অনূদিত গল্প
Published : 18 Aug 2025, 11:01 AM
ওয়াল্টার ক্রেন (১৮৪৫-১৯১৫) ছিলেন ভিক্টোরীয় যুগের একজন অগ্রগণ্য ইংরেজ শিল্পী, চিত্রকর এবং নকশাকার। তিনি মূলত শিশুতোষ বইয়ের অসাধারণ অলঙ্করণের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। শুধু ছবি আঁকা নয়, শিল্পকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলার জন্য তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন।
ক্রেন ছিলেন প্রভাবশালী ‘আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস’ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। শিল্পের বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধী ছিলেন তিনি এবং বিশ্বাস করতেন যে শিল্প কারখানার চাপে কারুশিল্প তার সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা হারাচ্ছে।
শিল্পচর্চার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ সমাজতন্ত্রী। বন্ধু ও সহকর্মী উইলিয়াম মরিস-এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত হন এবং নিজের শিল্পকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা প্রচারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। তার আঁকা অসংখ্য কার্টুন ও নকশা সেসময়কার শ্রমিক আন্দোলন এবং সমাজতান্ত্রিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হতো।
‘গাধা ও সাধারণ চারণভূমি’ রূপকথাটি তার এই সমাজতান্ত্রিক চেতনার এক চমৎকার প্রতিফলন। সাধারণ একটি গল্পের আড়ালে তিনি পুঁজিবাদের শোষণ এবং শ্রমজীবী মানুষের স্বাধীনতা হারানোর এক রূপক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।
এক ছিল এক গাধা, আর তার ছিল স্বাধীন জীবন। আহা, কী চমৎকার চারণভূমি! যত ইচ্ছে নরম মজার মজার ঘাস খাও। মৌসুম বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে খাবারের ধরনও বদলে যায়। তবে টাটকা কাঁটার চাটনি দিয়ে আহারের স্বাদে বৈচিত্র্য আনার কোনো অভাব নেই। ঝোপগুলো শুধু যে মন মাতানো সুবাস ছড়ায় তা নয়, ঝড়বৃষ্টি থেকেও দেয় চমৎকার আশ্রয়। আর বালির গর্তে গড়াগড়ি দিয়ে শরীর এলিয়ে দেওয়ার কী যে সুখ! জলপানের জন্য আছে পুকুর।
এরকম খেয়ালখুশি মতো স্বর্গরাজ্যে আরও অনেক গাধা বাস করে। কিন্তু প্রচুর জায়গা আর খাবারের কোনো অভাব না থাকায় তাদের মধ্যে কখনও কোনো বড় ধরনের ঝগড়াঝাঁটি বা মনোমালিন্য দেখা যায় না। এমনকি হাঁসের মতো আরও কিছু সাধারণ বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের কোনো শ্রেণিভেদ তৈরি হওয়ার কথা শোনাও যায় না, সবাই এই যৌথ জীবনব্যবস্থায় মহা খুশি।
আহ, সেদিন যেমন গাধাটা গভীর চিন্তায় ডুবে ছিল, পণ্ডিতের মতো মাথা ঝুঁকিয়ে, জ্ঞানের প্রতীক তার লম্বা কান দুটো মাঝে মাঝে নড়ে উঠছিল। হঠাৎ তার দিকে এগিয়ে এল এক দুপেয়ে মানুষ। গাধা বরাবরই দুপেয়ে এই প্রাণীদের তুচ্ছজ্ঞান করে। কিন্তু এই মানুষটির কাছে এমন কিছু আছে যা তার আগ্রহ জাগাল, কী আবার! এক বোঝা তাজা খড়। ব্যস, মুহূর্তে তাদের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এখানে কোনো ঠকানোর বাণিজ্যের গন্ধ ছিল না। মানুষটি শুধু খড় এগিয়ে দিচ্ছে, আর গাধা তা মনের সুখে খাচ্ছে।
