ধারাবাহিক উপন্যাস
Published : 02 Oct 2025, 03:29 AM
মাঙ্গোশি শক্ত করে গাছটিকে জড়িয়ে ধরল, চোখ বন্ধ করলো, আর চোখ খোলার আগেই সে পৌঁছে গেল এক নতুন জগতে। সে দেখল বিশাল দানবের মতো গাছ, যাদের ডালপালা মেঘ ভেদ করে উঠে গেছে আকাশে। এরা হলো সিকোয়িয়া, বললো প্রবীণতম গাছ। এরা আমেরিকায় জন্মায়। কিছু গাছের বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি।
গাছ এতদিন বাঁচতে পারে? বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।
আরও অনেক বেশি। ওটা তো অন্যদের তুলনায় এখনো শিশু।
তারপর হঠাৎই সে নিজেকে খুঁজে পেল পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গাছের সামনে। ওটা ছিল এক ব্রিসলকোন পাইনের গাছ। সে ভেবেছিল গাছটা হয়তো শুকনো, বেঁকে যাওয়া, ভাঙাচোরা হবে। কিন্তু না! প্রায় দশ হাজার বছরের পুরোনো হয়েও সে ছিল অদ্ভুত শক্তিশালী, ঠিক যেন নাচতে থাকা এক পাক খাওয়া নৃত্যশিল্পী।
তুমি এত পুরোনো হয়েও এত শক্তিশালী দেখাও কীভাবে? জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।
আমি মানুষ আর তাদের শহর থেকে দূরে থাকি। আমার চিন্তা পরিষ্কার, আমার চাহিদা খুবই সামান্য। দিন যেভাবে আসে, আমি সেভাবেই মেনে নেই। যদি কোনো গোপন রহস্য থাকে তবে সেটা হলো এই, আমার বয়স যখন পাঁচ হাজার বছর হলো, আমি আবিষ্কার করলাম সময় বলে আসলে কিছু নেই।
তারপর মাঙ্গোশি চলে গেল এক শীতল আবহাওয়ার জায়গায়। সেখানে সে দেখল মহাগাছ, প্রশস্ত কাণ্ড, ছড়িয়ে পড়া বিশাল ডালপালা। এরা কত সুন্দর! এরা কারা? এরা হলো ইংলিশ ওক গাছ। তারা ভীষণ বিশেষ। অনেক পুরোনো দিনে মানুষ তাদের পূজা করত।
তারপর মাঙ্গোশিকে নিয়ে যাওয়া হলো এক উষ্ণ দেশে। সেখানে সে দেখল চওড়া আর খাটো গাছ, যাদের ডালপালা মাটির ভেতরে নেমে গেছে আর আবার শিকড়ে পরিণত হয়েছে। তারপর সে দেখল অগণিত বন, যেখানে সব গাছ ফিসফিস করছে, আর সবাই যেন তাকে লক্ষ্য করছে। তুমি কোথা থেকে এসেছো? গাছেরা জিজ্ঞেস করল।
আফ্রিকা থেকে, উত্তর দিল মাঙ্গোশি।
আর সেখানে বন কেমন আছে? আমরা শুনি, সেগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে, এটা কি সত্যি?
হ্যাঁ, মাঙ্গোশি আস্তে বললো।
গাছেরা মাথা নুইয়ে নীরব হয়ে গেল।
তারপর মাঙ্গোশিকে নিয়ে যাওয়া হলো এক ভীষণ গরম জায়গায়। চারদিকে শুধু বালি। গরম বালি, গরম হাওয়া, আর যেদিকে তাকায় সেদিকেই কেবল বালি। এটা কী জায়গা? মাঙ্গোশি জানতে চাইল।
এটা মরুভূমি। এখানে শুধু বালি ছাড়া আর কিছু নেই। এখানে খুব গরম। কিছুই বাঁচে না। কোনো গাছ নেই।
বাওবাব গাছ গভীর হেসে বললো, কখনো এখানে বিশাল বন ছিল।
সেগুলোর কী হলো?
যখন মানুষ গাছ মারে, তখন যা ঘটে, এখানেও তাই হয়েছে।
কিন্তু এখানে তো মানুষও নেই।
জানি, বললো প্রবীণ গাছ।
যেখানে গাছ নেই, সেখানে মানুষ কীভাবে বাঁচবে?
তারপর মাঙ্গোশিকে নিয়ে যাওয়া হলো অনেক দূরে এক বিশাল বনে। কিন্তু সেটা স্বাভাবিক বন ছিল না। সেটা ছিল এক দুঃখভরা জায়গা। গাছেরা অবিরাম হাহাকার করছিল। মাঙ্গোশির মনে হলো এটা বন, কারণ প্রথমে সে গাছ দেখল। কিন্তু ওগুলো গাছ ছিল না।
ওগুলো কী? মাঙ্গোশি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল।
এটা অ্যামাজন, উত্তর এলো। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাছের কবরস্থান। অনেক বছর আগে এখানে এত বিশাল বন ছিল যে পুরো মহাদেশ ভরে যেত। সেই বন পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করত। কিন্তু ভয়ঙ্কর হারে কেটে ফেলা আর পুড়িয়ে দেওয়ার ফলে এখন প্রায় কোনো বনই আর অবশিষ্ট নেই।
তাহলে আমি কী দেখছি, যদি এগুলো গাছ না হয়?
