হুলিও কোর্তাসারের গল্প: ভালুকের ভাষণ
আমার বড় মায়া হয় ওদের ওপর। মানুষগুলো কত বড়, কত ভারী আর কত আনাড়ি!
হুলিও কোর্তাসার (১৯১৪-১৯৮৪) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী এবং উদ্ভাবনী কথাসাহিত্যিক। ১৯১৪ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে এক আর্জেন্টাইন পরিবারে তার জন্ম। জীবনের বড় একটা সময় তিনি আর্জেন্টিনায় কাটালেও রাজনৈতিক কারণে পরবর্তীকালে ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন বেছে নেন এবং ১৯৮৪ সালে প্যারিসে তার মৃত্যু হয়।
কোর্তাসার মূলত তার ছোটগল্প এবং নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাসের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘রাউয়েলা’ (ইংরেজি নাম ‘হপস্কচ’) আধুনিক উপন্যাসের ব্যাকরণ বদলে দিয়েছিল। তাকে বলা হয় ‘ছোটগল্পের জাদুকর’। লাতিন আমেরিকান ‘ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম’ বা জাদুবাস্তবতার আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা। হোর্হে লুইস বোর্হেসের সার্থক উত্তরসূরি হিসেবে তিনি লাতিন আমেরিকান ‘বুম লিটারেচারের’ এক অবিস্মরণীয় নাম।
‘ডিসকোর্স অব দ্য বেয়ার’ নামে এ গল্পটির মূল স্প্যানিশ শিরোনাম ‘দিসকুরসো দেল ওসো’। এটি ১৯৬২ সালে প্রকাশিত সংকলন ‘হিস্তোরিয়াস দে ক্রোনোপিওস ই দে ফামাস’-এর অন্তর্ভুক্ত একটি ছোটগল্প।
এটি মূলত নগরজীবনের যান্ত্রিকতার সমান্তরালে বয়ে চলা এক মায়াবী জগতের প্রতিচ্ছবি। গল্পের কথক স্বয়ং একটি অদৃশ্য ভালুক, যে একটি বহুতল দালানের জলের পাইপলাইনের ভেতরে বাস করে। কোর্তাসার এখানে ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম-এর প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। ‘ডিসকোর্স অব দ্য বেয়ার’ গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই কর্কশ আর যান্ত্রিক পৃথিবীর সমান্তরালে আরও একটি কোমল আর স্বপ্নময় জগৎ বিদ্যমান, যা কেবল হৃদয় দিয়ে অনুভব করা সম্ভব।
পুরোনো এই দালানটার একটা নিজস্ব প্রাণ আছে। দিনের বেলা যখন মানুষের কোলাহলে ইট-পাথরের দেয়ালগুলো থরথর করে কাঁপে, তখন আমি নিজেকে গুটিয়ে রাখি গভীর অন্ধকারে। কিন্তু যখন রাত নামে, শহরের রাজপথগুলো নিস্তব্ধ হয়ে আসে, আর বাড়ির প্রতিটি ফ্ল্যাটে জ্বলে থাকা আলোগুলো একে একে নিভে যায়- ঠিক তখনই শুরু হয় আমার যাত্রা।
আমি এই বিশাল অট্টালিকার জল ও বাতাসের পাইপলাইনের ভেতর বাস করা এক নিঃসঙ্গ ভালুক। তোমরা হয়তো ভাবছো, একটা ভালুক কীভাবে লোহার সরু নলের ভেতর দিয়ে চলাফেরা করে? আসলে আমি রক্ত-মাংসের সাধারণ কোনো বন্যপ্রাণী নই। আমি এই দালানের ধমনী দিয়ে বয়ে চলা এক পশমি প্রাণ, যার শরীরটা কুয়াশার মতো নরম আর বাতাসের মতো হালকা।
আমি যখন পাইপগুলো বেয়ে ওপরে উঠি, আমার লোমশ পিঠ ঘষে ঘষে লোহার পাইপের ভেতরের জং আর ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়। এই বাড়িটার জল আর বাতাস যে এখনো সচল আছে, তার কারণ আমি। আমি অনবরত ছুটে চলি এক তলা থেকে অন্য তলায়, গরম জলের তামাটে পাইপ থেকে শুরু করে হিটারের ধোঁয়াটে নলি পর্যন্ত। আমার কাছে এই পাইপলাইনগুলো কোনো যান্ত্রিক বস্তু নয়, বরং এক গোলকধাঁধাময় খেলার মাঠ।
মাঝে মাঝে আমি কৌতূহলী হয়ে উঠি। দোতলার রান্নাঘরের পাইপের কাছে গিয়ে যখন আমি একটু জোরে নিশ্বাস ফেলি বা মৃদু গর্জন করি, তখন বাবুর্চি গুইলারমিনা আঁতকে ওঠে। সে বিড়বিড় করে অভিযোগ করে, “উফ! এই পাইপ দিয়ে বাতাস চলাচলের কী সমস্যা! মালিককে বলতে হবে।”
