাকায়, অংশগ্রহণকারীরা একা সঞ্চয়কারীদের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি সঞ্চয় করেছিলেন।’

বিশেষ করে, সঞ্চয়ের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণকারী ব্যক্তি পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হলে, ফল আরও ভালো ছিল।

এই গবেষণার দেখা গেছে, কাউকে নিজের লক্ষ্য জানানো এবং নির্দিষ্ট সময় পর অগ্রগতি নিয়ে কথা বলার ব্যবস্থা সঞ্চয়ের অভ্যাসকে জোড়ালো করতে পারে। তবে ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একই হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

আয়, ব্যয়, পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সঞ্চয়ের সুযোগ ভিন্ন হতে পারে। বন্ধুর সহায়তা পরিকল্পনা ধরে রাখতে সাহায্য করলেও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

কেমন বন্ধু হবেন অর্থ-সঙ্গী

অর্থ-সঙ্গী বেছে নেওয়ার সময় বেশি আয় করেন বা বিনিয়োগের জটিল হিসাব জানেন, এমন কাউকে খুঁজতেই হবে না। বরং দরকার এমন একজন, যার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা যায়, যিনি গোপনীয়তা রক্ষা করেন এবং অগ্রগতি জানতে চাইলেও অপমান বা লজ্জা দেন না।

নিজের আর্থিক ভুল স্বীকার করতে হলে নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। বন্ধু যদি প্রতিবার খরচের কথা শুনে তিরস্কার করেন, তাহলে তার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘হার ফার্স্ট হান্ড্রেড কে’ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘ফিন্যান্সিয়াল ফেমিনিস্ট’ বইয়ের লেখক টোরি ডানল্যাপের মতে, “অর্থের লক্ষ্য পূরণে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের চেয়ে দায়বদ্ধতা তৈরি করতে পারে এমন সহায়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

তার কথায়, “অর্থ নিয়ে আলোচনা শেষে কেউ যদি নিজেকে আরও লজ্জিত বা ছোট মনে করেন, তবে সেই ব্যক্তি উপযুক্ত অর্থ-সঙ্গী নন। বন্ধুর কাজ বিচার করা নয়, বরং লক্ষ্য থেকে সরে গেলে তা মনে করিয়ে দেওয়া।”

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফিন্যান্সিয়াল ওয়াইজ’ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও নিবন্ধিত আর্থিক পরিকল্পনাবিদ ব্রিটনি কাস্ত্রো, অর্থ নিয়ে আলোচনায় মানসিক নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

তার মতে, “প্রত্যেকের অর্থের সঙ্গে সম্পর্ক আলাদা। কারও প্রয়োজন সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়া, কারও ঋণ সামলানো, আবার কারও ছোটবেলা থেকে তৈরি হওয়া অর্থসংক্রান্ত ধারণা বদলানো। তাই অন্যের আর্থিক অবস্থাকে নিজের সঙ্গে তুলনা না করে ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।”

বন্ধুর আয় নিজের চেয়ে বেশি বা কম হলে বিষয়টি শুরুতেই স্পষ্ট করে নেওয়া ভালো। বেশি আয় করেন বলে কেউ উপদেশদাতা হয়ে যাবেন না, আবার কম আয় করেন বলে অন্যজন নিজেকে পিছিয়ে ভাববেন না।

অর্থ-সঙ্গী হওয়া মানে একে অপরের আয়, ব্যাংক হিসাব বা ঋণের সব তথ্য জানতেই হবে, এমন নয়। কতটা তথ্য ভাগ করবেন, তা দুজনের সম্মতি ও স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর নির্ভর করবে।

নিয়মিত আলোচনার ছোট আয়োজন

অর্থ-সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রয়োজন নেই। চায়ের আড্ডায় নিজের একটি লক্ষ্য নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

‘প্রতি মাসে কিছু টাকা জমাতে চাই, কিন্তু নিয়মিত পারছি না’— এভাবে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করলে অপরজনও তার অভ্যাস বা সমস্যার কথা বলতে পারেন।

সরাসরি বন্ধুর আয়, ঋণ বা সঞ্চয়ের পরিমাণ জানতে চাওয়া অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

দুজন রাজি হলে মাসে একবার নির্দিষ্ট সময় ধরে অর্থের অগ্রগতি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। ঋণ পরিশোধ বা কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা চললে সপ্তাহে একবার সংক্ষিপ্ত খোঁজ নেওয়াও কাজে আসতে পারে।

আলোচনায় কত টাকা জমেছে, কোন খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে, কোন কাজটি পিছিয়ে আছে— এসব বাস্তব বিষয় তুলে ধরা যায়। তবে বন্ধুর ব্যক্তিগত হিসাব দেখানোর জন্য চাপ দেওয়া উচিত নয়।

ঋণ ও আয় বাড়ানোর চেষ্টায় সঙ্গী

ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক সময় সমস্যাটি লুকিয়ে রাখতে বাধ্য করে। লজ্জা বা ভয় থেকে হিসাব না দেখা, পাওনাদারের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে যাওয়া বা পরিশোধের পরিকল্পনা পিছিয়ে দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

বিশ্বস্ত অর্থ-সঙ্গী পাশে থাকলে নিজের ঋণ পরিশোধের লক্ষ্য নিয়ে কথা বলা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা সহজ হতে পারে।

একইভাবে বেতন বাড়ানোর অনুরোধ করা, নতুন কাজ খোঁজা বা বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করার সময়ও বন্ধুর উৎসাহ কাজে লাগে।

প্রত্যাখ্যানের ভয় বা নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ হলে বিশ্বস্ত কেউ প্রস্তুতি নিতে, লক্ষ্য মনে করিয়ে দিতে এবং চেষ্টা চালিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারেন। তবে চাকরি, ব্যবসা বা ঋণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের পরিস্থিতি ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

পুরনো খবর:

অল্প আয় থেকেও যেভাবে সঞ্চয় করা যায়
এফডিআর নাকি ডিপিএস— কোনটি বেছে নেবেন
মাস শেষে মানিব্যাগ ফাঁকা করতে না চাইলে