Published : 09 Jul 2025, 10:45 PM
শৈশব, শব্দটা শুনলেই কেমন যেন একটা ধূসর গল্পের জগৎ সামনে চলে আসে। চিন্তাহীন একটা সময়। কত গল্প, কত দুষ্টুমি আর কত ধরনের খেলাই না খেলেছি আমরা। বিকেল হলেই সঙ্গীদের নিয়ে খেলায় মেতে থাকতাম। সেসব স্মৃতিচারণে আজও আন্দোলিত হই।
কিন্তু সময়ের হাওয়ায় শৈশবের সেই খেলাগুলো এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। অথচ একসময় বাঙালি সংস্কৃতি ও বিনোদনের একটি বড় জায়গা দখল করে ছিল খেলাগুলো। আগে বিকেল হলেই পাড়ার ছেলেমেয়েরা যে খেলাগুলো নিয়ে মেতে থাকত তার মধ্যে দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, গোল্লাছুট, কুতকুত, হাড়িভাঙা, বৌচি, রুমাল চুরি, কানামাছি, ওপেন্টি বায়োস্কোপ, নৌকাবাইচ, এলাটিং বেলাটিং, আগডুম বাগডুম, লাঠিখেলা, মার্বেল, মোরগ লড়াই, লাটিম খেলা, ইচিং বিচিং, এক্কাদোক্কা ও হা-ডু-ডু অন্যতম।
ঐতিহ্যবাহী এসব খেলা এখন আর তেমন আয়োজন করা হয় না। এই খেলাগুলোর মধ্যে কিছু ছিল প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত, আবার কিছু ছিল সামাজিক বা সাংস্কৃতিক উৎসবে ব্যবহৃত। হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলো আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অঙ্গ, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্য সৃষ্টি হতো। বিলুপ্তিপ্রায় ওই খেলাগুলো কেমন ছিল? চলুন, সেটি একটু জেনে নিই।
গোল্লাছুট
এই খেলার সঙ্গেই যেন জড়িয়ে আছে আমাদের রঙিন শৈশবের গল্প। ‘গোল্লাছুট’ ছাড়া আমাদের শৈশবের গল্প ঠিক জমে না। কিশোর-কিশোরী নির্বিশেষে এই খেলা খেলে থাকে। দুই দলে থাকে খেলোয়াড়। একদল হাতে হাত ধরে পালানোর পথ খুঁজছে। অন্য দল ধরে ফেলার চেষ্টা করছে। ভীষণ উত্তেজনাকর সেই খেলা।
গোল্লাছুট ছিল এক ধরনের দৌড় ও স্পর্শভিত্তিক খেলা। মাটিতে এক জায়গায় গর্ত করে একটি লাঠি পুঁতে তাকে কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়, কেন্দ্রের চারপাশে বৃত্ত তৈরি করে ২৫/৩০ ফুট দূরে আরো একটি রেখা টেনে নির্ধারণ করা হয় সীমানা। বৃত্ত তৈরি করে ঘুরতে হয় বলে একে ‘গোল্লা’ বলে, আর আঞ্চলিক ভাষায় ‘ছুট’ মানে দৌড়ানো। এভাবেই খেলার নাম হয়েছে গোল্লাছুট। এটি কৌশল ও গতি নির্ভর একটি মজার খেলা।
দাঁড়িয়াবান্ধা
প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে একটা একটা করে ধাপ পেরিয়ে যাওয়া! প্রতিটি ধাপে চতুর শেয়ালের মতো বুদ্ধি খাটিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা। দুরন্ত শৈশবের উত্তেজনাকর খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই দাঁড়িয়াবান্ধা। গ্রামের অত্যন্ত জনপ্রিয় শারীরিক পরিশ্রমের এই খেলা। বিকেলবেলা হই হুল্লা হবে, হারজিত নিয়ে ঝগড়া হবে, এই না হলে খেলা!
