১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪ কার্তিক ১৪৩৩

সম্রাট আশুরবানিপাল ও পৃথিবীর প্রথম গ্রন্থাগার

তার রাজত্বকালে তলোয়ারের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চাও গুরুত্ব পেয়েছিল।

সম্রাট আশুরবানিপাল ও পৃথিবীর প্রথম গ্রন্থাগার

আশুরবানিপালের গ্রন্থাগার। চিত্রশিল্পী ফার্নান্দ লে কেসনের আঁকা পুনর্নির্মাণ চিত্র। সূত্র: ব্রিটিশ লাইব্রেরি।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 19 Oct 2026, 03:15 PM

Updated : 19 Oct 2026, 03:15 PM

আধুনিক লাইব্রেরির কথা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, থরে থরে সাজানো বইয়ের তাক, পড়ার টেবিল আর পিনপতন নীরবতা। কিন্তু যদি বলা হয়, আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে এমন এক লাইব্রেরি ছিল যেখানে কোনো কাগজের পাতা বা চামড়ার বাঁধাই করা বই ছিল না, তাকভর্তি ছিল কেবল পোড়া মাটির ছোট ছোট ফলক, তবে কেমন লাগবে!

মানবসভ্যতার সূতিকাগার মেসোপটেমিয়ায় গড়ে ওঠা এমনি এক অনন্য জ্ঞানভাণ্ডারের গল্প হলো আসিরিয়ার রাজা আশুরবানিপালের রাজকীয় লাইব্রেরি। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে বর্তমান ইরাকের মসুল শহরের কাছাকাছি প্রাচীন নিনেভেহ নগরীতে গড়ে উঠেছিল এই লাইব্রেরি। ইতিহাসের পাতায় একেই সাধারণত বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সুবিন্যস্ত ও সুসংগঠিত লাইব্রেরি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এই গ্রন্থাগারটি কেবল সরকারি হিসাব-নিকাশ বা রাজকীয় দলিলপত্র ধরে রাখার জায়গা ছিল না; বরং এটি ছিল এমন এক সংগ্রহশালা, যেখানে জমা করা হয়েছিল তৎকালীন পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনের অমূল্য উপাদান।

আসাড়িয়া বা আসিরিয়া সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন আশুরবানিপাল। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৬৮ থেকে ৬৩১ অব্দ পর্যন্ত তিনি সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। প্রাচীন আসিরীয় রাজারা সাধারণত বীরত্ব, যুদ্ধজয় এবং কঠোর সামরিক অভিযানের জন্যই বেশি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু আশুরবানিপাল ছিলেন ব্যতিক্রম। সিংহাসনে বসার আগে তিনি রাজপরিবারের তৃতীয় সন্তান হওয়ায় তাকে প্রাথমিকভাবে কোনো ধর্মীয় বা বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।

ফলস্বরূপ, তিনি সেকালের রাজাদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত ও পণ্ডিত প্রকৃতির মানুষ হয়ে ওঠেন। তিনি নিজে কঠিন সব পণ্ডিতি পাঠ পড়তে পারতেন এবং খোদাই করার স্টাইলাস বা কলম হাতে নিয়ে রাজকীয় ভাস্কর্যে পোজ দিতে ভালোবাসতেন। তার রাজত্বকালে তলোয়ারের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চাও সমান গুরুত্ব পেয়েছিল।

নিনেভেহ শহরে এর আগেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কিছু সরকারি প্রশাসনিক নথি বা আর্কাইভের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু আশুরবানিপালের সিংহাসনে আরোহণের পর এর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। তিনি সেগুলোকে নিছক প্রশাসনিক হিসাবের খাতা থেকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক লাইব্রেরিতে রূপান্তর করেন। লক্ষ্য ছিল মানবজাতির অতীতের সমস্ত অর্জিত জ্ঞান এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা। জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম, ভাষা, চিকিৎসাবিদ্যা, জাদুবিদ্যা, আচার-অনুষ্ঠান, ইতিহাস, কবিতা থেকে শুরু করে লোককাহিনি ও উপকথা- কোনো কিছুই বাদ যায়নি তার এই সংগ্রহশালা থেকে।

Image

সিংহের সঙ্গে লড়াইরত রাজা আশুরবানিপাল, যার কোমরে গোঁজা আছে একটি লেখার কলম। ইরাক, খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪৫–৬৩৫ অব্দ। সূত্র: ব্রিটিশ লাইব্রেরি।

এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার গড়ার পেছনে রাজা আশুরবানিপালের কৌশল ছিল বহুমুখী। তিনি একদল দক্ষ লিপিকারের একটি বাহিনী নিয়োগ করেছিলেন, যারা দিনরাত কাজ করে পুরনো গ্রন্থগুলোর প্রতিলিপি তৈরি করত এবং নতুন বিষয় লিপিবদ্ধ করত। শুধু তাই নয়, নিজের সীমাহীন রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল, করদ রাজ্য এবং মন্দিরগুলো থেকে জোরপূর্বক বা অনুরোধ করে গুরুত্বপূর্ণ সব পাণ্ডুলিপি ও ফলক সংগ্রহ করতেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, সম্রাট আশুরবানিপাল অনেক সময় বিজিত এলাকা থেকে গ্রন্থগুলো লুট করেও নিজের সংগ্রহশালায় নিয়ে আসতেন। টিকে থাকা একটি মাটির ফলক থেকে জানা যায়, রাজা তার সাম্রাজ্যের অধীন বিভিন্ন শহরের পণ্ডিতদের কাছে একধরনের ‘শপিং লিস্ট’ বা ফরমায়েশ পাঠিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের বইয়ের অনুলিপি দ্রুত নিনেভেহে পাঠাতে বাধ্য করতেন।

এই লাইব্রেরির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এর আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও নথিপত্র সংরক্ষণের পদ্ধতি। প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি মাটির ফলক বা ট্যাবলেটের প্রতিটিতে ছিল নির্দিষ্ট মেটাডেটা বা কোলফোন। এগুলো দেখে সহজেই বোঝা যেত কোন ফলকটি কোন সিরিজের কত নম্বর অংশ, কীভাবে তাকে নির্দিষ্ট ফাইলে সাজাতে হবে এবং কোন ফলকটি কার তৈরি। বর্তমান যুগের লাইব্রেরি স্ট্যাম্প বা বারকোডের মতো প্রাচীন এই ফলকগুলোতে আশুরবানিপালের মালিকানার সিলমোহর বা সতর্কবার্তা খোদাই করা থাকত। কোনো ফলক চুরি করলে বা ক্ষতি করলে দেবতার অভিশাপ নেমে আসবে- এমন হুঁশিয়ারিও খোদাই করা থাকত তাতে।

আশুরবানিপালের এই রাজকীয় সংগ্রহশালার সবচেয়ে বড় রত্ন হিসেবে ধরা হয় প্রাচীনতম মহাকাব্য ‘গিলগেমেশ’-এর ঐতিহাসিক সংস্করণগুলোকে। দেবতা ও দানবদের সঙ্গে লড়াই এবং মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রচিত এই মহাকাব্যটি মানবসাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। নিনেভহের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া মাটির ফলকগুলো না থাকলে এই মহাকাব্যের অনেক অংশই চিরতরে হারিয়ে যেত। এছাড়া প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যিকদের ওপরও এই মেসোপটেমীয় সাহিত্যধারার প্রভাব পড়েছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।

তবে এই সমৃদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডার স্থায়ী হতে পারেনি বেশিদিন। খ্রিস্টপূর্ব ৬১২ অব্দে ব্যাবিলনীয় এবং মেদদের যৌথ আক্রমণ ও অবরোধের মুখে পতন ঘটে প্রাচীন নিনেভেহ নগরীর। আগুনে ভস্মীভূত হয় রাজপ্রাসাদসহ পুরো শহর। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো সেই বিধ্বংসী আগুনই আশ্চর্যের এক আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়। তীব্র উত্তাপের কারণে লাইব্রেরির কাঁচা মাটির ফলকগুলো পুড়িয়ে শক্ত ইটের মতো করে দেয়, যা শত শত বছর ধরে মাটির নিচে ধ্বংস হওয়া থেকে সেগুলোকে রক্ষা করেছিল। অবশ্য কাঠ, চামড়া বা প্যাপিরাসের তৈরি অন্যান্য ফলক ও নথিগুলো সেদিন চিরতরে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।

পরবর্তী দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক ইরাকের মসুল শহরের কাছে মাটির নিচে ঘুমিয়ে ছিল এই ইতিহাস। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক অস্টেন হেনরি লেয়ার্ড এবং পরবর্তীতে ইরাকি বংশোদ্ভূত প্রত্নতাত্ত্বিক হোরমুজদ রাসসাম নিনেভহের ধ্বংসাবশেষ থেকে এই মাটির ফলকগুলোর ভাণ্ডার আবিষ্কার করেন। তারপর সেগুলো লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে শুরু হয় পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল পাজল মেলানোর কাজ। হাজার হাজার ভাঙা টুকরো পরিষ্কার করে, সাজিয়ে প্রাচীন লিপি পাঠোদ্ধার করার অক্লান্ত এক যজ্ঞ।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ডিজিটাল লাইব্রেরি কিংবা ইন্টারনেটের সুবাদে চোখের পলকে যেকোনো তথ্য পেয়ে যাই, তখন আড়াই হাজার বছর আগের সেই পোড়া মাটির ফলকগুলোর কথা ভাবলে সত্যি অবাক হতে হয়। রাজা আশুরবানিপাল হয়তো চেয়েছিলেন কেবল নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আধিপত্য জাহির করতে, কিন্তু তার এই দূরদর্শী জ্ঞানপিপাসাই প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরগুলোকে আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। মাটির বুকে লুকিয়ে থাকা সেই প্রাচীন ক্ষতবিক্ষত ফলকগুলো আজও মানবসভ্যতার মূল্যবান বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার হয়ে জ্বলজ্বল করছে।

সূত্র: হিস্ট্রি স্নব ডটকম