কিন্তু যেই না পেট ভরল, সেই দুপেয়ে মানুষটি খড়ের বোঝাটিকে লোভনীয় দূরত্বে রেখে হাঁটতে শুরু করল। আর গাধাটিও, মাঝে মাঝে দু-এক গ্রাস পেয়ে উৎসাহিত হয়ে, কিছু না ভেবেই তাকে অনুসরণ করতে লাগল। এভাবে তারা রাজপথে এসে পৌঁছাল। আর কী আশ্চর্য! বিনা নোটিশে মানুষটি খড়ের বোঝাটা কেড়ে নিল, গাধার মাথায় একটা লাগাম পরিয়ে দিলো, আর লাফিয়ে চড়ে বসল তার পিঠে! একের পর এক গোঁত্তা মেরে আর লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাকে বাধ্য করল নিজেদের সঙ্গে নিয়ে চলতে, সঙ্গে সেই খড়ের বোঝা।
গাধা কিন্তু চুপ থাকার পাত্র নয়। বিদ্রোহ করল সে। লাথি ছুঁড়ল, পেছনের দিকে টানল, আবার কখনও পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। যেন তার তরফ থেকে এ এক কঠিন বার্তা! অবশেষে, সে তার পিঠ থেকে সেই শাসককে পথের ধারে ফেলে দিতে সক্ষম হলো।
গাধাটি আবার মুক্ত হয়ে চারণভূমির দিকে ফিরে চলল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখল, অন্য মানুষেরা চারণভূমির চারপাশে বেড়া দিচ্ছে। তারা নাকি একে ‘ঘেরাও’ বলছে। গাধাটিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। সেই খড়ের মালিক আবার ফিরে এসে পরিস্থিতির সুযোগ নিল। তার এক বন্ধু একটি লাগাম নিয়ে এল, আর গাধার তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও জোর করে তার মুখে তা পরিয়ে দেওয়া হলো। তারপর দুজনেই গাধার পিঠে চড়ে বসল। এই উন্নত কৌশলের সামনে হতবাক হয়ে গাধাটি সেই মুহূর্তে নম্রভাবে চলতে শুরু করল। শুধু একটাই সান্ত্বনা, হয়তো পথের শেষে মিলবে একটু খড়।
অবশেষে সেই যাত্রা শেষ হলো। কিন্তু তা এক নোংরা, ধোঁয়া ওঠা এক শহরের কালো গলিতে, একটা ভাঙাচোরা, বাতাসযুক্ত চালাঘরে। সেখানে আছে ছত্রাক পড়া খড় আর বাসি জল, আর সারাদিনের খাটুনির পর তার হাড়গোড় ব্যথা হয়ে উঠেছে। কোথায় সেই নরম ঘাস! কোথায় সেই ঝোপ-ফুলের সুগন্ধ! এমনকি আশীর্বাদ করার মতো একটি কাঁটাযুক্ত গুল্মও নেই। এই কথাই ভাবছে বেচারা গাধাটি, যতক্ষণ না সারাদিনের ক্লান্তির পর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো।
কিন্তু তার ঘুম দীর্ঘস্থায়ী হলো না। নতুন মালিকেরা তাকে জাগিয়ে তুলে উঠোনে নিয়ে এল। তারা তার উপর লাগাম, একটি ভারী জিন এবং দুই পাশে দুটি বড় ঝুড়ি চাপিয়ে দিল। ঝুড়িগুলো লোভনীয় সবজি ও ফলে ভর্তি, কিন্তু গাধা সেগুলোর নাগাল পাচ্ছে না। তারপর দুজন আবার তার পিঠে চড়ে বসল এবং তাকে বাজারের দিকে নিয়ে গেল। কিন্তু এতে গাধার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হলো না, শুধু এক বোঝার বদলে অন্য বোঝা চাপানো হলো। সে এমন এক অবস্থায় পড়ল যার পিঠ ভালো জিনিসে বোঝাই, কিন্তু সে নিজে তা ছুঁতে পারে না; ক্ষুধার জ্বালায় রাস্তার আবর্জনা থেকে খাবার কুড়িয়ে খেতে বাধ্য হয়। সে মনে মনে বলল, ছি ছি, কী গাধাটাই না ছিলাম আমি! সেই চারণভূমি ছেড়ে এলাম!