দাঁড়িয়াবান্ধা খেলাটি তেমনই। ছোট ছোট কোর্ট বানিয়ে খেলা হতো। বিভিন্ন এলাকায় একে বিভিন্ন নামে ডাকা হয় এবং অঞ্চলভেদে এর নিয়মকানুনেও কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। মূলত প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে এক কোর্ট থেকে অন্য কোর্টে গিয়ে পয়েন্ট বাড়ানোই এই খেলার মূল উদ্দেশ্য। এতে খেলোয়াড়দের গতি, ধৈর্য ও কৌশল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কানামাছি
ভরদুপুরের অবসরে এখনো কানে বাজে এই খেলাটির সুর। ফিরে যাই নির্মল শৈশবের দিনগুলোয়। বিকেলের অবসরে অথবা স্কুলের টিফিনের স্বল্প সময়ে একদল ছেলেমেয়ে চোখ-বাঁধা কানামাছিকে ‘টুকি’ দিতে দিতে সুর করে গলা ছেড়ে গাইছে ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ’।
কানামাছি একজনকে ছুঁয়ে দিল, তো নতুন এক কানামাছির জন্ম হলো। এভাবে একের পর এক কানামাছির পরিবর্তন। কিন্তু সুর ও ছন্দ অপরিবর্তনীয়। কানামাছি খেলাটিকে ‘লুকোচুরি’ খেলাও বলা হয়ে থাকে। একসময় প্রায় সব শিশুর প্রিয় ছিল এটি। এটি সহজ কিন্তু আনন্দদায়ক, যেখানে একজন খেলোয়াড়ের চোখ বাঁধা থাকে এবং সে অন্যদের ধরার চেষ্টা করে। চোখ বাঁধা শিশুকে বলা হয় ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাবি তাকে ছোঁ’। অন্যরা শব্দ বা নড়াচড়ার মাধ্যমে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।
ওপেনটি বায়োস্কোপ
মেয়েদের পছন্দের খেলা ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’। ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ/ নাইন টেন টুইস্কোপ সুলতানা বিবিয়ানা/ সাহেব বাবুর বৈঠকখানা/ রাজবাড়িতে যেতে পান সুপারি খেতে/পানের আগায় মরিচ বাটা/স্প্রিংয়ের চাবি আঁটা’, এমনই মজার ছড়া আওড়াতে হয় খেলাটির সময়। এতে দুটি মেয়ে মুখোমুখি অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে পরস্পরের হাত দুটো ধরে উঁচু করে রাখে, যেন মনে হয় একটা দরজা তৈরি হয়েছে। তাদের তৈরি দরোজার মাঝ দিয়ে অন্যেরা লাইন ধরে চক্রাকারে ঘুরতে পারে।
এসময় সবাই মিলে সুরে সুরে আবৃত্তি করতে থাকে ওপেনটি বায়োস্কোপের ছড়াটি। ছড়ার শেষ লাইনে ‘আমার নাম জাদুমণি, যেতে হবে অনেকখানি’, অথবা ‘যার নাম বেনুমালা, তারে দিব মুক্তারমালা’ উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মেয়ে দুটি তাদের হাত নামিয়ে সবচেয়ে কাছের মেয়েকে ধরে ফেলে, তারপর সবাই মিলে তাকে ওপরে তুলে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে। এভাবেই শেষ হয় ওপেনটি বায়োস্কোপ খেলাটি।
এলোনা বেলোনা
