Published : 24 Feb 2026, 03:23 PM
মায়ের কোল সব সন্তানের জন্যই নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয় যদি জন্মের পরই হারিয়ে যায়? জাপানের ইচিকাওয়া চিড়িয়াখানার ছোট্ট এক বানরছানার জীবনে ঘটেছে এমনই এক করুণ ঘটনা।
নাম তার ‘পাঞ্চ’। মায়ের আদর না পেয়ে একটি পুতুলকে আঁকড়ে ধরেই সে খুঁজে নিয়েছে বাঁচার অবলম্বন। পাঞ্চের সেই অসহায়ত্বের দৃশ্য ইন্টারনেটের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে। তবে হতাশার মেঘ কেটে এখন পাঞ্চের জীবনে এসেছে সোনালি রোদ। তার একাকীত্বের গল্পের মোড় এখন নতুন বন্ধুত্বের দিকে।
গত বছরের জুলাই মাস। জাপানে তখন তীব্র দাবদাহ। ঠিক সেই সময়েই জন্ম হয় জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির এই ছানাটির। কিন্তু প্রকৃতির রুক্ষতা আর নিজের অনভিজ্ঞতার কারণে পাঞ্চের মা তাকে প্রত্যাখ্যান করে চলে যায়। সদ্যোজাত ছানাটির তখন মায়ের শরীরের উষ্ণতা ভীষণ প্রয়োজন।
চিড়িয়াখানার কর্মীরা উপায় না দেখে তার হাতে তুলে দেন একটি ওরাংওটাংয়ের স্টাফড টয় বা নরম পুতুল। অদ্ভুত এক মায়ার বাঁধন তৈরি হয় পাঞ্চ ও সেই পুতুলের মধ্যে। পুতুলটির নাম দেওয়া হয় ‘ওরা-মা’। মায়ের অভাব মেটাতে এই পুতুলটিই হয়ে ওঠে তার দিনরাত্রির সঙ্গী। ঘুম, খাওয়া কিংবা ভয়- সব সময় বুকের কাছে শক্ত করে সে জাপটে ধরে রাখে তার এই জড় বন্ধুকে।
পাঞ্চের ভিডিও যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি অনেকেই। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, দলের অন্য বানররা তাকে মেনে নিচ্ছে না। কেউ তাকে ধাওয়া করছে, কেউবা লেজ ধরে টানছে। আর ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে পাঞ্চ ছুটে যাচ্ছে তার পুতুলের কাছে। মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে ওই পুতুলটি ছাড়া তার আপন বলতে আর কেউ নেই।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বানর সমাজে এ ধরনের আচরণ অস্বাভাবিক নয়। সেখানে শক্তিশালীরাই দুর্বলদের ওপর ছড়ি ঘোরায়। কিন্তু পাঞ্চের ক্ষেত্রে দৃশ্যটি বড়ই করুণ। নেটিজেনরা ‘কিপ গোয়িং পাঞ্চ’ বা ‘লড়ে যাও পাঞ্চ’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে তার জন্য শুভকামনা জানাতে থাকেন। তার এই নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের গল্প ছুঁয়ে যায় কোটি মানুষের হৃদয়।
তবে আশার কথা হলো, পাঞ্চ হার মানেনি। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি এক দারুণ খবর দিয়েছে। যে পাঞ্চ ভয়ে এক কোণে বসে থাকত, সে এখন ধীরে ধীরে মিশতে শুরু করেছে অন্য বানরদের সঙ্গে।
চিড়িয়াখানার প্রকাশিত নতুন ভিডিওতে দেখা গেছে এক হৃদয়জুড়ানো দৃশ্য। দলের অন্য একটি বানর পাঞ্চকে জড়িয়ে ধরে ‘গ্রুমিং’ করছে বা গা চুলকে দিচ্ছে। বানর সমাজে এই গ্রুমিং শুধুই পরিচ্ছন্নতা নয়, এটি বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং দলে গ্রহণ করে নেওয়ার চূড়ান্ত সংকেত। শুধু তাই নয়, পাঞ্চ এখন অন্য সমবয়সী ছানাদের পিঠে চড়ছে, খুনসুটি করছে। মাঝে মাঝে বড়দের ধমক খেলেও সে আর আগের মতো মুষড়ে পড়ছে না। তার মানসিক শক্তি বেড়েছে বহুগুণ।
চিড়িয়াখানার কর্মী শুম্পেই মিয়াকোশি বলেন, “পাঞ্চ এখন সক্রিয়ভাবে অন্যদের সঙ্গে মিশছে। আমি অনুভব করতে পারছি, সে বড় হয়ে উঠছে। মানসিকভাবে সে এখন অনেক শক্তিশালী।”
কেন এমন হলো? অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন বেহির মতে, পাঞ্চের মা অনভিজ্ঞ ছিল এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই হয়তো সন্তানকে ত্যাগ করেছে। আর পুতুলটি দেওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। বানর ছানারা মায়ের লোম আঁকড়ে ধরে পেশিশক্তি বাড়ায় এবং নিরাপত্তা অনুভব করে। মায়ের অনুপস্থিতিতে ওই ওরাংওটাং পুতুলটিই পাঞ্চের ‘সারোগেট মাদার’ বা বিকল্প মা হিসেবে কাজ করেছে।
থাইল্যান্ডের মু-ডেং (জলহস্তী) কিংবা অস্ট্রেলিয়ার পেস্তো (পেঙ্গুইন) সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু প্রাণী তাদের আদুরে স্বভাব দিয়ে ইন্টারনেট তারকা বনে গেছে। পাঞ্চও এখন সেই তালিকার ওপরের সারিতে। তার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে, তাকে একনজর দেখতে চিড়িয়াখানায় ভিড় জমাচ্ছেন হাজারো দর্শনার্থী। পাঞ্চের সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে আসবাবপত্র কোম্পানি ‘আইকিয়া’ চিড়িয়াখানায় একগাদা সফট টয় উপহার দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি ও দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।