এই কঠোর পরিশ্রম, দুর্ব্যবহার এবং সামান্য ও নিকৃষ্ট খাবারের জীবন বেশ কিছুদিন ধরে চলল, আর আমাদের গাধার ভাগ্যে উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। মাঝে মাঝে সে অন্য গাধাদের বিদ্রোহের কথা শুনত, কিন্তু তার ফল হতো কেবল বাঁধনটা আরও শক্ত হওয়া, আর বোঝার ভার আরও বাড়া।
অবশেষে একদিন (সেদিন ছিল আবার পহেলা মে!) তার জীবনে একটি দারুণ পরিবর্তন এল। তার মালিকেরা তাকে গাড়ি টানার কাজে লাগিয়ে দিল। কারণ এখন তাকে গাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, এ যেন তার একরকম ‘পদোন্নতি’! এতে তার মালিকেরা নিজেদের-সহ আরও বেশি ওজন টানতে পারছে। তো, মালিকেরা এবার তাকে একটি চারণভূমিতে নিয়ে গেলো; এটা সত্যিই অন্যরকম জায়গা! কিন্তু সেই চারণভূমিতে আছে তাঁবু আর অদ্ভুত ছবি আঁকা ভ্যানের বিশাল ভিড়। গানের তালে কাঠের ঘোড়ার সারিওয়ালা চাকা ঘুরছে; বাঁশি বাজছে আর বন্দুকের গুলি ছোড়া হচ্ছে। প্রচুর মানুষের ভিড়। সব মিলিয়ে দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ।
আমাদের গাধাটিকে গাড়ি থেকে মুক্ত করে ফিতে দিয়ে সাজানো হলো, এবং দুই মালিক তার পিঠে চড়ে অন্য গাধাদের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড় করালো। এবার শুরু হবে গাধা দৌড়। যেই না সংকেত দেওয়া হলো, তারা দৌড় শুরু করল। পায়ের নিচে নরম ঘাসের স্পর্শ পেয়ে গাধাটির কী যে আনন্দ! তাকে কোনো উৎসাহ দেওয়ার প্রয়োজন হলো না, জীবনের পুরোনো স্বাদ আর প্রাণপ্রাচুর্য তাকে এমনিতেই দারুণভাবে টেনে নিয়ে গেলো। সে এত দ্রুত দৌড়াচ্ছে যে প্রথমেই তার এক মালিক পড়ে গেল। তারপর অন্যজনও কিছুক্ষণ পিঠে থাকার বৃথা চেষ্টা ও অনেক আঘাতের পর ভিড়ের হাসির মধ্যে পড়ে গেল।
পিঠ থেকে বোঝা মুক্ত অনুভব করে গাধাটি সহজেই দৌড়ে জিতে গেল। সে এমন তেজ দেখাল এবং তার সেই কষ্টের জীবনে ফিরে যাওয়ার বিরুদ্ধে এত জেদ ধরল যে, কেউ আর তাকে পুরনো জীবনে ফিরতে জোর করতে পারল না। শোনা যায়, সে আবার তার সেই চারণভূমিতে ফিরে গিয়ে তার সরল ও স্বাধীন জীবন উপভোগ করতে শুরু করেছে।
নীতিকথা: এই গল্পের শেষে আলাদা করে কোনো উপদেশের প্রয়োজন নেই হয়তো। তবে যদি গাধার জায়গায় সাধারণ মানুষ বা শ্রমিক, প্রথম মালিককে ভূস্বামী বা জমির একচেটিয়া দখলদার, আর দ্বিতীয় মালিককে পুঁজিবাদ ধরে নেন, তবে দেখবেন এই সহজ রূপকথার মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, শিল্প ব্যবস্থা, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, এসবের খুঁটিনাটিও দিব্যি মিলে যাচ্ছে।