নামটা শুনতেই কেমন মজা লাগছে না? খেলাটি আসলেই মজার। আমরা সবাই একসাথে হলেই কথা বলি। কিন্তু এটি কথা না বলার খেলা। গ্রামের বাড়িতে ভাইবোনেরা একসাথে হলেই আগে এই খেলাটি খেলতো। একজন সুর করে গাইতো, ‘এলোনা বেলোনা/ নড়িও না চড়িও না/ ঝুমকো লতা ঝুম/ আজি সালেকা মালেকা/ সালাই মালাইকুম/ রাজার বাড়ি লোক এসেছে/ মিষ্টি খাওয়ার ধুম।’
বলার সাথে সাথে সবাই চুপ। এরপর যে আগে হাসবে বা নড়াচড়া করবে সেই খেলা থেকে বাদ পড়বে। এভাবে শেষ পর্যন্ত যে টিকে থাকবে সে-ই হবে বিজয়ী। এই খেলাটির প্রচলনও এখন আর দেখা যায় না।
ফুল টোক্কা
এটি একধরনের ছন্দময় খেলা যেখানে শিশুদের গ্রুপ একে অপরকে ফুল ছোড়ে এবং তারপর সেই ফুলের ওপর ভিত্তি করে কোন একটি গান বা কাব্য পাঠ করতে হয়। সবার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এটি একটি আনন্দদায়ক খেলা হয়ে ওঠে। আনন্দের পাশাপাশি শিশুদের ভেতর গান ও কবিতাপাঠের প্রতিও এক ধরনের আগ্রহের সৃষ্টি হতো এই খেলার মাধ্যমে।
মার্বেল বা গুলি খেলা
কাচের ছোট্ট গোলাকার কালচে বা সবুজ মার্বেল খেলেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। গুলি খেলা একসময় গ্রামবাংলার শিশুদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় ছিল। কারও কারও প্রবল নেশাও ছিল এই মার্বেল খেলার প্রতি। পকেটে মার্বেল নিয়ে ঘুমাতোও অনেক শিশু।
স্কুল ছুটি হলে কিংবা স্কুল পালিয়ে মার্বেল কিনতে যাওয়া, বাবা কিংবা বড় ভাইয়ের হাতে ধরা পড়ে পিটুনি খাওয়ার স্মৃতি নিশ্চয়ই অনেককেই আন্দোলিত করে এখনও। সাধারণত মাটিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে গোল দাগ কেটে বা গর্ত করে খেলা হতো। খেলোয়াড়দের লক্ষ্য থাকত নির্দিষ্ট লক্ষ্যে মার্বেল বা গুলি ফেলা এবং প্রতিপক্ষের গুলিতে আঘাত করা। এই খেলায় মনোযোগ, কৌশল ও লক্ষ্যভেদের দক্ষতার প্রয়োজন হতো খুব।
লাটিম বা লাট্টু খেলা
লাটিম বা লাট্টু আমাদের ঐতিহ্যবাহী একটি শিশুতোষ খেলা। লাটিম খেলতে পারে না, এরকম মানুষ খুব কমই আছে সমাজে। এটি শুধু খেলাই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রঙিন লাটিম কেনার একরাশ স্মৃতিও। নতুন কেনা রঙিন লাটিম দিয়ে কাউকে হারিয়ে দেওয়ার যে সুখস্মৃতি, তা এখনো চোখে লেগে আছে। উল্টোদিকে, একের পর এক শত্রুদের লাটিমের হামলায় চোখের সামনে নিজের রঙিন লাটিম ক্ষতবিক্ষত হতে দেখার দুঃখটাও কম ছিল না।
কুতকুত
একসময় কুতকুত ছিল গ্রামবাংলার শিশুদের আরেকটি জনপ্রিয় খেলা। মাটিতে গোল বা চৌকো আকৃতি তৈরি করে এক পায়ে লাফিয়ে নির্দিষ্ট বিন্দুতে যেতে হতো। মুখে মুখে ‘কুত কুত কুত কুত’ বলে দম রাখতে হতো। এই খেলা শিশুদের শারীরিক কসরতের পাশাপাশি মানসিক বিকাশে দারুণ কার্যকরী ছিল।
ডাংগুলি
