Published : 26 Jan 2026, 10:53 PM
বিজ্ঞানীরা সচরাচর পর্দার আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। যদিও তারা তাদের কাজগুলো অ্যাকাডেমিক প্রকাশনা বা বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশ করেন, কিন্তু তাদের সেই কাজগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমরা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বিজ্ঞানীদের জীবনী এবং তাদের আবিষ্কারের গল্পগুলো পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস নিয়েছি এই সিরিজে। আজ তেমনি এক নিভৃতচারী বিজ্ঞানীর গল্প নিয়ে উপস্থিত হয়েছি আপনাদের কাছে।
খুলনার শিক্ষকতা থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়া প্রবাসী বিজ্ঞানী ডক্টর নওশাদ হকের জীবনের পথচলা যেন এক নিঃশব্দ সংগ্রামের উপাখ্যান। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (সিএসআইআরও)-এর প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট।
এই প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থা এবং বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। প্রায় ৫ হাজার গবেষক এখানে কর্মরত, যার বার্ষিক বাজেট প্রায় বিলিয়ন ডলার। নওশাদ হক নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, “আমি একজন সায়েন্টিস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট।” অর্থাৎ যিনি মানুষের জীবন ও সমাজের উন্নয়নের জন্য গবেষণা করেন। চলুন তার গল্পটি জেনে নিই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বনবিদ্যা বা ফরেস্ট্রিতে পড়াশোনা করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, তারপর যুক্তরাজ্যে মাস্টার্স ও অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি, তার এই দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার প্রতিটি ধাপে ছিল অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ। ২০০৫ সালে তিনি সিএসআইআরও-তে যোগ দেন। তখন থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হাইড্রোজেন প্রযুক্তি, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও গ্রিন স্টিলের মতো ভবিষ্যৎমুখী গবেষণায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। দেশ থেকে বহু দূরে থাকলেও তার চিন্তায় বারবার ফিরে আসে বাংলাদেশ, তরুণ প্রজন্ম এবং তাদের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার কথা।
নওশাদ হকের বিশ্বাস, আজকের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সামনে সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমানে প্রযুক্তি যোগাযোগকে সহজ করেছে, তথ্যের দরজা খুলে দিয়েছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা আর কঠোর পরিশ্রম। এই আলোচনায় তিনি তার অভিজ্ঞতা, গবেষণা দর্শন ও উচ্চশিক্ষার বাস্তব দিকগুলো নিয়ে কথা বলেছেন। সেই আলাপ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো:
মশিউর রহমান: আপনার পথচলা যদি সংক্ষেপে বলেন- বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত এই পথ কীভাবে তৈরি হলো?
নওশাদ হক: আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বনবিদ্যায় পড়াশোনা করেছি। পরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। কিন্তু গবেষণার প্রতি টান ছিল ভেতর থেকে। তাই যুক্তরাজ্যে মাস্টার্স, তারপর অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করি। পিএইচডির পর নিউ জিল্যান্ডে কাজ করেছি এবং শেষে সিএসআইআরও-তে যোগ দিই। একেক ধাপে একেক চ্যালেঞ্জ এসেছে, কিন্তু শেখার আগ্রহ কখনো কমেনি।
মশিউর রহমান: আপনি নিজেকে “সায়েন্টিস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট” বলেন। এর অর্থ কী?
নওশাদ হক: আমি মনে করি, গবেষণার সার্থকতা তখনই, যখন তা সমাজ বা পরিবেশের উপকারে আসে। শুধু পেপার প্রকাশ করলেই হবে না, বাস্তবে তার প্রভাব থাকতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কার্যকর সমাধান তৈরি করাই আমার লক্ষ্য।

মশিউর রহমান: আপনার গবেষণার মূল ক্ষেত্র নবায়নযোগ্য শক্তি ও হাইড্রোজেন প্রযুক্তি। কেন এই ক্ষেত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ?
নওশাদ হক: কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো জ্বালানি ও পরিবেশ। সৌর ও বায়ু শক্তি ভালো, কিন্তু এগুলো স্থায়ী নয়। হাইড্রোজেন প্রযুক্তি দিয়ে আমরা বিদ্যুৎকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর করে সংরক্ষণ করতে পারি। পরে সেই হাইড্রোজেন ব্যবহার করে আবার বিদ্যুৎ পাওয়া যায় কোনো কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের বড় সমাধান হতে পারে।
মশিউর রহমান: বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা কীভাবে দেখেন?