সে জানে না, তার ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরেই আমি বসে আছি, তার রান্নার বাসি সুবাস শুঁকছি। আবার কখনও তিনতলার সেই একা মেয়েটি যখন হাত মুখ ধুতে যায়, আমি কলের মুখ দিয়ে আলতো করে আমার একটা থাবা বের করে দিই। সে গরম জলের স্পর্শে চমকে ওঠে, ভাবে জলের কলটা বোধহয় নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আমি তো শুধু তাকে একটু ছুঁতে চেয়েছিলাম।
রাতের নিস্তব্ধতায় আমার শ্রবণশক্তি প্রখর হয়ে ওঠে। পাইপের দেয়ালে কান পাতলে আমি শুনতে পাই এই বিশাল বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে থাকা শত শত গোপন দীর্ঘশ্বাস। আমি শুনি, পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতিরা ঘুমানোর আগে কীভাবে একে অপরের ওপর বিরক্ত হয়ে ঝগড়া করে। তারপর যখন তারা ঘুমিয়ে পড়ে, আমি তাদের স্বপ্নের শব্দ শুনতে পাই।
আমার বড় মায়া হয় ওদের ওপর। মানুষগুলো কত বড়, কত ভারী আর কত আনাড়ি! ওরা নিজেদের চার দেয়ালের চৌকো ঘরে বন্দী হয়ে থাকে, ওরা তো আমাদের মতো পাইপের ভেতর দিয়ে এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীতে পিছলে যেতে পারে না।
আমি যখন খুব খুশিতে থাকি, তখন পাইপের ভেতর গড়গড় শব্দ করতে করতে ওপর-নিচ করি। সেই ধাতব শব্দে মানুষেরা বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে। তারা বিরক্ত হয়, তারা পাইপলাইনের এই জঘন্য অবস্থার নিন্দা জানায়। কেউ কেউ তো অন্ধকারের ভেতরেই একটা চিরকুটে লিখে রাখে, “দারোয়ানকে বলতে হবে, পাইপগুলো সারাতে হবে।”
তারা ভাবে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি, কিন্তু তারা জানে না তাদের বিরক্তির পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভালুকের অপার আনন্দ।
রাত যখন আরও গভীর হয়, আমি চিমনি বেয়ে একদম ছাদে উঠে যাই। সেখান থেকে আমি দেখি রাতের আকাশ। যদি দেখি আকাশে রুপোলি চাঁদটা মেঘের আড়ালে নাচছে, তবে আমার মন খুশিতে ভরে ওঠে। তখন আমি বাতাসের মতো হালকা হয়ে পাইপ দিয়ে পিছলে নেমে আসি একদম নিচের তলায়, যেখানে বিশাল সব বয়লার ঘর। সেই অন্ধকার আর উষ্ণতায় আমি অনেকটা সময় একা একা কাটাই।
গ্রীষ্মকালের রাতগুলো আমার সবচেয়ে প্রিয়। ছাদে যে বড় জলাধার বা সিসটার্ন আছে, সেখানে নক্ষত্রের প্রতিবিম্ব পড়ে টলটল করে জল। আমি সেই নক্ষত্রমাখা জলে রাতে সাঁতার কাটি। আমি হাত দিয়ে আমার মুখ ধুই, প্রথমে এক থাবায়, তারপর অন্য থাবায়, সবশেষে দুই থাবা এক করে। সেই জল যখন আমার পশমে লাগে, আমার মনে হয় আমি যেন মহাকাশের কোনো এক গ্যালাক্সিতে স্নান করছি।
ভোর হওয়ার ঠিক আগে, যখন জানালার কাচগুলোতে প্রথম আলোর আভা এসে লাগে, তখন মানুষগুলো জাগতে শুরু করে। তারা তাদের বিষণ্ণ মুখ নিয়ে বাথরুমে যায় আয়নার সামনে দাঁড়াতে। আমি তখন চুপিচুপি কোনো একটা খোলা কলের মুখ দিয়ে আমার নাকটা বের করি। তারা যখন মুখে জল দেয়, আমি পরম মমতায় আমার জিব দিয়ে ওদের নাক চেটে দিই, ওদের গালে আমার পশম বুলিয়ে দিই। ওরা ভাবে ঠান্ডা জলের ঝাপটা লেগেছে, কিন্তু আসলে ওটা ছিল আমার আদর।
আমি জানি, ওরা আমাকে কোনোদিন দেখতে পাবে না। ওরা অভিযোগ করবে, ওরা মেকানিক ডাকবে, ওরা এই শব্দ আর এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি চাইবে। কিন্তু আমি তো ওদের শত্রু নই। আমি এই বাড়ির অদৃশ্য এক প্রহরী, যে তাদের একাকীত্ব পাহারা দেয়।
আমি যখন আমার গোপন আস্তানায় ফিরে যাই, তখন আমার মনে অদ্ভুত প্রশান্তি থাকে। আমি জানি, এই বিশাল যান্ত্রিক শহরে যেখানে সবাই সবার থেকে আলাদা, সেখানে অন্তত আমি ওদের অলক্ষ্যে থেকে একটু ভালোবাসা দিয়ে এসেছি।
আমি সেই ভালুক, যে পাইপের আঁধারে বাস করে এবং মানুষের অজান্তেই তাদের জীবনের অংশ হয়ে থাকে। যতক্ষণ এই বাড়িতে জল বইবে, যতক্ষণ পাইপের ভেতর দিয়ে বাতাস খেলবে, ততক্ষণ আমিও থাকব- ওদের গালে আলতো করে চুমু খেতে আর ওদের স্বপ্নের সঙ্গী হতে।