ডাংগুলি খেলার জন্য একটি ছোট কাঠের গুটি ও লাঠি ব্যবহার করা হয়। গুটিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে পাঠানোর চেষ্টা করা হয় অনেক দূরে। অন্য দল তখন সেটি ধরার চেষ্টা করে। গ্রামবাংলার শিশু-কিশোরদের মাঝে একসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল আনন্দদায়ক এই খেলা।

মোরগ লড়াই
মোরগ লড়াই, নামটা শুনে মনে হয় মোরগদের মারামারি। কিন্তু আসলে সেটা নয়। শিশুরাই এক পা তুলে মোরগ সাজে। একজন আরেকজনকে এক পা দিয়ে ধাক্কা দেয়। যে মোরগ ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে যায়, সে খেলা থেকে তখন বাদ পড়ে। এভাবে যে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সেই বিজয়ী হয়।
রুমাল চুরি
সব বন্ধুরা মিলে গোল হয়ে বসে খেলতে হয় এই খেলাটি। প্রথমে একজন ‘চোর’ হয়, অন্যেরা কেন্দ্রের দিকে মুখ করে গোল হয়ে বসে। চোর হাতে রুমাল নিয়ে চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে সুবিধামতো একজনের পেছনে অলক্ষ্যে সেটা রেখে দেয়। সে টের না পেলে চোর ঠিক পেছনে এক পাক ঘুরে এসে তার পিঠে কিল-চাপড় দেয়। আগে টের পেয়ে গেলে কিংবা পরে মার খেয়ে রুমাল নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এবার সে হয় চোর আর তার শূন্য জায়গায় বসে পড়ে আগের খেলোয়াড়। এভাবেই মজার এই রুমাল চুরি খেলাটি হতো। খেলা নিয়ে চলত বন্ধুদের ঝগড়াও।
বউচি
এই খেলা সাধারণত একধরনের লুকোচুরি। এক দল একটি বস্তুর উপর দাঁড়িয়ে থাকে, এবং অন্য দলটি সেই দলকে ধরতে চেষ্টা করে। যারা দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের মধ্যে কোন একজন অন্যদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দৌড়ে বা লুকিয়ে ফেলে।
পুতুল খেলা
ছেলে-মেয়ে, বর-কনে এমনি নানা ধরনের পুতুল কাপড় ও গয়না দিয়ে সাজানো হয়। রান্না-বান্না, সন্তান লালন-পালন, মেয়ে পুতুলের সাথে ছেলে পুতুলের বিয়ে ইত্যাদি নানা বিষয়ের অভিনয় করেই খেলা হয় পুতুল খেলা। আসলে পুতুল খেলার মধ্যে পুরো সংসারের একটা ছবি ফুটে ওঠে।
পুতুলগুলো যেন ছোট ছোট মেয়েদের সন্তান। মায়ের মতো স্নেহ-আদর দিয়ে, খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুম পাড়ানো পর্যন্ত সব কাজই করে খুকুমায়েরা। কেবল আদর সোহাগই নয়, প্রয়োজনে শাসনও করে তাদের পুতুল-সন্তানকে। এ খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব হলো একজনের মেয়ের সঙ্গে আরেকজনের ছেলে পুতুলের বিয়ে দেওয়া।
চি-বুড়ি
এটি একধরনের দলভিত্তিক খেলা যেখানে খেলোয়াড়রা মাটিতে চক্রাকারে বসে বা দাঁড়িয়ে একটি তাল অনুসারে খেলে। সাধারণত ছন্দময় ছড়া বা গান গেয়ে এই খেলা পরিচালিত হয়। এক দমে ‘চি’ বলে অন্যের ঘর থেকে গুটি নিতে যায়। দম চলে গেলেই সে হেরে যাবে।