নওশাদ হক: বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা শুরু করতে হবে এবং তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যাতে বিশ্ব যখন পুরোপুরি হাইড্রোজেন অর্থনীতিতে যাবে, তখন আমরা পিছিয়ে না থাকি।
মশিউর রহমান: আপনি ই-বর্জ্য নিয়েও কাজ করছেন। এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নওশাদ হক: বাংলাদেশে মোবাইল সাবস্ক্রিপশনের সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি। কয়েক বছরের মধ্যেই এগুলো ই-বর্জ্যে পরিণত হবে। এই বর্জ্যের মধ্যে সোনা, তামা, লিথিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতু থাকে। এগুলো উদ্ধার করা গেলে পরিবেশ রক্ষা হবে এবং অর্থনীতিও লাভবান হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশে আধুনিক ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট তৈরি হবে।
মশিউর রহমান: গ্রিন স্টিল নিয়েও আপনার কাজ আছে, সেটি সম্পর্কে বলুন।
নওশাদ হক: হ্যাঁ, স্টিল শিল্প বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পগুলোর একটি। গ্রিন স্টিল মানে হলো কয়লার বদলে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে ইস্পাত উৎপাদন করা। এতে পরিবেশের ক্ষতি কমবে। ভবিষ্যতের শিল্পায়নে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মশিউর রহমান: গবেষণার প্রভাব নিয়ে আপনি লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্টের কথা বলেন।
নওশাদ হক: অবশ্যই। একটি প্রযুক্তি বা পণ্যের জীবনচক্রে চারটি বিষয় দেখতে হবে- এনার্জি, কার্বন, পানি ও বর্জ্য। এই চারটি কমাতে পারলে সেটাকে পরিবেশবান্ধব বলা যায়। তরুণ গবেষকদের এটি শিখতে হবে।
মশিউর রহমান: বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে চাইলে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা কী জানা দরকার?
নওশাদ হক: প্রথমত, ব্যাচেলরে ফুল স্কলারশিপ পাওয়া খুব কঠিন। মাস্টার্স ও পিএইচডিতে সুযোগ বেশি। যারা গবেষণা করতে চায়, তাদের সরাসরি পিএইচডির চেষ্টা করা উচিত। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো আইইএলটিএস স্কোর অনেক সময় দুর্বল সিজিপিএকেও পুষিয়ে দেয়।
মশিউর রহমান: সুপারভাইজার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কী পরামর্শ দেবেন?
নওশাদ হক: আগে তার গবেষণা পড়ো, সাম্প্রতিক প্রকাশনা দেখো। তারপর ইমেইল করো। ইমেইলে পরিষ্কারভাবে লেখো তুমি কেন তার সঙ্গে কাজ করতে চাও। আর অবশ্যই আইইএলটিএস স্কোর প্রস্তুত রাখবে।
মশিউর রহমান: অনেকেই দালাল বা এজেন্টের কাছে যান। এটি নিয়ে আপনার মতামত কী?
নওশাদ হক: আমি খুব সতর্ক থাকতে বলি। আজকের ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সব তথ্যই অনলাইনে পাওয়া যায়। নিজে পড়ো, যাচাই করো। যারা টাকার বিনিময়ে পরামর্শ দেয়, তাদের অনেকেই ভুল তথ্য দেয়।
মশিউর রহমান: গবেষকের মানসিকতা কেমন হওয়া উচিত?
নওশাদ হক: ধৈর্য, কৌতূহল আর পরিশ্রম- এই তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন একটু একটু করে শেখো। ইংরেজিতে পড়ো, লেখো, শোনো। সফট স্কিল গড়ে তোলো, দলবদ্ধভাবে কাজ শেখো। বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ হাত ধরে শেখাবে না, নিজেকে নিজে গড়ে তুলতে হবে।
মশিউর রহমান: শেষ প্রশ্ন, বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আপনার মূল বার্তা কী?
নওশাদ হক: স্বপ্ন বড় করো, কিন্তু পা মাটিতে রাখো। প্রতিদিন পরিশ্রম করো। ব্যর্থ হলে হাল ছেড়ো না। আমি দেখেছি, গড়পড়তা ছাত্ররাই অনেক সময় সবচেয়ে দূরে যায়, কারণ তারা লেগে থাকে। “জিনিয়াস উইদাউট হার্ড ওয়ার্ক ইজ অ্যা ট্র্যাজেডি”, এই কথাটা মনে রাখবে।