Published : 25 Jun 2026, 04:03 PM
বাঙালির উৎসব, সংস্কৃতি আর মননে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিরন্তন। সাহিত্যের এই রাজপুত্রের যে ফুটবল মাঠের প্রতি টান এবং প্রতিভাধর খেলোয়াড় চেনার জাদুকরী চোখ ছিল, তা অনেকেরই অজানা।
তিনি কেবল তার গল্প, উপন্যাস বা কবিতায় সমকালীন ফুটবলের উন্মাদনাকে তুলে ধরেননি, বরং পর্দার আড়ালে থেকে ফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকাদের গড়ে তুলতেও ভূমিকা রেখেছিলেন। এমনই এক বিস্ময়কর অধ্যায় জড়িয়ে আছে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ঐতিহ্যবাহী লাল-হলুদ জার্সি এবং ক্লাবের দুই কিংবদন্তি অধিনায়ক সূর্য চক্রবর্তী ও পরিতোষ চক্রবর্তীর জীবনের সঙ্গে।
বিংশ শতাব্দীর শুরু। ঢাকার কাইচল গ্রামের ললিতমোহন চক্রবর্তীর ছেলে সূর্য চক্রবর্তীর ফুটবল খেলতেন। তার ফুটবল প্রেমের কথা জানতে পেরে কবিগুরু তাকে নিজের কাছে অর্থাৎ শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
শান্তিনিকেতনে এসে সূর্য চক্রবর্তী পড়াশোনার পাশাপাশি কবির নিজস্ব দল ‘বিশ্বভারতী একাদশ’-এর হয়ে নিয়মিত খেলতে শুরু করেন এবং দ্রুত নিজের পায়ের জাদুতে রবীন্দ্রনাথের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। গরমের ছুটির সময় কবিগুরু সূর্যকে কলকাতার জোড়াসাঁকো বাড়িতে এনে থাকার স্থায়ী ব্যবস্থাও করে দিতেন।
সূর্যের ফুটবল প্রতিভা দেখে রবীন্দ্রনাথই সিদ্ধান্ত নেন তাকে কলকাতার বড় কোনো ক্লাবে খেলার সুযোগ করে দেওয়ার। সেই উদ্দেশ্যে তাকে প্রশিক্ষক দুখিরাম মজুমদারের আরিয়ান্স ক্লাবে অনুশীলনের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ১৯২৫ সালে কবিগুরুর পরামর্শেই সূর্য চক্রবর্তী ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে যোগ দেন এবং ১৯২৭ সালে ক্লাবের অধিনায়কের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে দীর্ঘ এক দশক মাঠ কাঁপান।
সূর্য চক্রবর্তী পরবর্তীতে নিজের ডায়েরিতে স্বীকার করেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের সেই দূরদৃষ্টি ও আশ্রয় না থাকলে তিনি হয়তো কখনোই ফুটবলার সূর্য চক্রবর্তী হয়ে উঠতে পারতেন না।
অনুরূপভাবে, ১৯৪০-এর দশকের ইস্টবেঙ্গল অধিনায়ক ও রক্ষণভাগের খেলোয়াড় পরিতোষ চক্রবর্তীর ক্যারিয়ারের পেছনেও কবিগুরুর আশীর্বাদ জড়িয়ে ছিল। ১৯৩৫ সালের দিকে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের ফুটবল দলের সুনামের কথা জানতে পারেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর নিজেই কলেজের অধ্যক্ষকে চিঠি লিখে শান্তিনিকেতনে এসে বিশ্বভারতী একাদশের বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার আমন্ত্রণ জানান।
সেই ম্যাচে বঙ্গবাসী কলেজ ১-০ গোলে জয়লাভ করে এবং মাঠের ধারে বসে খেলা দেখা রবীন্দ্রনাথ পরিতোষ চক্রবর্তীর খেলা দেখে মুগ্ধ হন। খেলা শেষে বিজয়ী দলের হাতে কবিগুরু নিজের হাতে সিল্কের কাপড়ে মোড়ানো ‘গীতাঞ্জলি’ গ্রন্থ উপহার হিসেবে তুলে দেন এবং পরিতোষ চক্রবর্তীকে আশীর্বাদ করেন।
ফুটবলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই অনুরাগ কেবল খেলোয়াড় তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তার সাহিত্যকর্মেও তা বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। ‘সহজ পাঠ’-এর ষষ্ঠপাঠে ফুটবল খেলার আমেজের উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি সমকালীন মোহনবাগান ক্লাবের প্রথম অধিনায়ক মণি সেনের নাম যুক্ত করেছিলেন।
আবার মোহনবাগানের কিংবদন্তি গোলরক্ষক গোষ্ঠ পালের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে কবি রসিকতা করে বলে উঠেছিলেন যে, “তিনিই তাহলে সেই চীনের প্রাচীর গোষ্ঠ পাল।” এছাড়া ‘দুই বোন’ উপন্যাস কিংবা ‘সে’ গল্পেও মোহনবাগান ফুটবল ম্যাচের প্রসঙ্গ এসেছে।
শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমে ছাত্রদের শারীরিক বিকাশের জন্য তিনি ফুটবল খেলা বাধ্যতামূলক করেছিলেন এবং মোহনবাগানের খেলোয়াড় গৌরগোপাল ঘোষকে শান্তিনিকেতনের গণিতের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।
শান্তিনিকেতনের ফুটবল দলের অপ্রতিরোধ্য শক্তির এক মজার গল্পও রয়েছে। একবার কলকাতার ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজকে তারা ৮ গোল দিলে রবীন্দ্রনাথ রেগে গিয়ে বলেছিলেন, “বাইরের দল খেলতে এসেছে বলে তাদের পর-পর আট গোল দেওয়াটা দস্তুরমতো অসভ্যতা, হারাতে হলে বড়জোর এক বা দুই গোলে হারানো উচিত ছিল।”
এমনকি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসুস্থ অবস্থায় যখন এক চিকিৎসকের ছেলে মোহনবাগানের সবুজ-মেরুন জার্সি পরে তার ঘরে আসেন, তখনও কবি রসিকতা করে বলেছিলেন, “ফুটবল দলের সমর্থক বলে তাদের ওসব পোশাক পরতে হয়, কিন্তু ফুটবল তো আসলে বাঙালির রক্তেই থাকে।”
জীবনকে সামগ্রিকভাবে উদযাপনের এই যে অদম্য প্রয়াস, তা কবিগুরুকে সাহিত্যের সীমানা ছাড়িয়ে খেলার মাঠের সবুজ ঘাসেও পথপ্রদর্শক হিসেবে অমর করে রেখেছে।
সূত্র: চেজ ইউর স্পোর্ট