শুনতারো তানিকাওয়া: এক জাপানি কবির অন্তর থেকে
তিনি এমন এক কবি, যিনি শিশুর চোখে দেখেন পৃথিবীকে।
শুনতারো তানিকাওয়া (১৯৩১-২০২৪) জাপানি কবিতার এক অনন্য কণ্ঠস্বর। আধুনিক জাপানি সাহিত্যের আকাশে তিনি যেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার আলো কেবল জাপানেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। তানিকাওয়ার কবিতা যেমন সরল, তেমনি গভীর; যেমন খেলাধুলার মতো হালকা ছন্দে, তেমনি জীবনদর্শনে পরিপূর্ণ।
তিনি এমন এক কবি, যিনি শিশুর চোখে দেখেন পৃথিবীকে, নির্মল বিস্ময় আর কৌতূহলের দৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তিনি পাঠককে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেন প্রতিদিনের পরিচিত জগতটির সঙ্গে।
তানিকাওয়ার কবিতায় ভাষা কখনো উচ্চকিত নয়; বরং বিনয়ী, শান্ত, স্পষ্ট। স্যুররিয়ালিজম দিয়ে শুরু হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কলমে জাপানি ঐতিহ্যবাহী ছন্দ, হাইকু ও তাঙ্কার ছায়া পড়ে। যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানি কবিতার দৃশ্যপটে তিনি সামনে আসেন একজন স্বাধীন, স্বকীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে। যেখানে কাব্যিকতা মানে কেবল অলংকার নয়, বরং নিজস্ব অনুভবের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।
তানিকাওয়ার কাব্যপথে হাঁটতে হাঁটতে পাঠক আবিষ্কার করেন, সাধারণ জিনিসের মাঝেও অসাধারণ সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। এই দর্শন তাকে যুক্ত করে উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের মতো কবিদের সঙ্গে, যারা প্রতিদিনের জগতকে কবিতার উপযোগী করে তোলেন।
তানিকাওয়ার নাম উচ্চারিত হলে মনে পড়ে যায় এমন এক কবির কথা, যিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন একটি সরল পঙক্তি, একটি সৎ অনুভব, একটি অনভ্যস্ত প্রশ্ন কিংবা একটি শিশুর হাসির মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে কবিতার আসল শক্তি। তার কবিতা আমাদের শেখায়— যে ভাষা হৃদয় ছোঁয়, সেটিই সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যের ভাষা।
নদী
মা,
নদীটা হাসছে কেন?
সে তো সূর্য তার গায়ে গায়ে হাসি তুলে দেয়,
টুকটুকে রোদ্দুরে টোকা মারে বলেই।
মা,
নদীটা গান গাইছে কেন?
কারণ আকাশে ভেসে যাওয়া একটা পাখি
তার কণ্ঠের প্রশংসা করেছে!
মা,
নদীটা ঠান্ডা কেন?
সে তো এখনো মনে রাখে
বরফ একদিন তাকে গভীর ভালোবেসেছিল।
মা,
নদীর বয়স কত?
ঠিক যতটুকু বয়স চিরতরুণ বসন্তের।
মা,
নদীটা কখনো থামে না কেন?
থামবে কী করে মা,
সমুদ্র-মাতা যে তাকে বুকে টেনে নেওয়ার অপেক্ষায়।
মাটি
স্মৃতি হলো
গভীর
সন্ধ্যার অন্ধকার।
বৃদ্ধ হতে থাকা মনে
অনুশোচনাও
কখনো কখনো হালকা আলো হয়ে জ্বলে।
ফুল ঝরে গেছে,
তবুও তাদের
বীজ পড়ে আছে আমার ভেতর।
আমি এখনো
সেই বীজ বুনে চলি—
এই মাটি
একদিন গান গাইবে বলে।
নিজেকে চিনুন
আমি বুড়ো মানুষ, লম্বা নই, মাথাও টাক।
অর্ধশত বছর ধরে কাটিয়ে দিয়েছি
শব্দ আর বাক্যের জঞ্জালে—
নাম, ক্রিয়া, অব্যয়, প্রশ্নবোধক চিহ্ন এসব নিয়ে।
এখন বরং নীরবতা ভালো লাগে।
যন্ত্রপাতি খারাপ লাগে না আমার,
তবে গাছ-গাছালিও ভালো লাগে,
তাদের নাম মনে রাখতে পারি না।
পুরোনো দিনের তারিখ নিয়ে তেমন খোঁজ নেই,
আর যারা নিজেদের বড় মনে করে, তাদের পছন্দ করিনা।
আমার চোখ একটু বিকৃত, দেখতে ঝাপসা, পড়তে ধোঁয়া ধোঁয়া,
আমার ঘরে কোনো মন্দির বা পূজার জিনিস নেই,
তবে একটা বড় ডাকবাক্স আছে আমার ঘরের সঙ্গে যুক্ত।
ঘুম আমার কাছে একটা আনন্দ,
স্বপ্ন দেখলেও সকালে তা মনে থাকে না।
এসব কথাই তো আমি জানি,
কিন্তু লিখলে মনে হয় ঠিক মিলে না।
আমার দুই সন্তান, চার নাতি-নাতনি আছে,
বিড়াল-কুকুর নেই।
গরমে বেশির ভাগ সময় টি-শার্ট পরে থাকি।
লিখে যাওয়া কথার জন্য হয়তো কোনো মূল্য দিতে হবে,
এটাও তো ঠিক।
এক বিকেলে বসে
এক বিকেল, পাতলা মেঘে আকাশ ঢাকা,
আমি বসে আছি সোফায়,
মুড়িয়ে থাকা শামুকের মতো নিরিবিলি।
কিছু কাজ আছে আমার করার,
কিন্তু আমি কিছুই করি না,
শুধু মুগ্ধ হয়ে বসে থাকি।
যে সব জিনিস সুন্দর, তা সুন্দরই থাকে,
আর যে কুৎসিত, তবুও যেন
কোনো না কোনো ভাবে সুন্দর লাগে।
শুধু এখানে থাকা
অদ্ভুত এক আশ্চর্য,
আমি নিজেকে ছেড়ে
কিছু অন্য কিছু হয়ে যাই।
আমি উঠে
এক চুমুক পানি খাই,
পানিও তো এক অসাধারণ বিস্ময়।
