ধারাবাহিক উপন্যাস
Published : 11 Sep 2025, 01:34 AM
এভাবেই কেটে গেল এক বছর। মাঙ্গোশি জঙ্গলের কথা ভুলে গেল। গাছেদের সঙ্গে তার সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাও ভুলে গেল। এমনকি যে রাতে তাকে ডাকছিল সেই রহস্যময় কণ্ঠস্বর, তাও ভুলে গেল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট পরিবর্তন ঘটতে শুরু করল তাদের জীবনে। ধানের ফলন কমতে লাগল, খাবারও কমে গেল। অচেনা অদ্ভুত সব জন্তু-পাখি গ্রামে দেখা দিতে লাগল। দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম পড়তে লাগল। তারপর মানুষ অসুস্থ হতে শুরু করল, কিন্তু কেউই বুঝতে পারল না অসুখটা কোথা থেকে আসছে।
মাঙ্গোশির মা ধীরে ধীরে আরও দুর্বল হয়ে পড়লেন। অবশেষে গ্রামের জ্ঞানী মানুষটি বললেন, শুধু সেই বিশেষ ফুলই তার মাকে বাঁচাতে পারবে, যে ফুল থাকে গভীর জঙ্গলে।
সেই একই ফুল, যেটা মাঙ্গোশি গত বছর আনতে পারেনি। তখন মাঙ্গোশির বাবা-মা বুঝলেন, ওকে তারা অনেক আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল। পাঠানোর আগে গ্রামের জ্ঞানীর সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত ছিল। এবার ঠিক হলো, মাঙ্গোশি সন্ধ্যার আগে জঙ্গলে যাবে। কারণ জাদুকরী ফুল তুলবার সঠিক সময় সেটাই।
বনে যাওয়ার আগে মাঙ্গোশির বাবা তাকে পাশে বসালেন। মাঙ্গোশি! তিনি ডাকলেন, তোমাকে পাঠানোর বিশেষ একটা কারণ আছে। এই ফুল খুঁজে পেতে পারে কেবল সাত বছরের একটি মেয়ে। অন্য কেউ পারবে না। যদি তুমি ফুলটা আনতে পারো, তবে শুধু তোমার মা-ই নয়, পুরো গ্রাম বেঁচে যাবে। তুমি কি বুঝতে পারছো, এটা কত বড় দায়িত্ব?
মাঙ্গোশি মাথা নাড়ল। আসলে সে বুঝল না কথার গভীর মানে। তবে তার মনে হলো বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাবা তাকে আগে কখনো এমন গুরুতরভাবে কিছু বলেননি। পুরো গ্রাম তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, বাবা আবার বললেন। আমি তোমার সঙ্গে যেতে চাই, কিন্তু তারা বলেছে তোমাকে একাই যেতে হবে। যদি কেউ তোমার সঙ্গে যায় তবে ওষুধের জাদু কমে যাবে। তোমার সাহসই এটাকে শক্তিশালী করে তুলবে। তুমি কি এটা করতে চাইছো?
হ্যাঁ, বাবা, মাঙ্গোশি উত্তর দিল। বাবার চোখে জল এসে গেল। আমি তোমার কাছে এটা চাইতাম না। কিন্তু তারা বলছে, তুমি ছাড়া আর কেউ এটা করতে পারবে না। মাঙ্গোশি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, কারা বলছে? যারা এসব বিষয়ে জ্ঞানী, সেই গ্রামের জ্ঞানীরা।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন, তুমি জঙ্গলে যাচ্ছো। তুমি এর আগে সেখানে গিয়েছোও। তবে এবার ফুলটা পাওয়া আরও কঠিন হবে। কেনো? মাঙ্গোশি জিজ্ঞেস করল। তুমি নিজেই দেখবে। দুনিয়া বদলে গেছে। আমরা সবাই বিপদে আছি। কেনো? মানুষ পৃথিবীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি। তাই তুমি নিজেই বুঝবে।
বাবা কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন, এবারের বন আর আগের বন এক নয়। যদি তুমি হারিয়ে যাও, যদি পথ খুঁজে পেতে কষ্ট হয়, একটাই কথা মনে রেখো: যদি তুমি ফুলটা আনতে পারো, ফুল গ্রামকে বাঁচাবে। আর যদি গ্রাম বাঁচে, তবে গ্রাম বনকেও বাঁচাবে। আমি চাই তোমাকে একটা মন্ত্র দিতে, যাতে তুমি নিরাপদে ফিরে আসতে পারো। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছে, তোমাকে কোনো মন্ত্র দেওয়া যাবে না। এতে ফুলের শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে।
তারা বলছে, তোমাকে সবকিছু নিজের চেষ্টায় করতে হবে। নিজের মন্ত্র, নিজের শক্তি তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। ভাবতে পারছো, এটা আমাকে কতটা কষ্ট দিচ্ছে? তুমি চাইলে না-ও যেতে পারো। তোমার মা-ও চাইছে না তুমি যাও। আমি চাই তুমি ঘরে থেকো, নিরাপদে থেকো। তুমি তো আমার একমাত্র সোনার মেয়ে।
মাঙ্গোশি বাবার দিকে তাকাল, তার গালে আলতো করে হাত রাখল আর হেসে উঠল। আমি যাব, বাবা। আমাকে যেতেই হবে। মনে হচ্ছে কেউ আমাকে বারবার ডাকছে, আর আমি এতদিন শুনিনি।
কিন্তু তোমাকে এটা করতেই হবে, এমন তো নয়, বাবা আবার বললেন।
না, বাবা। আমাকেই করতে হবে। মাকে বাঁচাতেই হবে। আমাদের গ্রামকেও বাঁচাতে হবে।
তুমি কি সত্যিই নিশ্চিত?