হাড়িভাঙা
এটি চোখবাঁধা দলীয় খেলা। বিশেষ করে ঈদ, পহেলা বৈশাখ বা দুর্গাপূজার মেলায় এর আয়োজন দেখা যেত। একটি মাটির হাঁড়ি দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো, আর প্রতিযোগী চোখ বাঁধা অবস্থায় লাঠি দিয়ে হাঁড়ি ভাঙার চেষ্টা করত। হাঁড়ি ভাঙতে পারলেই সে বিজয়ী। চারপাশের দর্শকের হাসি-মশকরা এবং হাঁড়ি মিস করলেই হাততালি। সব মিলে ছিল চূড়ান্ত উৎসবের আমেজ।
এলাটিং বেলাটিং
ছড়া বা রাইমের সঙ্গে জুড়ে থাকা একধরনের নৃত্য বা ঘোরানোর খেলা। মেয়েরা সাধারণত এটি দলে দলে গেয়ে ঘুরতে ঘুরতে খেলত। এ খেলার নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকলেও ছড়ার তাল ও ছন্দ ধরে সবাই একসঙ্গে সাড়া দিত, যা ছেলেবেলার এক গানের মাঠ হয়ে উঠত।
আগডুম বাগডুম
‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে...’, এই ছড়ার ছন্দে মুখর হয়ে উঠত খেলার মাঠ। এটি মূলত একধরনের দলভিত্তিক বাছাই খেলা, যেখানে ছড়ার প্রতিটি শব্দে একেকজন আঙুল দেখিয়ে বা ঘাড় ছুঁয়ে কাউকে ‘আউট’ করত। শিশুরা খেলায় ব্যবহারের পাশাপাশি এই ছড়াটি মুখস্থ করত অবলীলায়, যেন স্মৃতি ও ছন্দের সমান পাঠ।
লাঠিখেলা
বাংলার প্রাচীন মার্শাল আর্ট জাতীয় ক্রীড়া ‘লাঠিখেলা’। এটি ছিল শরীরচর্চা, আত্মরক্ষা ও শৈল্পিক যুদ্ধকলার সমন্বয়। দুই বা ততোধিক খেলোয়াড় বাঁশের লাঠি নিয়ে ছন্দময় গতিতে আঘাত ও রক্ষা করে একে অপরকে প্রতিহত করত। গ্রামীণ মেলা বা উৎসবে লাঠিখেলার আসর ছিল একটি আকর্ষণীয় দৃশ্য।
ইচিং বিচিং
ইচিং বিচিং একধরনের সিদ্ধান্তমূলক ছড়া। সাধারণত কোনো খেলায় দল বাছাইয়ের সময় বা ‘কে আগে যাবে’ ঠিক করতে শিশুদের মধ্যে এই ছড়া বলা হতো, ‘ইচিং বিচিং/কামানগাছা/বিলাইছোড়া/ডোমরাকাঁটা...’। ছড়ার শেষে যে পড়ে, সে হয় বাদ। খেলায় ব্যবহৃত এই ছড়া ছিল বুদ্ধি ও ছন্দের কৌশলী সমন্বয়।
এক্কাদোক্কা
এক্কাদোক্কা ছিল একটি এক পায়ে লাফিয়ে খেলার ধরণ, যেখানে চকে বা খড়ির সাহায্যে মাটিতে চৌকোনা বিভিন্ন ঘর আঁকা হতো। একটি কাঁকর ছুড়ে দিয়ে সেই ঘরগুলো এক পায়ে লাফিয়ে পার হতে হতো। এই খেলায় ভারসাম্য, নিখুঁত লক্ষ্য ও স্থিরতা ছিল মূলশক্তি। এটি মূলত মেয়েদের প্রিয় খেলা হলেও ছেলেরাও অংশ নিত অনেক সময়।
হা-ডু-ডু
বাংলার সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দলীয় খেলা ‘হা-ডু-ডু’। এখন যার আধুনিক নাম কাবাডি। খেলোয়াড় শ্বাস বন্ধ রেখে প্রতিপক্ষ দলের সীমানায় গিয়ে ‘হা-ডু-ডু’ বলতে বলতে যত বেশি সংখ্যক খেলোয়াড় ছুঁতে পারত, তত বেশি পয়েন্ট পেত। শ্বাস, গতি ও কৌশলের এক দুর্দান্ত সমন্বয় ছিল এই খেলায়।