এগুলো হলো গাছের ভূত, বললো প্রবীণ গাছ।
তারা দুঃখিত শুধু এজন্য নয় যে মানুষ তাদের ধ্বংস করছে, বরং এজন্যও যে এর ফলে পৃথিবীর কী হবে।
পৃথিবীর কী হবে? জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।
গাছ পৃথিবীকে দেয় সেই বাতাস, যা আমরা শ্বাস নেই। মানুষ যত বেশি গাছ কেটে ফেলে, পৃথিবীতে বাতাস তত কমে যায়। তুমি জানো কি, যদি পৃথিবীতে একটিও গাছ না থাকে তাহলে কী হবে?
কী হবে?
তাহলে আর মানুষ থাকবে না।
সত্যি?
হ্যাঁ। মানুষ গাছের ওপর নির্ভরশীল। যখন তারা বন কেটে ফেলে, তখন তারা আসলে নিজেদের ভবিষ্যতই কেটে ফেলে।
কী ভয়ঙ্কর! মানুষ কি এটা জানে না?
জানতে পারে না, বললো সবচেয়ে বৃদ্ধ গাছটি।
যদি জানত, তবে এমনটা কখনো করত না।
মাঙ্গোশি চারদিকে তাকাল, যতদূর চোখ যায়, শুধু গাছের গুঁড়ি। এটা তার জীবনে দেখা সবচেয়ে দুঃখজনক দৃশ্য। সে যেন গাছেদের কান্নার শব্দও শুনতে পেল। আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো, সে বললো। এটা খুবই কষ্টের।
আমি শুধু চাইছিলাম তুমি তোমার নিজের চোখে দেখো, মানুষ কী করছে। এখন আমার সঙ্গে এসো। শক্ত করে ধরো।
এবার আমরা কোথায় যাচ্ছি?
কিন্তু বাওবাব কিছু বললো না। মাঙ্গোশি শক্ত করে ধরে রইল আর হঠাৎই সে চলে গেল অনেক দূরে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। সে নিজেকে খুঁজে পেল এক অদ্ভুত সুন্দর জায়গায়। সেখানে একটি বনে অনেক ছোট ছোট তরুণ গাছ। তারা খুশিতে ভরে গাইছে, গান করছে। আমি কোথায় এসেছি? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।
এটা আফ্রিকা, বললো প্রবীণ গাছ।
একসময় এখানে ছিল মরুভূমি। এখন এটা পৃথিবীর গাছেদের জন্য সবচেয়ে আনন্দময় জায়গাগুলোর একটি। এখানে মানুষ লাখো গাছ লাগিয়েছে, আর আমরা মরুভূমিকে আবার জীবিত করে তুলছি।
তাদের এত খুশি লাগছে কেন? জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি। দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর প্রবীণ গাছটি বললো, তোমরা মানুষ ভাবো আমরা গাছ শুধু সাজসজ্জা। কিন্তু আমরাও তোমাদের মতো প্রাণী। আমরা অনুভব করি। আমরা ভালোবাসা আর যত্নের জবাব দিই। আমাদের তুমি যদি ভালোবাসো, তবে দেখবে আমরা আলোয় ঝলমল করি। হঠাৎ এক ঝলকে প্রবীণ গাছ মাঙ্গোশিকে নিয়ে গেল ইংল্যান্ডের দক্ষিণে। সেখানে ঢেউ খেলানো প্রাচীন পাহাড়ের মাঝে শতবর্ষী অ্যাশ গাছ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ডালপালা আকাশ ছুঁয়েছে, আর বিশাল ছাউনি তৈরি করেছে। তাদের চারপাশ যেন আলোর আভায় মোড়া।
কী সুন্দর তারা! বিস্ময়ে বললো মাঙ্গোশি।
কারণ তারা ভালোবাসা পায়।
তুমি কি জানো, কেউ যদি শুধু পাশ দিয়ে হেঁটে যায় আর আমাদের দিকে তাকিয়ে ভালো কিছু ভাবে, সেটাই আমাদের সারাদিনের আনন্দ হয়ে যায়? কখনো কোনো গাছের পাশ দিয়ে নির্লিপ্তভাবে চলে যেও না। ভাবো না যে তারা অনুভব করে না। যতবার পারো, একটি গাছকে ছুঁয়ে দিও, অভিবাদন জানাও। আমরা নীরবে এত কাজ করি, যা এই পৃথিবীকে জীবিত রাখে।
আমি আর কোনোদিন গাছকে আগের মতো দেখব না, বললো মাঙ্গোশি। সে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল চারপাশের মহীরুহ গাছগুলোর দিকে। একটি এত বিশাল যে, তার পাশে দাঁড়িয়ে মাঙ্গোশির মনে হলো সে যেন পিঁপড়ে। এই বনটা একেবারে সেই বিশাল গির্জার মতো, যেখানে একদিন বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন, বললো মাঙ্গোশি।
কীভাবে তোমরা এত বড় আর মহিমান্বিত হলে?
তুমি নিজেই গাছটিকে জিজ্ঞেস করো, বললো বাওবাব।
আমি নিশ্চিত, সে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে।
তুমি কীভাবে এত বড় আর মহান হলে? মাঙ্গোশি জিজ্ঞেস করল সেই মহাগাছকে।
গাছটি এক অপূর্বভাবে হাসল। আমরা সবাই ছোট থেকে শুরু করি, বললো গাছটি। আমরা মাটির ভালোবাসা টেনে নেই, রোদ্দুরের ভালোবাসা টেনে নেই। আমাদের শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত হয় জীবনের ভেতরে। আমরা একে অপরকে ভরসা দিই। কেউ একা মহান হতে পারে না, আমরা সবাই মিলে একে অপরকে সাহায্য করি। আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হই। আমাদের ধৈর্য খুব বড়। ধৈর্যের জোরে যে কী আশ্চর্য কাজ করা যায়, তা তোমাকে অবাক করবে।
চলবে...