হ্যাঁ, বাবা। আমি মনে করি, এবার আমি প্রস্তুত।
মাঙ্গোশির কথায় বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি তাকে কিছু খাবার দিলেন, অসুস্থ শরীরে মায়ের বানানো রুটি আর ফল। সঙ্গে দিলেন পান করার জন্য একটি বিশেষ কাপ। আর দিলেন একটি সাদা রুমাল, শক্ত করে বাঁধা। এই রুমালের ভেতরে, বাবা বললেন, আছে সাতটি বীজ। খুব ছোট ছোট। চোখেও ধরা পড়ে না।
এগুলো কী কাজে লাগবে? মাঙ্গোশি জানতে চাইল। ওটা তোমাকেই আবিষ্কার করতে হবে। এখন যাও, তোমার মায়ের সঙ্গে বিদায় বলে এসো। মাঙ্গোশি গেল মায়ের ঘরে। মা তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। মাঙ্গোশি চুপচাপ দাঁড়িয়ে তার মাকে দেখল। তিনি কতটা রোগা হয়ে গেছেন! গ্রামের ডাক্তার বলেছিলেন, তার জীবনে আর বেশি সময় বাকি নেই। মাঙ্গোশির চোখে জল চলে এলো। সে চলে যেতে উদ্যত হলো।
ঠিক তখনই মা জেগে উঠলেন আর মৃদুস্বরে তাকে ডাকলেন। তিনি খুবই দুর্বল ছিলেন, তবুও ফিসফিস করে বললেন, তাহলে, তুমি যাচ্ছো?
হ্যাঁ, মাঙ্গোশি উত্তর দিল।
যেও না। বিপদ হতে পারে।
আমি তো শুধু পাশের জঙ্গলে যাচ্ছি, মা। খুব দূরে নয়। আজ সন্ধ্যাতেই ফিরে আসব।
মা কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, যখন আমি তোমার বয়সী ছিলাম, আমাকেও কেউ ডেকেছিল সাহায্যের জন্য। কিন্তু আমি যাইনি। সাহায্য করিনি। আমাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর সারা জীবন নানা ডাক আমাকে পৌঁছেছে, কিন্তু আমি যাইনি। পরিবারের দিকে তাকিয়েছি। এখন আমি মরছি, আর তোমাকে কেউ ডেকেছে, আর তুমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে চলে যাচ্ছো। কেন?
আমি জানি না, মা, মাঙ্গোশি ফিসফিস করে বললো। আমি তোমাকে ভালোবাসি। চাই তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো।
মা হেসে উঠলেন।
তোমার কি মনে আছে, আমি তোমাকে যে শিকারির গল্প বলেছিলাম কিছুদিন আগে?
হ্যাঁ, মনে আছে, বললো মাঙ্গোশি।
তুমি সেই শিকারির চেয়ে জ্ঞানী হবে। মনে রেখো, অনেক সময় ছোট্ট একটি যাত্রাই সবচেয়ে বেশি সময় নেয়। তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে আমি প্রার্থনা করব তোমার জন্য। এ কথা বলে মা আবার গভীর অসুস্থতার ঘুমে তলিয়ে গেলেন।
মাঙ্গোশি বেরিয়ে এলো, বাইরে বাবা অপেক্ষা করছিলেন।
আরও একটা কথা, বাবা বললেন, তাকে গ্রাম ছাড়ার পথ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তুমি যেন মাটিকে তোমার পথপ্রদর্শক হতে দাও।
ধন্যবাদ, বাবা। দয়া করে চিন্তা কোরো না। আমি আজ সন্ধ্যাতেই ফিরে আসব।
এ কথা বলে সাহসী ছোট্ট মেয়ে মাঙ্গোশি, টুকটুক পায়ের শব্দে গ্রাম ছেড়ে জঙ্গলের পথে হাঁটতে লাগল। অল্প একটু পথ গিয়েই সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাবাকে হাত নেড়ে বিদায় জানাল। তারপর আবার সামনে হাঁটল। যখন সে আবার পেছনে তাকাল, তখন আর তার চোখে দেখা গেল না। না বাবা। না গ্রাম।
চলবে...